আরে! প্রিতম না! সঙ্গে কে মেয়েটা? রিনা না টিনা, স্বভাব পাল্টালো না একদম মাগিবাজ! কি দেখে যে মেয়েরা ওর প্রেমে পরে! তবে আমি ভাবছি কেন! যার কোলে মাথা দিয়ে ঘুমাক আমার কি!
আজ তো রবিবার, নিশ্চয় মেয়েটাকে নিয়ে ফুর্তি করতে যাচ্ছে! দেখো কেমন চেহারা করেছে গাজাখোরের মত! দাঁড়ি কাটেনা, আবার ভাবছি, কেন ভাবছি এসব ! আমি কি তবে ,,,মানে আজও ভালবাসি ওকে খুব, তাই ওর ভালথাকা কিম্বা না থাকা আমায় তাই এত ভাবাচ্ছে,,এখন বিকেল ছায়াটা তির্যক পরছে, পাশাপাশি আর একটা ছায়া এসে দাঁড়িয়েছে ,
“এমন বিকেল আসবে না আর কক্ষনও ঠিক
যাদবপুরের মাঠ পেরিয়ে একখানা মেঘ
যেমন তেমন একবিনুনি , হাওয়াই চটি
তোমার পাড়ায় যখন আমার সন্ধ্যা নামে,,,
ছাত্রিরা সব জটলা করে গাছের নীচে”,
‘এই প্রিতম কবিতাটা বল না একবার শুনি প্লিজ বল,,, ‘
‘এই জয়া, কি ভাবছিস এত, বৃষ্টি আসছে, দেখ কবিতাটা শুনতে চাইলি কেমন বৃষ্টি নামছে, এবার , কলকাতার সব বৃষ্টি এই জায়গাতেই হবে, তাড়াতাড়ি এদিকে ছাতার নিচে আয়, কফিসপটায় ঢুকি চল!’
‘তোর ছাতার নিচে যাব ভাবলি কি করে । তোর মত একটা মাগিবাজ, রিনা না টিনা কি নাম মেয়েটার, ফুর্তি করতে বেরিয়েছিস রবিবারে , কোথায় লুকিয়ে রেখে এলি ! দাড়ি আমার ভাল লাগে না জানিস চুমু খেলে গালে খোঁচা লাগে, খুব অস্বস্তি হয় ! ‘ ছায়াটি এখন আর নেই
আবার , ফিরে ফিরে আসছে ছবিগুলো আর ফ্লাসব্যাকে ফুটে উঠছে প্রিতমের মুখটা, কেন! আজ রবিবার তাই ! বিষণ্ণ রবিবার, বিষণ্ণতা কেন. ? ভাল থাকার জন্যোই তো এই পথ স্ব-ইচ্ছায় বেছে নিয়েছি, তবে কেন ! কেন এই বিষণ্ণতা। রবিবারগুলো কেন এত বিষণ্ণ হয়!
ম্যাডাম, ম্যাডাম! আপনার শরীর খারাপ লাগছে, কিছু মনে করবেন না! আপনি তো ঘামছেন, তাই বলছি ! অবশ্য ভেপসা গরমও পরেছে,
স্বম্বিৎ ফিরে এল, আকাশ থেকে সজোরে মাটিতে এসে পরলে যেমন ব্যথা লাগে সেইরকম একটা ব্যথা নিয়েই বললাম রিষভ তুই, এখানে, রিষভ মাথা চুলকে বলল মেয়েটা ম্যাকডোল্যান্ডের পিৎজা খাবে, আসলে জ্বর হয়েছে তাই বায়না করছে, কি রকম দাম হতে পারে , আমার তো আইডিয়া নেই, আমি বললাম দুশ টাকার মত হবে , ব্যাগ থেকে টাকাটা বার করে দিয়ে বললাম ,নে টাকাটা , রিষভ নেবে না কিছুতেই, তবুও জোর করে পকেটে ঢুকিয়ে দিলাম । বললাম শোন কাল থেকে পেপার দিস না. ভাবছি লকডাউনের মধ্যে পেপার নেব না, আর এই টাকাটা রাখ চাল ডাল একটু কিনে রেখে দিবি, পাচশো টাকার নোট দুটো রিষভের হাতে দিতে যাব , রিষভ তার আগেই নেবে না বলে একটু পেছনে সরে গেছে বলল দাদা দিয়েছে , বললাম টাকাটা রেখে দে, লকডাউন কতদিন চলবে ঠিক নেই। তারপর রিষভকে বললাম কিরে তোর দাদা কেমন আছে রে, রিষভ বলল ভাল নেই ম্যাডাম, রবিবার রবিবার বেলুরমঠে যায় । এখন তো গালভর্তি দাড়ি রেখেছে । মুচকি হেসে বলে আমি বলেছি, দাদা তুমি কি সন্ন্যাসী হয়ে যাবে! , দাদা বলে সংসারে থেকেও তো কত মানুষ সন্ন্যাসী হয়ে যায়! ও তুই বুঝবি না ।আমি ভাবতে লাগলাম প্রিতম কে বলেও একদিনও বেলুরমঠে নিয়ে যেতে পারিনি, বলত মন থেকে যেদিন চাইবে দেখবি এক এক দিন সারাদিন বেলুরেই পরে আছি ।
প্রিতম
‘রিষভ, মেয়ে এখন কেমন আছে, জ্বর কমেছে, ,সাবধানে থাকিস, বাজে একটা রোগ এসেছে, হ্যাঁ রে’, ‘জয়াদির সাথে দেখা হয়! কেমন আছে জানিস!” রিষভ বলল দাদা ম্যাডাম ভাল নেই, সেদিন পিৎজা আনতে গেছিলাম গত রবিবার ম্যাকডোনাল্ড এর সামনে । কিছু ভাবছিল বললাম শরীর খারাপ কিনা কিছু বলল না । উলটে টাকা দিয়েছে বলল লকডাউন চলবে চালডাল কিনে রাখিস । পিৎজার টাকাটাও দিয়ে দিয়েছে। জিজ্ঞেস করছিল আপনার কথা । “কি বললি, রিষভ বলল দাদা মনে হয় সন্ন্যাসী হয়ে যাবে। “বললি একথা ! শুনে কি বলল “ রিষভ বলল কিছু বলেনি শুধু ‘হাসল!
রাত এগারোটা ঘুমের ওষুধটা অভ্যাস হয়ে গেছে। না হলে ঘুম আসতে চায় না।
‘এই জয়া এদিকে ফের না একবার । ‘ কেন! এসব ভাল লাগে না সারাদিন কাজের পর, প্রিতম ,, তোর মনে তো শুধু ওইসব । আমার মত সারাক্ষণ টারগেট নিয়ে টেনশন নিয়ে কাজ করতে হলে বুঝতিস, “কাল তো রবিবার, “ না রে কালকেও বেড়তে হবে, “একবার ফের চুমুত খেতে পারি ! “ আগে দাড়ি কাট না হলে অস্বস্তি হয়,” জয়া কাল ফ্রেস হব। কাল হবে তো, কি ! “মিস্টার এন্ড মিসেস খেলাটা । জয়া এবার কিন্তু আমাদের চিন্তা করা উচিৎ, কিসের, একটা বেবির, একটা ছোট টুকটুকে পুতুলের মত মেয়ে ঘরে ঘুরবে ভাল লাগে না বল” , তুই ভাব আমি ঘুমাই ,
জয়ার রেখে যাওয়া কথাগুলো ভাবতে ভাবতে ঘুমিয়ে পরেছিলাম । জয়ার দিক দিয়ে কোন সারা ছিল না । একতরফা ভালবাসা কতদিন ! জয়ার ফাস্ট প্রায়োরিটি ছিল কাজ, তবু ওই একসময় প্রেসার করত । বিয়ে করার স্বপ্ন দেখত! ঘুমটা ভেঙে গেল দেখলাম জয়ার কথাই ভাবছি, জয়া গায়ের সমস্ত পোশাক এক এক করে খুলে বলছে নে যা ইচ্ছা কর ! শরীরটাকে নিয়ে , আমি ঘুমাব, নে নে কি হল। এক একদিন আরও বাড়াবাড়ি করত । ফ্লাটের ইএম আই এর টাকাটা যে ওই দেয় মনে করিয়ে দিত। যখন প্রেম করত নন্দনে মেরিলিন মনোরোর “ রিভার অফ নো রিটার্ণ “কিম্বা জুলিয়া রবাটসের” এরিন ব্রোকোভিজ”দেখার সময় দেখতে দেখতে বলত চল না মন্দারমনি কিম্বা অন্যকোথাও ঘুরে আসি একরাত্রি আমি আর তুই। আজ কি ভুলগুলো আমাকে ভাবাচ্ছে । কথাগুলো মনে পরে যাচ্ছে । রিষভের কথাটা মনে পরে গেল” ম্যাডাম মনে হয় ভাল নেই !” ভাবতে ভাবতে ঘুমিয়ে পরলাম।
জয়া
লকডাউনে বেলুরমঠ বন্ধ আছে । তাহলে এখন ,সারাদিন ও কি করছে । তবে যে মেয়েটার সঙ্গে সেদিন রাস্তায় দেখলাম কে ও, বাথরুমে সাওয়ারের নিচে দাড়িয়ে বিয়ের আগে মন্দারমনিতে রাত্রে যেভাবে ওর আদরগুলো লুকিয়ে দেখতাম । জল পরলেই চিরবির করত জ্বালায় । অসম্ভব ভাললাগায় ভুলে গিয়ে নখের আঁচড় গুলোয় হাত বুলাতাম । ভেবে হেসে উঠলাম । বাথরুম থেকে বেরিয়ে নগ্ন হয়ে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে দাগগুলো খোঁজার চেষ্টা করলাম। লকডাউন চলছে । মনে হল প্রিতমকে ফোন করব একবার । ভুল গুলো ভেঙে আমারই কী যাওয়া উচিৎ । আয়নার ভিতরের জয়া হেসে ওঠল। নাইটিটা পরে শুয়ে পরলাম। ঘুমোনোর আগে গা ধুলে ফ্রেস লাগে। দেখতে দেখতে প্রিতমের সাথে ছাড়াছাড়ি তিনবছর হয়ে গেল । মনে হল প্রিতমের চাওয়াগুলো তো ভুল ছিল না!
মনে পরে গেল প্রিতমের কথাগুলো , জানিস আগে মা ঠাকুমারা মস্করা করে ছড়া গেঁথে কি একটা বলত। মানেটা হল গিয়ে বিয়ের একবছরের মধ্যে একটা ছেলেপুলে হলে ভাল । আমি শুধু শুনতাম । বলতাম বেবি তো আর মনোরোর উড়ন্ত স্কার্ট দেখে আমেরিকা আবিষ্কার নয়। দশ মাস পেটের ভিতর বাণটা বড় হবে আর লেবার পেন কী বিষম! ওগুলো সহ্য করতে পারবো না, আজ করলি কালকেই পেট ফুলে উঠল পরশু বাচ্চা বেরিয়ে এল । দশ মাস দশ দিন, কাজ থাকবে । তারপর বাচ্চাটা নরম্যাল যদি না হয় । আর বাচ্চা সামলানোর হ্যাপা! , আমি তো ভাবতেই পারছি না, প্রিতম বলত “ প্রতিদিন প্রতিমুহূর্তে কত বাচ্চা জন্মাচ্ছে । কতজন আগে থেকে এসব ভেবে ভয় পায় বলতো! শুয়ে কথাগুলো ভাবতে থাকলাম। রিষভের মেয়েটার জন্য একটা জামা কিনে দেবে, দেখতে এত কিউট হয়েছে না ।
প্রিতম
সকালে বাইরে বেড়িয়ে পেপার নিয়ে এসেছি, চা খেতে খেতে ভাবলাম জয়া ভাল নেই জেনেও ফোন করব না! লকডাউন চলছে অফিসে তো যাইনি। করে দেখব একবার!, ফোন করে দেখলাম কু কু আওয়াজ করে কেটে গেল । এই নিয়ে তিনবার ফোন করলাম । ফোন রেখে দিলাম। কিছুক্ষণ বাদে ফোনটা বেজে ওঠল । রিসিভ করলে দেখলাম ও প্রান্ত থেকে কোন কথা আসছিল না, বুঝতে পারলাম জয়াই ফোন করেছে, ভিতর থেকে ভেঙে যাওয়া একটা মন নিয়ে জয়া বলল “প্রিতম কেমন আছিস! শুনলাম ভাল নেই, দাঁড়ি রেখেছিস বেলুর মঠ যাস রবিবার রবিবার”
“কে বলল রিষভ! তুইও তো ভাল নেই, পিৎজা কিনতে গিয়ে দেখা হয়েছিল রিষভের সঙ্গে ওই বলল ম্যাডামের শরীর মনে হয় ভাল নেই!”
“প্রিতম দেখেছিস আমারা দুজন কেমন নিয়তীতাড়িত ! দুজন ভাল নেই। দুজনার শরীর নিয়ে দুজনাই চিন্তিত। তবু কোথায় যেন আটকে গেছি, একটা অদৃশ্য হাত যেন টেনে ধরছে পেছন থেকে!”
“প্রিতম আমি ফিরতে চাই, ওই অদৃশ্য শক্তি কে অস্বীকার করে বুকে জায়গা দিবি না, “
“ প্রিতম ফিরব আমি, তারপর আমাদের ফ্যামিলি প্লানিং টা সেরে ফেলেব, তোর ঔরসে আমার পেটের ভিতর বেড়ে উঠবে আমার একটা অংশ , প্রতিটা মুহূর্ত উপলব্ধি করব। তুই পেটে কান দিয়ে শুনবি ওর লাথিগুলো তারপর একদিন ছোট একটা কিউট বেবি সিন্ড্রেলার মত ঘুরে বেরাবে ঘরময় । রবিবার রবিবার ঘুরতে যাব পার্কে।”কি ভাল লাগবে না
‘আর তোর চাকরি!’
“ছেড়ে দেব!”
‘আর অসহ্য লেবার পেনগুলো!’
‘সব মেয়েরই সহ্য করতে হয়!” তাই না?
“প্রিতম আসলে আমি তো ভাবিনি এমন করে। ভিতরের জয়াটা মনে করিয়ে দিল সব,,
প্রিতম শহরে এখন কার্ফু চলছে! শহরের সমস্ত কার্ফু কে অস্বীকার করে এখনই ফিরতে চাই,,
,,,,,,
,, ,,,,
“প্রিতম ওই কবিতাটা একবার বলবি
“এমন বিকেল আর আসবে না কক্ষনও ঠিক
যাদবপুরের মাঠ পেরিয়ে একখানা মেঘ,,,”
“যেটা বললে বৃষ্টি আসত চৈত্রের বিকেলে আর আমাদেরকে ভিজিয়ে দিত!”