আমার একটা উপকার করবেন শৈলেনদা? এইকথা শোনা মাত্রই নেপালের বুকের ভিতরটা ধড়াক করে উঠল এই বুঝি এখনি টাকা ধার চাইবে। টাকা ধার দিলে তো আর ফেরত পাবারও কোন সম্ভবনা নেই। নেপাল আরও কিছু বলার আগেই শৈলেন বলে উঠল দেখ ভাই সময়টা একেবারেই ভাল যাচ্ছে না হাতে টাকাপয়সা যা ছিল সবই বাড়ি করতে চলে গেছে তবে তুই যখন বলছিস তখন তিনচারশো টাকা ধার দিতে পারি।
এইকথা শোনামাত্র নেপাল বলে ওঠে না, না শৈলেনদা টাকা দিতে হবে না অন্য একটা ব্যাপারের জন্য সাহায্য চাইছি।
এই কথা শুনে যেন বুকের ভিতর ঠান্ডা হাওয়া ঢুকল শৈলেনের। মনে মনে বলে উঠল যাক বাঁচলাম।
–তবে কি সাহায্য করতে হবে বল ?
নেপাল এবার স্বস্তির নিঃশ্বাস ছেড়ে বলল তুমি তো জানো আমার এই সব্জির দোকান কি ছিল আর এখন কি অবস্থা।কোন খরিদ্দার আর এমুখো হয় না। পুঁজিও শেষ হয়ে যাচ্ছে।নুন আনতে পান্তা ফুরায় অবস্থা। তুমিই বলো কি করি, তুমিতো অনেক কিছুই জানো শিক্ষিত লোক।
শৈলেন এবার একটু গর্বিত হয়ে বলল কি করে আর তোর খরিদ্দারপত্র হবে ! সারাদিন মাল খেয়ে দোকানে বসলে খরিদ্দার তো ভয়েই চলে যাবে।
— মাল তুমি আমায় আগে খেতে দেখেছ? এখন খাই কি করবো বেচাকেনা নেই মনের দুঃখে খাই। আর বাড়ি গেলে খাই বউ-এর ঝাড়। আমি জানি তুমি বাচ্চু ঘোষকে কি একটা পাথর নিতে বলেছো আর সেই পাথর নিয়ে বাচ্চু ঘোষ আজ বড়লোক।
এবার শৈলেনের মাথায় ঢুকলো কেন তার শরণাপন্ন হয়েছে নেপাল। বিজ্ঞের মতো শৈলেন বলে উঠল শোন তোকে একেবারে আষ্টেপৃষ্টে ধরেছে শনি বুঝলি ! তুই শেষ হয়ে যাবি। কিন্তু তোর যে পাথর লাগবে তারতো অনেক দাম।ঠিকঠাক নীলার দাম পঞ্চাশ হাজারের কম নয়।
— তাহলে আমার বাঁচার কোন উপায় নেই শৈলেনদা ?
— আছে, তুই কি করতে পারবি ? এক পয়সাও লাগবে না।
এই কথা শুনে নেপাল ভরসা পেয়ে বলে তুমি একবার বলো কি করতে হবে যা বলবে তাই করবো।
— কিন্তু তোর বউকেও যে লাগবে। কারন দুজনের সামনে না বললে কাজ হবে না।
নেপাল ভীষণ ভরসা পেয়ে বলে ঠিক আছে শৈলেনদা আমরা দুজনেই থাকবো তুমি যা বলবে করতে তাই করবো। তাহলে এখনি চলো আমাদের বাড়ি।
শৈলেন এবার একটু অপ্রস্তুত হয়ে পড়ল। মজা করতে গিয়ে সমূহ বিপদ। সত্যিই সেতো কিছুই জানে না। মনে মনে ভেবে নিলো কায়দা করে একদিন সময় নেওয়া যাক তারপর ভেবে চিন্তে কিছু একটা করা যাবে।
— শোন নেপাল আজ বৃহস্পতিবার হবে না কাল তোর বাড়ি যাবো কি করতে হবে না করতে হবে বলে দেবো পরশু শনিবার সেদিন থেকে কাজ করতে হবে।
— কাল কখন যাবে ?
— বিকালে যাবো কাল ।
— পাক্কা, না আমি তোমাকে নিতে যাবো।
— না, না, তোকে আর যেতে হবে না। তুই যা আমার এখন অনেক কাজ আছে।
— কাল তাহলে এসো দাদা, আমি চললাম।
নেপাল চলে যেতেই মনে মনে শৈলেন ভাবতে লাগল আগে ওর মদের নেশা ঘোচাতে হবে। তারপর ওর নেশা ঘুচলেই ওর ব্যাবসাটা আবার দাঁড়িয়ে যাবে। কি করে এই অসাধ্য কাজটা করা যাবে, নেশা ছাড়ানো অত সহজ কথা নয়। তাছাড়া নেশা ছাড়ার কথা বললে বিশ্বাস করবে না। কোন নেশাড়ুইতো এই কথা মানবে না। ঠিক আছে কাল দেখা যাবে একটা বদবুদ্ধি কাজে লাগতে হবে।
পরের দিন দুপুর গড়াতেই শৈলেন বেশ চিন্তাই পড়ে গেলো। এবারতো যেতেই হবে। না হলে নেপালতো চলে আসবে ও যা ছেলে। তাছাড়া একবার বিশ্বাস করেছে যখন আমায়। যাই হোক যাওয়া যাক নেপালের বাড়ি।
নেপাল যেন অপেক্ষাই করছিল। বাড়িতে ঢোকার মুখেই শৈলেনকে দেখে বলে উঠল এসো দাদা ভিতরে এসো। কই গো এসো, বলে বউকে ডাক দিতেই বছর তিরিশের কাটোয়া ডাঁটার মতো রোগা একমহিলা বেরিয়ে এল সাজানো হাসি নিয়ে। বুঝলাম নেপালের বউ। ঘরের ভিতর গিয়ে বসতেই নেপাল বউকে বললো জানো ইনি শৈলেনদা কত মানুষের যে উপকার করেছেন এই গ্রামে। বলতেই নেপালের বউ নমস্কার জানাতেই নেপাল বলে ওঠে যাও একটু চা করে নিয়ে এসোতো?
মনে মনে শৈলেন যেন আজ নিজেকে একটু পীর পীর ভাবছে। নেপালের বউ চা করতে যাবার জন্য পা বাড়াতেই শৈলেন বলে ওঠে শোনো শোনো চা পরে বানালেও চলবে আগে শোনো কি করতে হবে।
এই কথা শোনা মাত্রই নেপালের বউ মুখ খুললো, কি আর করবেন কিছুই হবে না, মাতালদের কিছুই হয় না ধ্বংস ছাড়া। কত কষ্ট করে লোক দিয়ে লুকিয়ে নেশা ছাড়াবার ওষুধ এনে খাওয়ানো হলো কিন্তু হলো কোথায়! টাকাগুলো সব সর্বনাশ হলো। সবই তো শেষ হয়ে গেলো ছেলেটা এখন পড়াশুনা ছেড়ে কাজে লেগেছে। এবারতো আমায় লোকের বাড়ি কাজে লাগতে হবে !
শৈলেন বিজ্ঞের মতো বললো শোনো আমি যা করতে বলবো তা কি তোমরা করতে পারবে নিষ্ঠার সঙ্গে ? তোমার সাহায্য ছাড়া সম্ভব নয়। তাছাড়া তুমিতো ঘরের লক্ষী।
নেপাল শুনেই বলে ওঠে, “পারবে দাদা পারবে, তুমি শুধু বলো কি করতে হবে আমাদের” বলেই বউএর দিকে অনুনয়ের ভঙ্গিতে তাকিয়ে থাকে।
— ঠিক আছে করবো এবার আপনার কথাও রেখে দেখি তবে এই আমার শেষ চেষ্টা তারপর যা করার আমিই করবো বেশ রাগের ভঙ্গিতে বলে ওঠে নেপালের বউ।
— শোন কাজ টা করতে একটাকাও লাগবে না শুধু তোমাদের নিষ্ঠা ও বিশ্বাস থাকতে হবে। একথা শুনে দুজনেই একসঙ্গে বলে উঠে করবো বলুন আপনি যা করতে হয় করবো।
— তাহলে কাল শনিবার সঠিক সময়। আজই বিকালে কিছু সব্জি কিনে দোকান সাজিয়ে ফেলো যেটুকু পারো। তারপর কাল সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠেই নেপাল স্নান করে এসে ঠাকুরের সামনে বসবে আর বউমা তখন তুমি….বলেই শৈলেন কথা থামতেই নেপালের বউ বলে ওঠে বলুননা যা করতে হবে করবো সে যতই কঠিন হোক।
শৈলেন এবার বলে ওঠে নেপাল যখন স্নান সেরে ঠাকুরের কাছে চোখ বন্ধ করে নমস্কার করবে তখন তুমি একটা ঝাঁটা এনে নেপালকে সাতবার ঝাঁটার বাড়ি মারবে তারপরই নেপাল দোকানে গিয়ে বসবে। মনে রেখো শনিবার সাতবার মঙ্গলবার তিনবার আর শুক্রবার একবার এই ভাবে তিনমাস করতে হবে কথা দিচ্ছি ওর ঘাড় থেকে শনি চলে যাবে এবং ব্যবসাও ভালভাবে হবে আবার। কোন দুঃখ কষ্ট থাকবে না। তবে হ্যাঁ এ কথা কাউকে বললে চলবে না তাহলে শনি আরো রুষ্ট হবেন। একথা সম্পূর্ণ গোপন ভাবে করতে হবে। আর ঝাঁটার বাড়ি খাবার পর মদ আর ছুঁতে পারবে না তখন তুমি পবিত্র মানুষ এটা মনে রেখো।
এই শুনে নেপালের বউ ইতস্তত করতে থাকলো হাজার হলেও স্বামী, তাকে কিনা সকালে উঠেই ঝাঁটার বাড়ি মারতে হবে। ব্যাপারটা অনুমান করেই নেপাল বলে উঠলো বউকে, “তোমাকে পারতেই হবে বউ”। কোনো না করোনা আমি আবার ভালোভাবে থাকতে চাই।
শৈলেন আর কথা না বাড়িয়ে বললো দেখো পারবে কিনা? ভালমন্দ তোমাদের হাতে। আমি চললাম তবে হ্যাঁ তিনমাসের মধ্যে আমার সঙ্গে আর দেখা করবে না এইটাই নিয়ম বলে ঘর থেকে উঠে যেতেই নেপাল বলল,”করবই দাদা কাল থেকে করবই।”
দিন কয়েকপর খোঁজ নিয়ে জানলো নেপালের দোকান এখন ভাল চলছে। নেপাল আর মদও খায় না। মাস তিনেকের কাছাকাছি আসতেই একদিন আড়াল থেকে দেখলো শৈলেন, ব্যাবসা জমে ক্ষীর হয়ে গেছে নেপালের।দোকানে কর্মচারীও রেখেছে। এই দেখে শৈলেন মনে মনে হাসতে লাগলো মানুষের অন্ধ বিশ্বাসও কখন কখন শুভ কাজেও লাগে। আসলে মদ নেপাল এমনিতে ছাড়তো না, এই বিশ্বাস না ঢোকালে। নেশা ছাড়াতে পারলে ও যে আবার আত্মবিশ্বাস ফিরে পাবে এটা শৈলেন বুঝেছিলো।
তারপর তিনমাস বাদে একদিন নেপাল হাজির হলো শৈলেনর কাছে এবং জোর করে বাড়িতে ধরে নিয়ে গেলো রিক্সা চাপিয়ে। নেপাল ও তার বউ এত খাতির যত্ন করলো যে শৈলেন বেশ লজ্জিত হয়ে পড়লো, আর মনে মনে ভাবতে লাগল নেপালকে আর কতদিন বউ-এর ঝাঁটার বাড়ি খাওয়াবে। তারপর নেপালের বাড়ি থেকে ফিরে আসতেই রাস্তায় কে একজন শৈলেনদা বলে ডাকতেই শৈলেন বলে উঠল ভাই রিক্সা জোড়ে চলা।