দৈনিক ধারাবাহিক উপন্যাসে মৃদুল শ্রীমানী (পর্ব – ২৪৮)

পর্ব – ২৪৮

খোকা বলল, জ‍্যেঠু আমরা স্বপ্ন দেখি কেন?
তিনি বললেন, ঘুমোলে তো একটু স্বপ্ন দেখতেই হয়। তবে কোনো কোনো স্বপ্ন মনে থাকে। আর কোনো কোনো স্বপ্ন মনে থাকে না।
খোকা বলল, চুপচাপ ঘুমালেই তো হয়। স্বপ্ন দেখার দরকারটা কি?
জ‍্যাঠামশায় বললেন, সে একটা প্রশ্ন বটে। এই মনে করো গৌতম বুদ্ধ যখন জন্মাবেন, তখন তাঁর জন্মদাত্রী জননী স্বপ্ন দেখেছিলেন যে একটা শাদা হাতি এসে তাঁর পেটের মধ‍্যে ঢুকে গেল।
জ‍্যাঠাইমা বললেন, এমন কথা শ্রীরামকৃষ্ণের ব‍্যাপারেও শুনেছি। ওঁর মা চন্দ্রামণি দেবী না কি স্বপ্ন পেয়েছিলেন।
জ‍্যাঠামশায় বললেন, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সোনার তরী কাব‍্যগ্রন্থে “হিং টিং ছট” নামে কবিতায় স্বপ্ন মঙ্গলের কথা লিখেছেন। তার একটু শোনো,
স্বপ্নমঙ্গল
       স্বপ্ন দেখেছেন রাত্রে হবুচন্দ্র ভূপ,
       অর্থ তার ভাবি ভাবি গবুচন্দ্র চুপ।
       শিয়রে বসিয়া যেন তিনটে বাঁদরে
       উকুন বাছিতেছিল পরম আদরে।
       একটু নড়িতে গেলে গালে মারে চড়,
       চোখে মুখে লাগে তার নখের আঁচড়।
        সহসা মিলাল তারা, এল এক বেদে,
      ‘ পাখি উড়ে গেছে ‘  ব’লে মরে কেঁদে কেঁদে ;
       সম্মুখে রাজারে দেখি তুলি নিল ঘাড়ে,
       ঝুলায়ে বসায়ে দিল উচ্চ এক দাঁড়ে।
কবিতাটার আরেক জায়গার একটু শোনো
       ফরাসি পণ্ডিত ছিল, হাস্যোজ্জ্বলমুখে
       কহিল নোয়ায়ে মাথা, হস্ত রাখি বুকে,
      ‘ স্বপ্ন যাহা শুনিলাম রাজযোগ্য বটে ;
       হেন স্বপ্ন সকলের অদৃষ্টে না ঘটে।
       কিন্তু তবু স্বপ্ন ওটা করি অনুমান
       যদিও রাজার শিরে পেয়েছিল স্থান।
         অর্থ চাই, রাজকোষে আছে ভূরি ভূরি
       রাজস্বপ্নে অর্থ নাই, যত মাথা খুঁড়ি।
       নাই অর্থ কিন্তু তবু কহি অকপট,
       শুনিতে কী মিষ্ট আহা, হিং টিং ছট্‌। ‘
জ‍্যাঠাইমা বললেন, লোকেরা স্বপ্নে দেবতার ওষুধ পেত। সেই একটা ওষুধ বিক্রি করতে করতেই বাড়ি গাড়ি সব হত। কলকাতা দক্ষিণেশ্বরের কাছে এঁড়েদার নাম তো শুনেছ। সেখান কার অন্নদা ঠাকুর স্বপ্ন পেলেন ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালের কাছে একটা পুকুরের জলের তলায় দেবী শুয়ে আছেন। তারপর অন্নদা ঠাকুর সেই মূর্তি তুলে এনে মন্দির প্রতিষ্ঠা করলেন।
 খোকা বলল, জ‍্যাঠাইমা তুমি না বড্ড গালগল্পে বিশ্বাস করো।
জ‍্যাঠামশায় বললেন, গালগল্পের প্রতি মানুষের যে দুর্নিবার আকর্ষণ। ফ্রিডরিশ অগুস্ত কেকুলে নামে এক জার্মান বিজ্ঞানী ছিলেন। জৈব রসায়নের এক বড়মাপের পথিকৃৎ। তিনি বেঞ্জিন নিয়ে কাজ করছিলেন। বেঞ্জিনের রাসায়নিক সংকেত জানা ছিল। কি কি পদার্থ দিয়ে বেঞ্জিন তৈরি হয়, তাও জানা ছিল। কিন্তু বেঞ্জিনের অণুসজ্জার কোন্ বৈশিষ্ট্যের জন‍্য এটা বেঞ্জিন, তা জানা ছিল না। কেকুলে না কি স্বপ্ন দেখেছিলেন, একটা সাপ তার নিজের লেজ কামড়ে ধরে আছে।
১৮৬৫ সালে তিনি বেঞ্জিনের রিং আকৃতির অণুসজ্জার কথা বললেন। গন্ধ‌ওলা বিস্তর জৈবযৌগ আছে। যার গোড়ার জিনিসটা বেঞ্জিন। ওই রিংয়ের গঠন থেকেই গন্ধ আসে।
কেকুলে ওই যে সাপটাকে নিজের লেজ কামড়ে ধরতে দেখলেন স্বপ্নে, সেই ধারণাটা অবশ‍্য বহুদিন ধরে ধর্মীয় অনুভূতিতে ছিল। একে বলে অউরোবোরোস।  এই যে সাপ নিজের লেজ কামড়ে ধরছে, ১৮৬৫ সালে কেকুলে’র এই ঘোষণাটি জার্মান সমাজে বেশ সাড়া ফেলে। জার্মান কেমিক্যাল সোসাইটি ১৮৯০ সালে কেকুলের এই ঘোষণার রজতজয়ন্তী পালন করেন। অবশ‍্য কেকুলেকে ব‍্যঙ্গ করার লোকজনও কম ছিল না। তারা ১৮৮৬ সালে বেঞ্জিনের রিঙে সাপের বদলে গোল হয়ে বসে থাকা বানর বাহিনী দিয়ে ব‍্যঙ্গচিত্র আঁকল। পরে খোঁজ নিয়ে জানা গেল ১৮৬২ সাল থেকেই কেকুলে বেঞ্জিনের গঠন নিয়ে গভীর চিন্তাভাবনা করছিলেন। সেটাই হয়তো কোনোভাবে ওই সাপের নিজের লেজ মুখে পোরার ছবিটি কেকুলেকে দেখিয়ে থাকবে।
আবার একজন জার্মান বিজ্ঞানীর কথা বলি। ইনি ফ্রিডরিশ ওহলার। ইনি ইউরিয়া তৈরির পদ্ধতি আবিষ্কার করেছেন। ইনি ১৮০০ সালে জন্মেছিলেন। স্বপ্নে যে বিজ্ঞানচর্চা হতে পারে, সে নিয়ে এঁকে ঘিরে গপ্পগাছা গড়ে উঠেছে।
খোকা বলল, কিন্তু স্বপ্ন দেখার কারণটা কি?
জ‍্যাঠামশায় বললেন, আমাদের মস্তিষ্কের একটা নয়, অনেকগুলো খুব গুরুত্বপূর্ণ কাজ সামলে দেয় হাইপোথ‍্যালামাস। খিদে, তেষ্টা ঘুমের মতো বিষয় নিয়ে হাইপোথ‍্যালামাসের কাজ। ওকে বলে মাস্টার কন্ট্রোল। আর পিনিয়াল গ্ল‍্যাণ্ড আমাদের ভিতরের ঘড়িটা চালায়। প‍্যারেইটাল লোব ভিসুয়াল পারসেপশন নিয়ে কাজ করে। অক্সিপিটাল লোব কি দেখলাম, তাকে বোঝার চেষ্টা করে। আমাদের মগজে সারাদিন ধরে অজস্র তথ‍্য ঢুকছে। চারপাশে যা ঘটে চলেছে, যা কিনা আপাতভাবে মনেই হচ্ছে না বিশেষ করে লক্ষ্য করছি, সেটাও মগজ খুঁটে তুলে রেখেছে, পরে সময়মতো সেইসব তথ‍্য বিশ্লেষণ করছে। তা থেকে অনেক কিছু শিখছে বুঝছে।
জানো খোকা, আমরা যখন ঘুমাই, তখন একরকম ভাবে ঘুমোই না। কখনো গভীর ঘুম, আবার কখনো পাতলা ঘুম, ঘুমের নানারকম হতেই থাকে। হালকা ঘুমের সময় আমাদের চোখ নড়তে থাকে। একে বলে র‍্যাপিড আই মুভমেন্ট। এই কথার আদ‍্যক্ষর নিয়ে তৈরি হয়েছে রেম। ঘুমের এই রেম পর্যায়ে মানুষ স্বপ্ন দেখে।
খোকার মা বললেন, দাদামণি, স্বপ্ন নিয়ে আমার একটা গান মনে আসছে, গাইব একটু?
জ‍্যাঠামশায়ের মুখে সম্মতির হাসি।
খোকার মা গাইছেন,
স্বপ্নে আমার মনে হল   কখন   ঘা দিলে আমার দ্বারে,   হায়।
          আমি   জাগি নাই জাগি নাই গো,
              তুমি   মিলালে অন্ধকার,   হায়॥
                   অচেতন মনো-মাঝে   তখন   রিমিঝিমি ধ্বনি বাজে,
              কাঁপিল বনের ছায়া ঝিল্লিরঝঙ্কারে।
          আমি   জাগি নাই জাগি নাই গো,   নদী   বহিল বনের পারে॥
পথিক এল দুই প্রহরে   পথের আহ্বান আনি ঘরে।
          শিয়রে নীরব বীণা   বেজেছিল কি জানি না–
                   জাগি নাই জাগি নাই গো,
              ঘিরেছিল বনগন্ধ ঘুমের চারি ধারে॥
মা বললেন, স্বপ্ন নিয়ে আরেকটা গান এ রকম,
স্বপনে দোঁহে ছিনু কী মোহে, জাগার বেলা হল–
     যাবার আগে শেষ কথাটি বোলো ॥
     ফিরিয়া চেয়ে এমন কিছু দিয়ো
     বেদনা হবে পরমরমণীয়–
     আমার মনে রহিবে নিরবধি
বিদায়খনে ক্ষণেক-তরে যদি    সজল আঁখি তোলো ॥
নিমেষহারা এ শুকতারা এমনি ঊষাকালে
     উঠিবে দূরে বিরহাকাশভালে।
     রজনীশেষে এই-যে শেষ কাঁদা
     বীণার তারে পড়িল তাহা বাঁধা,
     হারানো মণি স্বপনে গাঁথা রবে–
হে বিরহিণী, আপন হাতে তবে    বিদায়দ্বার খোলো।
জ‍্যাঠামশায় বললেন, জানো খোকা, স্বপ্ন দেখাটা মানুষের দরকার। স্বপ্ন ভিতরে ভিতরে মানুষের কাজকে গুছিয়ে দেয়। যেমন বাজার থেকে সবজি মশলা আর ফল এলে বাড়ির মেয়েদের দায়িত্ব থাকে, তা গুছিয়ে ঝেড়ে পুঁছে সাজিয়ে তোলা, তেমনি স্বপ্ন দেখতে দেখতে আমাদের মগজ আমাদের ভিতরের মানুষকে অনেক কিছু শিখিয়ে পড়িয়ে বুঝিয়ে নেয়।
জ‍্যেঠু একটা জিনিস বুঝিয়ে দাও, চোখ যখন বন্ধ আছে, তখন আমরা স্বপ্ন দেখি কী করে? চোখ তো তখন দেখছে না।
জ‍্যাঠামশায় বললেন, তোমাকে কে বলল, চোখ দেখে?
বাঃ, আমরা তো চোখ দিয়ে দেখি। চোখের ছিদ্র দিয়ে বাইরের আলো ভিতরের রেটিনায় পড়ে, সেখানে রড কোশ থাকে, কোন কোশ থাকে। রড কোশ কে কত উজ্জ্বল তার খবর রাখে। কোন কোশ রঙের নানা বাহার বোঝে।
জ‍্যাঠামশায় হেসে বললেন, চোখ যেন ঘরের একটা জানলা। ভিতরে যেন একটা লোক আছে। দিনের বেলা সে জানলা খুলে আলো পায়। রাত নামলে জানলা বন্ধ করে আলো জ্বালে। আমি তোমাকে বলছিলাম না, ভিসুয়াল পারসেপশন হয় প‍্যারেইটাল লোবে, আর ভিসনকে ইন্টারপ্রেট করে অক্সিপিটাল লোব,  মগজের এই নানান অংশ বোঝাপড়া করেই  কাজ করে। তাতে আমরা দেখি। দেখব বললাম আর দেখতে পেলাম, বিষয়টা এত সহজ সরল নয়। এই রকম একটা গান আছে,
চোখ যে ওদের ছুটে চলে গো —
ধনের বাটে, মানের বাটে, রূপের হাটে,    দলে দলে গো॥
দেখবে ব’লে করেছে পণ,    দেখবে কারে জানে না মন–
প্রেমের দেখা দেখে যখন    চোখ ভেসে যায় চোখের জলে গো॥
      বলছেন,
চোখদুটোরে ডুবিয়ে যাব অকূল সুধা-সাগর তলে গো॥
আরেকটা গানে রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন,
কোন্‌ আলোতে প্রাণের প্রদীপ
       জ্বালিয়ে তুমি ধরায় আস।
সাধক ওগো, প্রেমিক ওগো,
       পাগল ওগো, ধরায় আস।
                    এই   অকুল সংসারে
       দুঃখ-আঘাত তোমার প্রাণে বীণা ঝংকারে।
                    ঘোরবিপদ-মাঝে
       কোন্‌ জননীর মুখের হাসি দেখিয়া হাস।
 এই যে জননীর মুখের হাসি, এ কি চর্মচক্ষে দেখার জিনিস গো? আবার দ‍্যাখো, আলো যে বাইরে থেকে পেতেই হবে, তার কোনো মানে নেই। রবীন্দ্রনাথ বলছেন,
চোখের আলোয় দেখেছিলেম চোখের বাহিরে।
অন্তরে আজ দেখব, যখন আলোক নাহি রে॥
ধরায় যখন দাও না ধরা         হৃদয় তখন তোমায় ভরা,
এখন তোমার আপন আলোয় তোমায় চাহি রে॥
জ‍্যাঠাইমা তাগাদা দিলেন, ওঠো ওঠো, এবার যে যার শোবার ঘরে যাও।
জ‍্যাঠামশায় বললেন, মাস্টার অরিন্দম দাশগুপ্ত,  হ‍্যাভ এ সুইট ড্রিম টুনাইট।
খোকা বলল, থ‍্যাঙ্ক ইউ।

ক্রমশ…

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।