মোবাইল বেজে উঠল। আর স্ক্রিনে ফুটে ওঠা নামটা আবার দেখে আমার সকালবেলাটা তেতো হয়ে গেল। তবু বোতাম টিপে ধরলাম। কিন্তু সাড়া দিলাম না। দু চার সেকেন্ড পরে ওধার থেকে লোকটা অধৈর্য হয়ে বলল,-“হ্যালো হ্যালো–”
আমি না চেনার ভান করে বললাম,-“কে?”
“চিনতে পারছেন না আমি দুর্গাদাস সমাদ্দার?”
“কি ব্যাপার?”
“আপনি অফিসে এসে দেখা করুন।”
“কেন?”
“বলছিলাম লেখক-লেখিকাদের সকলকেই আমার সঙ্গে দেখা করতে আসতে হবে। সকলে এসেওছেন, আপনি বাদে। আসুন একদিন। একটু আলাপ পরিচয় হোক। হেঁ হেঁ আপনি কিন্তু অফিস আওয়ার্সের পরে আসবেন, কেমন? একটু নিরিবিলিতে। তার আগে আমার সময় হবে না।”
“শুনুন, আপনার আগে যিনি সম্পাদক ছিলেন সেই ‘ভদ্রলোক’ সেই ‘ভদ্রলোক’–‘ভদ্রলোক’ শব্দটারর উপর জোর দিয়ে দুবার উচ্চারণ করে আমি একটু থামলাম।
“কি বলছেন?” – গলার স্বরে এবার নোঙরা ঔদ্ধত্য। যাক যতটা ভোঁতা ভেবেছিলাম ততটা নয় তাহলে। ইঙ্গিতটা ধরতে পেরেছে।
“বলছি কি”–গলায় মধু ঢাললাম আমি,-“সেই ভদ্রলোকের সঙ্গে আমার কোনো রকম পরিচয় ছিল না। দেখিইনি কোনোদিন। তিনি কালো না ফর্সা, বেঁটে না লম্বা, মোটা না রোগা কিচ্ছু জানি না। আমি স্রেফ আপনাদের এই পত্রিকায় আমার দুটি কবিতা বাঈ পোস্ট পাঠিয়ে দিয়েছিলাম। তার দু মাস পরে একটা ফোন পাই অজানা নম্বর থেকে। একটি অত্যন্ত পরিশীলিত, ভদ্র গলার স্বরে কয়েকটা কথা শুনেছিলাম। মুখস্থ হয়ে আছে সেগুলো। কথাগুলো এই রকম – আপনার কবিতা দুটি আমাদের সকলের খুব পছন্দ হয়েছে। আগামী সংখ্যাতেই প্রকাশিত হবে। এবং আমরা চাইব, আমাদের পত্রিকার সম্মান বাড়াতে ভবিষ্যতেও আপনি আমাদের পাশে থাকবেন – বুঝতে পারছেন মিস্টার সমাদ্দার, এক্ষেত্রে আমার লেখাই ছিল আমার পরিচয়। লেখক ও সম্পাদকের সম্পর্কের যা একমাত্র যোগসূত্র। আমি কদাকার, না ঝগড়ুটে, বদরাগী না স্বার্থপর এ নিয়ে তিনি মাথা ঘামাননি।” – একটানা কথা বলে আমি একটু শব্দ করে হাসলাম।
আমার এতক্ষণ বলে চলা কথার মধ্যে লোকটা ফুঁসছিল, মাঝখানে কথা বলে উঠতে চাইছিল কিন্তু আমি সে সুযোগ দিইনি।
এবার ফেটে পড়ল লোকটা। “শুনুন বেশী বড় বড় কথা বলবেন না। তিনি এখন রিটায়ার করে গেছেন। আমিই অল ইন অল। এবার থেকে আপনি যদি চান আপনার কবিতা এখানে বেরোক, তবে আপনাকে এসে আমার সঙ্গে দেখা করতে হবে, যত বড়ই যে হোন না কেন আপনি! লেখা পাঠিয়ে আপনি যে বসে বসে অর্ডার করবেন তা হবে না–যদি না আসেন তবে—”
একটা অশিক্ষিত, জঘন্য লোকের কথা শুনতে আমার ইচ্ছে করছিল না। আমি কেটে দিলাম।
আর প্রচন্ড একটা ক্রোধ আমাকে আচ্ছন্ন করে দিল। অনেক কাল আগে মহাভারতে পড়া কতকগুলো ভয়ংকর প্রতিহিংসার কাহিনী ছবি হয়ে ভেসে উঠল আমার চোখের সামনে।
প্রাক্তন সম্পাদক অমলবাবু রিটায়ার করার আগেই আমার কাছ থেকে শারদীয়া সংখ্যার জন্য একটি দীর্ঘ কবিতা নিয়ে রেখেছিলেন। বলেছিলেন,-“ছাড়ার আগে পুরো শারদীয়া সংখ্যার নক্শাটা করে রাখছি।”
কয়েক ঘন্টা পরেই একটা অচেনা নাম্বার থেকে ফোন এল। মেয়েলি গলা বলল,-“চিনতে পারছ সুলগ্নাদি?”
“কে?”
“আমি দিয়া গো?”
দিয়া–দিয়া–নামটা শুনেছি মনে হচ্ছে–অথচ–আমি স্মৃতির সিন্দুক হাতড়াতে লাগলাম। তারপর সে নিজের পরিচয় দিল।
“আমি দিয়া স্যানাল—সেই যে আলাপ হয়েছিল নিখিল বঙ্গ কবিতাপাঠের আসরে–আমি ‘কালদর্পণ’ পত্রিকায় আছি। সহ সম্পাদক।”
এবার মুখটা মনে পড়ল আমার। দুয়ে দুয়ে চার মিলে গেল তাহলে। না দেখেই বুঝতে পারছিলাম আমার ঠোঁটে একটা কুটিল হাসি ফুটে উঠল। আমি বেশ বুঝতে পারছিলাম ও কি বলবে। আর তার উত্তরে আমি কি বলব সেটাও মনে মনে গুছিয়ে নিলাম এক সেকেন্ডের মধ্যে।
ন্যকা ন্যাকা ভঙ্গিতে দিয়া আরম্ভ করল,- “এই শোন না বলছি কি–আমাদের স্যার বলছিলেন একদিন আসতেই হবে–যত তাড়াতাড়ি সম্ভব–”
“কিসের জন্যে?”
আমার গলার তীব্রতায় দিয়া একটু থতোমতো খেল। তারপর নিজেকে সামলে নিয়ে বলল,-“নাহ্ মানে লেখকদের সঙ্গে আলাপ পরিচয় হোক চান উনি–তাই স্যার বলছিলেন কি–”
এবার আমি একটু আগে গড়ে তোলা বাক্যটি বললাম। আমার সারা জীবনে উচ্চারিত অশালীনতম বাক্য।
“শোনো ওই অভদ্র লোকটা তোমার বস। ও যদি বাহ্যে করে চাটতে বলে, তুমি তা করতে বাধ্য। কিন্তু আমার তো সেই পরিস্থিতি নয়।”
আহ্ কি আরাম—কি গভীর আরাম এমন উচ্চারণের মধ্যে আগে জানতাম না।
মুহূর্তে দিয়ার গলা পালটে গেল। দু এক মুহূর্তের গুনগুন–ওধার থেকে একটা রাগী গর্জণ শুনতে পেলাম।
কাঠ কাঠ ভঙ্গিতে ও বলল,-“স্যার বলছেন তোমার লেখাটা শারদীয়া সংখ্যায় যাবে না তো বটেই–আর কখনই কালদর্পণে প্রকাশিত হবে না–যদি না তুমি–”
আমি ওর কথা কেটে বললাম, -“অজস্র ধন্যবাদ। একটা তৃতীয় শ্রেণীর লোক সম্পাদক থাকাকালীন এখানে আমার লেখা প্রকাশিত হলে, আমার পক্ষে তা খুব গ্লানির ব্যাপার হয়ে দাঁড়াত।”
কেটে দিলাম ফোন। তারপরে ফোনটা ছুঁড়ে ফেলে দিলাম মাটিতে। প্রচন্ড শব্দ করে ঘরের দরজা বন্ধ করলাম। আলনায় রাখা একটা পছন্দের শাড়ি তুলে নিলাম। দাঁত দিয়ে কামড়ে ছিঁড়ে কুটি কুটি করতে লাগলাম। ভীষণ আক্রোশে উন্মাদ হয়ে গিয়েছিলাম আমি।
হঠাৎই আমার নজর পড়ল সামনের আয়নায়। আর আমি চমকে উঠলাম। কারণ আমি দেখতে পেয়েছিলাম এক অসুস্থ মানুষকে। মোবাইলের নেট ওয়ার্কের মধ্যে দিয়ে কি ওদের নোঙরা অসুখ সংক্রামিত করে ফেলল তবে আমাকেও! ওই, রাগ, আক্রোশ, ঘেন্নার জীবাণুগুলো ওদের থেকে চলে এল আমার মধ্যেও? নাহ্ আমাকে সুস্থ থাকতেই হবে। আমি অনেক কষ্টে নিজেকে শান্ত আর সংযত করতে চেয়ে এই অসুখের ওষুধ খুঁজে বার করে ফেললাম নিজেই। ওষুধটার নাম ‘অবজ্ঞা’। ওই নীচ্ ভাইরাস এই ওষুধেই জব্দ হয়ে যাবে বরাবরকার মতো।