“মনু”
বাবার ডাক কানেই ঢুকলো না মনুর। তার চোখ তখন আটকে লক্ষ্যের দিকে – বহুদূরে মাচায় আটকানো মাটির কলসিগুলোর দিকে। কিছুমুহূর্তের অনন্ত নৈঃশব্দ্যের পরে তীর গিয়ে বিঁধলো কলসীতে, ভাঙলো কলসী।
বাবার উৎসুক চোখ এবার মনুর তীরন্দাজি অভ্যাসের পরবর্ত্তী লক্ষ্যের দিকে। বেনারসের আইনজীবী তাম্বেজীর একমাত্র লাডলী মনু। স্বাধীনচেতা ও বেপরোয়া স্বভাবের এই মেয়ে। তাম্বেজী গাছের আড়ালে লুকিয়ে দেখলেন মনু আরো অনেক দূরে ঝোলানো পাখির খাঁচায় কাঠের পাখিতে লক্ষ্যস্থির করলো। নয়বছরের ছোট্ট মনুর দ্বিতীয় তীর নির্ভুল বিঁধলো পাখীর গায়ে। গর্বিত বাবা তো আরও খুশি, আরো উৎসুক। এইবারে মনু লক্ষ্যস্থির করলো মহলের পুরোনো চাকর ভজুয়ার দুই হাতে ও মাথায় বসানো তিনটি আপেলের ওপর। ভয়েই কাঁপছে ভজুয়া। ছোট্ট মেয়ের রিনরিনে কচি গলা দিয়ে বেরোলো দাপুটে ধমক – যাকে বলে সিংহিনীর মেজাজ। ভয়ে কাঁটা হয়ে থাকা ভজুয়ার হাতে ধরা দুটি আপেল পরপর দুই তীর ক্ষিপ্রতায় ভাঙলো। রুদ্ধশ্বাস তাম্বেজী, চোখ বুজে ঈশ্বরের নাম করতে থাকা ভজুয়ার সাথে এক মুহূর্তের জন্য তাম্বেজীর প্রকান্ড বাগানের গাছগুলোর প্রতিটি পাতা অপেক্ষা করতে লাগলো। ছোট্ট মেয়েটা ছুঁড়লো তীর, এক লহমার জন্য স্তব্ধ হল পৃথিবীও বুঝি, তারপর নিমেষের আঘাতে ভজুয়ার মাথায় বসানো আপেল টুকরো হয়ে ছড়িয়ে পড়লো।
“ছাবিলি”
এইবার বাবার আদরের ডাক কানে ঢুকলো মনুর। এক লাফে গিয়ে বাবার কাছে “দেখো না বাবা ভজুয়াটা ভয় পায় খালি …” ইত্যাদি নালিশ করতে লাগলো। পাশেই গাছের গুঁড়ির ওপর বসে রঙ্গ দেখছিলেন মা দুর্গা। বেনারসের পুজোর শেষে কৈলাসের পথে যেতে গিয়ে হঠাৎ মনুর তীরন্দাজিতে চোখ পড়ে দুর্গা মায়ের। মনুর অভ্যাস দেখতে দেখতে দুর্গামায়ের আবছা মনে পড়তে লাগলো দশরথের সভার হরধনু ভঙ্গ, দ্রুপদের রাজসভায় মাছের চোখের লক্ষ্যভেদ! বড্ড মিষ্টি, কিন্তু কি তেজ মেয়েটার! নাঃ, একে দিয়েই হবে মনে হয়!
**
“রানী”
স্বামীর আদরের ডাকে বহুক্ষণ ধরে চোখের কোলে আটকে রাখা জল আর বাধা মানলো না, গড়িয়ে পড়লো ফর্সা গাল বেয়ে! ডাগর দুটো চোখ সর্বদা হাসিতে-সাহসে-মমতায় উজ্জ্বল হয়ে থাকে! আজ সে চোখদুটো বেদনাবিধুর। সদ্য চারমাসের সন্তান হারিয়ে শোক-সন্তাপে জর্জরিত বিধ্বস্ত আজ সাহসী রানী।
বড় শক্ত মেয়ে এই রানী, কান্নাকাটি ধাতে নেই। বিয়ের পরে রাজা দামোদর বড় আদরে-মর্যাদায় রেখেছেন তাঁর তরবারির মতো ঋজু-শানিত-নির্ভীক সৌন্দর্য্যের অধিকারী গৃহলক্ষ্মীকে। মেয়েলী সাংসারিক দক্ষতার বদলে আত্মরক্ষা ও অস্ত্রশিক্ষা, বিশেষ করে ধনুর্বিদ্যায় আগ্রহ-উৎসাহ ও প্রতিভা তাঁর ছোট থেকেই। বান্ধবীদের অস্ত্র শিখিয়ে সাহস জুগিয়ে রানী যখন তৈরী করছিলেন তাঁর প্রমীলাবাহিনী, তখন অলক্ষ্যে মা দুর্গা হাসছিলেন কৈলাসে। এতদিনে মনে হচ্ছে পবনদেবের দেওয়া তীর-ধনুকটা কাজে লাগানোর লোক পাওয়া গেলো! কিন্তু অলক্ষ্যে হাসছিলেন নিয়তি। সন্তানহারা মা-টির যন্ত্রণায় মোড়া কান্না মা দুর্গার মন টলিয়ে দিলো।
**
হেরে যাওয়ার মেয়েই নয় মণিকর্ণিকা, একা ছুটে চলেছেন ডাকাত ভাগাতে। চারিপাশে স্বপক্ষের মৃত সৈনিকদের ভীড় আর তাঁকে দমাতে পারবে না। ডাকাত-ই তো এরা! ডাকাতি করে ভারতবর্ষকে নিজেদের অধীনে করতে চায় ব্রিটিশরা, বুঝতে পেরে গেছেন তিনি। তাঁর ঘোড়া ছুটে চলেছে। সিপাহী বিদ্রোহের সময়কাল, তীর-ধনুকের অব্যর্থ লক্ষ্যে কাটতে কাটতে চলেছেন শত্রুকে। সিংহের মতো তেজ সুন্দরী মণিকর্ণিকার, স্থির লক্ষ্য। শত্রুনিধনে ব্যস্ত মেয়েটির মনে এলো না পিতা বা স্বামীর কথা, রানী হওয়ার মুহূর্ত, সন্তান হারানোর শোক, দত্তক-সন্তানের মুখ। ধনুর্বীর রানী ও তাঁর প্রমীলা বাহিনীর লড়াই ভয় ধরালো ব্রিটিশদেরও, ছুটে এলো মারণাস্ত্র, ঘোড়া থেকে ছিটকে পড়ে ধুলোয় পদ্মের মতো সুন্দরী রানী ও তাঁর ধনুর্বাণ। নিদারুণ বেদনায় চোখ বুজলেন বীরাঙ্গনা। মুহূর্তের যন্ত্রণা শেষে যুদ্ধক্ষেত্রে শহীদ হলেন ঝাঁসীর রানী লক্ষ্মী বাঈ। ত্রিশ বছরের ছোট জীবন, কিন্তু সার্থক।
রানী শহীদ হতে মা দুর্গা স্মিতহেসে যুদ্ধক্ষেত্রে এসে দাঁড়ালেন। আদরের মেয়েটাকে নিজের হাতে রথে তুললেন, সঙ্গে তাঁর তীর-ধনুককেও! তীরধনুক এতকাল তো পশু কিংবা নারীশিকারেই ব্যবহৃত হয়ে এসেছে! পণ্যের মতো নারীরা স্বয়ম্বরসভায় এসে দাঁড়িয়েছে আর পুরুষেরা নারীকে জয় করার জন্য খেলেছে তীরন্দাজি। স্বয়ম্বরসভা নাম দিয়ে নারীস্বাধীনতার ভাঁওতার আড়ালে লেখা হয়েছে অগ্নিপরীক্ষা, অন্যের আদেশে পঞ্চ-স্বামীর মধ্যে ভাগ হয়ে যাওয়া কিংবা জুয়াখেলার ‘বাজি’ হওয়ার করুণ ইতিহাস।
নাঃ, তীর-ধনুকটা যত্ন করে রাখা দরকার- ভাবলেন মা দুর্গা। শহীদ রানীর হাতে তীর-ধনুকের যে ইতিহাস আজ লেখা হল, তাই তো পরে কাজে লাগাবেন সুভাষচন্দ্র বসু! দেবীর অস্ত্র যে এবার ফিরবে সুভাষ বোসের আত্মায়, আবার তৈরী হবে প্রমীলাবাহিনী, কাজে লাগবে মুক্তিযুদ্ধে।
একটু হলেও স্বস্তি পেলেন মা দুর্গা! আরও একটা অসুর নিকেশের পথে বোধহয়!