রম্যরচনা-তে বিকাশ এস জয়নাবাদ

কলা

বাজারের সাথে ঠাকুরের লিঙ্কটা যুক্ত করার পর চাঁপাকলায় গ্যাস । অপোক্ত অখাদ্য চাঁপাকলায় হলুদবরণ রঙ । এক’শ কুড়ি টাকা ডজন । সাধন ভজন জানা থাকলে ফলের প্রত্যাশা না করেও মোক্ষ পাওয়া যায় ।বেনাচিতি ফলপট্টিতে সব ব্যবসায়ী লালে লাল । বাংলার কেতাবীবাবুদের কেতা খুলে ফলতে পড়কে পড়কে তুঁত ।তিতিবিরক্ত কবি অনিকেত ঝগড়ুটেদের পিঠে ঝামা ঘষে দিতে নিউটন বাজার থেকে একগাছি দড়ি , হাতুড়ি মার্কা বালতি আর একপোয়া তুঁত কিনে বুঁদ।স্বর্গ ।স্বর্গ টর্গ বলে কিছু নেই যত পাপপূণ্য বেনাচিতি বাজারে। বাজার দখল করবার লড়াই। রাজায় রাজায় লড়াই, একদিন বেনাগাছের জঙ্গলে মঙ্গলকাব্য লিখেছিল যারা, চিৎকার করে আওয়াজ তুলত লাল দুর্গাপুর লাল সেলাম তারাই জামা পাল্টে ঘাসফুল। ফুল বেলপাতা ধূপ পান আর কলা থাকলে সমস্ত পাপ কিডনি থেকে বেড়িয়ে যায়।বাঁচতে হলে কলা চাই কলা।  রাজারা কলা দেখায় বলে জনগণ ঠাকুরকে প্রতি পুজোয় কলা দেখায়।চাঁপাকলা। চাপা সন্ত্রাস। বেনাচিতি বাজারের কলা ব্যবসায়ীরা ঘুষখোরদের আচ্ছা করে পিটিয়ে ছবি তুলে ভাইরাল করল, সেদিনও কলা।সব চুপ।আইন আইনের পথে চলে। গ্রাম্য মানুষ সান্ধ্য দৈনিকে চাপা সন্ত্রাস থেকে বাঁচতে রাশিফল খোঁজে বলেই শেরগড়ের কবি চণ্ডীপালের কাব্যে –
আল চাল কাঁষক্ষীর নৈবিদ্য চাপর কলা ।
ঘৃতের পদীপ জ্বালে ধূপের পাঞ্জলা ।।
কথ্য ভাষায়  ‘ চাপর কলা ‘ চাঁপাকলা ! হয়ত । কলা না দেখালে ‘মাঞী’ সন্তুষ্ট হন না । মাকে ভুলিয়ে ভালিয়ে কলা দেখিয়ে তার ভিটেমাটি ছাড়া করবার ইতিহাস বড় প্রাচীন । মেজেডি বা বনগ্রাম প্লটের  উদ্বাস্তুরা নিজেদের বাড়ন্ত উঠোনে মায়ের নিজের হাতে লাগানো তুলসী আর চাঁপাকলাকে স্থান দিতে না পেরে গর্ব অনুভব করে । লোহা কারখানার ছাই, সিমেন্ট কারখানার ছাই, রাস্তার ধারের নার্সিংহোমের পাশে যে জীবন্ত পাথর ভাঙ্গার কারখানা তার ছাইভস্ম মেখে সদাশিব।দূরে আমলৌকায় দাঁড়িয়ে , সঙ্গমরত অবস্থায় , অণ্ডাল বিমানবন্দর থেকে উড়ে যাওয়া বিমানের খোঁজ রোজ নেয়  তামলা এবং বরিগপোঁতা নদী ।  দেড় মাইল দূরে উখড়োর রথ। আধ মাইল দূরে ইছাপুরগ্রামের রথ। রথ দেখা আর কলা বেচা দুটোই সমানতালে ক্রিয়াশীল। ইছাপুরগ্রামের উত্তরপূর্বে একটা যমের মন্দির  আছে।  পাহারাদার। মন্দিরের পিছনে মিথেন গ্যাসভান্ডার।মাটির তলায় গ্যাস,  কয়লা। উঠিয়ে লে। একবার যদি আগুন লাগে তবে জ্বলে পুড়ে খাক। সপ্তাহেএকদিন যমের পুজো দেন  গ্রামের চাষী বউ কল্যাণী। সকলের কল্যাণের জন্য।কলা।এখন কেউ অন্যের জন্য চিন্তা করেনা। করে নিজের জন্য,নিজের স্বামীর জন্য, নিজের সন্তানের জন্য।এটাই যুগধর্ম।
ধর্ম কি যম?  যমের দুয়ারে পড়ল কাঁটা!
হতে পারে আবার নাও হতে পারে । ধর্মটাই অধর্ম। বিভেদ। ধর্মব্যবসায়ীরা জানেন
জাতপাতের হাত পা মাথা মুণ্ডু কুমারডিহির পরিত্যক্ত খোলামুখ খনিতে ফেলে দিলে জীবনেও উঠবে না । কিন্তু তাঁরা বিভেদ চায়!তাই জলজ্যান্ত টুমনি নদীকে কালোদানোরা চিবিয়ে চিবিয়ে খেয়ে লিলে তার হাড়গোড় ছুঁড়ে ছুঁড়ে সেই অতল খাদে ফেলে দিলে আর জোয়াল ভাঙ্গার তীরে  দাঁড়ায় ধর্ম লাচ্ছে । লাচুক । রামাই পণ্ডিত শূণ্যপুরানে চিনিচাঁপাকলা সম্পর্কে গাইছেন –
              চিনিচাঁপা কলা             সেত ফুল মালা
                           আগোর চন্দন আর ।
              ঘৃত মধু ফল                 আতপ তণ্ডুল
                           গঙ্গাজল ভারে ভার ।।
বাংলার গ্রামে গৃহস্হের ঘরে কলার গাছ থাকত। কত ধরনের কলা, কত তার নাম।কলার পাতা ছিল পবিত্র, খোল ছিল পূজার অঙ্গ। কলার ফুল (মোচা) এবং থোড় ছিল বাঙালির প্রিয় খাদ্য।কলার তন্তু দিয়ে কাপড় বানানো হত। বাঙালির জীবনের অঙ্গ ছিল কলা তাই সে কলা বিক্রি করতে করতে রথের মেলা দেখত। ধর্মকর্মে পাকাকলা শুধু নয় কাঁচকলাও পূজার অঙ্গ।  কাঁচকলার খাদ্যগুণও অসাধারণ। সস্তার খনিজ লোহা। অনেকের শ্রাদ্ধে আবার কাঁচকলা দিতে হয়। নেতাদের কলা দেখাতে পারে না বলেই চিনিচাঁপা কলা কারবাইড ঢেলে হলুদরঙা করা কলা কিনে পায়ে নিবেদন করে। রক্ষা কর মা।
কলা আজ পণ্য। পণ্যই আজ ধর্ম।
ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।