কপাল যে এভাবে পুড়বে, এমন অপ্রত্যাশিতভাবে, ভাবতেও পারিনি | কেই বা পারে ? চারপাশে অনেককে ট্রেনে-বাসে কাটা পড়তে দেখেও মানুষ নিজেকে দুর্ভেদ্য ভাবে, নিজের ঘরের লোককে হার্ট অ্যাটাক, স্ট্রোক, ক্যান্সারে মরতে দেখেও মানুষের অমর বলে মনে হয় নিজেকে | এই আশাবাদের জোরটুকু না থাকলে প্রতিদিনের পথ চলাও হয়তো সম্ভব হত না , সবাই মুখ থুবড়ে পড়ত দরজার বাইরে পা রাখতে না রাখতেই | আমি আলাদা হব কী করে ? বিশেষ করে যখন আমার মনে হচ্ছে যে এইবার কপাল খুলছে, তালগোল পাকানো অক্ষরগুলো নিজেরাই নিজেদের সাজিয়ে সমাধান করে ফেলছে ধাঁধা তখন আবার খারাপ কিছুর কথা ভাবতে যাব কোন দুঃখে ?
কোনও কারণ ছিল না অবশ্য |
প্রথম দিন শটের পর পরিচালক নিজে ডেকে আমার কাজের প্রসংসা করলেন | আমি শুটিং সেরে ফেরার পথে ইন্দ্রপুরীতে গিয়ে একটা প্রনাম ঠুকে এলাম শোভনদাকে | হাজার হোক, উনি প্রথম ব্রেকটা দিয়েছিলেন বলেই …
– অনেক দূর যাবি, তুই আরও অনেক দূর যাবি | শোভনদা আলতো হেসে বললেন |
আমি কোনও কথা না বলে চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলাম | মনে মনে বললাম, আমাকে যেতেই হবে |
রাত্রে ফোন করলাম ডোরাকে | আমি তখন সপ্তম স্বর্গে | শোভনদার শুভকামনাটার কথা জানালাম | আমার কাজ কীরকম হয়েছে জিজ্ঞেস করলাম |
ডোরা কীরকম একটা কাঠ কাঠ গলায় উত্তর দিল, ভালই তো করছিস |
– ভালো ? শুধু ভালো ? আমি নিবে যাওয়া গলায় বললাম |
– তাহলে কী বলতে হবে বল ? ডাস্টিন হফম্যানের মতো ? নাসিরুদ্দিন শাহর মতো ? ডোরা একটা হাই তুলল |
– তোর কী হয়েছে ডোরা ? আমি রীতিমতো হার্ট হয়ে জিজ্ঞেস করলাম |
– কী আবার হবে, কাল শুটিং আছে, ঘুমোতে হবে না ?
তখনই মনে হল পিছনে যেন কোনও পুরুষের গলার আওয়াজ শুনলাম | ডোরা তো যতদূর জানি, লেক গার্ডেন্সে একটা ফ্ল্যাটে একা থাকে, তা হলে এত রাতে ওর ঘরে কে এল ? জিজ্ঞেস করব ? পরক্ষণেই নিজেকে নিজেকে অনেক তিরস্কার করে সন্দেহটাকে বার করে দিলাম মাথা থেকে | ডোরার ঘরে কেউ আসেনি, যেহেতু ডোরা আমার কাজের উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেনি, তাই আমার এসব মনে হচ্ছে | ছিঃ !
– রাখছি বুঝলি | ডোরার গলাটা তীক্ষ্ণ শোনাল |
– ওকে বাই, গুড নাইট | আমি বললাম।
ফোনটা ছেড়ে দিয়ে একটা সিগারেট ধরিয়ে আমার ফ্ল্যাটের লাগোয়া ছোট বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ালাম | বাতাসের ধোঁয়ার সঙ্গে বুকের ভিতরের ধোঁয়া মিশে কীরকম সব জটিলতার সৃষ্টি হল | যে ডোরার সুপারিশ ছাড়া আমি এই রোলটা পেতেই পারতাম না, আমাকে ভালো কাজ করতে দেখে তার গলা এতটা ঔদাসীন্যে ভরে গেল কী করে ? ও কি খুশি নয় আমার ভালো কাজ দেখে? ধ্যাত, কী সব উল্টোপাল্টা ভাবছি | কিন্তু যদি উল্টোপাল্টাই হবে তা হলে ও এত কোল্ড কেন আমার সঙ্গে ? এমন কি হতে পারে যে আমার কোনও ব্যবহারে ও আঘাত পেয়েছে? কী করেছি আমি ? জিজ্ঞেস করব, একবার ফোন করে ? না থাক, কাল সকালে স্টুডিয়োয় তো দেখা হচ্ছেই | ভাবতে ভাবতে শুয়ে পড়লাম | পরদিন ভোরে একটা পাখির ডাক শুনে ঘুমটা ভাঙল | আর ঘুম থেকে উঠে খুব ফ্রেশ লাগল | গতকালের যা কিছু রাগ, অভিমান, মনোমালিন্য সব কালকেই শেষ হয়ে গেছে, আজ একদম নতুন ভাবে শুরু করতে হবে | মাথার ভিতরে বাজতে থাকা অ্যালার্ম ঘড়িটা বলল , টিকটিক করে |
স্টুডিয়োতে পৌঁছলাম, কলটাইমের আগেই | মেক-আপ করে কনসেনট্রেট করছি , ডোরা সামনে এসে বলল, কী রে ধ্যান করছিস নাকি ? বলে, আমার উত্তরের অপেক্ষা না করেই হেসে উঠল খিলখিল করে | তারপর যেমন ঝড়ের বেগে এসেছিল সেভাবেই বেরিয়ে গেল | আর আমার মনে মেঘের যে ছিঁটেফোটা ছিল, সঙ্গে করে নিয়ে গেল |
কাজেও তার প্রভাব পড়ল হয়তো | পরিচালক সুমঙ্গল সেন লাঞ্চব্রেকের সময় আমাকে আলাদা করে ডেকে প্রশংসা করলেন | আমি গলার ভিতরে দলা পাকিয়ে ওঠা আনন্দটাকে নিয়ে কী করব বুঝতে না পেরে বাথরুমে গিয়ে এদিক-ওদিক তাকিয়ে কেঁদে ফেললাম | উফ, শান্তি !
শান্তি অবশ্য অশান্তিতে বদলে গেল লাঞ্চব্রেকের পরেই | সিনেমায় হিরোর পার্ট যে করছিল, সেই প্রতাপের সঙ্গে আমার লাগল | না লেগে কোনও উপায় ছিল না, ও সারাক্ষণ ডোরার পর্দার নাম ‘মধুরিমা’কে ‘মধুর মা’, ‘মধুর মা’ বলে উচ্চারণ করছিল |
অ্যাসিস্টান্ট ডিরেক্টর ঝন্টু প্রথম ব্যাপারটা আমার নজরে আনে | আমি ওকে, সুমঙ্গল সেনকে জানাতে বলি | কিন্তু ঝন্টু ভয় পাচ্ছিল কারণ ফিল্ম লাইনে প্রতাপের অগাধ ক্ষমতা এবং সেটের ভিতরে ঘুরে বেড়ানো প্রতাপের চামচারা ইতিমধ্যেই বারবার করে সবাইকে জানিয়ে দিয়েছে, এই সিনেমার প্রোডিউসারের সঙ্গে ওর কীরকম দাদা-ভাইয়ের সম্পর্ক |
কথাগুলো যে আমারও কানে আসেনি তা নয় | কিন্তু আমি নিজের কাজ নিয়ে ব্যস্ত ছিলাম বলে খেয়াল করিনি | আর তা ছাড়া প্রতাপ সাক্সেনা ইউ পি-র ছেলে, সিক্স প্যাক চেহারার মালিক, যে কোনওদিক দিয়েই বক্স অফিস আর্টিস্ট, সেখানে আমি নেহাতই একজন স্ট্রাগলার। আমি প্রতাপের ব্যাপারে মাথা গলাতে যাব কেন ?
মুশকিল হল, একটা ক্যামেরার আওতায় যখন যখন দুটো মুখ চলে আসে তখন তার একটা সুপারম্যানের আর একটা হরিপদ কেরানির থাকে না | তখন এ যদি আফ্রিকার সিংহ হয় তা হলে ও বাইসন | বিনা যুদ্ধে কেউ কাউকে এক ইঞ্চি জমিও দেবে না | এভাবেই ভানু বন্দ্যোপাধ্যায় স্ক্রিন স্পেস শেয়ার করতেন উত্তমকুমারের সঙ্গে, এভাবেই পরেশ রাওয়াল টক্কর দেন অমিতাভ বচ্চনের সঙ্গে | ওখানে কোনও ছাড়াছাড়ি নেই | আর আমি কীভাবে প্রতাপের মুখে সারাক্ষণ, ‘মধুর মা’ শুনে যাব ? আমার হাসি পাবে না ?
দু’তিনবার শট এন.জি হওয়ার পর যখন ফ্লোরে থমথমে নীরবতা তখনই প্রতাপের এক চামচা বলে উঠল, স্যার, সুপারস্টারদের লোকে ক্রেজে দেখতে চায়, অভিনয় তো আলফাল আর্টিস্টরা করবে | প্রতাপ ভাইয়া জো করেগা ওহি হিট হো যায়েগা।
প্রতাপ একগাল হেসে তাল দিল, মাটন অ্যায়সে বনাও কি ত্যায়সে বনাও – লোকে হুপহাপ খেয়ে নিবে, ওইসব সবজি-অবজি নিয়ে কমপ্লেইন আসবে – নুন কম, মিঠাস বেশি …
– শাট আপ | গলাটা ফ্লোরের এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্ত কাঁপিয়ে দিল |
আমি অবাক হয়ে দেখলাম, গলাটা আর কারও নয়, এই ছবির পরিচালকের |
সুমঙ্গল প্রচন্ড রেগে বলে উঠলেন, মিস্টার সাক্সেনা, এটা কোনও হোটেল নয় আর আমরা এখানে মাছের কালিয়া, মাংসের কোর্মা কিংবা পটোলের ডালনা বানাচ্ছি না |
প্রতাপ একটু থতমত খেয়ে বলল, অ্যাকচুয়ালি আমি বলতে চাইছিলাম …
– আপনি কী বলতে চাইছিলেন, আমার বোঝা হয়ে গেছে | এবার আমি কী বলতে চাইছি সেটা বোঝার চেষ্টা করুন | আপনার যদি নিজেকে বোনলেস মাটন বলে মনে হয় তা হলে আপনি কলকাতা শহরে যারা রেজালা বানায়, তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেন আর যদি মনে হয় যে আপনি একজন আর্টিস্ট, সরি, আর্টিস্ট শব্দটা বাড়াবাড়ি হয়ে গেল, তবুও বলছি, একমাত্র তা হলেই কাল আবার সেটে আসবেন | থ্যাঙ্ক য়ু অ্যান্ড প্যাক আপ | সুমঙ্গল সেনের গলাটা বাজের মতো ফেটে পড়ল |
সেটে সবাই মৃত সৈনিকের মতো বসে আছে এমন সময় আমার পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় প্রতাপ দাঁতে দাঁত চেপে আমায় বলে গেল, কাজটা ভালো করলি না | তোকে দেখে নিব | আমি অবাক হয়ে ওর দিকে তাকিয়ে রইলাম | কিছু বলতে পারলাম না |
– আচ্ছা, ও আমাকে হুমকি দিল কেন ? রাতে ফোন করে জিজ্ঞেস করলাম ডোরাকে |
– ডোরা ঝাঁজিয়ে উঠল, থ্রেট দেবে না তো কী করবে, তোকে আদর করবে ? তুই একাই পুরো ফিল্মটা নষ্ট করে দিচ্ছিস | আর তুই সেটা বুঝতেও পারছিস।
– আমি নষ্ট করছি না প্রতাপ নষ্ট করছে ? হতবাক হয়ে গেলাম ডোরা আমায় অ্যাকিউজ করছে দেখে।
– শোন, লোকে যদি সিনেমাটা দেখতে আসে তাহলে প্রতাপের জন্যই আসবে | তোর-আমার থোবড়া দর্শক টানবে না |
– আমি তো ভাবছিলাম এই ছবিটার গল্প, গান, ট্রিটমেন্ট দর্শক টানবে |
– ভাবের ঘরে চুরি করিস না তো, ওই জমানা চলে গেছে | গল্পের জোরে ছবি চললে তামিল, তেলুগু ডিভিডি নকল করে সিনেমার পর সিনেমা তৈরি হত না, হিটও করত না |
– কিন্তু আমরা যে সিনেমাটায় সুযোগ পেয়েছি, সেটা তো ওইসব ঢপের ফিল্মের বিরুদ্ধে একটা কিছু করার প্ল্যাটফর্ম | সেখানে দাঁড়িয়ে আমরা…
ডোরা আমাকে থামিয়ে দিয়ে বলল, সারাজীবন ওই প্ল্যাটফর্মেই দাঁড়িয়ে থাকতে হবে, ট্রেনে আর চড়া হবে না তোর কথামতো চললে |
– তুই কী বলছিস, আমি কিছু বুঝতে পারছি না |
– তোর বোঝার দরকার নেই, শুধু একটা রিকোয়েস্ট করছি, আমার বাড়া ভাতে ছাই দিতে আসিস না |
– মানে ?
– মানে, তোর কী হবে আমি তাই নিয়ে ইন্টারেস্টেড নই, আমাকে আমার কেরিয়ার গুছিয়ে নিতে দে |
– নে না গুছিয়ে | কে বারণ করেছে ? মাথা গরম হয়ে গেল আমার |
– শুধু বারণ করলে পরে তো ল্যাঠা চুকে যেত, তুই বাগড়া দিচ্ছিস |
– কী আবোল তাবোল বকছিস?
– একদম ঠিক কথা বলছি। আর শুধু বলছি না, তোকে একটা ওয়ার্নিং দিচ্ছি | অনেক কষ্টে আমি প্রতাপের হিরোইন হওয়ার চান্স পেয়েছি | ও আমাকে ‘মধুর মা’ ডাকুক বা ‘যদুর মা’ ডাকুক সেটা আমি বুঝে নেব | তুই এর মধ্যে জড়াস না | একদম অ্যালুফ থাক।
– আমার দায় পড়েছে জড়াতে | তুই তোর কষ্ট করে পাওয়া কেষ্ট এনজয় কর | আমার কোনও প্রবলেম নেই | কিন্তু আমার সঙ্গের সিনগুলোয় ও যদি ঝোলায় তাহলে আমি বাওয়াল করবই | তোর যেমন প্রতাপের লেজ ধরে স্টার হওয়ার একটা অপশন আছে, আমার তো নেই, তাই না ? আমাকে অভিনয় করেই যেখানে পৌঁছোবার, পৌঁছতে হবে | আর সেই রাস্তায় নোংরা থাকলে সেটা ঝেঁটিয়ে বিদেয় করতে হবে আমাকেই |
– খুব বড় বড় কথা বলছিস | তুই জানিস না প্রতাপ সাক্সেনাকে চটানোর ফল কী মারাত্মক হতে পারে ! ইন্ডাস্ট্রিতে টিকতে পারবি, ওর সঙ্গে শত্রুতা করে ? ও ডাবিং-এর সময় সব সামলে দেবে, তুই পারবি ?
– না পারলে, পারব না | তাই বলে একটা সব-স্ট্যান্ডার্ড লোকের সঙ্গে কমপ্রোমাইজ করে নিজের অভিনয়টাকে গলা টিপে খুন করব ?
– ফিলসফি ঝাড়িস না। ডিরেক্টরকে একটু হাত করেছিস বলে ভাবছিস ওর পা চেটে বিরাট কেউকেটা হয়ে যাবি | কিন্তু পৃথিবীটা অত সহজ নয় বাচ্চু | সাপ-লুডো খেলা দেখেছিস তো ? কখন যে নিরানব্বই থেকে একদম তিনে নেমে আসবি, টেরও পাবি না | ডোরার গলাটা নিষ্ঠুর শোনাল |
– তখন আবার তোর সুপারিশ চাইব, তিন থেকে নিরানব্বইয়ে ওঠার জন্য, আমি চেষ্টা করে হাসলাম |
– মর শালা হারামি | ডোরা ফোনটা কেটে দিল |
আমি গুম হয়ে বসে রইলাম কিছুক্ষণ | তারপর একটা টি-শার্ট গলিয়ে বেরিয়ে গেলাম রাস্তায় | অনেকক্ষণ পায়চারি করেও মনটা শান্ত হল না, অনেকগুলো সিগারেট খেয়েও না | একটা মদের দোকানের সামনে মিনিট দুয়েক দাঁড়িয়ে ভাবলাম আকাশ-পাতাল | একজন কর্মচারী সম্ভবত আমায় চিনতে পেরে দু’তিনবার মুখটা দেখে গেল | ফিসফিসিয়ে একবার জিজ্ঞাসাও করল কিছু | কিন্তু আমি কোনও জবাব দিলাম না | শুধু বিড়বিড় করে বললাম, একটা সমস্যা এড়াতে আর একটা সমস্যাকে জীবনে টেনে আনার কোনও মানে হয় না | আমি কষ্ট ভোলার জন্য নেশা করব না | আমার তো অভিনয়টাই নেশা, আমার কাল সকালে কলটাইম | কেরিয়ারের এই স্টেজে আমি ল্যাদ খেয়ে পড়ে থাকতে পারি না, আমি হ্যাংওভার অ্যাফোর্ড করতে পারি না | আমাকে ঠিক সময়ে যেতে হবে | জানপ্রাণ দিয়ে অভিনয় করতে হবে | ফাটিয়ে দিতে হবে |
ফাটিয়েই দিলাম | একদিন, দু’দিন, তিন দিন | আমার সঙ্গের দৃশ্যগুলোয় প্রতাপ সাক্সেনা যে ম্রিয়মাণ, জ্যালজেলে তা বলে না দিলেও বোঝা যাচ্ছিল | বুঝতে পারছিল প্রত্যেকটা টেকনিশিয়ান, বুঝতে পারছিল ডোরা, বুঝতে পারছিলেন সুমঙ্গল সেন আর সবচেয়ে বেশি করে বুঝতে পারছিল প্রতাপ নিজে | ও চেষ্টা করছিল, ওর মতো করে প্রাণপণ চেষ্টা করছিল কিন্তু যে ‘বর্ণপরিচয়’ পড়েনি তার পক্ষে কি ‘শেষের কবিতা’র মাধুর্য উপলব্ধি করা সম্ভব ?
এই প্রশ্নটাই সুমঙ্গল সেন আমাকে করলেন, চতুর্থ দিন শুটিং-এর শেষে | আমি কোনও জবাব না দিয়ে ওঁর মুখের দিকে তাকিয়ে রইলাম |
– চার-পাঁচটা ফড়ে যোগাড় করতে পারলেই কোনও কোনও গুজরাতি, মাড়োয়ারি, সিন্ধির মনে হয় যে সে রবীন্দ্রনাথ থেকে শুরু করে গোটা বাংলা সাহিত্যটাই রি-রাইট করতে পারে, সত্যজিত থেকে তপন সিংহ নতুন করে বানাতে পারে, একটু সুফি আর একটু জ্যাজ-এর ফিউশন করে নজরুলগীতি থেকে অতুলপ্রসাদি, সলিল চৌধুরী থেকে নির্মলেন্দু চৌধুরী সবকিছুর খোলনলচে পাল্টে দিতে পারে।
– আমরা মেনে নিই কেন ? আমি একটু সঙ্কোচের সঙ্গেই জিজ্ঞেস করলাম |
– মানি কারণ আমাদের গলায় গান, হাতে লেখা থাকলেও, মনোবল নেই | আমরা ক্ষয়রোগে ভুগতে ভুগতে এটা বিশ্বাস করতে শুরু করেছি যে যার এত এত টাকা তার পক্ষে কোনও কিছুর অথরিটি হওয়াই অসম্ভব নয় |
– এ তো সেই ‘উলঙ্গ রাজা’ কবিতাটার মতো | সবাই জানে যে রাজা উলঙ্গ কিন্তু মুখ ফুটে কেউ কিছু বলছে না |
– গুড | এই জন্যই তো আপনাকে চাই | সুমঙ্গল আমার পিঠ চাপড়ে দিলেন |
– আমার সৌভাগ্য স্যার | আপনার কাছ থেকে যে এতখানি গাইডেন্স আর ভালোবাসা পাব, আশা করিনি।
– উঁহু, ভালোবাসা নয় | ভালোবাসার ‘ভ’ও নয় | সুমঙ্গল হাসলেন। কাজ, শুধু কাজ | যে লোকটা ফিল্মটা বোঝে মোটামুটি, সে ভালো কাজ করে যে তাকে চাইবে না ?
– চায় কই ? আমি একটা দীর্ঘশ্বাস চাপলাম |
– চায় না তার একটা কারণ আপনি বললেন, ‘উলঙ্গ রাজা’ কনসেপ্ট | আর একটা, আমি বলি | আমাদের এই লাইনে আপনি হামেশাই ছ’ফিট ঘরের মধ্যে চার ফিট ট্রলি দেখতে পাবেন |
– একটু যদি এক্সপ্লেন করতেন স্যার। আমি বললাম।
– একবার ভাবুন, | ওইটুকু একটা ঘরের মধ্যে যদি ওরকম একটা ট্রলির ওপর ক্যামেরা বসানো থাকে, তা হলে ট্রলিটা ঘুরবে কী করে আর ছবি উঠবে কী করে ?
– সম্ভব নয় কোনওটাই |
– রাইট | আর ছ’ফিট লোকগুলোর মধ্যে যদি চার ফিট করে ইগো থাকে, তা হলে তারা মন খুলে সবকিছু বিচার করবে কীভাবে আর সিদ্ধান্তই বা নেবে কেমন করে ? তারা শুধু খুঁজবে সেই লোকগুলোকে যারা ওই বিরাট ইগোটাকে আরও ফোলাতে পারে |
– ভালুক চেনে শাঁকালু, হবে।
– ঠিক তাই | আর এই কারণেই ইন্ডাস্ট্রি ছেয়ে গেছে সিক্স প্যাক আর এইট প্যাকে | সব চাবুকের মতো শরীর কিন্তু মাথাটায় হাত দিয়ে দেখুন | শক্ত গোবরের ডেলা, কংক্রিটের চেয়েও শক্ত | এর মধ্যে যদি শার্প কোনো মাথাওয়ালা অভিনেতা চোখে পড়ে তা হলে পছন্দ হবে না ? সেই পছন্দ হওয়াটা কিন্তু ভালোবাসা নয় | অন্তত আপনি ডোরাকে যে অর্থে ভালোবাসেন, সেরকম ভালোবাসা নয় | সুমঙ্গল সেন জোরে হেসে উঠলেন |
আমি চোখ তুলেও ধরা পড়ে যাওয়ার লজ্জায় তৎক্ষনাৎ নামিয়ে নিলাম চোখ | কিন্তু চোখের জল আটকাতে পারলাম না |
চোখের জল যে গ্লিসারিন ছাড়াও আসে তা আমি জানতাম কিন্তু বড় অভিনেত্রীরা যে সেটা ট্যাপ কলের জলের মতো বার করতে পারে, সেটা ডোরার সঙ্গে বেডসিন করতে গিয়ে জানলাম |
রিহার্সাল দেওয়ার সময় যে মেয়েটা সবরকম সহযোগিতা করছিল সে যে হঠাৎ শটের মধ্যে – ‘এ কী আপনি অসভ্যতামি করছেন কেন’ বলে চিল-চিৎকার জুড়ে দেবে, আর আগে থেকে তৈরি চিত্রনাট্য অনুযায়ী প্রতাপ সাক্সেনা দুটো চামচা নিয়ে শুটিং স্পটে ঢুকে এসে আমাকে এলোপাথাড়ি মারতে শুরু করবে, আমি কল্পনাও করতে পারিনি | কিন্তু যে জঙ্গলে মেশিনগান হাতে থাকলেও নিরাপত্তা বোধ করা যায় না, সেই জঙ্গলে যখন কাজ করতে এসেছি তখন ভাবা উচিত ছিল | অন্তত আঁচ করতে পারা সম্ভব ছিল ডোরার আগের দিনের কথাবার্তা থেকে | একটু প্রিকশন অন্তত নেওয়া যেত তা হলে | আচমকা বাজ পড়ত না মাথায়।
প্রতাপের হাতে মার খেতে খেতে পাল্টা মার দেওয়ার বদলে এই কথাগুলোই ঘুরছিল আমার মাথায় | সুমঙ্গল সেন আর ঝন্টু মিলে আমায় ওর হাত থেকে বাঁচিয়ে নিলেও ওদের শয়তানি থেকে বাঁচাতে পারা সম্ভব ছিল না |
ডোরা, আমার নামে আর্টিস্ট ফোরাম, গিল্ড – সর্বত্র চিঠি দিল | আমিও দিলাম পাল্টা চিঠি কিন্তু শ্লীলতাহানির চার্জে একজন অভিনেতাকে ফাঁসানো যত সহজ, ষড়যন্ত্রের চার্জে একজন অভিনেত্রীকে প্যাঁচে ফেলা তার চেয়ে অনেক বেশি কঠিন | আর এক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় প্রশ্নটা ছিল, আমি কে? কোন হরিদাস পাল আমি যে আমার বিরুদ্ধে কেউ ষড়যন্ত্র করবে ? তাও আবার প্রতাপের মতো সুপারস্টারকে সঙ্গে নিয়ে?
আমি যে একটা কেউ হয়ে উঠতে পারতাম, এই সিনেমাটা রিলিজ করার পর, লোকে যে আমাকে খেয়াল করতে বাধ্য হত, সে কথা কাকে বোঝাব ? রাঙামাসির গোঁফ হলে আমার কটা মামা হত, কে শুনবে সে কথা ?
কেউ শুনল না | সুমঙ্গল সেন অনেক লড়াই করলেন আমার জন্য | ফিল্মের অনেকটা শুট করা হয়ে গেছে, এই অবস্থায় আমাকে বাদ দিলে পুরোটাই নতুন করে তুলতে হবে নয়তো নষ্ট হয়ে যাবে এতদিনের কাজ – ইত্যাদি অনেক কিছু বললেন কিন্তু প্রযোজকরাও অতিমানব নন | তাঁদেরও এই ‘জোর যার মুলুক তার’-এর বাজারে ব্যবসা করে খেতে হয় | প্রতাপ সাক্সেনাকে চটানোর চাইতে আমার মতো ‘নোবডি’কে হটিয়ে দেওয়া অনেক বুদ্ধিমানের কাজ, এটা বোঝার জন্য রকেট সাইন্সে পিএইচ.ডি করতে হয় না |
তাই সুমঙ্গল সেন, নিজেই হটে গেলেন একদিন | মানে, ভদ্র ভাষায়, সরিয়ে দেওয়া হল ওঁকে | আর ওঁর জায়গায় যিনি এলেন তিনি সবদিক সামলে ছেঁটে কেটে যা দাঁড় করলেন, তাতে আমার সেকেন্ড লিড একটা অতিথি শিল্পীর রোলে গিয়ে দাঁড়াল | সুমঙ্গল সেন সরে যাওয়ার পর অভিনয় করতে ডাকা হয়নি আমায়, ডাব করতেও না | ওদিকে হাওয়ার আগে ছুটতে থাকা বদনাম আমার বর্তমান এবং ভবিষ্যতের সব প্রোজেক্টের দরজায় আমার জন্য ঝুলিয়ে দিছিল একটা মস্ত বড় ‘না’ | এই এতগুলো ‘না’-এর ভিতরেও ওই সিনেমাটা রিলিজ করলে আমি একদিন দেখতে না গিয়ে পারলাম না | আর প্রায় ফাঁকা হল দেখে, পাল্টে যাওয়া গল্প দেখে, জঘন্য অভিনয় আর সর্বোপরি অতিথি শিল্পীকে দেখে আমি চিৎকার করে বলে উঠলাম, না | কিন্তু আমার আওয়াজ কারও কানে পৌঁছল না |