সারারাত বৃষ্টি ছিলো। এখন দুপুর গড়িয়েও সে বৃষ্টির বিরাম নেই। বস্তির ঝুপড়ি ঘরের বিছানায় কাঁথা জড়িয়ে শুয়ে আছে মনোয়ার। একটু পরই তাকে উঠতে হবে। রিক্সা নিয়ে বেরোতে হবে। শরীরটা বেশ জুত লাগছে না। এমন না যে তার কাছে খাওয়ার পয়সা নেই। কিন্তু তবুও তাকে বেরোতে হবে। সে এখন টাকা জমাচ্ছে। হাতে বেশ কিছু টাকা হলে সে গ্রামে ফিরে যাবে। একটা মুদি দোকান দিবে। রিক্সা চালানোর চাইতে মুদি দোকান চালানোর কষ্ট অনেক কম। মনোয়ার কম কষ্ট করে জীবন পার করতে চায়। তার বেশি টাকা পয়সার দরকার নাই। খেয়ে পরে জীবন কাটলেই হলো।
দরিদ্র পরিবারের সন্তান মনোয়ার। বাপের দাদা,তার ও দাদা সবাই পরের জমিতে, বাড়িতে কামলাগিরি করেই জীবন পার করে গেছে। মনোয়ারের বাপ-চাচারা ছয় ভাই। তাদের মধ্যে মনোয়ারের বাপ আবদুর রহিম সবার ছোটো। সে কিছুদিন স্কুলে যাবার সুযোগ পেয়েছিলো। ফলে তার মাথায় নিজের সন্তানকে শিক্ষিত করবে এই চিন্তাটা ঢুকে গিয়েছিলো। সে পরিবার পরিকল্পনা গ্রহণ করেছিলো মসজিদের ইমামের নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে। ইমাম সাহেব বলেছিলো, রিজিকের মালিক আল্লাহ। আল্লাহ যাকে পৃথিবীতে পাঠান তার রিজিক দিয়েই পাঠান। কাজেই তুমি এ পৃথিবীতে কারো আসার পথ বন্ধ করতে পারো না।
আবদুর রহিম মসজিদের ইমাম সাহেবের কথা শোনে নি। গ্রামের লোকদের ধারণা এ কারণেই আবদুর রহিম আজ পঙ্গু।
তবে আবদুর রহিম সেটা বিশ্বাস করে না। তার কথা একটানা ঘন বরষায় ভিজে ভিজে গাছপালা সব পিচ্ছিল হয়ে উঠেছিলো। সেই পিচ্ছিল গাছে উঠার সময়ের অসাবধানতার কারণেই পড়ে গিয়ে তার কোমরের হাড় ভেঙেছে। আল্লাহ কখনোই জন্ম নিয়ন্ত্রণ করার কারণে তাকে শাস্তি দিতে পারে না। তুচ্ছ কারণে করুণাময় আল্লাহ মানুষকে শাস্তি দেন না!
কিন্তু মনোয়ার মনে মনে ভাবে ওর যদি আর দুইটা ভাই থাকতো তাহলে পুরো সংসার চালানোর ভার এখন তাকে বইতে হতো না।
বাবা মায়ের একমাত্র সন্তান হওয়ায় দায়িত্ব পালন আর পরিশ্রম দুই-ই তাকে বেশি করতে হয়।
কাঁথার নরম ওম ছেড়ে উঠতে ইচ্ছা করে না। মনোয়ার মাথাটা একটু হাল্কা তুলে দরজার দিয়ে বাইরে তাকায়। সরু গলিটা তুমুল বৃষ্টির দাপটে কেমন জুবুথুবু হয়ে আছে। উল্টোদিকের ঘরটার নড়বড়ে লাল টিনের দরজাটায় তালা ঝুলছে। ওটা আয়নুলের ঘর। আয়নুল আর তার তৃতীয় পক্ষের স্ত্রী কারিশমা ভ্যানে ভাত তরকারি বিক্রি করে। দরজায় তালা মানে ওরা কাজে বেরিয়ে গেছে। আয়নুলের শালা,কারিশমার সৎ ভাই মতিমিয়ার কথা মনে পড়ে। আয়নুলদের সাথেই থাকে।কোন কাজ-কাম জানে না। ভীষণ বোকা হাবা মতিমিয়াকে লোকজন ঠকায়, মারে,বকে। বাপ মা নাই। আয়নুল আর তার বউ মায়া করে তাকে তাড়িয়ে দেয় না।তবে তাকে ঘরে রেখে যাওয়াও নিরাপদ মনে করে না। তাই কাজে যাওয়ার আগে ঘরের বাইরে রেখে যায়। ছেলেটা সারাদিন পথে পথে ঘোরে। এর তার কাছে চেয়ে চিন্তে খায়। যদিও আয়নুলের বউ নাকি তাকে ভাত খাওয়ার জন্য টাকা দিয়ে যায়। কিন্তু সেই টাকা দিয়ে কখনো মতিমিয়াকে মুড়ি আর বনরুটি ছাড়া আর কিছু কিনে খেতে দেখা যায় না।
বৃষ্টির মধ্যে লোকজন কাউকে চোখে পড়ে না।। তবু আন্দাজে মতিমিয়ার নাম ধরে ডাক দেয় মনোয়ার। দু’বার ডাক দিতেই মতিমিয়ার দেখা মেলে। এক ঠোঙা মুড়ি নিয়ে ঘরে ঢোকে সে। মনোয়ার বলে মুড়ি খাসসোস?
খাইবে? মতি মিয়া হাবাগোবা হলেও বেশ উদার। সে মুড়ির ঠোঙা মনোয়ারের দিকে এগিয়ে দেয়। মনোয়ার হাত বাড়িয়ে এক মুঠো মুড়ি নিয়ে বলে, চা খাবি?
মতিমিয়ার চোখ উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। শুকনো মুড়ি চিবোতে ভালো লাগছে না।সে বলে, খামু।
তাইলে মুড়ির ঠোঙ্গাটা ঐ টেবিলটার উপরে রাইখা শামসুলের দোকান থেইকা আমার নাম কইয়া দুই কাপ চা নিয়া আয়।
চায়ের কথা শুনে মতিমিয়া যতোটা খুশি হয়েছিলো, এই বৃষ্টির মধ্যে বাইরে গিয়ে চা আনতে হবে শুনে সে ততোটাই চুপসে যায়।
মনোয়ার বলে, কী হইলো? চা খাবি নে?
যেইরাম বিস্টি! মতিমিয়া আমতা আমতা করে।
মনোয়ার বেড়ার গায়ে গুঁজে রাখা একটা বড়সড় পলিথিনের প্যাকেট দেখিয়ে বলে ঐটা মাথায় দিয়া যা। ভিজবি না।
বৃষ্টিতে না ভেজার সমাধান পেয়ে মতিমিয়া খুশি মনে চা আনতে বেরিয়ে যায়।
২.
আকাশের মেঘ বুঝি আজ আর ফুরোবার নয়। ঘন কালো মেঘের পুরু আস্তরণ, দেয়ালের পলেস্তরার মতো আকাশের গায়ে লেপ্টে আছে। বেশ ভালোই জল জমে গেছে রাস্তায়,
সিটি কর্পোরেশনের উন্নয়ন কাজ চলছে।
খোঁড়াখুঁড়ি,কাটাকাটির ফলে এবড়ো থেবড়ো, উঁচু-নীচু, ইট-পাথর-লোহা-লক্কর-নানা কিছুর স্তুপে রাস্তার অবস্থা দূর্গম পাহাড়ী পথ যেনো।চলাচল করাটা বেশ কঠিন।
মনোয়ার রিকশা নিয়ে বেরিয়েছে। শরীর টানছিলো না। তবু বেরিয়েছে। কারণ বৃষ্টি বাদলার দিন ভাড়া বেশি পাওয়া যায়। মনোয়ারের টাকা দরকার। হাজার পঞ্চাশেক টাকা হলেই সে গ্রামে চলে যাবে। বাজারে একটা দোকান নেবে। টাকার অভাবে ক্লাস সেভেন এ উঠার পরই রোজগারে নামতে হয়েছিলো। তারপর আর এগোয়নি।এমনিতেই সে ততোটা মেধাবী নয় তার ওপর পড়াশোনার প্রতি আগ্রহী ছিলো না। হলে পাশের গ্রামের রোকুনের মতো নাইট স্কুলে পড়তে পারতো। তা মনোয়ার পড়েনি আর। সারাদিন কামলা খেটে দিন শেষে পাওয়া মজুরীটুকু মায়ের হাতে তুলে দিয়েছে। তবে খুশি হয়ে কেউ বখশীশ দিলে ( মনোয়ার সেটা প্রায়ই পেতো) সেটা নিয়ে বড় বাজারে চলে যেতো৷ কোনো কোনোদিন বড়বাজারের মঞ্জুশ্রী সিনেমা হলে নাইট শো দেখে ফিরতো। কোনোদিন কামালের দোকানে চা, চপ,বেগুনি এসব খেয়ে বাসায় ফিরতো।
বাবা ছেলের ইনকামে খারাপ যাচ্ছিলো না দিন। কিন্তু ঐ যে বলে না, কপাল! ঐ কপালে অভাবই লেখা চিরকাল। তাইতো বছর চারেক আগে এক তুমুল বৃষ্টির দিন
মোল্লাবাড়ির গাছ ছাঁটতে গিয়ে গাছ থেকে পড়ে কোমর ভেঙে যায় আবদুর রহিমের।
সেই থেকে আবার অভাবের শুরু। ভাত মেলে তো নুন মেলে না। আবার ভাত নুন দুটোই মিললো তো বাবার ওষুধ মেলে না।
সংসারে তো নয় যেন অকূল দরিয়া।মনোয়ারের বয়স কম। অভিজ্ঞতাও কম। কামলা খাটার মতো কাজ সে পেরে উঠছিলো না। যে কাজ তার বাপ এবং অন্যেরা এক রোজেই শেষ করতে পারে সে কাজ করতে তার দেড় রোজ লাগে। গেরস্থ বাড়ির লোকজন তাকে কাজ দিয়ে তুষ্ট হয় না। অবশেষে গ্রামেরই শুভাকাঙ্খীদের পরামর্শে ঢাকায় চলে এসেছে মনোয়ার। প্রথমে রাজমিস্ত্রির জোগালির কাজ করলো কিছুদিন। কিন্তু ওতে বড্ড চাপ৷ একদিন বাদ দেওয়ার উপায় নেই। তাহলে অন্যজন স্থলাভিষিক্ত হয়ে যায়। বেকার লোকের তো অভাব নেই। এরপর আরো টুকটাক এটা সেটার চেষ্টা করলো। অবশেষে এলো রিক্সা চালানোতে। এতে পয়সা আছে। স্বাধীনতাও আছে। ইচ্ছা হলো যাও। কিংবা কখনো প্যাসেঞ্জার কে মানা করে দাও! তাছাড়া ইনকামও ভালো। তিনমিনিটের পথ রিক্সা টানলে বিশ তিরিশ টাকা পাওয়া যায়।
মনোয়ার কুড়ি বছরের জোয়ান ছেলে, দিনে পাঁচ ছয় ঘন্টা রিক্সাটানা তার জন্য কঠিন নয়। এবং আরো এক দুই ঘন্টা বেশি টানলে দিনে হাজার টাকা আয় হয়।
গ্যারেজে দুশো দিয়েও ভালো টাকা হাতে থাকে।
এবং তখনই মনোয়ারের মাথায় চিন্তাটা আসে। ঢাকা শহরটা তার শুরু থেকেই ভালো লাগে না। ভীড়, হৈ হুল্লোড়,জ্যাম।এতো বড় বড় দালান কোঠা, এতো দামী দামী গাড়ি রাস্তায়, ধনী মানুষেরা ঘুরে বেড়ায়, ঝলমলে পোষাক-আষাকে, আর তার পাশে বিশাল দরিদ্র মানুষের বাস, ছেঁড়া কাপড়ে ভিক্ষে করে, ডাস্টবিন ঘেঁটে খায়। একই বয়সে ধনীর সন্তান যখন গাড়ি করে স্কুলে যায় তখন ছিন্নমূল শিশু গুলো রাস্তায় কাগজ টোকায়, বাড়ি বাড়ি ময়লা পরিস্কার করে!এ শহরে মানুষের দাম নাই।
দারিদ্র গ্রামেও আছে। এবং মনোয়ার নিজেও সেই দারিদ্র্যের প্রত্যক্ষ ভোগী। কিন্তু তারপরও তার মনে হয় গ্রামে অল্প খেয়ে পরে সুখ না হোক, শান্তিতে থাকা সম্ভব। কিন্তু এ শহরে বড় অস্থিরতা। সারাক্ষন মৃত্যুভয় তাড়া করে ফেরে মানুষকে। আর কে যে সাধু কে যে শায়তান মুখোশের আড়ালে তা বুঝতে পারা কঠিন।
বুকের খুব গভীরে অনুভূত হয় রান্নার চাতালের নীচে মায়ের পাশে বসে গরম ভাত আর আলুভর্তাই অমৃত। বাবা যখন দরদ মাখা কন্ঠে বলে, আইজকা বাড়ীত বইস্যা বিশ্রাম করো বাজান। একদিন উপাসে আমরা কেউ মরমু না। তোমারে এতো কষ্ট করতে হবে না– বুকের ভেতর কী মহা তৃপ্তি স্পর্শ করে যায়। অমন মমতা অমন ভালোবাসা অমন দরদ ভরা কন্ঠ এ শহরে কই!
মনোয়ার ভাবে, খুব বেশি নয় হাজার পঞ্চাশেক টাকা জমাতে পারলেই সে গাঁয়ে ফিরে যাবে।গ্রামে ফিরে ব্যবসা করবে। দোকানদারী।বড় বাজারে একটা মুদী দোকান নেয়ার স্বপ্ন তার।বেশি লাভ চাইনা তার।বেশি টাকাও নয়। মোটামুটি হলেই চলবে।
৩.
লতিফাকে বেশ ভালো লাগে মনোয়ারের। টলমল পুকুরের মতো চোখ। ঐ চোখ সব সময় কথা বলে। শীর্ণ দেহী, গোলাপের মতো লতিফাকে দেখলে সব তালগোল পাকিয়ে যায় মনোয়ারের। আর সেটা বুঝতে পেরে লতিফা খিলখিল করে হেসে লুটিয়ে পড়ে। পুকুরের জল তিরতির করে কেঁপে ওঠে। নারকেল পাতায় হাওয়া বয়ে যায় উদাস সুর তুলে। দূরে কোথাও নাম না জানা কোনো পাখী একটানা সুর তুলে গাইতে থাকে! মনোয়ারের তখন রাগ হওয়ার বদলে লতিফার প্রতি মুগ্ধতা আরো বেড়ে যায়।
ও জানে, লতিফাও ওকে পছন্দ করে। চোখের গভীর দৃষ্টি মেলে লতিফা যখন মনোয়ারের দিকে তাকায় সে দৃষ্টিতে মনোয়ার নিজেকে হারিয়ে ফেলে।
বড় বাজারে লতিফার বাবার চা সিঙ্গাড়ার দোকান আছে। মনোয়ার যদি বড় বাজারে একটা মুদি দোকান দেয় লতিফার বাবা মেয়ে দিতে অস্বীকার করবে না। লতিফার বড় বোন আছে। তার বিয়ের পর লতিফার পালা। লতিফার বাবা একদিন কথায় কথায় বলেছিলো মেয়েদের সে গাঁয়ের বাইরে বিয়ে দেবে না। মেয়েদুটো তার কলিজার টুকরা। প্রতিদিন একবার তাদের মুখ দেখতে না পারলে সে মরেই যাবে।মনোয়ার তাই দ্রুত টাকা জমানোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। গ্রামে ফিরে দোকান দিয়ে তারপর সে লতিফাকে ঘরে তুলবে!
৪.
টাকা মনোয়ার ঘরেই রাখে। ঘরের ভেতর কাপড় চোপড় রাখার জন্য যে ট্রাংকটা ঢাকায় এসেই রায়ের বাজার থেকে কিনে নিয়েছিলো, সেখানেই সব কাপড়ের নীচে একটা পুরানা শার্টের পকেটে টাকা জমায় সে।
রিক্সা গ্যারেজের মালিক ফজলু ভাই অবশ্য কথায় কথায় একদিন বলেছিলো টাকা পয়সা ব্যাংকে রাখাই ভালো। নিরাপদ থাকে। কিন্তু ব্যাংকে হিসাব খোলার জটিলতার কথা ভেবে সে পথে আর যায় নি মনোয়ার।
ঢাকায় আজ প্রায় আড়াই বছর পেরিয়েছে। মাসে মাসে নিজের খরচ,বাড়িতে টাকা পাঠানোর পরও সাতাশ হাজার টাকা জমিয়ে ফেলেছে । আর একটু বেশি পরিশ্রম করলে পঞ্চাশ হাজার টাকা জমাতে খুব বেশি সময় লাগবে না।
দ্রুত টাকা জমিয়ে বাড়ি ফেরার তাড়নাতেই আজ এই ভীষণ বর্ষণমূখর দিনে শরীর এবং মনের প্রবল অনিচ্ছা সত্ত্বেও রিক্সা নিয়ে বেরিয়েছে মনোয়ার।
সকালে তো তার বিছানা ছাড়তে ইচ্ছাই করছিলো না। মনে হচ্ছিলো সারাটা শরীর জমাট বেঁধে আছে। একটু দুরমুশ করতে পারলে সচল হবে! তারপর মতিমিয়ার আনা চা খেয়ে একটু অবসাদ কেটেছিলো বটে কিন্তু এখন বৃষ্টিতে ভিজে দুটো খেপ মারার পর ফের ক্লান্তি এসে ভর করেছে। কিন্তু ক্লান্তিকে প্রশ্রয় দিলে চলবে না। দরকার হলে অন্য একদিন সারাদিন টানা বিশ্রাম নেবে। কিন্তু বৃষ্টিতে পথে থাকতেই হবে। ভাবতে ভাবতে রিক্সা টেনে নিয়ে একটা চা দোকানের সামনে থামে মনোয়ার। দোকানটায় বেশ ভীড়। দোকান ভরে সবই তারমতো স্বল্প আয়ের লোকজন। দুই তিন সারি কাঠের লম্বা লম্বা টুল পাতা। লোকজন ওতে বসে পানাহার করছে। একপাশে একটা মস্তো কড়াইতে সিঙ্গাড়া পুরী ভাজা হচ্ছে। চা দোকানের ছোট্ট ছাউনীটার নীচে বৃষ্টিতে ভেজা লোকজনের গায়ের গন্ধের সাথে পোড়া তেলের গন্ধ মিশে চাপা একটা গন্ধ ঠান্ডা বাতাসটাকে ভারী করে তুলেছে। সাথের ভেজা গামছাটা দিয়েই চুল মুখ মুছতে মুছতে দুটো পুরী আর বেশি করে দুধ চিনি দেয়া কড়া লিকারের এককাপ চা এর অর্ডার দেয় মনোয়ার।
টুলে বসে চারপাশে নজর বুলায়। একটা ধুমসি মহিলা সম্ভবতঃ দোকানীর স্ত্রী চা বানানো,কাপ ধোয়া ইত্যাদি কাজে সাহায্য করছে। মহিলার পরণের কামিজটা খুবই আটোসাটো। নড়াচড়ার সময় চর্বিযুক্ত ভাঁজ গুলো থলথল করছে। ব্যস্ততার কারণে কিংবা অসাবধানবশতঃ তার বুকের ওড়না সরে গিয়ে একটা স্তন সুস্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে। যৌবনজনিত কারণে মনোয়ারের দৃষ্টি সেদিকে কিছুসময় আটকে থাকে। এবং সে সময় তার মঞ্জুশ্রী হলের সামনে টাঙানো সিনেমার বড় বড় পোস্টার গুলো কথা মনে পড়ে। দর্শক টানতে সিনেমা হলের সামনে ঝোলানো পোস্টারে নায়িকাদের শরীরের বিশেষ জায়গাগুলো খুব তীব্রভাবে উপস্থাপন করা হয়। ভাবনা ও দর্শনে একই সাথে ছেদ পড়ে চা সিঙ্গাড়া চলে আসাতে এবং চারপাঁচজন যুবকের প্রবেশের ফলে মহিলাটি তাদের আড়ালে চলে গেলে।
গরম সিঙ্গাড়া চিবোতে চিবোতে মনোয়ার মনে মনে সিদ্ধান্ত নেয় হাফ বেলার জন্য বলেছিলো বটে কিন্তু আজ যতোক্ষণ মন চায় রিক্সা টানবে সে। গ্যারেজে ভাড়া না হয় একশ টাকা বাড়িয়েই দিবে। যেরকম বৃষ্টি পড়ছে, তার ওপর আজ খোলার দিন লোকজন বের হতে বাধ্য, কাজেই আজকের ইনকাম যে অন্যদিনের চাইতে তিনগুণ হবে সেটা নিশ্চিত।
৫.
যতই মনে জোর এনে আজ সারাদিন রিক্সা চালানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছিলো মনোয়ার কিন্তু শরীর তাতে আর কোনোভাবেই সায় দিলো না।
চা দোকান থেকে বেরিয়ে ছোটো বড় দু’তিনটে খেপ টানার পর তার মাথা ব্যথাটা ক্রমশঃ বাড়তে শুরু করলো। একই সাথে তীব্র শীত জড়িয়ে ধরলো। ক্রমাগত বৃষ্টির কারণে বাতাস এমনিতেই শীতল, মনোয়ারের শরীরে তা কাঁপন তুলছে।
আজ বাইর হওনটা আহাম্মকি হইছে – ভাবতে ভাবতে মনোয়ার বস্তিতে ফিরে চললো।
৬.
বস্তিতে খানিক উত্তেজনা।এদিক ওদিক গুঞ্জন। কাঁথার ভেতর মুখ মাথা ঢুকিয়ে শুয়ে আছে মনোয়ার। দুটো প্যারাসিটামল খেয়েছে। তবে জ্বর এখনো আয়ত্তে আসেনি। নিঃশ্বাসের গরমে কাঁথার ভেতর গরম হয়ে উঠছে। এই অবস্থাতেও বস্তির লোকজনের মইরা যাইবো, রক্তে ভাইসা গেসে এমন টুকরো টাকরা কথা কানে ভেসে আসে।
অসুস্থ শরীর সত্ত্বেও কৌতুহল নিবৃত্ত করতে পারে না মনোয়ার। ঘটনা কী জানার জন্য ও বার কয়েক মতি মিয়ার নাম ধরে ডাক দেয়। মতিমিয়ার সাড়া পাওয়া যায় না। বরং মনোয়ারকে বিস্মিত করে গ্যারেজ মালিক ফজলু মিয়া ঘরে ঢোকে। তার কন্ঠ বিষন্ন। মনোয়ার স্তম্ভিত হয়ে শোনে রাস্তার ওই পাশের নব নির্মিত ভবন থেকে পড়ে গুরুতর আহত মতিমিয়া হাসপাতালে মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ছে। জরুরী অপারেশন প্রয়োজন। তিরিশ হাজার টাকা দরকার। কিন্তু টাকা কোথায়। আয়নুল আর তার বউ বলে দিয়েছে, মতিমিয়া তাদের আপন কেউ না। এতোদিন মায়া করে নিজেদের কাছে রেখেছে। তারা নিজেরাই গরীব। সামান্য সঞ্চয় যা আছে তা তো মতিমিয়ার জন্য শেষ করে দিতে পারে না। মতিমিয়াকে হাসপাতালে রেখে আসা হয়েছে। হায়াত মউত আল্লাহর হাতে। তার হায়াত থাকলে সে বাঁচবে!
বস্তির লোকজন, সবাই গরীব। কারোই সাহায্য করার অবস্থা নয়। মতিমিয়ার রক্তে ভাসা দেহ সবাই দেখেছে ৷ মতিমিয়াকে ভালোবাসুক বা না বাসুক আজ বস্তির সবারই তার জন্য মন খারাপ হচ্ছে। অবিরাম ঝুপ ঝুপ বৃষ্টি, পড়ছে তো পড়ছেই। নেমে আসা সন্ধ্যার মুখে আঁধারটা যেন আজ একটু আগেই নেমে এসেছে একটা মৃদু সিনসিনে বেদনার সুর তুলে।
ফজলু মিয়ার কথা চুপচাপ শুনছিলো মনোয়ার। মতিমিয়ার সরল হাবাগোবা চেহারাটা জ্বরের ঘোর লাগা চোখে আবছা আবছা ভাসছে। হসপিটাল,মতিমিয়া,রক্ত, লতিফা এলোমেলো ভাবনা জেগে জেগে হারিয়ে যেতে থাকে।
ভীষণ শীত করছে মনোয়ারের। জ্বর বাড়ছে সম্ভবতঃ। রোদ জলে রিকশা চালানো বড় কষ্ট। বাড়ী ফিরতে হবে। “অপারেশনটা করা গেলে পোলাটা বাঁচতো”-ফজলু মিয়া বলতে থাকে।
মনোয়ারের মনে পড়ে তার বিছানার নীচে লোহার ট্রাংকে সাতাশ হাজার টাকা আছে।