আমরা দু’জনে একে অপরের দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছি। ওর নিষ্পলক চাহনি প্রতিমুহূর্তে আমার দিকে ছুঁড়ে চলেছে অভিযোগ ভরা অভিমানের তীর। যা একের পর এক বিঁধছে আমার লজ্জার বিবেকে। হঠাৎ ওর চোখের কোনায় যেন একটা জলের বিন্দু স্পষ্ট দেখতে পেলাম। যদিও লোকানোর যথাসম্ভব চেষ্টা ও চালিয়েছিল তবু চোখ থেকে চাহনি কখন যে মনে গেঁথে গেছে তা নিজেও জানিনা। মৌনতা ভাঙ্গার প্রথম চেষ্টাটা আমিই করলাম। গলাটা কেমন যেন ভিজে আছে। মনের কোনে জল কখন যে আমার শব্দ নালিতে ডেরা গেড়েছে বুঝতেই পারিনি। তাও একটা ছোট্ট গলা খাকরানি দিয়ে চেষ্টা করলাম নিজেকে সামলাতে। আবার রাখলাম চোখ ওর চোখে।
“চিনতে পেরেছিস তাহলে!”
একটা অদ্ভুত ম্লান হাসি খেলে উঠলো আমার ভীষণ চেনা দুটো ঠোঁটে। চোখের ইশারায় দেখিয়ে দিল ওর পাশের ফাঁকা সিটটাকে।
আবারও যেন শুনতে পেলাম আমাকে কাছে টানার ওর ফিসফাস চিৎকার। না সময় বলছে ।পরিণত হয়েছে পদ্ধতি। হয়ত পরে আজ শুধু পরিচিত। তাই ওই টুকুটাই সঙ্গ করে প্রাক্তন পরিচয় নিয়ে উঠে গিয়ে বসলাম ওর পাশে। মনের মধ্যে হাজার প্রশ্নের ধুপ ধাপ শুনতে পাচ্ছি। কিন্তু পরের কয়েক মুহূর্তে দুজনেই চুপচাপ।
“সাধারণত আমি বাসেই বাড়ি ফিরি”। বলতে আরম্ভ করল পূর্বাশা।
“আজও তাই ফিরতাম কিন্তু হঠাৎ করে সামনে এসে দাঁড়ানোর ট্রামটার জানলার ভেতরে চোখ পড়তেই” মুখটা একবার নিচু করে পরের মুহূর্তেই জানলার বাইরে চোখ ঘুরিয়ে থামল ও।
“আমার পাশের সিটটা তো খালি ছিল তাহলে অন্য সিটে বসলি যে !”
“একজন হারিয়ে যাওয়া মানুষের স্মৃতির হাড়ে দুব্য গজাতে চাইনি। তাই অপেক্ষা করছিলাম আর দেখছিলাম তোকে।”
“তুই দেখছিলি আমায়?”
“কেন বিশ্বাস হচ্ছে না? যদিও না হওয়াই ভাল। তোর গন্ধটা কিন্তু এখনো বদলায়নি।”
“তুই কি আমার গন্ধ চিনিস নাকি?” হেসে জিজ্ঞাসা করলাম আমি।
“কি করি বল! মিশে আছে যে আমার ঘামে।”
“তা যাচ্ছিস কোথায়?”
“আমার রাত্রি ঠিকানায়।”
“কিন্তু তোর বাড়ি তো……”
” এখন বালিগঞ্জে থাকি। একটা এক কামরার ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়ে।”
“হঠাৎ ভাড়ার ফ্ল্যাটে কেন?”
“প্রগতিশীল সমাজে একজন ডিভোর্সি ঠিকানা যে ভাড়াবাড়ি হয়!”
“মানে ঠিক বুঝলাম না!”
“দক্ষিণাপণ যাবি?” প্রশ্ন করল পূর্বাশা। “শেষবারের মতো!”