সাপ্তাহিক ধারাবাহিক কথা সাগরে প্রদীপ গুপ্ত

বাউল রাজা

দ্বিতীয় খন্ড ( ঊনত্রিংশ পর্ব )

গুরুপদবাবার আখড়ার পাশে মায়ের পাদপদ্মের যে শান বাঁধানো চাতাল, সে চাতালের পাশেই খানকয়েক ইটের তৈরি উনুনের ওপর একটা বিরাট কড়াইয়ের ভেতর নানান সবজি দিয়ে পাঁচমিশালি তরকারি তৈরি হচ্ছে। কড়াইতে খুন্তি চালাতে চালাতে গুনগুন করছেন সোনাবাবা। ঠোঁটের কোণে একটা চারমিনার সিগারেট ধোঁয়া ছড়াচ্ছে। আর কি অদ্ভুত, ডানহাতে খুন্তি, বাঁ হাতে একটা সাফি দিয়ে ধরে রেখেছেন কড়াইয়ের আংটা, আর ঠোঁটে সিগারেট নিয়ে আপনমনে গেয়ে চলেছেন —
” এ কি জিনিস দিলে গুরু সংসারে
ঝোলে ঝালে অম্বলে কিসে না লাগে কুমড়ারে,
কদু আর কুমড়া দিয়ে, এ কোন ডুগি বাজায় হিয়ে,
গুরু বলে কাটনি নিয়ে, কেন কাটিস প্রাণডারে..
ছোঁচা জিভে মোচা নাচায়, সিমে আর বেগুনে বাঁচায়,
পরাণে যে আরও কী চায়, সাথে ডালের বড়ির নাচডারে…”
আমাকে দেখেই একগাল হেসে খুন্তি রেখে দু’ আঙ্গুলের ফাঁকে সিগারেট নিয়ে এগিয়ে এলেন।
–” কতজনের ভান্ডারা হবে আজ? ”
আমি জিজ্ঞাসা করলাম।
–” এটা এককথায় বলা যাবে না গো পদীপদা, তা ধরো না কেন ঘরের সাধুই তো আশী জন হবে। বাইরে থেকে জনা তিরিশ, এর ওপরে গরীব গুব্বো সব মিলিয়ে তা পেরায় শ’দুইয়ের ঘর ধইরে টান দে দেবে গো। ”
–” দু’শো জন? এই এত লোকের খাবার আপনি একা রাঁধবেন? ”
–” এই ড্যাগমাষ্টারি টা আমার বাঁধা চাকরি গো, সাতে করে কুটনো কাটা,বাটনা বাটা এসব কাজের জন্যি ওই বিল্টু সাধু আর ভবেন রিক্সাওয়ালা আচে। ”
আমি সোনাবাবার সাথে কথা বলছি ঠিকই, কিন্তু মন পড়ে আছে সেই গুহাবাসী সাধুদের ওপরেই। সেই খর্বাকায় সাধুবাবার কথাগুলো খুব ভাবাচ্ছিলো আমায়। শরীর থেকে মনকে উড়িয়ে দেওয়া, খাঁচা, দেহপিঞ্জর, পাখি, এসব কথাগুলো আমার খুব পরিচিত মনে হচ্ছে। এ জাতীয় কথাগুলো আমি এর আগেও শুনেছি। কিন্তু কোন প্রেক্ষিতে শুনেছি, সেটা মনে করতে পারছি না।
–” আচ্ছা সোনাদা, এই যে হিমালয়ের থেকে আসা সাধুবাবারা, এঁনারা কি সত্যি সত্যিই খুবই উচ্চমার্গীয় সাধক? ”
–” দেখো পদীপদা, আমি সাধনার পথে খুব একটা হাঁটিনি। সাধুসঙ্গ করতে ভালো লাগে আর সত্যি বলতে কি, লোকাল পুলিশের থেকে পালিয়ে বাঁচতে এখানে এসে ঘাঁটি গেড়েচি। ”
–” পুলিশের চোখে? কেন এমন কী অন্যায় করেছেন আপনি?”
–” সেসব শুনে কাজ নেই। তবে এটুকু শুনে রাখো, শুধুমাত্র পুলিশের চোখে ধুলো দিতে আমার মতো কত মানুষ যে সাধু সেজে এখানে সেখানে ঘুরে বেড়াচ্ছেন, তার ইয়ত্তা নাই। দেখো গে, ওই হিমালয়ের সাধুবাবারাও কি ওরকমই নাকি! ”
আমার সমস্ত জ্ঞানগম্যি যেন লোপ পাচ্ছে। তাহলে ক্রিমিনাল অ্যাকটিভিটি থেকে পালিয়ে বেড়ানো মানুষেরা — বাল্মিকীর মতো…

চলবে..

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।