(দ্বিতীয় পর্বের পর)
শবর প্রজাতির পূজাবিধি আলোচনা করার প্রসঙ্গে পরবর্তী ব্যাখ্যায় যাব। উড়িষ্যাতে বসবাসকারী সোরা/ ভিন্নমতে শবর জাতির উপাস্য দেবতা রুগাবই সোনাম। সোনাম অর্থে দেবী। বসন্ত রোগের দেবীরূপে পূজিতা হন সোনাম রুগাবই।
রুগাবই নামটির উৎপত্তি হয়েছে রোগোঁ শব্দটি থেকে, যার অর্থ হল লাল বর্ণের ছোলা। বসন্তরোগের জলভরা বিস্ফোটকের সঙ্গে সাদৃশ্যের জন্যেই রুগাবই নামটির উৎপত্তি হয়েছে। আবার, ময়ূরের শরীরে যে ফুটি ফুটি দাগ দেখা যায়, তার সঙ্গে পক্সের দাগের সম্পর্ক আছে বলে ময়ূরের পালক দিয়ে সোরা উপজাতির মানুষেরা বসন্তরোগের সময় রুগীদের ঝাঁড়ফুঁক করেন।
রুগাবইয়ের অবতারকে সোরা ভাষায় উদেনমারকু বলা হয়(Udenmarku)। বাংলায় যার অর্থ হলো ময়ূরের স্বরের মত কাশি। বসন্তরোগে সর্দি কাশির সময় রুগীর কাশির শব্দ কেকাধ্বনির মত শোনায় বলে হয়ত এই নাম দেওয়া হয়েছে।
সোরা উপজাতিদের গ্রামে রুগাবই সোনমের জন্য দ্রুগাসাম নামে পিঠ বা ঠাকুরতলা দেখা যায়। এখানে একটি বিষয় না বললেই নয়, সোরা উপজাতির মানুষেরা রুগাবইকেই দুর্গা বা ঠাকুরাণী নামেও পূজা করেন।
ব্রিটিশ ঐতিহাসিক এলউইন আবার ঠাকুরাণীকে রুগাবইয়ের থেকে উচ্চকোটির দেবী বলে উল্লেখ করেছেন। অন্ধ্রপ্রদেশ এবং উড়িষ্যার বিস্তীর্ণ অঞ্চলে যে সোরারা ছড়িয়ে আছেন, তারা ঠাকুরাণীকে বসন্তরোগের দেবীরূপে পূজা করেন। ঠাকুরাণীর পূজারীরা মহিলা হন, লোকবিশ্বাস বলে ঠাকুরাণী যা ইচ্ছা করেন তা মহিলা পূজারীদের কানে কানে বলেন। পূজারীরা সেইমত কাজ সম্পন্ন করে ঠাকুরাণীর মাথায় সিঁদুর পরান।
অন্ধ্রপ্রদেশের গোদাবরী উপত্যকায় বসবাসকারী কোয়ি বলে এক উপজাতি মারিয়াম্মা নামের এক দেবীকে বসন্তরোগের দেবী বলে পূজা করেন। কোয়ি উপজাতির মানুষেরা বসন্তরোগের প্রাদুর্ভাবে রুগীকে কলাপাতায় শোওয়ান, মারিয়াম্মার মাটির মূর্তিতে জল ঢেলে মন্ত্র পড়েন এবং রুগীকে মূর্তিধোওয়া জল খাইয়ে রোগের উপশমের চেষ্টা করেন। কর্ণাটকের গ্রামগুলিতে আবার পাঁচফুট দৈর্ঘ্য এবং আধফুট প্রস্থের পাথরকে মারিয়াম্মা বলে পূজা করা হয়। প্রাচীনকালে বসন্তরোগ হলে মারিয়াম্মার সামনে গবাদিপশু বলি দেওয়া হত।
অন্ধ্রপ্রদেশ গঙ্গামা নামে অন্য এক দেবীর মন্দিরের উল্লেখ পাওয়া যায়। তাকে বসন্তরায়া নামে পূজা করা হয়। ১৯২১ সালে ঐতিহাসিক হেনরির গবেষণাপত্রে একটি অদ্ভুত লোককথার উল্লেখ পাই আমরা। এটিও বসন্তরোগের সঙ্গে সম্পর্কিত। রামান্না নামের এক বিধবা নারী বিজয়ওয়ারা এবং হায়দ্রাবাদের মধ্যবর্তী অঞ্চলে থাকতেন। বুদ্ধাসাহিব নামে এক চাকরের সঙ্গে তাঁর অবৈধ সম্পর্ক ছিল। রামান্নার ভাই ক্রুদ্ধ হয়ে রামান্না এবং বুদ্ধাসাহিবকে মেরে ফেললে গ্রামের সমস্ত গবাদিপশুর এক বিকট সংক্রমণ হয়, যাকে ক্যাটল প্লেগ বলে সনাক্ত করেছেন হেনরি। এই রোগে গবাদিপশুর সারা গায়ে লাল রঙের গুটি বেরোয় এবং তাদের পা ফুলে যায়। গ্রামবাসীরা ভয় পেয়ে রামান্না এবং বুদ্ধাসাহিবের কাঠের মূর্তি গড়ে, একটি গরুরগাড়ির সঙ্গে বেঁধে রাত্রিবেলা সারা গ্রামে ঢাক, ঢোল এবং অন্যান্য বাদ্য সহযোগে ঘোরানো হয়। লোকাচারের শেষে রামান্না এবং বুদ্ধাসাহিবের মূর্তিকে ছুঁড়ে পাশের গ্রামে ফেলে আসা হয়।
অতএব, এইটুকু বোঝা যায় যে বসন্তরোগের দেবী রূপে এক আদিমাতৃকাশক্তি উপমহাদেশের বিভিন্নস্থানে বিভিন্ননামে পূজিতা হয়ে এসেছেন। শীতলা নামে তিনি মূলতঃ পশ্চিমবঙ্গ, বিহার এবং ওড়িষা অর্থাৎ পূর্বভারতের পূজিতা দেবী হলেও, উত্তর ভারতে দেবী শীতলার পূজার্চ্চনার উল্লেখ পাওয়া যায়। জৌনপুর, রাজস্থান, হিমাচল প্রদেশে তাঁর মন্দির দেখা যায়। যেহেতু তিনি শীতলাগ্নি উদ্ভূতা তাই তাঁর ভক্তরা বাসি খাবার দেবীকে নিবেদন করে এবং সেই খাবার গ্রহণ করে শীতলার পূজা করেন। পূর্বভারতে শীতলাপূজার সঙ্গে উত্তরভারতের এই দেবীর পূজার একটি বিশেষ পার্থক্য হল, শীতলাদেবী উত্তরভারতে বর্ষাকালে পূজিতা হন, আর পূর্বভারতে চৈত্রমাসে। আরেকটি রাজ্যের কথা এ প্রসঙ্গে না বললেই নয়, সেটি হল গুজরাট। সুরাট, ভারুচ, মাহাবা, জেতপুর ইত্যাদি একাধিক স্থানে শীতলা দেবী পূজিতা হন গুজরাটে। তবে মহামারীর দেবী রূপে নয়, তিনি এই রাজ্যে সৌভাগ্য, অর্থ এবং যশের দেবী।
দেবী শীতলা প্রসঙ্গে বৌদ্ধধর্মে উল্লিখিত আরেক দেবীর নাম না করলেই নয়। তিনি হলেন দেবী হারিতি। তিনি মূলতঃ যক্ষী, বিনয়সূত্রে জানা যায় তিনি এবং তাঁর সহচরীদের যক্ষীসত্ত্বা রীতিমত ভীতিউদ্রেককারী ছিল। ১৯১১ সালে পেশাওয়ার অঞ্চলে খননের ফলে দেবী হারিতির যে মূর্তি পাওয়া যায় তা চতুর্ভুজা। তাঁর কাঁখে এবং কাঁধে শিশুসন্তান। নবজাত শিশুদের অপহরণ এবং হত্যা করে নরমাংস ভক্ষণের জন্য দেবী হারিতি কুখ্যাত ছিলেন। স্বয়ং ভগবান বুদ্ধদেবের প্রভাবে দেবী হারিতি তাঁর ক্রুদ্ধা, ভীষণা, ক্ষতিকর রূপটি থেকে মঙ্গলাকারী রূপে পর্যবসিত হন। শিশুহননের জায়গায় স্থান নেয় শিশুরক্ষা। শুধু তাই নয়, বৌদ্ধদের মধ্যে তিনি পূজিতা হন, বসন্তরোগের নিরাময়কারী দেবী রূপে। পেশাওয়ারের মূর্তিটি দেবী হারিতির মঙ্গলাকারী রূপ।
সময়টা প্রথম এবং তৃতীয় খ্রীষ্টাব্দের মধ্যবর্তী প্রায় আড়াইশ বছর। সেই সময় কুষাণরাজ্যের রাজধানী ছিল পেশাওয়ার। কুষাণরাজ্যের সীমানা মধ্যএশিয়া থেকে শুরু করে বর্তমান সময়ের উত্তরপ্রদেশ পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। তৎকালীন স্থাপত্যরীতি এবং আইকোনোগ্রাফিতে ইন্দো-গ্রীক প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। লক্ষণীয় বিষয় হল, এই সময়েই মহাযান বুদ্ধধর্মের শাখাটি জন্মলাভ করে। কিম্তু কুষাণবংশের সঙ্গে দেবী হারিতির কী সম্পর্ক! এই প্রশ্নটির উত্তর জানতে গেলে, প্রত্নতাত্ত্বিক এ.ডি.এইচ বিভারের গবেষণাপত্রে উল্লিখিত ইতিহাসের এক আশ্চর্যজনক অধ্যায়ের কথা বলতে হয়।
১৬৫ থেকে ১৮০ খ্রীস্টাব্দের মধ্যবর্তী সময়ে এশিয়া এবং ইউরোপের এক বিস্তীর্ণ অঞ্চলে অ্যান্টোনাইন প্লেগ নামের এক ভয়াবহ মহামারীতে প্রায় পাঁচলক্ষ মানুষ মারা যান। এই মহামারীকে প্লেগ বলে চিহ্নিত করা হলেও এর লক্ষণ হাম এবং পক্সের মতো। ডক্টর বিভার তাঁর গবেষণাপত্রে লিখেছেন, ১৯১১ সালে পাকিস্তানের শাহরি বলোল নামক স্থানে প্রাপ্ত দেবী হারিতির মূর্তির বয়স আনুমানিক ১৩৮ খ্রীষ্টাব্দ হলে ধরে নিতে হবে, সেই সময়ে কুষাণ সাম্রাজ্যের অন্তর্গত গান্ধার অঞ্চলে( বর্তমানে পেশাওয়ার) এই ধরণের সংক্রমণের প্রাদুর্ভাব লক্ষ্য করা গিয়েছে। ঐতিহাসিকদের মতে, দক্ষিণ এবং পূর্ব এশিয়া থেকেই সমুদ্রপথে নাবিক ও ব্যবসায়ীদের মাধ্যমে বসন্তরোগের সংক্রমণ ভূমধ্যসাগর সংলগ্ন একাধিক অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছিল।১৯৫৮ সালে প্রকাশিত হিস্ট্রি অফ ইণ্ডিয়ান বুদ্ধিজম: ফ্রম দি ওরিজিন টু দ্য সাকা এরা বইটিতে ঐতিহাসিক ল্যামট লিখেছেন পেশাওয়ারে আবিষ্কৃত দেবী হারিতির মূর্তির পাদদেশে একটি প্রাথর্নামন্ত্র উৎকীর্ণ করা রয়েছে, যার মূলভাবে দেবী বসন্তরোগের জীবাণু মহাশূন্যে বিলীন করার জন্য প্রার্থনা করা হয়েছে। পেশাওয়ারের এই হারিতি মূর্তিটির উল্লেখ হিউয়েন সাং করে গিয়েছেন।
১৯১৫ সালে প্রকাশিত নোটস অন অ্যানসিয়েন্ট জিওগ্রাফি অফ গান্ধারা বইটিতে ঐতিহাসিক আলফ্রেড ফাউচার পেশাওয়ারে এক হারিতি দেবীর স্তূপের কথা উল্লেখ করেছেন, যেখান থেকে মাটি কুড়িয়ে হিন্দু মুসলিম নির্বিশেষে মহিলারা বাহুবন্ধে বা মাদুলিতে পুরে সন্তানকে পরাতেন। পরবতীর্তে হারিতি কাল্ট নেপাল, চায়না এবং জাপানেও ছড়িয়ে পড়ে।
উত্তরপ্রদেশের মথুরা,উড়িষার রত্নগিরি, বিহারের সারান, মহারাষ্ট্রের অজন্তা এবং ইলোরা, বাংলাদেশের রাজশাহী সহ একাধিক স্থানে দেবী হারিতির মূর্তি উদ্ধার করা হয়েছে।
তবে দেবী হারিতির উৎপত্তির ইতিহাস নিয়ে বিভিন্ন মতবিরোধ আছে। ঐতিহাসিক শ্রীপদ্মা বলছেন, অন্ধ্রের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে পূজিতা দেবী এরুকাম্মাই হলেন আসলে দেবী হারিতি। অন্ধ্রপ্রদেশের আলাদা আলাদা স্থানে এরুকাম্মার নাম বদলে গিয়েছে, কোথাও তিনি মুট্যালাম্মা, কোথাও পোচাম্মা, কোথাও বা নুকালাম্মা, যদিও আইকোনোগ্রাফি অনুযায়ি এরা একই দেবী। শ্রীপদ্মার মতে বসন্ত রোগের সংক্রমণের ফলে গর্ভবতী মহিলাদের মৃত্যু হওয়ায় মানুষের মনে বিশ্বাস জন্মায় সেই গর্ভবতী নারীদের আত্মাকে সন্তুষ্ট না করলে ঝাড়েবংশে নিঃশেষ হওয়ার সম্ভাবনা, তাই দেবী হারিতির মূর্তিকল্পনা এবং তাঁর পূজার প্রচলন হয়।
১৯৮৮ সালে প্রকাশিত বই হিসট্রি অফ ইন্ডিয়ান বুদ্ধিজমে ঐতিহাসিল ল্যামট জানাচ্ছেন, নেপালে দেবী হারিতিকে বসন্তরোগের দেবী রূপে এখনও পূজা করা হয়।
ব্রাত্যদেবীদের নিয়ে আলোচনা করার প্রসঙ্গে এর পরের পর্বে ওলাদেবী এবং রক্তাবতী সহ একাধিক দেবীদের নিয়ে আলোচনা করার ইচ্ছা থাকল।