|| সাহিত্য হৈচৈ – সরস্বতী পুজো স্পেশালে || অন্তরা দাঁ
by
·
Published
· Updated
সরস্বতী পুজো : বাঙালির ভ্যালেন্টাইন্স ডে
আমাদের ছোটবেলায় ভ্যালেন্টাইন্স ডে ছিলো না, সরস্বতী পুজো ছিলো। মা’র কাছে হলুদ শাড়ির বায়না ছিলো, বাড়ির বড়দের কাছে সারাদিন বাইরে থাকার অবাধ লাইসেন্স পাওয়ার আবদার ছিলো, প্রথম, বচ্ছরকার সাধ মিটিয়ে কুল মুখে দেওয়ার উত্তেজনা ছিলো আর সেই… ওই, ওই যে ছেলেটা দুর্গাপুজোর সময় থেকে রোজ দু’বেলা ইস্কুল যাওয়ার রাস্তায় দাঁড়িয়ে, আড়চোখে দ্যাখে, না দেখার ভাণ করে, ঝারি মারে,তাকে ভালো করে দেখার উদগ্র ইচ্ছে ছিলো! আমি অবশ্য তখন ‘ঝারি’ শব্দের মানে জানতাম না, সে জেনেছি অনেক পর, কলেজে উঠে। তবে ওই স্কুল থেকেই ওইসব শব্দবন্ধ শিখছি টুকটাক, নিষিদ্ধগন্ধমের রঙিন হাতছানি। আমাদের শৈশব-কৈশোরের এমনকি প্রথম যৌবনের দিনগুলোতেও সরস্বতী পুজোর একটা বিশাল অবদান ছিলো, আমাদের বোধ, চিন্তা, মননের অনন্ত সংবেদী বিন্যাসের সাথে সে অনুষঙ্গ কোথাও ওতপ্রোত ভাবেই জড়িয়ে আছে।
খুব হলদেটে যে সব ছবি মনে আসে, তাকে এই পড়ন্তবেলার গোধুলি আলোয় দেখি, একটি পাড়াগাঁ’র কচি-কলাপাতা-রঙ ভোরে, মাঘমাসের শীত, আকাশের অকলঙ্ক নীলে, মা ষষ্ঠী’র তেল-হলুদ মাজা ঝকঝকে রোদ, তখন ওই সাত কী আট, মা’র তাঁতের শাড়ি পেটের কাছে ফুলে আছে, কচি শরীরে এখানে-ওখানে সেফটিপিন, ঘাড় পর্যন্ত ছাঁটা চুল উমনো-ঝুমনো মুখের ওপর।
দুপুর গড়িয়ে বিকেল হয়ে গেছে, তবু সে শাড়ি কিছুতেই খুলবে না মেয়ে!
আরেকটু বড় হওয়া, সদ্য কিশোরী, আলপনা’র খড়িগোলা চলকে পড়েছে হলদে শাড়ির ভাঁজে, পিঠে এসে পড়া ভেজা চুল সামলাতে গিয়ে! কারোর আধভেজা রুমাল দিয়ে যত্ন করে মুছে দেওয়া গ্যাছে সে দাগ! আর স্মৃতির সেইসব খড়ির আঁকিবুঁকি! আজও এই পড়ন্ত বিকালের গোধুলি আলোয়, সোনারঙ পড়ে ঝিলমিল ক’রে ওঠে! ফল কাটা, নৈবেদ্য সাজানো, অঞ্জলি! এসব তাকে আবডালে পাবার ছুতো!
জীবন কেমন গড়িয়ে যায়, না? সময় তাকে একখানি প্রেম-অপ্রেম-বিষাদ-আনন্দের মালা গেঁথে সাজিয়ে দেয় অপরূপ, সেই অধরা-মাধুরী’র জন্য আমাদের পাকদণ্ডী পথ হাঁটা, চড়াই-উতরাই, আরোহণ-অবরোহণ।
ভোগের হড়হড়ে ফ্যাকাশে হলুদ খিচুড়ি আর সব্জীর লাবড়া, কখনো বাঁধাকপি’র এ্যানিমিক উপস্থিতি, পায়েসান্ন মানে ভাতের মন্ড একটু মিষ্টি দেওয়া আর বোঁদে, কড়কড়ে চিনির পাক, হলুদ রঙের মাঝে মধ্যে দু’একটা লাল লাল দানা! সরস্বতী পুজোয় সবকিছুই হলুদ-ঘেঁষা, কোথাও যেন আগাম বসন্তের আভাস। তিথিটা’ই যে বসন্তপঞ্চমী! ইস্কুলের পাশাপাশি পাড়ায় পাড়ায়, এমনকি বাড়িতে বাড়িতেও তখন বেশ চল ছিলো এ পুজোর। লাইব্রেরি, ক্লাব, সর্বত্র মাইকে গমগম করতো গান। কী আশ্চর্য, বিদ্যা’র দেবী অথচ গান বাজতো বেশিরভাগই ফিল্মি, দু’একখানা হিন্দি চটুল গান’ও যে বাজতো না তা নয়, বেশ একটা ‘মুক্তি মুক্তি ‘ ফিলিংস! সকাল বিকেল পড়তে বসা নেই, টিউশন নেই, মা’র রক্তচক্ষু নেই, আহা! অবাধ ঘুরে বেড়ানোর দিন, কাটা ঘুড়ির ইচ্ছেসুতোয় তখন হেভি মাঞ্জা।
যে প্রেম’টা অনেকদিন হবো হবো ক’রে ঝুলে ছিলো, শেষমেষ লজ্জা-শরম জয় ক’রে সে বলেই দিলো! তখন হাতচিঠি’র বেশ চল ছিলো।টুকরো টুকরো চিরকূট, তাতে লেখা ‘আই লভ ইউ’ কিম্বা ‘তুমি শুধু আমার ‘ এই টাইপ, মাঝে মাঝেই তা হারমোনিয়াম ভাঁজে, যুদ্ধ-বিমানের মত এসে পড়তো এর ওর মাথায়, নীচে লেখা ‘তোমার চিরদিনের সু’ অথবা ‘এভার ইওর্স অ’,সুমন বা অরিন্দম, নামের এব্রিভিয়েশন ইউজ করা হতো, সাধারণত ছেলেরা মেয়েদের দিকে ছুড়ে দিতো এসব, সাথে বাড়ির ছাদে ফোটা, টবের গোলাপ, চন্দ্রমল্লিকা নিদেনপক্ষে গাঁদা বা বোগেনভিলিয়া,( আমরা বলতাম কাগজফুল) দিয়ে কাজ চলতো। একটা প্রেম পাকাতে দুটো পক্ষ থাকতো, ছেলেপক্ষের বন্ধুবান্ধবরা দায়িত্ব নিয়ে বান্ধবীদের মাধ্যমে( মেয়েপক্ষ)নায়িকার কাছে পৌঁছে দিতো, সে চিঠি অথবা ছটফটানি যাইই হোক। এই নায়ক-নায়িকাদের চক্করে দু’একটা সহনায়ক নায়িকার প্রেম হয়ে যেত! সে বেশ মজা!
তখন হায়ার সেকেন্ডারি, জেনুইন দিওয়ানিপন! হুটহাট প্রেম নয়, তখন প্রেমকাতরী, ‘দিল চিরকে দেখ তেরা হি নাম হোগা ‘টাইপ বিরহ! ও আমার দিকে তাকাচ্ছে না, থাক, ‘নিজের পছন্দের গার্লফ্রেন্ড’কে নিয়ে সুখে থাক’ টাইপ স্যাক্রিফাইস। সরস্বতীপুজোয় উদাস সাদা শাড়ির আঁচল, সব নালিশ মা সরস্বতীর কাছে ‘তুমি দেখো মা! ‘ সারাজীবন একা থাকার কঠিন সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলা অঞ্জলি দিতে দিতে, তার সাথে বেশ একটা ‘কিছু করে দেখিয়ে দেবো ‘ ধরনের অঙ্গীকার। সরস্বতী ঠাকুর আমাদের বড় আপন ছিলেন, আজও তাইই আছেন। মুখে মা বললেও একটা বড় দিদির মত ব্যাপারস্যাপার যার কাছে সহজেই কনফেস করা যায়, কম নম্বর থেকে ছ্যাঁকা খাওয়া প্রেম! সবটুকুই।
কলেজে পড়ার সময় শিখলাম ভ্যালেন্টাইন্স ডে! তা’ও জানতাম না ঠিক করে, তখন হাতে হাতে গুগল বাবা ছিলেন না, জুকুসাহেবের কারসাজি তার’ও অনেক পরে। একটি বঙ্গজ সন্তান, এই গাঁ-গেরাম থেকে পড়তে আসা, আনস্মার্ট, ক্যাবলা’র হদ্দ, শ্যামলা মেয়ের হাতে যদি গুঁজে না দিতো একখানা এ্যাড জেলে’র কলম আর রাইটিং প্যাড, একখানা রক্তলাল হৃদয়ের ফ্রেমে ঘূর্ণায়মান মেম-সাহেব!যাচ্চলে! এ যে পীরিত করতে চায়!?আমি অলরেডি তখন ‘প্রেম কভি নেহী’ তে বডি ফেলে দিয়েছি। সেই শেখালে, ভ্যালেন্টাইন্স ডে! আমি তড়িঘড়ি বাড়ি ফিরে দাদামশায়ের কেমব্রিজ ডিকশনারি খুঁজেপেতে মানে বের করে পুলকিত! প্রেম হলো না, অজস্র ভ্যালেন্টাইন্স আমার মানসলোকে ধেইধেই নেত্য করছে তখন! শুধু মানে বুঝেই বেজায় খুশি। যাক, চান্স আছে তাহলে!
আজ এতবছর পর, বুড়িবেলায়, শেতলষষ্টি’র হি হি ঠান্ডা ভাত মুখে তুলতে গিয়ে ভাবি— উষ্ণতা, অনুভব, সবকিছুই বদলে যায়! সরস্বতী পুজো আছে, ভ্যালেন্টাইন্স ডে আছে, আর সে ইচ্ছে নেই, কোমরে খচখচ করে ব্যথা, সকালবেলায় শ্যাম্পু করা দূরঅস্ত, স্নান করতেও বেজার লাগে! নমো নমো করে অঞ্জলি দিতে দিতে, চুপিচুপি মা’কে বলি, ছেলেপিলেদের লেখাপড়া যেন হয় মা, আর…
স্বপ্ন দেখে বুক ধড়ফড় করতে করতে কবে মরে যাবো এবার, বয়েস হচ্ছে তো! ই.সি.জি রিপোর্ট ভালো না।
এখনো প্রায়ই দুঃস্বপ্ন দেখি পরীক্ষায় বসে একটা প্রশ্ন’ও লিখতে পারছি না। এমন কেন করো মা? কুল তো মুখে দিই না তোমার পুজো না হলে! তবে! কী দোষ করলাম রে বাবা! এমন স্বপ্ন কেউ দ্যায়?! এখনো?