গ এ গদ্যে পাভেল ঘোষ

আংটি

কদিন বৃষ্টির পর কাঁচা মিঠে রোদটাকে মনে হচ্ছে মায়ের আদর। সকালের এই স্নিগধ নরম আলো জবা গাছের ফাঁক দিয়ে যেন লুটোপুটি খাচ্ছে কোলের উপর। আহা..! মন ভরে যাচ্ছে আমার।
সবে কপালভাতি শুরু করেছি, হঠাৎ মুঠোফোনে বাল্যবন্ধু অরবিন্দের নম্বর স্ক্রিনে উঠতেই চোখটা গেল আটকে।
“হ্যালো” বলে ফোনটা ধরতেই অপর প্রান্তে কান্নার আওয়াজে মনটা চঞ্চল হয়ে উঠলো।
“ঠাম্মি আর নেই কাকু..! আধঘন্টা আগে হঠাৎ ডাকতে গিয়ে দেখি কথা বলছে না। মনে হয় ঘুমের মধ্যেই.….” ডুকরে কেঁদে উঠলো রঞ্জনা। অরবিন্দের কিশোরী কন্যা।
শুনেই মনটা বিমর্ষ হয়ে গেল।বুকের ভিতর একটা বেদনার চোরা স্রোত অনুভব করলাম।
মাসিমা নেই…! ভাবতেই পারছি না।সপ্তাহখানেক আগে অরবিন্দের বাড়িতে কত গল্প করে এলাম। প্রনাম করলেই বলতেন,”তোরাই শেষ জেনারেশন; যারা একটু পোনাম ঠোনাম করিস।তোরা কিন্তু পাবি না,এই বলে দিলুম….!” বলেই একগাল হেসে উঠতেন।
মাঝে মাঝেই মাসিমার মিষ্টি কথার টানে হাজির হতাম বন্ধুর বাড়ি।
শেষ যেবার গেছিলাম,বেশ মনে আছে, চলে আসার মুহূর্তে ওনার শেষ কথাটা। কাঁপা কাঁপা কণ্ঠে বলেছিলেন, “সংসারটা বড় স্বার্থপর হয়ে যাচ্ছে রে বাপ,পেটের ছেলে পর্যন্ত..! তবে আমার অরু খুব ভালো ছেলে,বুঝলি। ভাগ্য করে ওর মত ছেলে পেটে ধরেছি..!”
শুনে বন্ধুর জন্য গর্ব হতো আমার। মাতৃভক্তের সংখ্যা এখন তো হাতেগোনা।সংসারের পাকেচক্রে পরে মা বাবাকেই ভুলে যাচ্ছে তারা।সেখানে সত্যিই অরবিন্দের মতো ছেলে ব্যতিক্রম।
“কারোর কিছু হলো নাকি রে.? মুখটায় দুঃখের মেঘ জমেছে দেখছি….”
অন্তর্যামী মায়ের কথায় সম্বিৎ ফিরলো আমার। সত্যিই মায়েরা এমনই হয়..! সন্তানদের হাসি কান্নার আগাম খবর ওরা কোথায় পায় কে জানে? সাতসকালে খারাপ খবরটা দেবো….! এই ভেবে মাসিমার খবরটা বেমালুম চেপে গেলাম।
“অরবিন্দের মায়ের শরীরটা খারাপ; একটু দেখতে যাবো ভাবছি…” বলেই উঠে পড়লাম আমি।
অরবিন্দের বাড়ি যখন পৌঁছলাম,তখন ঘড়িতে কাঁটায় কাঁটায় দশটা।শহরের উত্তর প্রান্তে বছর ছয়েক আগে গড়ে ওঠা বসতি,রবীন্দ্রপল্লী। বন্ধু রবীন্দ্রনাথের খুব ভক্ত। নামটা ওরই দেওয়া।বাড়ি ঢুকলেই শুধুই রবীন্দ্রনাথ।ওনার প্রতিকৃতি,আঁকা ছবিতে দেওয়াল ভর্তি।
“রবীন্দ্র মিউজিয়াম বানিয়েছিস দেখছি।কুর্নিশ অরবিন্দনাথ..!” মাঝে মাঝেই রসিকতা করে ওর নামের পরে ‘নাথ’ যোগ করে দিতাম আমি।শুনে মারতে আসতো আমাকে।তবে একটা তৃপ্তি অনুভব করতো অরবিন্দ,সেটা ওর চোখ মুখ দেখে টের পেতাম।
‘যখন পড়বে না মোর পায়ের চিন্হ.….’ গানটা কানে আসতেই নিজের জগতে ফিরলাম।বুঝলাম,বন্ধুর বাড়ির দুয়ারে হাজির হয়েছি।
সদ্য মাতৃহারা অরবিন্দ এই কঠিন সময়েও বিশ্বকবিকে ভোলে নি। মাথা ঠান্ডা রেখে যথাযথ গানটা চালিয়েছে তো…! সত্যি ওকে বাহবা না দিয়ে পারা যায় না।
বিষন্ন চিত্তকে সঙ্গী করে পৌঁছে গেলাম মাসিমার ঘরে।আমাকে দেখেই অরবিন্দ লুটিয়ে পড়লো বুকের উপর। সত্যি ওকে সান্তনা দেওয়ার ভাষা আমার নেই। আকস্মিক মৃত্যু মানুষকে কতটা অসহায় করে তোলে,ওকে দেখেই বুঝলাম।বন্ধুর কান্নাভেজা মুখ বুকে রেখেই আমার চোখ চলে গেল মাসিমার মুখের দিকে।যেন এক অদ্ভুত প্রশান্তিতে ঘুমাচ্ছেন উনি।মুখের মধ্যে এখনো লাবণ্য অমলিন।খালি মনে হচ্ছে,’এখনই চোখ খুলে মাসিমা বলবেন,”এসেছিস বাবা..একটু জল খাবি?”
নীরবে চোখ থেকে অবিশ্রান্ত ধারায় জল নেমে এলো আমার।মোমের মতো গলছি শোকের তাপে,বেশ বুঝতে পারছি।
মাসিমার মাথার ঠিক বিপরীতে একটা চেয়ারে বসে শুধু স্মৃতির পাতা উলটে যাচ্ছি,যার প্রধান চরিত্র মাসিমা। মাঝে মাঝেই ঝাপসা দেখছি সব।স্মৃতির একেকটা পর্ব একেক ফোঁটা জলবিন্দু হয়ে গাল বেয়ে নীচে নামছে আমার।সেই ছাত্রাবস্থা থেকে কতশত মনে রাখার মত মুহূর্ত।আহ..! মৃত্যু কেন আসে ঈশ্বর..? এত যন্ত্রনা আর নিতে পারছি না যে আমি..!
হঠাৎ কানে একটা ফিসফিস শব্দ কানে আসতেই সোজা হয়ে বসলাম।
“মায়ের বাম হাতের মধ্যমায় আংটিটা খুলতে ভুলে গেছো,খেয়াল করেছ? কি যে করো না তুমি…!”
আমার ঠিক পিছনেই বিষন্ন বদনে বসে থাকা অরবিন্দের অস্পষ্ট কণ্ঠ কানে এলো। একি শুনছি? নিজের কানকেই তো বিশ্বাস করতে পারছি না। এই চরম বিষাদময় মুহূর্তে বন্ধুর মাথায় আংটির কথাটা এলো…!
আরো সতর্ক হলাম আমি। এর পরের মন্তব্যটি এলো দিতিপ্রিয়ার কাছ থেকে।বন্ধুর স্ত্রী।
“দেখছি,কি করা যায়..? ওটা আমার উপর ছেড়ে দাও।”
কথাটা শোনার পরেই আমার চোখ চলে গেল মাসিমার বাম হাতের তর্জনীর দিকে।সোনার আংটিটার উপর একটা কিছু লেখা দেখতে পাচ্ছি।একটু অস্পষ্ট লাগলো দূর থেকে।নিশ্চিত হওয়ার জন্য কাছে গেলাম চেয়ারটা টেনে।এবার নজরে এলো।আংটির ঠিক মাঝখানে সুন্দর করে লেখা ‘আঙুর’।বুঝলাম মাসিমার নামের আদ্যক্ষর।এই আংটিটার কথাই হয়েছে ওদের দুজনের আলোচনায়,বুঝলাম।
কিছুক্ষনের মধ্যেই মাসিমাকে শ্মশানে মহাপ্রস্থানের পথে নিয়ে যাওয়ার জন্য শুরু হলো প্রস্তুতি। চিরনিদ্রায় মগ্ন ভাবলেশহীন মাসিমা যেন সবার মাঝে থেকে চুপি চুপি সব কান্ডকারখানা দেখছেন আর মুচকি হাসছেন।
হঠাৎই আচম্বিতে ঘটে গেল ঘটনাটা। দিতিপ্রিয়ার চিৎকারে নিস্তব্ধ,শোক সন্তপ্ত ঘরে সবাই চমকে উঠলেন। মাসিমার বুকে আছড়ে পড়লো ও। এই কাণ্ডের জন্য পারিপার্শ্বিক মানুষজন কেউ প্রস্তুত ছিলেন না।
“মা গো.…..!” দিতির আকুল কণ্ঠে সবাই শোক সাগরে ডুব দিলেন আর একবার।
এর মধ্যে অরবিন্দ সময় করে গানটা পাল্টে নতুন একটা গান চালিয়েছে..!
“আগুনের পরশমণি ছোঁয়াও প্রাণে…..” ওর সময় জ্ঞানকে বাহবা না জানিয়ে সত্যিই পারলাম না..!
মিনিট পাঁচেক পর আমার বন্ধু নিজেই উঠে এসে মাসিমার বুকে পড়ে থাকা দিতিকে কানে কানে কিছু বলে একপ্রকার জোর করেই উঠিয়ে নিয়ে গেল ওকে । বুঝলাম,কার্যসিদ্ধি হয়েছে ওদের।
নিশ্চিত হবার জন্য মাসিমার কাছে গিয়ে দেখলাম,ওনার হাতের আংটিটা সত্যিই আর নেই…!
ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।