জীবনের গল্পে কত যে স্তর, কত যে বৈচিত্র্য! সুখী মানুষ, দুঃখী মানুষ, কাজের মানুষ কিম্বা অলস মানুষ, এক একজনের সুখ দুঃখ আনন্দ বেদনা সাহস কিম্বা ভয়ের বোধ এক একরকম। সবার সঙ্গে সবার মেলেনা। এ নিয়ে অবশ্য সবাই যে ভাবতে বসে তা নয়। অনেকের কাছেই তা এক বিলাসিতা। যাদের জীবন অল্প কিছু রোজগার কিম্বা দিন আনা দিন খাওয়ার বাঁধা রুটিনে অভ্যস্ত তারা দৈনন্দিন সব চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হতে আর সুখ দুঃখের দার্শনিক ভাবনা নিয়ে ভাবতে বসবে কি করে।
অনেকেই বলেন যে আমরা যারা মোটামুটি একটা নিরাপদ আশ্রয়ে থাকি তারা একেবারে প্রান্তিক মানুষজনের ব্যথা বেদনা দৈনন্দিন জীবনধারণের যন্ত্রণা সেভাবে অনুভব করতে পারেনা। কথাটা হয়তো ঠিক। কিন্তু পারি আর নাই পারি, প্রতিদিন সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের আটপৌরে জীবন চলে যে ছন্দে, যেখানে জীবন ধারণের জন্য দৈনন্দিন লড়াইটা খুব মসৃণ নয়, সেরকম জীবনেরও কিছু কথা থাকে। তার বয়ে চলারও একটা নিজস্ব ছন্দ আছে। সেখানে সুখ দুঃখ তৃপ্তি অতৃপ্তি আনন্দ বেদনা নিরাপত্তার নিজ নিজ ধারণা আছে। সেগুলোর কিছু অনুসন্ধান করা যেতেই পারে।
অন্যের সেই বোধগুলো আমরা সবাই যে ঠিকমতো অনুভব করতে পারি তা নয়। কে কিসে আনন্দ পাবে, তৃপ্তি পাবে, কিম্বা এই যে বিশ্ব জুড়ে চলছে করোনা ভাইরাসের মহামারি, তাতে কে কতটা সাবধানতা নেবে বা ভয় পাবে তার নির্দিষ্ট মাপকাঠি আছে কি? ঠিক জানিনা। আনন্দ বা তৃপ্তির কথাটাই আগে ধরা যাক। আমরা সাধারণ মধ্যবিত্তরা ঘরের নিশ্চিন্ত ঘেরাটোপে থেকে আর ঘরের তৈরি খাবার খেয়ে একরকমের অভ্যস্ত। কখনও কখনও হয়তো রেস্টুরেন্টে খাওয়া হয়, কিন্তু তার আগে অনেক কিছু মনে মনে ভেবে নিই, নিশ্চিত নিরাপত্তার অনুসন্ধান করি। কেননা আমরা অনেক ব্যাপারে নিরাপত্তা-হীনতায় ভুগি যে! ভয় হয়। অনেক অজানা আশংকা তৈরি হয় মনে। খাবার সব ঠিকঠাক তো? স্বাস্থ্য সম্মত পরিবেশ আছে তো? অথচ পাড়ার মোড়ের একফালি ছোট্ট খাবারের দোকানটিতে প্রতিদিন টিফিন করে কত মানুষ। তারা কেউ রিকশাওয়ালা, কেউ দিনমজুর, কেউ সবজি বিক্রেতা, কেউ এপার্টমেন্ট কমপ্লেক্সের সিকিউরিটি গার্ড, কেউ হয়তো কোন কুরিয়ার সার্ভিসের ডেলিভারি বয়। তাছাড়াও সেই দোকানে আরও কত পেশার মানুষ যে আসে! চাঁদমুখ করে তারা খায় মুড়ি ঘুগনি, ফাটা পরোটা আলুর দম, টোস্ট, ওমলেট ডিম সেদ্ধ যা খুশি। তারপর একটু ইনস্ট্যান্ট কফির গন্ধ মেশানো কড়া চা। খাওয়ার পর কি তৃপ্তি তাদের চোখেমুখে! পরিশ্রমী শরীরের পেটের খিদে কিছুটা মিটলে বোধ হয় এমনিই হয়। আমি সেই তৃপ্তিটুকু দেখেছি। এত কম পয়সায় এত সুন্দর ঢেকুর তোলা খাবার আর কোথায় পাওয়া যাবে! এমন কি সেই দোকান মালিক ও তাঁর পরিবার, তাঁরাও তো সেই খাবারই খান।
সবই যে খুব স্বাস্থ্যকর পরিবেশে হচ্ছে তা তো নয়। বরং সব স্ট্রিট ফুডের দোকানেই যেমন হয়ে থাকে, তেমনই। বাসনপত্র ধোওয়া হয় সেরকম ভাবেই। সেই একই জলে একবার ডুবিয়ে ঘষে নিয়ে আর একটি পাত্রে রাখা জলে একবার চুবিয়ে নেওয়া। ব্যাস, ধোওয়া হয়ে গেল সব। অনবরত রাস্তার ধুলো উড়ে এসে জমছে সমস্ত খাবারে। খোলা খাবার থেকে মাছিদেরও কি আর সরিয়ে রাখা যায়? কিন্তু কি এক আশ্চর্য জাদুতে সেসব খাবার খেয়েও তো কারও শরীর খারাপ হচ্ছেনা! হলে কি আর সেই একই লোক বারবার খেতে আসত সেখানে? দোকান তো চলছে সেই বহুকাল থেকে। কারও কোন অভিযোগ তো শোনা যায়না!
তাহলে সবকিছু কি ঠিকঠাক, খুব নিরাপদ? আসলে সবটাই আপেক্ষিক। যে যেভাবে চিন্তা করে। খাওয়া, থাকা, সব ব্যাপারেই এমনি, কত অল্পতে সন্তুষ্ট হতে হয়, কত কমে তৃপ্ত হতে হয় এটা যেন তাদের জন্মসূত্রেই জানা। সুখের যে উপকরণের জন্য নিরন্তর প্রত্যাশা, সেটি অধরা থেকে যায় বলেই প্রতিদিন তার পিছনে নতুন আশায় নতুন উদ্যমে ছোটে মানুষ। স্বপ্ন-পূরণের জন্য প্রতিদিন হাড়ভাঙ্গা খাটুনি খাটে। তা থেকে একটু জিরিয়ে নিতে আর পেটের খিদে মেটাতেই ওইরকম কোন দোকানে একটু বসা আর যা হোক কিছু খেয়ে নেওয়া। পরিশ্রমের পয়সা খরচ করে সেটুকুই যেন একমাত্র বিনোদন, তাই তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকে সংশয়হীন ভালো লাগা, উদ্বেগহীন তৃপ্তি। জীবনের চাকা তো এভাবেই চলছে।
অতিমারী নিয়ে সাবধানতা আর ভয়ের ব্যাপারেও সম্ভবত সেই একই মানসিকতা। আনলক পর্বে যখন একে একে খুলে যাচ্ছে সবকিছু, সময়টা চেষ্টা করছে যতটা সম্ভব স্বাভাবিক হতে, তখনও তো সেই মনের মধ্যে ভয় – খুব কাছাকাছি চলে এলামনা তো? মাস্ক ঠিকঠাক আছে তো? সব ঠিক থাকলেও স্পর্শদোষ কাটানোর জন্য হাতে ভালো করে স্যানিটাইজার লাগানো কিম্বা ঘরে ফিরে সাবান দিয়ে ভালো করে হাত ধোওয়া। নিয়ম মতো এগুলো সবই দরকার। কিন্তু উল্টো ছবি যে কম দেখছিনা? অন্তত যারা সেই দোকানে খেতে আসে সেরকম মানুষজনের মধ্যে! এবং আরও অনেকের মধ্যে? তাহলে এই আবহে সাবধানতা আর ভয়ের বোধও তো সবার মধ্যে একরকম নয়?
আসলে তাই। তারা জানে, নিরাপত্তা-হীনতার এত ভয় থাকলে জীবন চলেনা। প্লাস্টিকের ছাউনির যে ছোট্ট দোকানের উপর ভরসা করে জীবন অতিবাহিত হয়, তার মালিক জানে এ নির্বাহ বড় অনিশ্চিত। যে কোনও সময় ঘটতে পারে যে কোন রকম অঘটন। এমনকি এখান থেকে উঠে যেতে হতে পারে। তাছাড়া দূরত্ব-বিধি তো ভুলে থাকতে হচ্ছেই, তাতে অতিমারীর সংক্রমণ হতে পারে যেকোনো সময়। কিন্তু সেই আশংকা মনের মধ্যে রেখে দিলে জীবন চলবে কি করে? নিজেদের এই ছোট্ট ব্যবসাকে ঘিরেই তো প্রতিদিনের বেঁচে থাকা। তেমনি সেখানে আসা মানুষজনও জানে এর চেয়ে উন্নত কোন পরিবেশে উন্নত মানের খাদ্য তাদের নাগালের বাইরে। তাই তারাও অভ্যস্ত পথেই হেঁটে চলে সব আশংকা অগ্রাহ্য করে। এর চেয়ে সাবধান হওয়া, এর চেয়ে বেশি ভয় পাওয়া তাদের সম্ভব নয়। জানিনা এটাই জীবনীশক্তি কিনা। জীবন এই আলোছায়ার খেলাটাই যেন খেলতে ভালোবাসে। সমস্ত চিন্তাকে ছাপিয়ে দিনের শেষে নিজের এবং পরিবারের সকলের একটু হাসিমুখ দেখতে পাওয়াটাই পরম পাওয়া হয়ে ওঠে।