বাবার প্রকাশনা সংস্থা ও অনুবাদ পত্রিকা সারা বছর জুড়েই নানান ওয়ার্কশপ, সেমিনার, অনুষ্ঠান আয়োজন করত।ভারতবর্ষের নানা প্রান্ত থেকে লেখক এবং অনুবাদকরা আসতেন।কখনো কখনো বিদেশ থেকেও অতিথি আসতেন সেই সব অনুষ্ঠানে যোগ দিতে।
তাঁদেরকে রাখা হত কোনও সরকারি গেস্ট হাউসে, কিংবা সার্কিট হাউসে অথবা নিকটস্থ কোনও ভালো হোটেলে।
তবে হোটেলে রাখা বিশেষ করে মফস্বলে অনুষ্ঠান হলে সাধারণত হোটেলের বদলে কোনও বাড়িতে কিংবা আশেপাশের কোনও সরকারি গেস্ট হাউসই বাবার পছন্দ ছিল।
অনেক ছোট থেকে বাবার সঙ্গে আমি ঘুরি।এই সব অনুষ্ঠানে আমার একটা বিশাল দায়িত্ব থাকত।এবং আমি সেটা হাসিমুখে সামলাবার চেষ্টা করতাম।
অতিথিদের কপালে টিপ পরিয়ে দেওয়া,তারপর ফুলের স্তবক বা মালা পরিয়ে বরণ করা।
এই টুকু সময় আমি অনুষ্ঠান কক্ষে থাকতে বাধ্য। কারণ এটা আমাদের অনুষ্ঠান।
এই পর্বটুকু মিটলেই পুরো বিষয়টা হয়ে যেত বাবাদের। আমি তখন হল থেকে বেরিয়ে অন্য কোথাও ঘুরে বেড়াতাম।
বাবার গাড়ির ড্রাইভার কালীচরণ কাকু,যাঁকে শুধু ড্রাইভার বললে বাবা রেগে যেতেন,তিনি আমাদের পরিবারের সদস্য হয়ে গেছিলেন।
সেই সব দিনে তিনি ছিলেন আমার পাহারাদার। যদিও দূর থেকে অনুসরণ করতেন।কাছে এলেই আমি বিরক্ত।
আমি কি ছোট বাচ্চা নাকি!রীতিমত ক্লাস ফাইভ সিক্সে পড়ি।তাকে পাহারা দেবার কি আছে!
কালীচরণ কাকু আবার গোপনে আমার সব গতিবিধি নজর রেখে ফিরে এসে মাকে বলে দিতেন। মা সেই মুহূর্তে কিছু না বললেও পরে কোনও একসময় বলতেন সেই ঘটনার খানিকটা। বহুদিন পর্যন্ত ভাবতাম, মায়ের নির্ঘাত দিব্য চোখ আছে।নইলে যাই করি জেনে যান কি করে!
কালীচরণ কাকুও বলতেন বৌদি স্বয়ং মা দুর্গা।তাই মায়ের ত্রিনয়ন আছে এ বিষয়ে আমিও নিঃসংশয় ছিলাম।
মাঝারি গঠনের ঘন কালো চুল,বেশির ভাগ সময় সাদা পোশাক পরা তাঁকে দেখলেই আমাদের নানা বায়নাও শুরু হত।
বিশেষ করে রাস্তায়।বাবা সচরাচর চা খেতে গাড়ি থেকে নামতেন।কিংবা কোনো সবুজে ভরা মাঠের পাশ দিয়ে, বা ঘন জঙ্গলের মধ্যে গাড়ি যাচ্ছে, বাবা নেমে পড়লেন।খানিকক্ষণ তন্ময় হয়ে দাঁড়িয়ে গোটা তিন চার সিগারেট খেলেন।সেই সময় আমাদের সঙ্গে কোনও প্রেস ফটোগ্রাফার হয়তো চলেছেন অনুষ্ঠান কভার করার জন্য।
বাবার সেই তন্ময় ছবি তিনি ক্যামেরা বন্দী করলেন।
খানিক বাদেই বাবার খেয়াল হল আমি রয়েছি সঙ্গে। তিনি ডেকে নিলেন- কিরে এখনো গাড়িতে?
আমি শুধু এটুকু শোনার অপেক্ষায়। এক লাফে নেমেই চারপাশে ঘুরতে শুরু করে দিতাম।
বাবা বলতেন- যা যতটা পারবি ধান ক্ষেতের মধ্যে হেঁটে আয়।
কালিচরণ কাকু অমনি প্রস্তুত আমার সঙ্গে যাবে বলে।
এই যাওয়ার বিষয়টা বাবা কখনোই কালীচরণ কাকুকে নির্দেশ দিতেন না।বরং তিনি চাইতেন তাঁর বড় কন্যা তাঁর মতোই কিছুটা বোহেমিয়ান হোক।
বহু সময়ই বলতেন -কোনো কিছুতে আসক্তি রাখবি না।যা কাজ করার,কর্তব্য করার সব করতে হবে।কিন্তু আসক্ত হবি না।আসক্তি থাকবে কেবল মহা জাগতিক যে অপরিসীম শক্তি, তা তুই ঈশ্বর বল আর নাই বল,তার প্রতি।সাধারণ কোনও কিছুর কাছে নিজেকে সমর্পণ করার থেকে সেই অসাধারণ শক্তির সন্ধানে তাঁর কাছেই একমাত্র সমর্পণ করবি।তাতে মনের শক্তি যেমন বাড়বে,তেমনি সব মলিনতা থেকে দূরে থাকতে পারবি।
বাবার সব কথা যে তাঁর কন্যা বুঝতে পারত তা নয়।কিন্তু কিছু একটা শক্তি অনুভব করত,যা টানতো বাবার জীবন দর্শন অনুসরণ করার জন্য।
কালীচরণ কাকু বাবার নির্দেশে তাকে অনুসরণ করছে না,এটা তাই সে নিশ্চিত ছিল।আবার এটাও জানত মায়ের নির্দেশ আছে তার প্রতি কড়া দৃষ্টি রাখার।কারণ এই বড় কন্যা কখন কি করবে সে নিয়ে তাঁর যথেষ্ট চিন্তা আছে।
ছোটো কন্যাটি মা ছাড়া কিছু বোঝে না,মেজটিও তাই।তবে দিদিকে সামলাতে গিয়ে সে মাঝেমধ্যেই দুঃসাহসিক সব কাজের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে। সব সময় যে নিজের ইচ্ছেয় তা নয়,কিন্তু দিদির প্রতি তার চরম অনুরাগ।আর সে সব কথা চট করে বলবেও না পাছে মা দিদিকে মারে,বকে ভেবে।
এই তো সেদিন বুকে পেরেক ফুটে রক্তারক্তি। তিনি একাই বীরের মতো দিদিকে সামলাবার চেষ্টা করছিলেন।ভাগ্যিস রক্তের ধারা বাইরের নর্দমায় প্রবাহিত হল,তাই খবর পাওয়া গেল এক কন্যা বাথরুমে বসে রক্ত ধোওয়ার চেষ্টা করছেন,আরেকজন কাঁদছে ভয়ে,আবার তুলো দিয়ে রক্ত বন্ধ করার চেষ্টা করে যাচ্ছেন। এদের ভাব তাঁকে যতটা আশ্বস্ত করে ততটাই চিন্তায় ফেলে মাঝে মধ্যেই।
কে না জানে আগলা গরু যেদিকে যায়,পিছলা গরুও সেদিকেই যাবে।
মেজটা অবশ্য মায়ের প্রতি প্রচন্ড নির্ভরশীল। বড়টা নয়।সে একটু দূরে দূরে থাকতেই ভালোবাসে।
হয়তো খানিকটা অভিমান কাজ করে মায়ের প্রতি এটা বুঝতে পেরেও কিছু করার থাকে না তাঁর।
কালিচরণকে তাই বলা আছে মনা থাকলে যেন একটু চোখে চোখে রাখে।দাদার তো কোনও বাহ্যিক হুঁশ নেই। নইলে একরত্তি মেয়েটাকে নিয়ে দিনের পর দিন শশ্মানে কাটাতে পারে?
কালীচরণ কাকু পিছনে আসছে দেখেও কিছু বলল না মনা।সে নিজের গতিতেই ছুটতে লাগল আলক্ষেত ধরে।খানিকটা নাচও করে নিলে ধানের সবুজ শীষ ছুঁয়ে।
এমনই এক ছুটে চলার মুহূর্তে তিনি মনকে শান্ত স্বরে বলেছিল- দাদা যেটা করেন সেটা তোমাকে মানায় না মন।দাদা পনেরো দিন বাড়ি না ফিরলেও কেউ আঙুল তুলে বলবে না কিছু। এই সমাজে পুরুষদের বাড়ির বাইরে থাকাটা কাজের জন্য হয়,আর মেয়েরা কাটালে সে চরিত্রহীণ।এই যে আমি দাদার গাড়ি চালাই,বাইরে ঘুরি,সে আমার পরিবার প্রতিপালন করার জন্য। কিন্তু তোমার কাকিমা তা পারে কি?
চরিত্রবান,চরিত্রহীণ শব্দগুলো সেই দশ বারো বছরের মেয়েটির কাছে ধোঁয়াশার মতো।শরৎচন্দ্রের ‘”চরিত্রহীণ” যদিও সে পড়ে ফেলেছে,কিন্তু এই শব্দের মানে ততটা বুঝতে পারেনি।
কালিচরণ কাকু আরও বলেছিলেন- মেয়ে হয়ে যখন জন্মেছ,বিয়ে তো হবেই।এত চরকির মতো ঘুরতে থাকলে সংসার করবে কি করে! যতই চাকরি করো আর টাকা রোজগার করো মেয়েদের কিন্তু গন্ডী টানা। দেখছ না বৌদি এত কাজ একা হাতে সামলান,কিন্তু দাদার মতো বাইরে দিনের পর দিন কাটাতে পারেন কি? তোমরা তাঁকে আষ্টেপৃষ্টে বেঁধে রেখেছ।এখন থেকে মায়ের মতো হবার চেষ্টা করো।সংসারে শান্তি আসবে।