বোধেরও অনেক স্তরভাগ আছে। বিষয়টা আশ্চর্যজনক ভাবে ব্যাখ্যা করেছিলেন ধ্রুবদা। অনেক সময় এমন এমন মানুষের কথা বা কার্যকলাপে এমন আশ্চর্যজনক ঘটনা উঠে আসে যে সেই কথা বা কাজ অত্যন্ত তাৎক্ষণিকভাবে মানুষটাকে সেই মুহূর্তের জন্য তাকে আলাদা মাত্রা এনে দেয়। গতবার মন্দির যাওয়ার নাম করে ধ্রুবদা যখন আমাকে ঘিরে ধরা সাধুদের টীকাটিপ্পনীর বেড়াজাল থেকে মুক্ত করতে আমাকে নিয়ে মন্দিরের দিকে রওনা হয়েছিলেন, তখন হাতের টর্চের আলোর গোলাকার পরিধির উপমায় বোধের স্তরের বিভিন্নতাকে সুন্দরভাবে ব্যাখ্যা করেছিলেন। সেদিন তিনি একটা আলোর বৃত্তে অন্য টর্চের আলোকে আপতিত করে বোঝাতে চেয়েছিলেন যে প্রত্যেকেরই বোধের একটা পরিধি আছে। আর একজনের কার্যকরী বোধের সাথে যখন অন্যের বোধ যুক্ত হয়, তখন সেই যুক্তবোধের উজ্জ্বলতা বৃদ্ধি পায়। খুব সাধারণভাবে ধ্রুবদা দুটো টর্চের আলোকে একটা বৃত্তের ভেতর এনে খুব সুন্দরভাবে সেদিন যেটা বোঝাতে চেয়েছিলেন, সেটাই কি আজ প্রত্যক্ষ করলাম! এই আশ্চর্যজনক যাদুকরীর কোনোরকম ব্যাখ্যাই তো পাচ্ছি না। আমি তো অচেতনে মিলনদৃশ্য প্রত্যক্ষ করিনি, তখন যে আমি সম্পূর্ণভাবে সচেতন ছিলাম। অথচ…
আমি পরিষ্কার ভাবে যে দৃশ্য দেখতে পেলাম, সেখানে যে আধশোয়া অবস্থায় কৃষ্ণভামাই ছিলো, আর সেই যে তার তর্জনী এগিয়ে দিয়েছিলো আমার দিকে এ বিষয়ে কোনো সংশয় নেই। অথচ কানাইদা বলছেন এটা মা তারার চমৎকারী! আমি কিছু বুঝতে পারছি না, এই কুহকজাল ছিঁড়ে ফেলা আমার পক্ষে অসম্ভব।
না, এখানে আর নয়, আজই আমায় ফিরে যেতে হবে দাদুর আখড়ায়। সেখান থেকে কাল ভোরেই ট্রেন ধরে নেবো।
—” পদীপদাদা, মানুষ ভাবে এক আর হয় আরেক। আমরা কেউই কোনো সিদ্দান্ত নেওয়ার মালিক নই গো, মালিক তো আলো হয়ে বিরাজ করচেন গো, তিনি না বললে গাচের একটা পাতাও নড়তে পারবে না গো ঠাকুর –“
–” আচ্ছা প্রদীপবাবু, নাহে আমার দ্বারা তোমাকে বাবুটাবু বলে ডাকা চলবে না। এতোটুকু বাচ্চা ছেলেকে আমি অন্তত.. ”
–” সেইডা আবার কী কথা কন সাধুবাবা, অরে বাবু ডাকবেন ক্যান? হ্যায় তো আপনের নাতির বয়সী। ”
— ” হয়তো বা তাই, কিন্তু অসম্ভব গুণের অধিকারী। যখন গানটা ধরেছিলো, তখন ওর মুখের দিকে তাকিয়ে আমি যেন এক শিশু সূর্যের আলোর বিচ্ছুরণ প্রত্যক্ষ করলাম। কী অপূর্ব সে ভাব, আর কী সুন্দরই না সে গানের ব্যঞ্জনা! ”
–” সত্যি কইতে কি, এই যে আমি অর লগে এতদিন ধইরা আছি, আমিও কিন্তু জানতামই না যে হ্যায় এতো সুন্দর গান গাইতে পারে। গেলবার ভাদ্রের আমাবস্যার রাতে আর সক্কালবেলা যহনে সূর্য উঠতে আসিলো, হেইসময় প্রদীপে যে গানডা — আহা, য্যান অহনও… ”
— ” জানো প্রদীপ, সে আমার যৌবন বয়েস, এক জলসায় এক ভদ্রলোকের গলায় একটা গান শুনেছিলাম , আমি গানটান সেরকমভাবে কোনোদিনই শুনিনি, সে গানটা ছিলো রবিঠাকুরেরই গান। কী দর্শন সে গানের! যেমন কথা, তেমনি সুর, আধ্যাত্মিকতার কোন স্তরে উঠলে সে গান কোনো কবি লিখে উঠতে পারেন, জানি না। তবে তোমাকে এটুকু বলতে পারি, সেই গানটা আমার জীবনকে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেললো, সেদিন আমার বোধে এসে ঘর বাঁধলেন পরমপিতা। ”
— “আহা রে, এ জন্যই না তিনি রবিঠাকুর গো গোঁসাই। আধ্যাত্মবাদ শিকতে হলি তার কাচেই তো নাড়া বাঁধতি হপে গো। তা গানটা কী, শুনি কেনে গো গোঁসাই। ”
–” তব নাম লয়ে চন্দ্র তারা অসীম শূন্যে ধাইছে,
রবি হতে গ্রহে ঝরিছে প্রেম, গ্রহ হতে গ্রহে ছাইছে,
অসীম আকাশ নীল শতদল, তোমার কিরণে সদা ঢলঢল,
তোমার অমৃত সাগর মাঝারে ভাসিছে অবিরামে। “
— ” এই দ্যাকো কেনে গো, তুমিও তো দেকি সেই গোড়া ধরেই নাড়া দিলে গো গোঁসাই, সেই একই তত্ত্ব, সবকিছুর মালিক তো সেই একজনই। তিনি দেকালে আমরা দেকি, তিনি বলালে আমরা বলি, তিনি করালে আমরা করি। ”
–” দেখো বাবা প্রদীপ, আমাদের ক্ষুদ্র অহং মনে করে বুঝি আমিই করেছি, আমিই দেখেছি, যে কথাটা আমি বললাম সেটা বুঝি আমারই মনগত কথার উচ্চারণ, যে কাজটি আমার দ্বারা সাধিত হলো সেটা বুঝি আমারই ক্ষমতাবলে আমিই করলুম, আমি যাকে ভালোবাসলুম সে বুঝি আমারই মনোগত প্রবৃত্তি। আমি যার সাথে মিলিত হলাম, সে স্বপ্নে হোক, অবচেতনে অথবা চেতনে, সেও বুঝি আমার দ্বারা সাধিত হলো। কিন্তু উপনিষদ অধ্যয়ন করলে এ ভুল ভেঙে যাবে। তখন বোঝা যাবে যে শুধুমাত্র আমরা কেন, এই যে বিশ্ব ব্রহ্মান্ড, এই যে নক্ষত্ররাজি, ছায়াপথের অজস্র কোটি নক্ষত্রমন্ডলী, সূর্য, তারা, পৃথিবী, গ্রহ সবকিছু… সমস্ত কিছুই তাঁর খেলার পুতুল, তিনি যাকে যেভাবে খেলাবেন, সে সেভাবেই খেলবে। তিনিই এক এবং অখন্ড। তিনিই আদি, তিনিই অন্ত, তিনিই অদ্বিতীয়।”
— ” খেলিছো এ বিশ্ব লয়ে
বিরাট শিশু,আনমনে
প্রলয় দৃষ্টি তব পুতুল খেলা
নিরজনে প্রভু নিরজনে।
কী আশ্চর্য, কৃষ্ণভামার সেই মূর্তি উধাও হয়েছে, এখন যেন একজন তাপসিনী, বিষাদের বিন্দুমাত্র চিহ্নও আর অবশিষ্ট নেই, জ্যোতিপূর্ণ মুখাবয়বে বিরাজ করছে এক পরম প্রশান্তি।
কিন্তু আমি অবাক হলাম এজন্য যে এ গান সে শিখলো কোথায়! ওরা যে রবিঠাকুরের ভক্ত, অথচ একজন মুসলমান কবি নজরুলের গানও কতোই না নিখুঁতভাবে গাইলো বাউলনি! আর একটা জিনিস লক্ষ্য করছি, সাধুবাবা, কানাইদা, বাউলনি সবার মনই যেন এক তারে বাঁধা। একই ভাব দর্শন প্রত্যেকের মনোবীণার তারে ঝংকৃত হচ্ছে। পড়াশোনার গন্ডীর উর্ধ্বে উঠে ভাবের যে উচ্চ গন্ডীতে এদের নাড়া বাঁধা পড়েছে, তার উচ্চতায় আমি যেন কোথায় হারিয়ে যাচ্ছি। এনারা প্রত্যেকেই সুরে সুর মিলিয়ে যেন বলতে চাইছেন —
ওরে পাগল, মনটারে তুই বাঁধ,
এ যে নয় কোনো ভুল, নয় পরমাদ।
নয়রে এ তোর মনের সাধন
মিলনের লীলা খেলায়
প্রভুর সাথে রঙ্গলীলায়
প্রভুই সাথেই রঙ্গে মাতন
এ যে প্রভুর মনের সাধ,
ওরে পাগল, মনটারে তুই বাঁধ।