কদিন ধরেই কানাঘুষো শুনছিলেন, আজ সকালে এক এগিয়ে থাকা খবরের কাগজের পেছনের পাতায় এক কোণে দেখেন তাঁর আশঙ্কা সত্যি প্রমাণিত করে আপাত নিরীহ ছোট্ট খবরটি প্রকাশিত হয়েছে। শিরোনাম: ‘ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপের দিন কী ফুরালো?’ দেখেই বুকে হাল্কা করে ধাক্কা খেলেন কবি শ্বেতবসনা মুৎসুদ্দী।
কী বললেন? আপনি এমন কোনো কবির নাম শোনেন নি? ধুর মশাই! তাহলে আপনি একেবারেই আপটুডেট নন। আরে ইদানিং ফেসবুক, ইন্সটা, হোয়াটসঅ্যাপ এ ওঁর লেখায় লাভ, লাইক, কেয়ার, হাহার সংখ্যা কম সে কম হাজার পাঁচেক! উনি যদি লেখেন “মন খারাপের নিঃশ্বাসে আকাশ মেঘলা আজ” তাহলেও হেসে খেলে হাজার দুয়েক স্যাড ফেস আর কেয়ার! বইপাড়ার পাকা পোক্ত লিখিয়েরা প্রথম প্রথম তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করলেও পরে শ্বেতবসনা দেবীর জনপ্রিয়তাকে সম্মান করে ওঁর ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট এ সাড়া দিয়েছেন। এতে শ্বেতবসনা দেবীর বন্ধু সংখ্যা যেমন বেড়েছে তেমনই বেড়েছে ফলোয়ারের সংখ্যা। তবে ওনার কাব্যপ্রতিভা সহজাত। যখন তখন, যে কোনো দিনে, যে কোন বিষয়ের ওপর, যে কোন প্রাতঃস্মরণীয় ব্যাক্তিকে উনি কাব্যাঞ্জলি দিতে পারেন। সহজ করে বলতে গেলে ‘রথযাত্রা-জগন্নাথ-রাখিবন্ধন-ইতুপুজো-ঈদ উল ফিতর-দুর্গোৎসব-যীশুপুজো-রবিপুজো-দেশীয় এবং আন্তর্জাতিক বিবিধ দিবস মায় স্বাধীনতা-গণতন্ত্র দিবস’ এ সমস্ত কিছু নিয়ে উনি সম্বৎসর লিখতে থাকেন। এইতো সেদিন একটি ধর্মসংক্রান্ত ত্রৈমাসিক পত্রিকায় ‘আত্মা’ র ওপর একটি মনোগ্রাহী কবিতা লিখেছিলেন, যার প্রথম দুটো লাইন এমন- “আত্মা আমার আলোর মতো পলকা সুতো/ মায়ার বাঁধন কাটবে যেদিন ওমনি ভুতো”। তারপর ওই সুতো, ভুতোর পর পূতঃ, খুঁতো, গুঁতো, অভিভূত, পরাজিত, অবস্থিত ইত্যাদি নানান রকম শব্দ মালা সাজিয়ে আত্মার ব্যাখ্যা করেছেন। ফেবু ভক্তেরা কবিতার সাত রকম অর্থের রিভিউ লিখে দিয়েছিল। আত্মার এহেন ছান্দিক বিশ্লেষণে শ্বেতবসনার হৃদয়ের লাবডুব ধ্বনিত হচ্ছিল জুকারবার্গের পাড়ায় পাড়ায়। সে আপনার মতো দু একজনের নাক সিঁটকানোতে কারুর কিচ্ছু এসে যায়না। শুনুন তবে আরো বলি, ইতিমধ্যেই এক উঠতি প্রকাশনা সংস্থা ওঁর পঞ্চাশ টি কবিতা নিয়ে ‘সেরা পঞ্চাশ’ বলে একটি বই প্রকাশ করেছেন। সে বই বাজারে মোটামুটি জায়গা করে নিয়েছে বলাই বাহুল্য। তবে কিনা ওঁকেও যে ছাপার সময় বেশ ক’টি বইএর দাম দিতে হয়েছে সেটা কেউ জানেনা। আর বই কিনলেই সই ফ্রি। মুড ভাল থাকলে সেল্ফি ও। সেটায় অবশ্য প্রকাশকের কোনো বিধিনিষেধ নেই। বেশ দিন কাটছিল শ্বেতবসনার। ইউনিভার্সিটির পর আবার বহু বছর বাদে এমন জনপ্রিয়তা পেয়ে কবি শ্বেতবসনা দিন দিন ফুলের মতো প্রস্ফুটিত হচ্ছিলেন। দিব্যি চলছিল সব তার মধ্যে বলা নেই কওয়া নেই এই খবর!
শ্বেতবসনার ঘুম উড়েছে। চোখের কোলে কালি। মুখশ্রী মলিন! ওজনও শুনতে পাই একদিনেই আড়াইশো গ্রাম কমেছে! অবস্থা দেখে বাড়িতে ওঁর ছেলেমেয়েরা ঠাকুমার কাছ ঘেঁষে রয়েছে, শ্বশুরমশাই সিগারেটের সাথে ঘনঘন চা না পেয়ে দুখানা মাস্ক বেঁধে পাড়ার দোকানে ঠেক বসাবেন কিনা ভাবছেন আর ওঁর নিরীহ পতিদেব অফিস থেকে ফোন করে জানিয়েছেন একবারে নাইট করে পরশু ফিরবেন। রান্নার মেয়েটি ভুলেও কবির ঘরে পা বাড়ায়নি পাছে দাঁত কিড়মিড় খেতে হয়। সে নিজের মতো শুক্তো, মাছের ঝোল আর ভাত নামিয়ে ধাঁ! আপনার মনে হতেই পারে আমি গালগপ্প দিচ্ছি। না মশাই না! এসব নিজের চোখে প্রত্যক্ষ করা বলেই বলছি। গেল বার আম্ফানে সেই যে তিনদিন নেটওয়ার্ক ছিল না…শ্বেতবসনা ক্রমাগত লিখছিলেন কিন্তু দেওয়ালে দিতে পারছিলেন না! তারপর আর কি! গা হাত পা কেঁপে, মাথা ফাতা ঘুরে, বদহজম হয়ে যাচ্ছেতাই অবস্থা! তারপর এক ডাক্তার ফ্যানের প্রেসক্রিপশনে শোবার আগে একহপ্তা সিটালোপ্র্যাম খেতে হয়েছিল! মনে আছে?
কী বলছেন?এসব খবর আমি কোথায় পেলাম? কেন, ওনার ওয়ালেই! পরে আমাদের সব বলেছিলেন না! আর এই যে বাড়ির এই হাঁড়ির খবর সেও তো ওনার স্ট্যাটাসেই পাচ্ছি! সে আপনি আমাকে স্টকার বলুন আর যাই বলুন। ওঁর মতো মানুষ কে স্টক করেও সুখ। যেন আপনি কাউকে করেন না? এই তো সেদিন দেখলাম আপনি ফিল্ম স্টার রুবি মাইতির পোষ্ট এ লিখেছেন, ‘সোনা তুমি সুন্দরী কত!” আমি কি স্ক্রীনশট তুলে আপনার বৌকে হোয়াতে পাঠিয়েছি? আর গতকাল যে….থাক আর বললাম না! শেষে বলবেন আমি আপনাকেও স্টক করি!
শেষ খবরটা বলি। শ্বেতবসনার সমস্ত ফ্যান ফলোয়ার, ইয়ে মানে…আমিও, ঠিক করেছি মাস পিটিশান দেব সরকারের কাছে, যাতে সরকার এইসব স্যোশাল মিডিয়াগুলোর সাথে আইনি ব্যাপার স্যাপারগুলো মিটিয়ে নেয়। আমরা থাকব কী নিয়ে বলতে পারেন? তবে আমার মনে হয় এতকিছু কেবল বলার জন্যেই বলা। ওই যেমন হয়, আসল ইস্যু থেকে নজর ঘোরাবার জন্য আমাদের দেশে হরদম এসব ছুটকা ছাটকা ঘটনা হয়েই থাকে। খোদ পরধান মন্ত্রী মশাইয়ের শুনেছি পাঁচ কোটি ফলোয়ার, আর মুশকো মন্ত্রীও খুব একটা পেছনে নেই। ওদেরও তো জনসংযোগ বজায় রাখতে হবে! নাকি ?