কলকাতা থেকে দূরে আমোদপুর নামে এক ছোট্ট গ্রামে সুহাসিনী দেবী একাই থাকেন । প্রায় ৭০ বছর পুরোনো একটা দোতলা বাড়ি । সেই বাড়ির একতলায় দুটো ঘর । একটি ঘরে আসবাব পত্র বলতে দুখানা প্লাস্টিকের চেয়ার একটি ছোট্ট সেন্টার টেবিল । অন্য ঘরে একটি সিঙ্গেল বেড । একটি কাঠের আলমারি ।তাতে কিছু শাড়ী ও অগুনতি বই রাখা । ঘরের কোণে একটি আলনা । সব ঘরের দেয়ালের রং মলিন হয়ে গেছে । বাথরুমও পুরোনো আমলের । কোনো আধুনিক ট্যাপ বা শাওয়ার নেই বরং একটি চৌবাচ্চা আছে । ঘরের সাথে লাগোয়া একটা ছোট্ট বারান্দা । খুব চেষ্টা করে আড়াআড়ি ভাবে দুজন একসাথে সেই বারান্দায় দাঁড়াতে পারে । ঘরের এক কোণে ছোট্ট একটা রান্না করার জায়গা । ঘরের সাথে লাগোয়া সিঁড়ি দিয়ে উঠে গেলে খোলা ছাদ ।একার জন্য মোটামুটি ভাবে যথেষ্ট এই বাড়ি ।
উনি গ্রামের এক ছোট্ট স্কুলে কাজ করেন । মাঝে মাঝে কলকাতায় আসেন ব্যাংকে জমা রাখা টাকা পয়সার হিসেব নিকেশ করেন । একটা রাত নিজের ফ্ল্যাটে কাটান । পরের দিন আবার গ্রামে ফিরে যান ।
ওনার স্বামী শ্রী অরবিন্দ গোস্বামী আর্মিতে ছিলেন । কারগিলের যুদ্ধে শহীদ হয়েছেন । অরবিন্দ বাবু নিজের জীবনের অনিশ্চয়তা জানতেন । তাই সময় মতো কলকাতায় ফ্লাট ও ব্যাংকে সেভিংস সব কিছুই ঠিক করে গেছিলেন ।
স্বামীর মৃত্যুর পরে ছেলে আয়ুষকে আঁকড়ে ধরেই সুহাসিনী দেবীর দিন কাটছিলো ।
তাই আয়ুষকে প্রাণে ধরে বাবার পদক্ষেপ অনুসরণ করার সম্মতি দিতে পারেন নি ।
আয়ুষেরও পৃথিবী ছিল মাকে জুড়ে । মায়ের কথায় ক্লাস এইট থেকেই FIITJEE থেকে IIT র প্রিপারেশন নেওয়া আরম্ভ করে ।
ছোট থেকেই খুব ভালো রেজাল্ট করতো আয়ুষ । ওর একটাই স্বপ্ন মায়ের মনের মতন সন্তান হওয়া ।
চশমার গ্লাসটা ভালো করে মুছে নিয়ে আয়ুষের অন্নপ্রাশনের অ্যালবাম দেখছিলেন সুহাসিনী দেবী ।
ঠিক সেই সময়ে দরজায় কড়া নাড়ার আওয়াজ ।
দরজার বাইরে একটি অচেনা ছেলে দাঁড়িয়ে । সুহাসিনী দেবী ভালোকরে ছেলেটির মুখের দিকে দেখলেন ।
পড়ন্ত বিকেলের আলোয় ছেলেটিকে দেখতে অনেকটাই আয়ুষের মতো লাগলো ।
সেই ছিপছিপে গড়ন । একমাথা চুল । পরিষ্কার গাল । ফর্সা রং । পিঠে ল্যাপটপ ব্যাগ ।
কিছুক্ষনের জন্য থমকে গেলেন । অস্ফুট স্বরে বললেন, ‘বাবু’ । দরজার বাইরে দাঁড়ানো ছেলেটি তাড়াতাড়ি বলে উঠলো,
ম্যাম ! একচুয়েলি আমি আয়ুষের বন্ধু । কলকাতায় আপনার সাথে দেখা করতে গেছিলাম । আপনার প্রতিবেশী বললো আপনি আমোদপুরে শিফট করেছেন । ওনার কাছ থেকে আপনার এড্রেস নিয়ে দেখা করতে এসেছি ।
সুহাসিনী দেবীর বুকটা দুলে উঠলো । নিজেকে সামলে নিয়ে বললেন,
-তুমি বাবুর বন্ধু ! বাইরে দাঁড়িয়ে থেকো না । ভেতরে এসো ।
বসো বাবা । আমি তোমার জন্য একটু জল আর মিষ্টি নিয়ে আসছি । তোমার নাম কি গো ?
-রোহিত ।
– বাহ্ খুব সুন্দর নাম ।
– থ্যাংক ইউ ম্যাম ।
একটি প্লেটে দুটো মিষ্টি ও জল নিয়ে এসে সুহাসিনী দেবী রোহিতের উল্টো দিকের চেয়ারে বসলেন ।
চোখে অনেক জিজ্ঞাসা । বাবুর বন্ধু । বাবুর কাছ থেকে কিছু নিয়ে ওনার কাছে এসেছে । ওনার তর সইছিলো না ।
তাও নিজের উদ্বেগ সামলে নিয়ে উনি গল্প শুরু করলেন ।
-তুমি কোথায় থাকো ?
-মুম্বাই ।
খুব বিস্মিত হলেন সুহাসিনী দেবী ।
-তুমি মুম্বাই থেকে আমোদপুর এসেছো বাবুর জিনিস দিতে ?
-হ্যা আন্টি । ওটা আপনাকে সরাসরি দিতে হতো । পোস্ট অথবা কুরিয়ার করা যেত না ।
-বেশ । কি সেটা ।
-একটা পেনড্রাইভ ।
-পেনড্রাইভ ?
– হে আন্টি ।
– কি আছে ওতে ?
– আন্টি আপনি নিজেই দেখুন ।
পেনড্রাইভটা রোহিত নিজের ল্যাপটপে লাগিয়ে চালু করতেই আয়ুষ চলে আসে পর্দায় ।
চোখের জল সামলে স্ক্রিনে ভেসে ওঠা ছেলের চেহারার ওপর হাত বোলায় সুহাসিনী দেবী । অস্ফুট স্বরে বলেন, বাবু ।
সামনের স্ক্রিনে আয়ুষ বলতে থাকে ।
মা । আমায় ফরগিভ করতে পারবে ? আমি তোমার মনের মতো হতে পারলাম না। আমার একটা সেমেস্টারেও ভালো মার্ক্স্ আসে নি। অনেক চেষ্টা করেছিলাম। কিন্তু পারি নি। আমার কাজ প্রফেসরদের পছন্দই হয় না।
তুমি সবাইকে বড় মুখ করে বোলো, ‘আমার বাবু সব সময় টপ করে ।’আমি আর টপ করতে পারছি না গো, মা । আমায় তুমি ক্ষমা করো ।
ল্যাপটপের স্ক্রিনটা কালো হয়ে যায় ।
ডুকরে কেঁদে ওঠেন সুহাসিনী দেবী ।
নিজেকে সামলে নিয়ে রোহিতকে জিজ্ঞেস করেন, “বাবু আমায় ছেড়ে চলে গেছে 2015 সালে । এখন 2020 । তুমি এখন এই পেনড্রাইভ কোথা থেকে পেলে ?”
-ওর এক সিনিয়রের কাছে
মুখ নিচু করে রোহিত বলে, আন্টি, আমি আয়ুষের বন্ধু নই। আপনাকে মিথ্যে বলেছিলাম ।আমি একজন রিপোর্টার । গত বছর আমার ছোট ভাই রেহান হাইয়ার সেকেন্ডারি রেজাল্ট ভালো না করতে পারায় আত্মহত্যা করে । ভাইয়ের এই অকাল মৃত্যু আমার মা কিছুতেই মেনে নিতে পারেন নি । কিছুদিনের মধ্যেই ওনার স্ট্রোক হয় । ওনাকে আর বাঁচানো যায় নি ।নিজের বাড়িতে দুজনকে অসময়ে হারিয়ে আমি ঠিক করি, আরো এরকম স্টুডেন্ট সুইসাইডাল কেস খুঁজে বের করার । ও সুইসাইডের কারণগুলো জানার । যদি সম্ভব হয় কোনো ছাত্র ছাত্রীকে এই চরম পরিণতি থেকে আটকাবার । বিভিন্ন কলেজে ও ইউনিভার্সিটিতে খোঁজ খবর নিতে গিয়ে আয়ুষের কেস আমার সামনে আসে
মা । আমায় ফরগিভ করতে পারবে ? আমি তোমার মনের মতো হতে পারলাম না। আমার একটা সেমেস্টারেও ভালো মার্ক্স্ আসে নি। অনেক চেষ্টা করেছিলাম। কিন্তু পারি নি। আমার কাজ প্রফেসরদের পছন্দই হয় না।
তুমি সবাইকে বড় মুখ করে বোলো, ‘আমার বাবু সব সময় টপ করে ।’আমি আর টপ করতে পারছি না গো, মা । আমায় তুমি ক্ষমা করো ।
ল্যাপটপের স্ক্রিনটা কালো হয়ে যায় ।
উনি ফুপিয়ে ফুপিয়ে জিজ্ঞেস করলেন ,
– আমার কি দোষ ছিল রোহিত ? ওর না পারার যন্ত্রনাটা আমায় একবারের জন্য জানালো না । আমিও বুঝতে পারলাম না । আমি ওর খিদে পেলে বুঝতাম । ওর কেমেস্ট্রি ফিজিক্সের কোনো অসুবিধে হলে বুঝতাম । হাইয়ার সেকেন্ডারি পরীক্ষার সময় ইংলিশ পড়বার সময় পেতো না । তাই ওকে হোম টিউটর দিলাম, যাতে সময় বাঁচে ।
আমি কি শুধুই মা ছিলাম ? ওর বন্ধু হতে পারি নি কখনো ?
ওর ভালো রেজাল্ট হলে আমি খুব খুশি হতাম ঠিকই , কিন্তু রেজাল্ট খারাপ হলে কি আত্মহত্যা করতে হয় ?
খারাপ রেজাল্টের ভয়ে ও আমাকে ছেড়ে চলে গেলো ?
রোহিত কি বলবে খুঁজে পেলো না । মাথা নীচু করে ধরা গলায় একটাই কথা বললো
– ম্যাম !
হয়তো দোষটা আমাদের সমাজ ও এডুকেশন সিস্টেমের ।
বাচ্চাদের ওপর সেই কিন্ডারগার্টেন সময় থেকে সিলেবাসের পাহাড় চাপিয়ে দিয়ে বলা হয়, এগুলো শেখো,এগুলো করো । ওদের রেজাল্ট ভালো হলে আমরা বড়াই করে আত্মীয় সজ্জন, পাড়াপ্রতিবেশী সবাইকে বুক ফলিয়ে বলে আসি। ফেসবুকের টাইমলাইনে ফলাও করে বলি। আশাও করি ওরা প্রতি বছর একই রকম পারফর্ম করবে ।
যতই অনিচ্ছা থাকুক না কেন, আমাদের খুশি করবার জন্য ওরা ঘন্টার পর ঘন্টা বইয়ে মুখ গুঁজে বসে থাকে ।
কটা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পড়াশুনার সাথে সাথে মানসিক ভারসাম্য বজায় রাখার বিষয়টা শেখাতে পারে বলুন ?
আজ কাল কোচিং ক্লাসের যুগে বাচ্চারা শিক্ষা পাচ্ছে না শিক্ষা গিলছে বোঝা দায় ।
দিনের শেষে আমরা সবাই ভুলে যাই ছাত্র গুলোও মানুষ । মাথার ঠিক ১৮ ইঞ্চি নিচে ওদেরও একটা মন আছে ।
ওরা কোনো পাপড় বা ব্রেড তৈরী করবার ইনগ্রেডিয়েন্টস নয় । সব কিছু মেপে মেশিনে দিলাম। বছর বছর একই মাপের পাপড়/ব্রেড তৈরী হয়ে যাবে । ওদের জীবনেও নানা রকম উত্থান পতন আসে ।
সেগুলোকে কিভাবে হ্যান্ডেল করা উচিত সে সব কেউ শেখায় না ।
সব থেকে বড় জিনিস যেটা জানেন ম্যাম, জীবন কোনো অংকের ফর্মুলায় চলে না ।
কম্পিটিটিভ পরীক্ষায় পাশ করলেই পেপারওয়ালারা দৌড়ে কৃত ছাত্রদের বাড়ি পৌঁছে যায় । পেপার জুড়ে ওদের ছবি । পাশাপাশি যারা অকৃতকার্য তাদের সাথে আমরা সবাই কেমন যেন ব্যবহার করি ? যেন কোনো দাগী অপরাধী।
একটা কম্পিটিটিভ এক্সাম ক্লিয়ার করতে না পারলে জীবন শেষ । তার আগে কিছুই নেই । কেউ ওদের মনের অবস্থা বুঝি না । বোঝবার চেষ্টাও করি না ।
ঈশ্বর প্রত্যেককে আলাদা আলাদা কাজের জন্য তৈরী করেছেন । কিন্তু আমরা সেটা ভুলে যাই ।
ওদের সিস্টেমের প্রসেসে ফেলে দি ।
ফলস্বরূপ, বাড়িতে সবার মাঝে থাকা বাচ্চাটা মনের দিক থেকে একা হয়ে যায়। এ যেন আমরা বুঝেও বুঝি না ।দেখেও দেখি না ।
রিপোর্ট কার্ডের নম্বর দিয়ে ওদের মানসিক ক্ষমতার বিচার করি । ভুলটাতো আমরাই করি । ওদের ভালো রেজাল্ট আমাদের সামাজিক স্টেটাস হয়ে দাঁড়ায় ।
তাই, আমাদের প্রিয় আয়ুষ, রেহান এরা আজ না ফেরার দেশে চলে গেছে। কত ছাত্র নেশাগ্রস্ত হয়ে পড়েছে।
কোচিং সেন্টারে ফিজিক্স কেমেস্ট্রির কঠিন কঠিন ফর্মুলা এক্কেবারে ক্যাপসুল বানিয়ে ছাত্রদের গিলিয়ে দেবার চেষ্টা করে। কোনো কোচিং সেন্টার কি চেষ্টা করে স্ট্রেস লেভেল ম্যানেজমেন্ট শেখাবার ? জীবনের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হবার ? লক্ষ লক্ষ টাকার বিনিমিয়ে হিউমান মেশিন বানানোর অদম্য চেষ্টা করা হয় । হিউম্যানিটি কেউ শেখায় না । বাবা মায়েরা নিজেদের সম্পূর্ণ সেভিংস ব্যয় করে এই এক্সপেন্সিভ কোচিং সেন্টারে নিজেদের বাচ্চাদের পাঠান । সর্বশেষ রেজাল্ট কি হয় ?
কেন শিক্ষাকে রক্তের সঙ্গে মিশিয়ে দেবার চেষ্টা না করে পিঠের বোঝা বানানো হয়, বলতে পারেন ম্যাম ।
শূন্য দৃষ্টিতে সুহাসিনী দেবী রোহিতের দিকে তাকিয়ে থাকে । ওনার কাছেও এই সব প্রশ্নের কোনো উত্তর নেই ।
কোনো ভাবে চাপা গলায় বলেন।
– অনেক রাত হয়েছে । আজ আর কলকাতা ফিরে যেও না । এখানেই থেকে যাও । রাতের খাবার বানাতে আমার হেল্প করে দাও । আমিও তোমার সাথে বাচ্চাদের বাঁচানোর কাজে জুড়তে চাই ।
রোহিত চেয়ার ছেড়ে সুহাসিনী দেবীর কাছে হাঁটু গেড়ে বসে দুহাতে ওনার হাত চেপে বললো,
-তাই হবে আন্টি ।
একাজ আমি একা পারবো না । আমরা পারবো ।
সজল চোখে ওর মাথায় আশীর্বাদী হাত রেখে সুহাসিনী দেবী বলেন
-আয়ুষ্মান ভব ।
পরিচিতি
জন্ম -ডিগবয়,অসম। পড়াশুনা -আসাম ও শান্তিনিকেতন। পেশায় -গৃহবধূ। নেশা – গান আর গল্পের বই।