বাবাকে গোল করে ঘিরে যেন প্রাচীর তুলে দিয়েছে পাড়ার লোক। তাই বাবার কাছে তাদের পৌঁছানো হয় না। দূর থেকেই তারা শুনতে পায় বাবা হাত জোড় করে তাকে ঘিরে থাকা জনতার উদ্দেশ্যে ঘুরে ঘুরে বলে চলেছে — আমার কি দোষ বলো ? কারও ইচ্ছে–অনিচ্ছের উপরে তো কুষ্ঠ হওয়া নির্ভর করে না।বাবার কথা শেষ হয় না, অঞ্জলিরা দেখে যে মলিন্দকাকা মাস খানেক আগেও তাদের বাড়িতে সন্ধ্যাবেলায় মদের আসরে বাবাকে দাদা দাদা করত সেই মলিন্দকাকাই কেমন দাঁত মুখ খিচিয়ে ওঠে — অত সব আমরা জানি না। পাড়ায় এত লোক থাকতে তোমার মায়েরই বা কুষ্ঠ হলো কেন ? নিশ্চয় তুমি কিছু পাপ করেছো। নাহলে পুতে দেওয়ার পরও শেয়াল– কুকুরে, শকুনে ছিঁড়েইই বা খেতে গেল কেন ?
তার কথা শেষ হতে না হতেই বাবার আর এক বন্ধু দুরোই কাকা বলে ওঠে, আমরা অত সব শুনতে চায় না। ছেলেমেয়ে নিয়ে বাস করি। মারাংবুরু খেপে গেলে কি হবে কে বলতে পারে? তাই মারাংবুরুর পুজোর জন্য জরিমানা তোমাকে দিতেই হবে সুখলাল। একসময়ের বন্ধুদের মুখে ওই নিদান শুনে বাবা আরও মুষড়ে পড়ে। চারদিকে একবার অসহায়ের মতো চেয়ে দেখে। তাদের চোখে চোখ পড়তেই দ্রুত দৃষ্টি সরিয়ে নেয় বাবা। তাদের চোখে তখন শুধুই গড়িয়ে পড়ছে জলের ধারা। পাছে তারা আরও উতলা হয়ে পড়ে বলে বাবা একবারও তাদের দিকে তাকায় না।
কিছুক্ষণ সামলে নেওয়ার পর ফের বাবা বলতে শুরু করে — মায়ের কুষ্ঠ কেন হয়েছিল তা বলতে পারব না। কি পাপ করেছি তাও বলতে পারব না। কিন্তু মায়ের দেহ শিয়াল–কুকুরে ছিঁড়ে খাওয়ার দায় আমি মেনে নিচ্ছি। আসলে একা মাকে অত দুরের শ্মশানে টেনে হিঁচড়ে নিয়ে যাওয়ার পর খুব বেশি গর্ত করতে পারি নি তো। তাই এবার বেশী গর্ত করেই মায়ের হাড় মাংস কুড়িয়ে পুঁতে দিয়ে আসব। কিন্তু জরিমানা দেওয়ার টাকা আমি কোথাই পাব ?
উপস্থিত জনতা যেন গর্জে ওঠে — কোথায় পাবে তা তুমিই জানো। আমাদের সমাজের নিয়ম তো তোমার অজানা নয়। সালিশীতে যখন রায় হয়ে গিয়েছে তখন জরিমানা তোমাকে তো দিতেই হবে।
—- বেশ তাহলে, এখন তো আমার কাছে কানাকড়িও নেই। পৌষ মাস পর্যন্ত সময় দেওয়া হোক। তখন বাবুদের কাছে খোরাকীর ধান পাবো। সেই ধান বিক্রি করে তোমাদের জরিমানার টাকা মেটাব।
এবারে কথা বলে কালীরামকাকা — তা বললে তো হবে না বাপু। পাড়ার লোকেদের সর্বনাশ
করার জন্য মারাংবুরু কি অতদিন বসে থাকবে? জরিমানার টাকা তোমাকে আজই মেটাতে হবে। কোথা থেকে পাবে জানি না। আর জরিমানা না মেটানো পর্যন্ত তোমরা কেউ গ্রাম থেকে বেরোতে পারবে না।
ওই কথা শোনার পরই একেবারে ভেঙে পড়ে বাবা। কাঁদতে কাঁদতে কালিরামের পায়ে আছড়ে পড়ে। তার পা দুটো জড়িয়ে ধরে বলে — কালিরাম ভাই, তোমরা আমাকে দয়া করো। জানোই তো একদিন না খাটলে আমাদের হাঁড়ি চড়বে না। তোমরা যদি আমাদের গ্রাম থেকে বের হতে না দাও তাহলে যে ছেলেমেয়ে নিয়ে আমাদের শুকিয়ে মরতে হবে। দয়া করো ভাই , তোমরা ছেলেমেয়ে গুলোর মুখ চেয়ে আমায় একটু দয়া করো।
বাবার ওই আকুতি শুনে তারা দু’বোন আর নিজেদের ধরে রাখতে পারে না। ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠে তারা। কিন্তু কালিরাম কাকাদের মন একটুও গলে না। বাবাকে ঠেলে সরিয়ে দিয়ে কালীরাম কাকা বলে, আমার কিছু করার নেই। এ হলো সালিশির রায়। হাকিম নড়ে তবু হুকুম নড়ে না।তারপর মোড়ল পরিষদের সদস্যদের দিকে চেয়ে বলে — এই শোন, জরিমানা আদায় না হওয়া পর্যন্ত ওকে দড়ি দিয়ে গাছে বেঁধে রাখো।
সঙ্গে সঙ্গে বাবাকে মোড়লের বাড়ির সামনের তালগাছে বাধার তোড়জোড় শুরু করে দেয় ওরা। আর সহ্য করতে পারে না অঞ্জলিরা। তারা পরানকাকুদের বাড়ির দিকে ছুট লাগায়। বছরভর বাঁধা দিনমজুরীর পাশাপাশি কৃষাণী ভাগে পরানকাকুদের বিঘে খানেক জমিতে বর্ষায় ধান চাষ করে বাবা।
তার জন্য খোরাকী বাবদ ১০টিন ধান দেয় ওরা। ধান তোলার পর বাবার ভাগ থেকে তার ররজন্য ১৫ টিন ধান কেটে নেওয়া হয়।
সেই খোরাকীর ধান যদি এই বিপদের সময় পাওয়া যায় সেই আশায় দুই বোন পরানকাকুকে ঘটনার কথা খুলে বলে। কিন্তু সব শোনার পর পরানকাকা বলেন , তোর বাবা গত বছরের দুটিন ধান এখনও শোধ দিতে পারে নি। তাছাড়া আজ মঙ্গলবারের অমাবস্যা। ধানের গোলাতে তো হাতই দেওয়া যাবে না। আর নগদ টাকাও নেই।পরানকাকুর কথা শোনার পরই মুখ কালো হয়ে যায় দু’বোনের। শেষ চেষ্টা হিসাবে এরপর তারা যায় পাশের গ্রামের রাম জ্যেঠুর বাড়ি। রাম জ্যেঠু পার্টির নেতা। মাঝে মধ্যে তাদের পাড়ায় যান। মিটিং-মিছিলে যাওয়ার জন্য পাড়ার লোকেদের নানা রকম আশা-ভরসার কথা শোনান। তাদের বাড়িও গিয়েছেন বার কয়েক। বাবাকে ভালোই চেনেন।
তাকে গিয়েই বাবার বিপদের কথা খুলে বলে তারা। তাদের কথা শোনার পর রামজ্যেঠু বলেন – চরম অমাবিক ব্যাপার। মধ্যযুগীয় সামন্ততান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থার প্রভাব। এর একটা বিহিত হওয়া দরকার। তার কথা শুনে দু’বোন একটু আশার আলো দেখতে পায়। মনে মনে ভাবে, জ্যেঠু হয়তো টাকা ক’টা দেবেন। নয়তো পাড়ায় গিয়ে লোকেদের বুঝিয়ে একটা ব্যবস্থা করবেন। তাই তারা বলে, জ্যেঠু যা করার একটু তাড়াতাড়ি করুন। বাবাকে ওরা বেঁধে রেখেছে। টাকা না পেয়ে এতক্ষণে হয়তো মারধোর ও শুরু করে দিয়েছে।
— হ্যা সে তো করতেই হবে। তোরা একটু বোস। আমি পোশাকটা বদলে নিই। তারপর থানায় গিয়ে অভিযোগ লেখাতে হবে।
থানা পুলিশের কথা শুনে তারা দমে যায়। কারণ গাঁয়ে পুলিশ ঢুকলে খেপে যায় আদিবাসী সমাজ। হারানকাকার ক্ষেত্রেই তারা দেখছে। ডাইন বলে কাকীর জরিমানা করেছিল সালিশীসভা। তখন নেতাদের কথা শুনে থানা-পুলিশ করেছিল হারান কাকা। কিন্তু ফল ভালো হয়নি। পুলিশ সেদিন মোড়ল সহ কয়েকজনকে ধরে নিয়ে গিয়েছিল। দুদিন পরে গ্রামে ফিরে তারা হারানকাকার উপর হামলা শুরু করে। গ্রাম ছেড়ে চলে যাওয়ার নিদান ঘোষণা করে তারা। চাপে পড়ে হারানকাকারা গ্রাম ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য হয়। নাহলে রাতের অন্ধকারে ওরা ভরপেট মদ খেয়ে হারানকাকাকে পিটিয়ে মেরে দিত। এটাই আদিবাসী সমাজের অনুশাসন। গ্রামে থাকতে গেলে সালিশীর রায়কে মেনে নিতেই হয়। অন্য গ্রামে গিয়েও সব ক্ষেত্রে রেহাই মেলে না। কম-বেশী একই অনুশাসন প্রায় সব গ্রামেই চালু আছে। তার উপরে যদি আত্মীয়তার সুবাদে এই গ্রামের জরিমানা এড়িয়ে পালিয়ে যাওয়ার খবর সেই গ্রামে পৌঁছোয় তাহলে তো আর কথাই নেই।
তখন সেই গ্রামেও পাকেপ্রকারে বিপাকে ফেলার চেষ্টা করা হয়। তাই রামজ্যেঠুর কথা শুনে দুই বোন মুখ চাওয়াচাওয়ি করে। হারানকাকার ঘটনাটা চোখের সামনে ভেসে ওঠে। হারানকাকাকে যখন গ্রাম ছাড়া করার জন্য একঘরে করে রাখা হয় তখন পুলিশ- পার্টি কেউ পাশে এসে দাঁড়ায় নি। পুলিশের পক্ষে একটা পরিবারকে দিনের পর দিন নিরাপত্তা দেওয়া সম্ভব নয়। আর পার্টির পক্ষেও একটা পরিবারের জন্য গোটা গ্রামকে চটানো বুদ্ধিমানের কাজ নয়।সেই কথা বিবেচনা করেই অঞ্জলি বলে — না , জ্যেঠু থানা-পুলিশ করার দরকার নেই। আমাদের তো গ্রামেই থাকতে হবে। আপনি বরং টাকাটা ধার হিসাবে দিন, নাহলে পাড়ায় গিয়ে মোড়লদের বুঝিয়ে কিছু একটা করতে পারেন তো দেখুন।
অঞ্জলির কথা শুনে চোখ মুখ কুঁচকে যায় রামজ্যেঠুর। বিরক্তির সঙ্গে তিনি বলেন , আমার কাছে অত টাকা নেই। থাকলেও দিতাম না। জরিমানার টাকা দেওয়া মানেই তো মধ্যযুগীয় ব্যবস্থাকে সমর্থন করা। আর একক সিদ্ধান্তে আমি গ্রামে কিছু বলতে যেতেও পারব না। পার্টির মিটিং ডেকে তবে যেতে হবে। কারণ গ্রামের লোক আমার কথা অমান্য করলে বিরোধীরা শুনে হাসাহাসি করবে। আশার শেষ প্রদীপটুকুও নিভে যাওয়ায় চরম হতাশ হয়ে পড়ে তারা। পাড়ায় ফিরতে ফিরতে ভাবে , অন্যের সমস্যা এড়িয়ে যাওয়ার জন্য মানুষ কত সহজেই নানা অজুহাত খাড়া করতে পারে।
বাবা মায়ের পরিশ্রমের ফসলে পরান কাকুদের গোলা ভর্তি। অথচ সামান্য দু’টিন ধান বাকি আছে বলে বাবার এই দুর্দিনে মঙ্গলবারের অমাবস্যার দোহাই দিয়ে এড়িয়ে গেল। পরান কাকা কি করে বুঝবে সালিশির রায় তো অমাবস্যা — মঙ্গলবার মানে না। রাম জ্যেঠুদেরও আদিবাসী অনুশাসনের কথা অজানা নয়। তবুও তিনি পাটির সদস্যদের মতো ভারী ভারী কথা বলেই দায় খালাস করলেন। মোড়লের বাড়ি পৌঁছে বাবার অবস্থা দেখে কান্নায় ভেঙে পড়ে তারা।তালগাছে বাঁধা অবস্থায় বাবা তখন নেতিয়ে পড়েছে। কিছুটা দূরে বসে কেঁদেই চলেছে মা। ছোট ভাইটা কেবল বাবার হাত ধরে টানছে আর বলছে – ‘ অ বাবা বাড়ি চ না ‘।