সাপ্তাহিক প্রতিযোগিতা পর্ব – ৫৮
বিষয় – বাইশে শ্রাবণ / প্রকৃত স্বাধীনতা / শ্রাবণ ধারা
মালঞ্চ শোক
রবীন্দ্রনাথ জমিদারের ছেলে হয়েও তাঁর ব্যক্তিগত জীবন ছিল দুঃখ ও শোকে ভারাক্রান্ত। আমি তারই সৃষ্টি।
তার দুঃখ আমিও অনুভব করেছি আমার অন্তরে।
জীবনভর শোক যেন সৃজনশীলতার অনুপ্রেরণা।
মাত্র ১৩ বছর বয়সে তিনি মাতৃহারা হন।
বিয়ের রাতে নিজের জ্যেষ্ঠ ভগ্নিপতি সারদা প্রসাদ মারা গেলেন। এর চার মাস পর আফিম খেয়ে আত্মহত্যা করেন, তার প্রিয় বৌদি কাদম্বরী দেবী, যিনি তাকে মাতৃহারার বেদনা ভুলিয়ে ভালোবাসা ও পৃষ্ঠপোষকতার মাধ্যমে কবি হয়ে ওঠার প্রেরণা দিয়েছিলেন।
মাত্র ৪১ বছর বয়সে শেষ হয়ে যায় রবীন্দ্রনাথের দাম্পত্যজীবন। ১৯০২ সালে তাঁর স্ত্রী মৃণালিনী দেবী মারা যান। রেখে যান তিন মেয়ে ও দুই ছেলে।তারা হলেন শমীন্দ্রনাথ, রথীন্দ্রনাথ, মাধুরী লতা বা বেলা, রেনুকা বা রানী ও মীরা বা অতশী।
রবি ঠাকুরের তিন কন্যার মধ্যে কনিষ্ঠটির দীর্ঘায়ু।
কনিষ্ঠের জন্যই আমাকে সৃষ্টি করলেন কবি। মীরা ওরফে অতসীবালার দীর্ঘ জীবনের গল্প কিন্তু বিষাদময়। ঠাকুরবাড়ির মেয়ে। যেমন রূপ, তেমনি গুণ। আমি তো মুগ্ধ।অথচ দীর্ঘ জীবন প্রতিপদে যেন ঠকিয়ে গিয়েছে তাঁকে। অন্য দুই মেয়ের মৃত্যু যেমন কাঁদিয়েছে রবীন্দ্রনাথকে, মীরার জীবনও তাঁকে কম কাঁদায়নি।রবীন্দ্রনাথের ছোটো মেয়ে মীরার দাম্পত্যজীবন সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন, “ওর জীবনের প্রথম দণ্ড তো আমি ওকে দিয়েছি— ভালো করে না ভেবে ওর বিয়ে দিয়েছি। –বিয়ের রাত্রে মীরা যখন শোয়ার ঘরে ঢুকছিল তখন একটা গোখরো সাপ ফস্ করে ফণা ধরে উঠেছিল তখন সাপটা যদি ওকে কাটত ও পরিত্রাণ পেত।” স্নেহময় বাবার এইবেদনাময় উক্তিতে আমিও বেদনাহত । অথচ জীবনের শুরুতে তো সবটাই সুন্দর ছিল মীরার। দাদা-দিদিদের সঙ্গে তাসের বাড়ি ও পুতুল বানিয়ে ছোট্ট মীরা খেলত। ইংরেজ শিক্ষক লরেন্স এসে পড়াতেন, ছবি আঁকতেন শান্তিনিকেতন আশ্রমে। বিজ্ঞানী জগদীশচন্দ্র বসু খুব স্নেহ করতেন মীরাকে। নিজের ভাগ্নে অরবিন্দমোহনের ভাবী স্ত্রী হিসেবে মীরাকে কল্পনা করে মস্করাও করতেন। রবীন্দ্রনাথ মেয়ের অসবর্ণ বিবাহ দেওয়ার সাহস দেখাতে পারেননি। তবুও মাতৃহারা মেয়েটিকে শৈশবেই পাত্রস্থ করেন।আবার মীরাকে ডেভিড কপারফিল্ড, অ্যালিস ইন ওয়ান্ডারল্যান্ড, মহাভারত ইত্যাদি পড়ার কথাও বলতেন।
রবীন্দ্রনাথ নারীমুক্তি আন্দোলন করেছিলেন কিন্তু মেয়েগুলোকে বিয়ে দিয়েছিলেন খুব অল্প বয়সে ১২-১৩, কারো বা ১১ বছর বয়সে। ভাবছিলাম তিনি কেন এমন করলেন।
মীরার ১৩ বছর বয়সে বিয়ে দিয়েছিলেন নগেন্দ্রনাথের সাথে। বিয়ের পর কবি নগেন্দ্রনাথকে আমেরিকায় পাঠিয়েছিলেন কৃষিবিদ্যা শেখার জন্য। রবীন্দ্রনাথের ইচ্ছা ছিল স্বদেশের কৃষিকাজের উন্নতিকল্পে নগেন্দ্রনাথকে কাজে লাগাবেন। কিন্তু নগেন্দ্রনাথ বিদেশে থাকাকালীন রবীন্দ্রনাথের কাছে বারবার চিঠি লিখতেন, টাকার দরকার। উত্তরে রবীন্দ্রনাথ লিখতেন জমিদারি থেকে মাত্র তিনি পাঁচশত টাকা গ্রহণ করেন। সেই টাকা পুরোটাই তাকে দিয়ে দেন। এখন তিনি ধারের উপরে আছেন।
পাত্র নগেন্দ্রনাথ গঙ্গোপাধ্যায়ের চাহিদা বাড়তে থাকে।পরবর্তী সময় এটাই স্পষ্ট হয়েছে, নগেন্দ্রনাথ অর্থের জন্য বিয়ে করেছিলেন। আমিও তো সেটাই মনে করি।
প্রেমহীন এই দাম্পত্যের কষ্ট যে পেলেন মীরাদেবী,
তাতে আমিও সমব্যাথী।
খুব দুঃখ পেয়েছি মীরার পরিণতিতে। অতি সুন্দরী এবং অতি বড়ো ঘরণী হয়েও বর ও ঘরের সুখ মীরা পেলেন না। শূন্যতা তাঁর জীবনের সঙ্গী হল। শৈশবে মা, ভাই, দিদিদের হারানোর বেদনা তো ছিলই। তার চেয়েও অধিক বেদনা দাম্পত্যের মৃত্যু।
তবে জীবনে পেয়েছেন রবীন্দ্রনাথের স্নেহময় সাহচর্য।নীতিন্দ্রনাথ আর নন্দিতার জন্ম দিয়ে মীরা মাতৃত্বের আস্বাদ পেয়েছিলেন ।
ছোট জামাই আমেরিকা থেকে গ্র্যাজুয়েশন করে ফিরে আসেন কিন্তু মীরার ভাগ্যে বেশি দিন স্বামীসঙ্গ লাভ হলো না। মীরা এক ছেলে ও এক মেয়ের মা হওয়ার পর নগেন্দ্রনাথ খ্রিষ্টান হয়ে মীরাকে ছেড়ে চলে যান।মীরা ও নগেন্দ্রের আইনানুগ বিচ্ছেদ ঘটে ১৯২৯ সালে। তাতে কবি
খুব দুঃখ পেলেন।
মীরার ছেলে নীতুকে রবীন্দ্রনাথ প্রকাশনা শিল্পে শিক্ষার জন্য জার্মানিতে পাঠান, কিন্তু কবির এমনই দুর্ভাগ্য মাত্র ২০ বছর বয়সে নীতু ক্ষয় রোগে (যক্ষ্মায়) আক্রান্ত হয় এবং রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুর নয় বছর আগে নীতু মারা যায়।
দ্বিজেন্দ্রনাথের অকালপ্রয়াত পুত্রের নাম ছিল নীতিন্দ্রনাথ। তাই এই নামটি নিয়ে ঠাকুরবাড়িতে আপত্তি উঠেছিল। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ সে আপত্তি নাকচ করেন। বিধির এমনই বিধান মীরার ছেলে নীতিন্দ্রেরও অকাল প্রয়াণ সহ্য করতে হয় তাকে। সত্তরোর্ধ বয়সে কন্যা নন্দিতারও মৃত্যুশোক বুক পেতে নিয়েছিলেন মীরা। ।
রবীন্দ্রনাথ মেয়ের জন্য শান্তিনিকেতনে বাড়ি তৈরি করে মালঞ্চ নাম দিলেন । আমার ছবি আঁকার ঘরটিই ছিল তাঁর শান্তির আশ্রয়।
রবি ঠাকুরের মেয়ে বলে কোনোদিন কোনো মঞ্চে বা সভায় নিজেকে প্রচার করেননি মীরা। আমার ঘরেই থাকতে ভালোবাসত।পঁচাত্তর বছর বয়সে ১৯৬৯ সালে আমাকেও শূন্য করে মীরা চলে গেল। শোক করার মতো আমি ছাড়া তার কেউ ছিল না।শুধু মালঞ্চের ঘর আঁকড়ে ছিল মেয়েটির দুঃখী অন্তরটুকু।শূন্য ঘরে আমি মালঞ্চ তার শোকে
শোকাহত।
আমি শান্তিনিকেতনে আর কবি জোড়াসাঁকোয়
মৃত্যুশয্যায়।
বেলা বারোটা বেজে নয় মিনিট সেদিন ২২ সে শ্রাবণ।
এতক্ষণ অচেতন কবি যেন সজ্ঞানে ফিরলেন। শুনলাম এত ঝরঝরে তিনি বহুদিন বোধ করেন নি। তার শরীর থেকে আত্মা বেরিয়ে ভাসছে বাতাসে। তিনি যেন সবাইকে পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছেন। এমনকি তার শায়িত শরীরটাও ! এটাই কি তবে মৃত্যু ? এতো আরামের অনুভূতি। একেই তবে ভয় পেয়েছিলেন।শিলাইদহের জমি, আকাশ, নদী সব স্পষ্ট দেখছেন, আগের নাম খোরশেদপুর। পতিসর যেখানকার তিনি জমিদার। এখানকার প্রজারা বড় সরল আর পরিশ্রমী ছিল তার আপনজন। বিদায় জানিয়ে সবাইকে বললেন ভাল থেকো। সামনে দাঁড়িয়ে মৃণালিনী যেন বলছে, আজ সব কাজ থেকে ছুটি। এসেছিলেন বাবামশাই ! পিছনে দাঁডিয়ে মিটমিট করে হাসছেন সঙ্গে দাদামশাই, প্রিন্স দ্বারকানাথ। যাওয়ার আগে বললেন, দাদামশাই আপনার সম্বন্ধে একসময় আমার অনেক ভুল ধারণা ছিল। আমি আপনার ব্যবসার কত জরুরী কাগজ পুড়িয়ে ফেলেছিলাম। আমায় ক্ষমা করবেন। কবি হাত জোড় করে প্রার্থনা করলেন। দ্বারকানাথ বুকে টেনে নিলেন তার বংশের সবচেয়ে খ্যাতিমান পুরুষটিকে।
জোড়াসাঁকোয় কবির ঘরটিতে উঠেছে কান্নার রোল।১৯৪১ সাল ৭ আগস্ট কবি চলে গেলেন। কিন্তু,সবাই অবাক। কবির হাতদুটো হঠাৎ বুকের কাছে চলে এল। কবি যেন সবার কাছে বিদায় চাইলেন। বলে গেলেন –
পেয়েছি ছুটি / বিদায় দেহ ভাই / সবারে আমি প্রণাম করে যাই।
হাতদুটো আবার এলিয়ে পড়ল।
কবি চিরতরে বিদায় নিলেন।
শুধু আমি মালঞ্চ তার চরণ স্পর্শ করতে পারিনি।