সাপ্তাহিক গল্প নেই-তে কল্যাণ গঙ্গোপাধ্যায় – ৬

গল্প নেই – ৬

পিঠে মৃদু স্পর্শ পেয়ে ফিরে তাকালাম। দেখি ভৃগু। বলল,  কি ব্যাপার তুই এখানে ? কে আছে সঙ্গে?
বললাম, কেউ না। একাই এসেছি। কথাটা বলেই দেখি ভৃগুর পাশে এসে দাঁড়াল ওর স্ত্রী, লতা। হাতে দুটি তালপাতার পাখা। বলল, এখানে সস্তায় পেলাম।
ভৃগু বলল, একা এসেছিস? কোনো মানে হয়! বলে ও এমন ভাবে তাকিয়ে রইল যেন আমি গুরুতর কোনো অপরাধ করে ফেলেছি। বলল,  বউ না হোক বান্ধবী নিয়ে তো আসতে পারতি। নয়ত বন্ধুদের সঙ্গে।
বললাম,  এই তো তোদের পেয়ে গেলাম।
লতা কলকল করে উঠল। আপনি আর পেলেন কোথায়,ও যদি আপনাকে না ডাকত তাহলে তো দেখতেই পেতেন না। সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে কি এমন দেখছিলেন? 
যা এমনিতে  দেখা যায় না, সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে তাই দেখছিলাম।
তার মানে? লতা বলল,  কি দেখা যায় না?
যেমন ধর অফিস যাওয়ার তাড়া। যান-জট। ডিজেলের ধোঁয়া। মুখোশে ঢাকা অজস্র জটিল মুখ। খুন, জালিয়াতি আর ধর্ষণের খবর। বিশ্বাসহীনতা। এইরকম আরও অনেক। যা সমুদ্রের দিকে তাকালে দেখা যায় না। তাই ওদিকে তাকিয়েছিলাম।
থাক থাক। আর কবিত্ব করতে হবে না। লতা বলল, সত্যি সত্যি একা এসেছেন? না বান্ধবী জুটিয়ে নিয়ে এসেছেন।
বললাম, কি বলে তোমাকে খুশি করতে পারি? হঠাৎ মনে পড়ল ভৃগুর বোন সাগরিকার কথা। গত মাসে ওর বর মারা গেছে ক্যানসারে। ভৃগুকে বললাম, সাগরিকার খবর কি রে? কেমন আছে? শোকটা সামলে উঠতে পেরেছে তো?
ভৃগু কিছু বলতে যাচ্ছিল।তার আগেই লতা বলল, বেইমান। সব বেইমান। জানেন তো ওর জন্য আমরা এতকিছু করলাম,আর এখন নিজে থেকে একটা খোঁজ নেয়ারও প্রয়োজন মনে করে না।
ওর যা অবস্থা, এখন ওর কাছ থেকে কিছু আশা করাই উচিত নয়। বরং আমাদের উচিত… ভৃগুর কথা এক ধমকে থামিয়ে দিয়ে লতা বলল, থাক। আর বোনের হয়ে ওকালতি করতে হবে না। তোমাদের বাড়ির সবাইকে আমার জানা হয়ে গেছে। তোমরা কেউ মানুষ না।
ভৃগুর মুখটা কেমন ম্লান হয়ে গেল। ও আমার দিকে তাকিয়ে বলল, আছিস তো,আবার দেখা হয়ে যাবে।
ভৃগু এগিয়ে গেল। পাশে লতা। ও অনর্গল কথা বলে যাচ্ছে। যে প্রসঙ্গ এল কথায় কথায়, জানিনা লতা কোথায় এর শেষ করবে। এভাবে হয়ত রোজই নানা বিষয়ে কথা শুনতে হয় ভৃগুকে।
এদিকে পড়ে রইল বিশাল সমুদ্র। কিছুক্ষণ বাদে জ্যোৎস্না উঠে একের পর এক ভাঙতে থাকা ঢেউয়ের মাথায় আঁকবে বিচিত্র নক্‌সা।
সেদিকে তাকিয়ে আমার ভৃগুর কথা মনে পড়বে। লতার কথাও। সমুদ্রের বিপরীতে মুখ করে চলে যাওয়া ওদের ডেকে এই অপরূপ দৃশ্য আমি দেখাতে পারব না।  
ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।