ছোটগল্পে স্বপন পাল

রাজ্যসরকার অধিগৃহীত একটি বিদ্যুৎ উৎপাদন সংস্থা থেকে ২০১৪ সালে অবসর গ্রহণ। প্রায় ছেচল্লিশ বছর সাহিত্যক্ষেত্রে যুক্ত। কবিতা ও গল্প রচনা করে থাকি। অন্যান্য বহু বিষয়ে বিশেষ আগ্রহ অনুভব করি।

শেষযাত্রা 

এইমাত্র মারা গেলেন শিশিরবাবু। অপর্ণার জেঠু। সাতাশি বছর পেরিয়েছে পুজোর দিনকয় পরেই, আর এখন এপ্রিল, গরমটা শুরু হয়েছে। অপর্ণা খাবার নিয়ে এসে শুয়ে থাকা শিশিরবাবুকে কয়েকবার ডাকাডাকি করেও সাড়া না পেয়ে ভালো করে তাকিয়ে দেখে একটু অবাক হলো। কেমন অদ্ভুত ভাবে শুয়ে আছে না জেঠু। মাথাটা বালিশ থেকে নেমে গেছে, চোখ দু’টো আধখোলা। ভয় পেলো অপর্ণা। এবাড়িতে জেঠু আর সে। গত তিনমাস সে বাকী তিনবাড়ির আয়ার কাজ ছেড়ে জেঠুর কাছে দিনরাতের জন্য। আগে দু’বেলা আসতো বাথরুমের কাজ, খাওয়ানো সেরে ফিরে যেতো বাড়ি। কিন্তু বছরের শুরুতে রক্তের পরীক্ষায় ধরা পড়লো সোডিয়াম খুব কম আবার থাইরয়েডের গোলমাল। ওষুধ আরও বাড়লো। জেঠুর ছেলে তাকে সবসময়ের জন্য লাগিয়ে দিয়ে রাঁচী চলে গেল। যাবার আগে চারখানা ফোন নম্বর তুলে দিয়ে গেছে অপর্ণার মোবাইলে। অবশ্য আর তিনবাড়ি মিলিয়ে যে টাকা হয়, তার বেশিই দিচ্ছে অভিদাদা। সে দিক দিয়ে খুব নিয়ম মানা লোক দাদাবাবুটি। দিনে ঠিক তিনবার ফোনে খোঁজ নেবে। আর ঠিক মাসপয়লা টাকা পাঠিয়ে দেবে ব্যাঙ্কে। অপর্ণা শুধু কার্ড নিয়ে এটিএমে যায়। যেটুকু লাগবে তার কমই তোলে, বেশি তুললে বাজে খরচ।
এখন অপর্ণা কি করবে বুঝতে পারছে না। অভিদাদা তো সেই সকাল সাতটায় ফোন করেছিল, এখন তো তাকেই দরকার। ফোন বেজে গেল। এই লকডাউনের দিনে দাদাবাবু বাড়িতে বসেই অফিসের কাজ করে। বৌদিও তো বাড়িতে, একমাত্র মেয়ে সেও চেন্নাই থেকে এসে বাড়িতে আটকে পড়ে আছে। তা কেউ তো ফোনটা ধরুক। আরো একবার চেষ্টা করলো অপর্ণা, সেই এক ব্যাপার, কেউ ধরছে না। তাহলে এখন কি করবে অপর্ণা। এ পাড়ায় একটু মাতব্বর গোছের মানুষ বিশ্বাসকাকু। তা তার বাড়ি যেতে গেলে এ বাড়িতে তালা দিয়ে বেরোতে হবে। তাই করলো অপর্ণা। বিশ্বাসবাবুর বাড়ির বাইরে থেকে অনেক ডাকাডাকির পর দরজা খুললো বিশ্বাস কাকীমা। চোখে জিজ্ঞাসা। গেটের বাইরে দাঁড়িয়ে সবটা বললো অপর্ণা। বিশ্বাস কাকীমার গলায় একটা ভয় পাওয়ার মতো আওয়াজ বের হলো। বলিস কি রে। এই লকডাউনের মধ্যে মারা গেলেন উনি। শত আশঙ্কা আর উদ্বেগের মধ্যেও হাসি পেলো অপর্ণার। মানুষের মরা চলবেনা এমন ফরমান কেউ দিয়েছে বলে শোনা যায়নি। না, হাসা চলবে না। এখন দরকার উপযুক্ত সাহায্য আর ঠিক পরামর্শ। বিশ্বাসকাকুকে একটু দরকার ছিলো, এই বলে গেটের বাইরে অপেক্ষা করছে, এমন সময় ফোন বাজলো অপর্ণার। অভিদাদার ফোন। তাড়াতাড়ি ফোনে সব কথা বলে নিলো এক নিশ্বাসে। ওপার থেকে পরামর্শ এলো, অপর্ণাকে বাড়িতে থাকতে বললো অভিজিৎ, আরো বললো সে পাড়ার ডাক্তারবাবুকে ফোন করে সব জানিয়ে রাখছে, উনি এসে দেখে যাবেন, তারপর তিনঘন্টা পেরোলে সার্টিফিকেট লিখে দেবেন। অভি আরও জানালো, সে এখনই গাড়ি নিয়ে বেরোলে মোটামুটি ঘন্টা ছয় লাগবে বাড়ি পৌঁছোতে। তাতে রাত হয়ে যাবে। যদি পাড়ার লোকজন বেড়িয়ে এসে সাহায্য করে, শ্মশানে নিয়ে যেতে চায় তো অভিজিতের তাতে আপত্তি নেই, অন্তত সময় মতো সৎকার তো হবে। অভিজিৎ জানালো সে বিশ্বাসবাবুকে ফোন করছে।
যাক ছুটোছুটি করার ঝামেলা অপর্ণার আর রইলো না। অভিদাদাই ফোনে ফোনে যা করার করবে, তাকে এখন মরা আগলে বসে থাকতে হবে এই যা। একটা হাই তুললো অপর্ণা, একটু চা করে খেলে হয়। জেঠু মরে গেছে কি না সে এখন ডাক্তারবাবু না দেখা পর্যন্ত নিশ্চিত করে বলার সে কেউ নয়। চা তৈরী করলো, ভুল করে দু’কাপ জল চাপিয়ে ফেলেছিলো, চিনি দিতে গিয়ে মনে হলো, জেঠুর চা তো আর হবে না, ফুটে যাওয়া জল এককাপ ফেলে দিলো অপর্ণা। চা খেতে খেতেই ডাক্তারবাবু এলেন। রিটায়ার করেছেন সরকারী হাসপাতাল থেকে, এখন বাড়িতেই চেম্বার খুলেছেন। সকাল বিকেল রোগী দেখেন। কিন্তু এই লকডাউনে রোগী আসাও বন্ধ। বাড়িতে পরা বারমুডা আর টি-শার্ট পরেই চলে এসেছেন জেঠুকে দেখতে। আসলে ডেডবডি দেখতে। জেঠুকে উনি দাদা বলতেন। ডাক্তারবাবু দেখে শুনে বললেন, মারা গেছেন উনি, একটু পরে কাউকে বলো সার্টিফিকেট আমি লিখে রাখবো, নিয়ে আসতে। অভিজিৎ ফোন করেছিলো, আবার এদিকে পাড়ার বিশ্বাস বাবুও খবর নিলো। অভিজিতের দেরী হলে ওরা পুলিশকে জানিয়ে যা করার করবে, তা হ্যাঁরে, তোর জেঠুর গতকাল বা তার আগে কাশি হচ্ছিলো কিনা বলতে পারিস। তুইতো সারাক্ষণ থাকিস, বলতে পারবি। অপর্ণার মনে হলো গতকালই হবে, দুপুরে খাওয়ার সময় কি একটা বলার চেষ্টা করতেই জেঠুর বেমক্কা কাশি শুরু হয়েছিল। পিঠে চাপড় মেরে, জল খাইয়ে অনেক কষ্টে সামাল দিয়েছে অপর্ণা, তার জামা কাপড়ে এঁটো ভাত ছিটকে একসা। জেঠুকে মুখ ধুইয়ে নিজে আবার বাথরুমে ঢুকেছিল। তা সে কথাখানা যদি বলে তো এখনই হৈচৈ শুরু করতে পারে ডাক্তারবাবু। করোনা বলে না জানি কোথায় চালান দেবে কে জানে। তাকেও চৌদ্দদিন ঘরবন্দী থাকার ফরমান ধরিয়ে দেবে। না বাবা ফালতু ঝামেলা পাকিয়ে গেলে তারই ক্ষতি। মুখে বললো না কাকু সেসব কিছু হয়নি তো। নিশ্চিন্ত হয়ে ডাক্তারবাবু ঘর ছেড়ে বাইরে গেলেন, যেতে যেতে বললেন, আমি সার্টিফিকেট লিখে রাখছি, পাড়ার কেউ গেলে তার হাতে দিয়ে দেবো, আবার ওই সার্টিফিকেটখানার ছবি তুলে অভিজিতের মোবাইলে পাঠাতে হবে, নইলে রাঁচী থেকে এতটা পথ আসতে পুলিশে আটকালে দেখাবে কি ?
ডাক্তারবাবু যেতেই হুসমুসিয়ে এসে পড়লেন পাড়ার বিশ্বাসবাবু। অভয় দেবার ভঙ্গিতে বললেন, চিন্তা করিসনা অপর্ণা, অভিজিতের সাথে কথা হয়েছে, এদিকে থানায় জানিয়ে দিয়েছি, ডেথ সার্টিফিকেটের জেরক্স নিয়ে থানায় গেলে ওরা সব ব্যবস্থা করে দেবে বলেছে। সব শুনলো অপর্ণা, বুঝলো কিছু, কিছু বুঝলো না। তার এখন হাই উঠছে। তুলসীগাছটার দিকে চোখ পড়তে মনে হলো ডাক্তারবাবু যখন বলে দিলেন মারা গেছে তখন দু’টো তুলসীপাতা জেঠুর চোখে দেওয়া যেতেই পারে। ঘরে এসে একটু চন্দন ঘষলো, তারপর চন্দনের ফোঁটা দিলো কপালে আর দু’টো তুলসীপাতা দুইচোখে। দেখলো লুঙ্গি পরা জেঠুকে। অপর্ণার মনে হলো একটা ধুতি পরালে ভাল হয়। জেঠুর কাচা একটা ধুতি আর পাঞ্জাবী এনে বুঝলো ওই ভারী শরীর তুলে তাকে ধুতি-পাঞ্জাবী পরানো তার কাজ নয়। পরিকল্পনা বাতিল করে অপর্ণা সকালে জেঠুর না-খাওয়া দুধ-কলা আর কর্নফ্লেক্স মাখাটা বাইরে কুকুরের মুখে দিতে চললো।
হাতমুখ ধুয়ে দুপুরের জন্য ফোটানো ভাত আর আলুসেদ্ধটা খানিক খেয়ে নিলো অপর্ণা। জেঠুকে জলখাবার খাইয়ে সে প্রতিদিন অন্য রান্নাগুলো করে। আজ ওই ভাতটুকু হওয়ার পর অপর্ণা আর কিছু রাঁধতে যায়নি। লকডাউন না হলে এতক্ষণ এই বাড়িটা পাড়ার নানা লোকজনে গমগম করতো। ঘুম পাচ্ছে অপর্ণার। খানিক আগে অভিদাদাবাবু ফোনে জানিয়েছে যে সে রওনা হয়েছে বৌদিকে নিয়ে। মেয়েকে না নিয়ে যাওয়াই ভালো। বলেছে চিন্তা না করতে, সব ব্যবস্থা হয়ে গেছে শুধু অপর্ণা যেন একটু থাকে বাড়িতে, ভয়টয় যেন না পায়। ঘুম পাচ্ছে অপর্ণার, জেঠুর ঘরের বাইরে মেঝেতেই গড়িয়ে পড়ে। জেঠু দেখলে বলতো ঘরে গিয়ে শো অপু। একদিন খাওয়াচ্ছিলো অপর্ণা জেঠুকে, গল্প করছিলো। হাতের আংটিটা দেখিয়ে অপর্ণা ঠাট্টা করে বলেছিলো, জেঠু তোমার কি ওটা বিয়ের আংটি ? বাঁধানো দাঁতে হেসে জেঠু উত্তর দিয়েছিল, নারে, বিয়ের আংটি কি আর এতো বছর থাকে ? এটা অভি চাকরী পেয়ে আমাকে একটা আর তোর জেঠিকে একটা করিয়ে দিয়েছিল। তা এক কাজ করবি, আমি মারা গেলে ওটা তুই নিয়ে নিস, বিয়ের কথা তুললি তো তাই বলছি ওটা তোর বিয়েতে আমি দিলাম। অপর্ণা আজও দেখেছে আংটিটা জেঠুর হাতে চকচক করছে। ঘুম পাচ্ছে খুব অপর্ণার। এবাড়ির কাজ চুকলো, কাল থেকে অন্য বাড়ি দেখতে হবে তাকে। বুড়োবুড়ির কি অভাব আছে নাকি, না অভাব আছে অভিদাদাবাবুর মতো বাইরে থাকা মানুষের।
গাড়ির আওয়াজে ধড়মড়িয়ে উঠে বসলো অপর্ণা। চারদিক অন্ধকার। সন্ধ্যে হয়ে গেছে। অপর্ণা এতো ঘুমিয়েছে ? ঘরে উঁকি দিয়ে দেখলো জেঠু তেমনই বিছানায়। কপালে চন্দনের ফোঁটা, দু’চোখে তুলসীপাতা। তাড়াতাড়ি ঘরের আলোগুলো জ্বালালো অপর্ণা। তারপর দরজায় ঘন্টি শুনে দরজা খুলে দিলো। অভিজিৎ আর তার বৌ সুপ্রিয়া। ঘরে ঢুকে সুপ্রিয়া একবার ডুকরে কেঁদে উঠলো। তারপর অপর্ণাকে চা বানাতে বললো। আরও বললো, আজ থেকে শ্রাদ্ধকাজ হওয়া অব্দি ক’টা দিন অপর্ণা যেন এ বাড়িতে থেকে যায়। অপর্ণা বুঝলো তার এখনই ছুটি হচ্ছেনা। অপর্ণা বুঝলো এখন তার কাজ বাড়বে বই কমবে না। বেশ তড়িঘড়ি সব বন্দোবস্ত হয়ে গেল। একটা ফুল সাজানো কাচের গাড়িও চলে এলো ম্যাজিকের মতো। পাড়ার অল্প ক’জন গেল সঙ্গে শ্মশানে। চলে যাচ্ছে কাচে ঢাকা গাড়ি, চলে যাচ্ছে জেঠু, অপর্ণার চোখ দিয়ে কোথা থেকে গড়িয়ে নামলো জলের ধারা। খই উড়ছে। নাকে মুখে রুমাল আর মাস্কবাঁধা চার পাঁচটা মানুষ গাড়িতে চড়ে এগিয়ে গেলো, হরিবোল দিলো কেউ। অপর্ণা ঠায় দাঁড়িয়ে দরজায়। অপর্ণার একবার মনে হলো বলে, জেঠুর আঙুলের আংটিটা খুলে দিয়ে যাও তোমরা, ওটা জেঠু আমাকে দিয়ে গেছে। কিছু বললোনা অপর্ণা, একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকলো, জেঠু চলে যাচ্ছে, ফুল সাজানো কাচের গাড়িতে শুয়ে শুয়ে।
ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।