সাপ্তাহিক ধারাবাহিক উপন্যাসে সায়ন (পর্ব – ৪)

অমৃতায়ণ

জীবনের একটা অপর স্থান থাকে। যে স্থান স্পন্দিত বাস্তব চেতনার গোপন গৃহকোণ। এই অন্য পৃথিবীর খোঁজ থেকেই আমাদের সচেতন সভ্যতা। সৃষ্টির মান্যতা দিতে দিতে কোথায় হারিয়ে গেছে ‘আপন’পাঠ ও ভাষা। সেই চলনক্রিয়ার সামনে দাঁড়াতে আমাদের অস্বস্তি হয় খুব। মনের সরলরেখা তৈরি করতে করতে শুকিয়ে যেতে থাকে হৃদয় মৌচাকের কুঠুরির মধু। ভাবতে হয় বারবার এই মুহূর্তের ছিটে লাগা রঙ বিভঙ্গ তৈরি করতে থাকা ক্যানভাস ।
হেমন্তের বেলাশেষে চুপচাপ জানলায় দাঁড়িয়ে থাকতে খুব ভালো লাগে। রোদের মায়াবী রঙ রেখা এক একটা অদ্ভূত ভাষা তৈরি করে। সেই ভাষার মধ্যে পরা আর অপরা সময় লুকিয়ে থাকে, সারাদিনের পর অমৃতাকে সেই গল্পগুলো করি।
জীবনের কিছু পর্যায় থাকে যেখানে দাঁড়িয়ে পিছন ফিরে তাকাতে লোভ হয় । সেই লোভ নিষ্কাম, এখানে কোনও সাবধানতা নেই।
কাগজের টুকরোটা সামনের টেবিলে রাখা আছে।
রোববার কাছে এলেই জীবনের ফেলে আসা সাতটা দিনের কথা খুব মনে পড়ে । বিশেষ সাতটা দিনের। সেই সাতটা দিনের কাছে বার বার ফিরে যাই। আস্তে আস্তে ঘড়ির কাঁটা উল্টো দিকে ঘুরতে চলেছে।
আজকের সকালটাও খুব এসব কথাগুলো মনে করিযে় দিচ্ছে । চুপচাপ এককাপ চা নিয়ে বসে আছি, কিছু শব্দ মনের মধ্যে ঘুরপাক করছে কিন্তু সাজাতে পারছি না, এই সময়টা আমার এরকমই অবস্থা হয়। মা আর বাবা এতদিন আমার এই সব উন্মাদনা সহ্য করেছে, এখন এর দায়িত্ব ও দায় নিয়েছে অমৃতা।
সাদা পৃষ্ঠায় আঁকিবুকি কাটছি… হঠাৎ ফোনটা বেজে উঠলো –
– হ্যালো
– এই হারামজাদা বাড়িতে আছিস?
এই সম্মোধন আমার গুনধর বন্ধু পারিজাত ছাড়া আর কারোর নয়, যথারিতি বললাম –
– চলে আয় বাড়িতে, আড্ডা হবে… হ্যাঁ, .. দেরি করিস না। রাখছি।
কলেজ জীবনের কবিতার খাতাগুলো নাড়াচাড়া করছি, বইগুলো থেকে ধুলো ঝারছি। পুরোনো খাতার ধুলোয় ইতিহাসের আলপথ আঁকা থাকে। তবে আমাদের জীবনে রহস্য মাঝে মাঝে আনন্দে ভরিয়ে তোলে,আবার মাঝে মাঝে
খুব যন্ত্রণাদায়ক হতেও পারে। পাতা উল্টোছি পুঁটি দা’র খোলা ক্যন্টিন, গড়িয়া নজরুল মেট্রো স্টেশন, অমৃতা’র জন্য লিখে রাখা না-দেওয়া চিঠি, দীপাদার চা’যে়র দোকানে বসে আড্ডা সব জায়গায় তখন এক অদ্ভূত নিরংহকার আনন্দ ঘিরে থাকতো।
– এই যে কবিবর , চা’যে ঠান্ডা হয়ে গেল।
অমৃতা একমনে রান্না করছে, ঘর আর রান্নাঘরের মাঝখানে জানলা দিয়ে দেখছি অমৃতাকে। বাইরে তখন এক অনিশ্চিত শান্তির পরিবেশ, সূর্যের আলো ওর গা বেযে় এমন একটা ছায়া তৈরি করছে মনে হচ্ছে কোনো সোনার ধাতব পাত ঘিরে একটা অন্ধকার দেহ থেকে বার হয়ে আসছে মনে কথাটুকু। অমৃতার বিরাট খোঁপায় আলোর পিছলানো রঙের বাদামি আভা এসে পরেছে আমার হাতের খোলা পাতার উপর।
অমৃতা বললো – বাবা কি দেখছো গো এমনভাবে!
– তোমাকে
– থাক হয়েছে! এ বাড়িতে এসে তোমার মধ্যে এখন কত মানুষ ঢুকে পরেছে, আমি সব জানি।
– কত মানুষ, ঢুকে পরেছে… মানে
অমৃতার গভীর চোখ এখন শুধু রান্নার ধোয়া ভরা ভাসমান একটা বর্তমান ।
– মানেটা আস্তে আস্তে তুমি জানবে। ঐ যে টেবিলের উপর যে কাগজের টুকরোটা রেখে দিয়েছো, ওটা কিন্তু শুধুই একটা কাগজ নয় ।
বেশ অবাক হয়ে তাকিয়ে আছি , নির্বাক শূন্য ।
অমৃতা স্থির হয়ে, কথাগুলো বলছে যেন কোনও অজানা প্রান্ত থেকে টেনে এনে ছুঁড়ে দিলো কথাগুলো –
– এতদিন যেটা শুধু কাগজের টুকরো ভাবছিলে,সেটা কিন্তু একটা চিঠি ।
– কিইইই চিঠি ? কি বলছো গো..
অমৃতা কেমন হঠাৎ কড়াইয়ের দিকে তাকিয়ে হঠাৎ হেসে উঠলো, যে হাসি ও হাসে না এতটা শব্দ করে। মাথায় ঘামের রেখা হঠাৎ থেমে গেল বরফের মুখে। শুধু কানে এলো –
– “হ্যাঁ গো”, হাসতে হাসতে “হ্যাঁ ….. ” আরও জোর হাসতে হাসতে হাসতে হাসতে ” হ্যাঁ গো….হ্যাঁ”
ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।