অবনী ঘুমের মধ্যে নাক ডাকে। ঘুমের মধ্যেই মাঝরাতে হঠাৎ চিৎকার করে ওঠে।এমন চিৎকার যেন সে একটা ভয়ংকর অবস্থার মধ্যে পড়েছে। অসহায়। সেখান থেকে উদ্ধার পাওয়ার কোনো উপায় নেই।ওর সঙ্গে আদ্রায় যাচ্ছি শুনে ওর স্ত্রী রীনা আমাকে সাবধান করে দিয়ে বলেছিল, ‘ওর সঙ্গে যাচ্ছেন যান। তবে রাতের ট্রেনে ওকে সামলাবার দায়িত্ব কিন্তু আপনার।’
দু’জনে যাচ্ছি। পরস্পরকে সামলাবার দায়িত্ব যে নিজেদেরই এ তো জানা কথা। এই কথার আর কি জবাব দেব?
ট্রেন ছুটতে শুরু করলে অবনীর নাকের ডাক শুনতে পাব না। ট্রেনে এত লোকজনের সামনে চিৎকার করে ও নিশ্চয়ই লজ্জা পাবে। এই ভেবে আমি নিশ্চিন্ত হয়ে শুয়ে পড়লাম। রাতের ট্রেনের ছুটে চলার শব্দের মধ্যে একটু একটু করে ঘুমিয়ে পড়ার ইচ্ছে নিয়ে।
রাত প্রায় এগারোটা ঝালমুড়ি উঠল।ওই রাতে উঠল ডাব। চপ। সঙ্গে নাস্তা নাস্তা চিৎকার। চা তো আছেই। ঘুম অসম্ভব।গাড়ি থামলেই দরজা খুলে লোকজন ওঠানামা করছে।কেউ কেউ দরজা খুলে বাইরে কি দেখছে কে জানে! নিশ্চিন্ত হয়ে ঘুমাবার কোনো উপায় নেই। মাথার নিচে ব্রিফকেস। ওটার মধ্যে সব। কেঊ যদি নিয়ে যায় তবে সমস্যায় পড়ব। ভাবলাম যাদের নানা ধরনের মূল্যবান কিছু আছে তারা কি রাত জেগে সব পাহারা দিচ্ছে? এমনও তো হতে পারে দরজা খোলা পেয়ে একদল লুটেরা উঠল! তখন কে আটকাবে?
রাত একটা দেড়টা হবে হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেল। দেখি আমাকে একজন ধাক্কা দিচ্ছে। উঠে দেখলাম অবনী ঘুমের মধ্যে পরিত্রাহি চিৎকার করছে। ডেকে তুলতেই চারিদিকে কেমন অবাক হয়ে তাকাল। বড়ো শ্বাস ফেলল। ও বেঁচে আছে এটা বুঝতে পেরে যেন নিশ্চিন্ত হল। পরে বলেছিল, ও স্বপ্ন দেখছিল গোটা ট্রেনটা দাউ দাউ করে জ্বলছে। অজস্র মানুষের সঙ্গে ও পুড়ছে। বুঝলাম কিছুদিন আগের ট্রেন দুর্ঘটনার স্মৃতি, ট্রেনে উঠবার সঙ্গে সঙ্গে ওকে তাড়া করে বেড়িয়েছে। রাতের ছুটে চলা ট্রেনে আগুন লেগে পুড়ে মরেছে ওর এক প্রিয়জন। অন্য নানান প্রসঙ্গে কথা বলতে বলতে একসময় আমরা শুয়ে পড়লাম।
ঘুমের মধ্যেই আমার মনে হল কেমন দম বন্ধ হয়ে আসছে। এভাবে থাকলে আর একটু হলেই মারা যাব।ছটফট করে উঠে বসলাম। ঘড়ি দেখলাম আদ্রা আসতে তখনও একঘন্টা বাকি। নাকে এল ধোঁয়ার গন্ধ। দম বন্ধ হয়ে আসছে। কষ্ট হচ্ছে। এই রকম অবস্থা বেশিক্ষণ চললে দেখা যাবে কামরার সমস্ত লোকজন অসুস্থ হয়ে পড়বে। হয়ত বা মারা যাবে।
অবনীও ছটফট করে উঠে বসল।ওর কাশি এল। কাশতে কাশতে দু’টো চোখ যেন ঠিকরে বেড়িয়ে আসতে চাইছে। বোতল থেকে জল খেয়ে কোনোরকমে সমলে নিল নিজেকে।
আপার বার্থ থেকে দুজনে নামলাম। এই কামরায় বেশ কিছু শিশু আছে তারা কেমন আছে! সুস্থ আছে কি? বেঁচে আছে তো এখনও। নামতে গিয়ে দেখি দরজার সামনে একজন চাওয়ালা। তার কেটলির নিচে জ্বলন্ত আগুনের শিখা।সেখান থেকে ধোঁয়া উঠে গোটা কামরায় ছড়িয়ে পড়েছে।
অবনী ধমক দিয়ে চাওয়ালাকে নামতে বলল। দেখলাম রেলরক্ষীদের সঙ্গে গল্প করতে করতে হাসিমুখে তাদের দিকে চা এগিয়ে দিচ্ছে চাওয়ালা।
অবনীর বকুনিকে পাত্তাই দিল না।