জালালুদ্দিন সওদাগর ওখনও অনবরত কথা বলছেন, রীতিমত কথার শব্দে কান ঝাঁ ঝাঁ করতে শুরু করেছে। চায়ের দোকানের দু-একজন লোক রীতিমত কটমট করে মাঝে মধ্যে তাঁর দিকে দেখছে। কিন্তু কিছুই বলছে না, অবশ্য এ ধরণের কর্মকান্ডে চায়ের দোকানের বাকি সবাই যে বেশ ভালই বিরক্ত তা বোঝা যাচ্ছে।
অনিচ্ছা সত্ত্বেও মহিন সাহেব সে কথাগুলো ঝিম মেরে শুনে যাচ্ছেন। মাথা নিচু করে চায়ের কাপের দিকে তাকিয়ে আছেন। একটু বলে নেয়া দরকার; এই দুই ভদ্রলোক এখন বসে আছেন উজানচরের একটি বি ডি আর পরিচালিত অস্থায়ী কাঁচা বাজারে। বসেছেন সামনাসামনি, জালালুদ্দিন সওদাগর এরই মধ্যে পরপর তিন কাপ চা খেয়ে ফেলেছেন। এখন চার নাম্বার চায়ের কাপটি হাতে। অন্যহাতে শেখ হোয়াইট এর একটা আধ-খাওয়া সিগারেট। কথার ফাঁকে ফাঁকে লম্বা লম্বা টান দিয়ে দীর্ঘ শ্বাসে সিগারেটের ধোঁয়া ছাড়ছেন।
মহিন সাহেব ঢাকা থেকে গ্রামে এসেছেন গত পরশু। বড় মেয়ে মহুয়ার জন্য সম্বন্ধ দেখার একটা তোরজোড় এরই মধ্যে চলছে। মাস্টার্স ফাইন্যাল ইয়ারের পরীক্ষা দেয়া একটা প্রাপ্ত বয়স্ক মেয়েকে এভাবে ঘরে বসিয়ে রাখাটা ঠিক না। লোকে পাঁচ কথা বলে।
এখন বেলা প্রায় ঘনিয়ে এসেছে, পশ্চিমের লাল রেখাটা আরো স্পষ্ট হতে শুরু করেছে। কেমন হিম হিম একটা ঠান্ডা ভাব এরই মধ্যে জমতে শুরু করেছে। গায়ে মেরুন রঙের পাতলা একটা হাফ-হাতা হাওয়াই শার্ট, ঠান্ডাটা এখন গা বেয়ে হাড়ে যাবার পায়তারা শুরু করেছে। সময়টা মাঘ মাসের প্রায় শেষের দিকে। একটু পরেই কুয়াশায় অস্পষ্ট হয়ে আসবে সবকিছু।
-জালালুদ্দিন সাহেব!
-†R¡|
-আপনার কথা কি শেষ হয়েছে? এই মুহূর্তে ভদ্রলোকের মুখে দু-নম্বরি একটা থমথমে হাসি।
-†R¡ না। আরেকটু বাকি আছে। বেশ নরম গলায় উত্তর দিলেন জালালুদ্দিন সওদাগর।
-কথাগুলো কি আজই বলা জরুরী?
-উঁহু-কাইল বললেও হইব।
-ঠিক আছে, তাহলে কালই শুনব। আপনি এক কাজ করেন, কাল দুপুরে আমাদের বাড়িতে আসেন। আপনার দাওয়াত, খাওয়া-দাওয়া শেষে আপনার সাথে আয়েশ করে কথা বলা যাবে।
-মুখে আধভাঙ্গা একটা আল্লাদি হাসি জেগে উঠল। এত কইরা যহন কইতাছেন আমি আমুনে। তারপর চা-ওয়ালাকে গলাটা একটু চড়িয়ে,
-অই বিলের টেহা কত আইছে?
-আডাইশ টেহা।
মহিন সাহেব টাকা দেয়ার জন্য পকেটে হাত দিলে জালালুদ্দিন কিছুটা বিব্রত ভঙ্গিতে-
-ছে! ছে! ভাইসাব কি করতাছেন এইডা। আপনে বাইত যান, বিলের টেহা আমি দিতাছি। এই কামডা কইরা আর শরমিন্দায় ফালাইয়েন না।
ভালো রকমেরই অন্ধকার নেমেছে এরই মধ্যে। পায়ে হাঁটা রাস্তা ধরে হাঁটছিলেন মহিন সাহেব। মাটির রাস্তাগুলো ভেজা পানিতে প্যাঁকপ্যাঁকে হয়ে রয়েছে। পা ফেললেই আঙুল ঢুকে যাচ্ছে; সেই সাথে প্যাঁক-মাটির একটা ভাপসা গন্ধ! চারদিকে তাকালেন, কোথাও কেউ নেই। দুপাশে গমের সারি সারি ক্ষেত, ধান পোকাগুলো d«z d«z শব্দ করে উড়ছে। সামনেই গাজী বাড়ির একটা পারিবারিক কবরস্থান দেখা যাচ্ছে, উঁচু ডিবির মত আট কি দিশটি কবর হবে। দৈত্যের মত বিশাল বিশাল গাছপালা, ভারী অন্ধকারে দলা পাকিয়ে লুকিয়ে আছে সে গাছের ডালপালায়। জায়গাটা বেশ ছিপছিপে একটা নির্জন অন্ধকার। ঝোপঝাড় জড়িয়ে আছে চারপাশে।
একটা শিয়াল এরই মধ্যে জমির আইল অতিক্রম করে, সেই ঝোপের মধ্যে গিয়ে লুকিয়ে পড়ল। তিনি দূর থেকে দৃশ্যটা স্পষ্টই দেখলেন। মরা নতুন লাশের গন্ধ পেলেই শিয়ালের উপদ্রবটা একটু বাড়ে। কবর থেকে সুযোগ পেলেই লাশ টেনে তুলে ফেলে। তারপর খামচেখুমচে বিচ্ছিরি হাড়গোড়গুলো ফেলে যায়।
বাড়ির উঠানের কাছাকাছি আসতেই লক্ষ্য করলেন, বাড়ির সামনে একটি হ্যাজাক বাতি জ্বলছে। টাঙানো হয়েছে পশিমের ঘরটার বাঁশের খুঁটির সাথে। পাশের বাড়ির সেফার মা গাইলে গুঁড়ি করছে ভেজা আতপ চালের। গাইলের ধুক ধুক একটা বিকট শব্দ হচ্ছে। গাইলের গুঁড়ি করার শব্দের সাথে পায়ের নিচের মাটিও কছুটা তরতির করে কাঁপছে। রান্নাঘরে চুলায় ভাপা পিঠা বানাচ্ছে কানিজ আর উনার আম্মা রত্না বেগম। দুজনের কথার একটা অবছা শব্দ পাওয়া যাচ্ছে। রত্না বেগম কথা বলার ফাঁকে ফাঁকে শাড়ির আঁচল দিয়ে চোখ মুছলেন। কানিজ খোলার পিঠা খুন্তি দিয়ে উল্টানোর কাজটা বেশ মনযোগ দিয়ে করে যাচ্ছে।
উঠানের মাঝখানে একটা অস্থায়ী চৌকি পাতা হয়েছে, সেখানে তার বড় মেয়ে মহুয়া গুটি পাকিয়ে সাপের মত শুয়ে আছে। শুধু ছোট মেয়ে মলুয়াকেই দেখতে পেলেন না। বোধ হয় ভেতরের ঘরে। মহুয়ার বোন মলুয়া, দু-মেয়ের নাম নিজেই রেখেছে কানিজ। এখানে মহিন সাহেবের অবশ্য কোন হাত নেই। তবুও নাম দুটো ভারি সুন্দর।
উঠানের কোণে দাঁড়িয়েই পুরো বাড়িটায় চোখ বুলিয়ে নিলেন। এসে উঠানে রাখা চৌকিটায় বড় মেয়ের পাশে নিঃশব্দে বসলেন।
-কিরে মা, এই অসময়ে শুয়ে আছিস যে?
-মহুয়া একটু হাসল। কিছু বলবে বাবা?
-না। মলুয়াকে দেখছি না। কোথায়?
-রহিমন দাদীর বাড়ির দিকে গেল কিছুক্ষণ আগে। উনি এসে নিয়ে গেছেন। রাতে মনে হয় খেয়েদেয়ে তারপর ফিরবে।
-ও আচ্ছা।
একটু পরেই সেফার তিন বছরের বাচ্চাটা একটা বিকট চিৎকার দিয়ে কেঁদে উঠল এতক্ষণ উঠোনে মাটিতে বসে খেলছিল। কি হল কে জানে! সেফাকে দেখা গেল দৌড়ে বাচ্চার বাচ্চার দিকে গিয়ে কোলে তুলে নিল।
-কান্দিসনা বাজান, কান্দিসনা। কি অইছে? বাচ্চাকে কোলে তুলে সান্ত্বনা দেয়ার চেষ্টা করছে। কিন্তু কান্না কিচুতেই থামছে না। সেফার গলা জড়িয়ে ধরে আরো জোরে জোরে কাঁদছে সে।
রান্নাঘর থেকে রত্না বেগমের গলার আওয়াজ শোনা যায়-কিলো কি অইলো তর পুতের আবার, কান্দন লাগাইছে কেরে?
-কইতারি না জেডি। গলাটা চওড়া করে উত্তর দেয় সেফার মা।
-মুহ বুনি দে। আগে পোলাডারে বুনি খাওয়াইয়া-ল, কাম কাইজ পরে করিছ।
সেফার মা এরপর হনহন করে ঘরের ভেতরের দিকে চলে যায়। বাচ্চার মুখে বুকের দুধ পুরে দেয়। তার গা বেয়ে কেমন দরদর একটা ঘাম নামছে। হেচকিতোলা কান্নার শব্দটা পরমুহূর্তেই থেমে যায়। সেফার মা এখনও বিড়বিড় করছে, কান্দনের আর হাইঞ্জ পাইলি না, বালের পোলা!
মহিন সাহেব আবার চোখ ঘুরিয়ে নিলেন রান্না ঘরের দিকে। চুলার আগুনের লাল আঁচে কপালে আর চিবুকে ফোঁটা ফোঁটা ঘাম চিকচিক করছে কানিজের। সাদা ধবধবে বকের পালকের মত সাদা মুখটা আগুনের আঁচে কেমন টসটসে পাকা ডালিমের মত লাল হয়ে উঠেছে।
আকাশে আর ভরা পূর্ণিমা। এ পূর্ণিমায় চারদিকটা এমনিতেই ঝকঝক করে। তার উপর উঠোনে হ্যাজাক বাতি জ্বালানোর কোন প্রয়োজনই ছিল না। বাতিটা এখন প্রায় নিভু নিভু করছে। তেল শেষ হয়ে এসেছে। গতকাল আকাশে আজকের মতই ভরা পূর্ণিমা ছিল। কানিজকে কত করে বলেছেন-চল বাহিরে পূর্ণিমা দেখি; আকাশে ভরা চাঁদ।
ঘুমের চোখে সে যেন উনাকেই দেখতে পেল না! শান্ত ছেলের মত তাই বালিশে মাথা গুঁজে কানিজের পাশেই শুয়ে পড়লেন।
তিনি আকাশের দিকে তাকালেন। চোখ কেমন ঝাপসা হয়ে আসে। বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকে যায় না। চোখদিয়ে টপটপ করে পানি পড়ে। পূর্ণিমার তীব্র আলোর সাথে দঃখের কোথায় যেন গভীর একটা সম্পর্ক।
সেফার মা একটু আগে এক থালা ভাপা পিঠা দিয়ে গেছে, সাথে একটা পিরিচে করে ভর্তা।
-ভাইজান ভর্তা দিয়া খান, ভালা লাগব। চাওন্দা মাছের ভর্তা। হজর পাতা দিয়া বাইট্টা বানাইছি। সে একথালা পিঠা সামনে দিয়েই চলে গেল। এখন আবার সেই গাইলে ধুক ধুক শব্দে ভেজা আতপ চালের গুঁড়ি করছে।
একটা পিঠা মুখে দিতেই জিহ্বাটা কেমন করে উঠল, হাত থেকে পিঠাটা সোজা মাটিতে পড়ে গেল।
-বাবা, আস্তে আস্তে খাও। এত তাড়াহুড়োর কি আছে? মহুয়ার দিকে তাকালেন, আনমনা একটা হাসি দিলেন।
খাওয়া-দাওয়ার পাট চুকেছে অনেক আগেই। বাড়ির সবগুলো দরোজা জানালা এখন বন্ধ। যে যার যার করে ঘুমোচ্ছে। কানিজও খেয়েদেয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে। মহিন সাহেব একবার ভাবলেন তাকে ডেকে তুলবেন পূর্ণিমা দেখার জন্য;
-এই কানিজ, এই উঠ। দেখ বাহিরে আজ ভরা পূর্ণিমা। ভরা যৌবনে তুমি যেমন সুন্দর ছিলে, ঠিক সেই রকম। উঠ না; কি হল?
কিন্তু ডাকলেন না। পায়ের নিচের কাঁথটা দিয়ে তাঁর বুক পর্যন্ত ঢেকে দিলেন। তারপর একা একা ঘরের দরজা খুললেন নিঃশব্দে। গায়ে দু-পাল্লা করে ভাঁজ করে দৈনিক বাংলার মোড় থেকে কেনা আরবান রঙের চাদরটা মুড়ি দিলেন। এসে বাড়ির উঠোনে দাঁড়ালেন। গুঁটি গুঁটি পায়ে বাড়ির পশিম পাড়ের বাঁধানো কুয়ো পাড়ের দিকে গেলেন। ঝাঁকে ঝাঁকে জোনাকি উড়ছে পাশের মাঝারি সাইজের ডুমুর গাছটার মগডালে, পূর্ণিমার গোগ্রাসে আলোয় জোনাকির আলোতা কেমন নিস্তব্ধ হয়ে নিজের মধ্যেই আটকে গিয়েছে।
এ আলোয় এক প্রবল হাহাকার কাজ করে। কুয়োর পাড়ে গুটি মেরে বসে কিছুক্ষণ নিচ্ছিদ্র আকাশটার দিকে তাকিয়ে রইলেন। কোথায় যেন একটা শূন্যতা! পায়ের নিচে ফরফরা শুননো মাটিতে বেশ সুন্দর একই অবয়বে একটি ছায়া জেগে উঠেছে। নিষ্প্রাণ ছায়া। তিনি তাকিয়ে আছেন।
হটাত আচমকাই কেমন আঁতকে উঠলেন। ছায়ার পাশেই আরেকটি ছায়া কিছুটা দূর হতে হেঁটে হেঁটে শ্লথ পায়ে জেগে উঠা একই অবয়বে ছায়াটার দিকে এইয়ে আসছে। এসেই পাশাপাশি দাঁড়াল।
-কি হল, তুমি ঘুমাওনি?
-ঘুম আসছে না। ঘুমের ভান করে শুয়ে ছিলাম, দেখলাম তুমি বাহিরে বেড়িয়ে এলে। তাই…
কানিজ তার হাতটি আলতো করে মহিন সাহেবের পিঠে রাখলেন। পাশে এসে গাঁ ঘেঁষে বসলেন। দুটো শরীরের উত্তাপ একটা অনুভূতি প্রবাহে হিম হয়ে আসা মৃদু বাতাসটায় কেমন মিলিয়ে যেতে লাগল।
শরীরে জড়ানো চাদরটা খুলে একপাল্লা করে কানিজের শরীরে জড়িয়ে দিলেন। চাদরের নিচ দিয়ে কোমড়ে কিছুটা চেপে ধরে-
-শীত লাগছে তোমার?
প্রতি-উত্তরে একটা বুক ঠেলে আসা নির্ঝর হাসি হাসলেন কানিজ।
-ওই দিকটায় যাবে?
দেবদারু গাছতার একটা ছায়া পড়েছে। আঙুল উঁচিয়ে দেখায় সে।
-চল যাই। কত সহজেই কথায় সায় দিল মহিন সাহেব। দুজনে হাঁটছেন পাশাপাশি। জেগে উঠা ছায়া দুটোও হাঁটছে সম-ব্যবধানে। কি যে ভয়ংকর সুন্দর। রাত গড়িয়ে যায় ধীর গতিতে। ভরা পূর্ণিমার আলোটাও নিজের রঙ পাল্টায় গড়িয়ে চলা সময়ের ব্যবধানে একটু একটু করে।