শ্যামলীর কথার উত্তরে একটু হেসে বৃদ্ধ বললেন, বাহাত্তর বছর বয়স হলে ভীমরতি হয়। আমি নব্বই পেরোলাম। কাজেই আমার কথাগুলো ভীমরতি পাওয়া মানুষের কথা বলে ছুঁড়ে ফেলে দিও। বলে তিনি কলিংবেল টিপলেন। ভিতরের একটা দরজা খুলে একটি বধূ বের হল। ওকে দেখিয়ে বৃদ্ধ বললেন, আমার নাতবউ। ওর সাথে যাও। আমার বুড়ির সাথে আলাপ করে এসো। শ্যামলী দেখল কচি ঢলঢল লাবণি মাখা দুই চোখ। কিছুতেই তার বয়স আঠারো পেরোয় নি।
বৃদ্ধ মারোয়াড়ি ভাষায় নাতবউকে বললেন, এ খেয়ে আসেনি। একে আমাদের ঘরোয়া খাবার খাওয়াও। একে আমি খুব পছন্দ করি।
শ্যামলী খুব আপত্তি করলেও বালিকাবধূর মিনতির কাছে তার কোনো আপত্তি টিঁকল না। তাদের ভিতরের ঘরে নিয়ে গিয়ে দিদিশাশুড়ির কাছে একটি বেতের চেয়ারে বসিয়ে দিল সে। বৃদ্ধা অসম্ভব ফরসা, হুইল চেয়ারে বসে বসে সংসার চালান। সোনার চশমার আড়ালে স্নেহপূর্ণ চোখে তাকালেন শ্যামলীর দিকে। আমার কর্তা রোজ একবার করে তোমার কথা বলে। তোমার কথা শুনে শুনে একটা আইডিয়া করে রেখেছি। কবে মরে যাব, তোমাকে দেখে খুশি হলাম। অন্যান্য বধূরা, বালিকারা ঘরে এসে জুটল। শ্যামলীর মনে হচ্ছিল, এ বাড়িতে সে বিশেষ সম্মানিত অতিথি। এর মধ্যেই একজন কাঁসার একটি বড় পাত্র এনে ধরল তার সামনে। আর ইঙ্গিত করল হাত ধুয়ে ফেলতে। তারপর ছোটো একটি টেবিল এগিয়ে দিয়ে বড়ো কাঁসারের থালায় মোটা মোটা ঘিয়ে ভাজা পরোটা আনল। সাথে ছোটো ছোটো বাটিতে বেশ অনেক রকম তরকারি। একজন প্রবীণা বললেন, নাও একটু খেয়ে নাও, আমরা একেবারেই শাকাহারী। বিশুদ্ধ ঘিয়ের গন্ধে শ্যামলীর মনে পড়ল আর্য ঋষিমুনিদের পছন্দের জিনিস ছিল হৈয়ঙ্গবীন ভর্জিত পুরোডাশ। খেতে খেতেই শ্যামলীর মনে পড়ল বাসনার সেরা বাসা রসনায়।
খাওয়া হলে বৃদ্ধা তাঁর ছেলেবেলার কথা পাড়লেন। স্কুলে ভর্তি হন নি তিনি। স্বামীর কাছে পড়তে শিখেছেন। সংসারের হিসাব রক্ষণ করতে শিখেছেন। বলতে বলতে মনে পড়ল মেনিনজাইটিস হয়ে একটি মেয়ে মারা গিয়েছিল, তার কথা। হু হু করে বৃদ্ধা কেঁদে উঠলেন। বালিকা নাতবউ পরম স্নেহে বৃদ্ধার চোখের জল মুছিয়ে দিতে দিতে কৃত্রিম শাসন করল। শ্যামলীর দিকে তাকিয়ে বলল, কবে না কবে মরে গেছে, আজও নতুন মানুষ দেখলে তার কথা মনে করে কাঁদে।
বৃদ্ধার কাছে ছুটি নিয়ে গোটা বাড়ি ঘুরে ঘুরে দেখতে হল তাকে। শাশুড়িরা জায়েরা সবাই মিলে মিশে কেমন সুন্দর ভাবে আছে এরা। বালিকাটিকে শ্যামলী বলল একটু বাথরুমে যাব। বাথরুম থেকে বেরিয়ে শ্যামলীর মনে হল, এ বাড়ি তার কাছে খুব সহজ হয়ে গেছে।
সকলের কাছে বিদায় নিয়ে ফের বৃদ্ধ মহাজনের কাছে গেল শ্যামলী। বলল, খুব ভালো খেয়েছি। বৃদ্ধ হেসে বললেন, তোমার বিয়ের খবর কানে আসছে। বিয়ের পিঁড়িতে তোমাকে বেনারসি পরা দেখতে চাই।
শ্যামলী একটু গম্ভীর হল। বলল, কে বলেছে যে আমার বিয়ে হচ্ছে?
বৃদ্ধ হেসে বললেন, যার সঙ্গে বিয়ে হচ্ছে, তাদেরও চিনি। তারাও ব্যবসায়ী পরিবার।
শ্যামলী বলল, ওদের দিক থেকে প্রস্তাব এসেছে। কিন্তু, আমার এখনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি।
বৃদ্ধ বললেন, আমাদের সময় মেয়েদের বিয়ে হত ছোটোবেলায়। আজকাল একটু বড় হয়ে বিয়ে হচ্ছে কারো কারো। তবে তুমি অন্য রকম মেয়ে। তোমার পারসোনালিটি খুব বেশি। বিয়ে করলে খুব দেখে শুনে ভেবে বিয়ে কোরো। তুমি আর পাঁচটা মেয়ের মতো নও।
বৃদ্ধ নাগাড়ে বলে চলেন, তোমার বাবাকে তো জানি। গ্রাম ছেড়ে এখানে এল। খুব খাটত। খেটে খুটে কারখানা দাঁড় করাল। তারপর কী যে ধর্মবাতিক চাপল, কারখানায় যেত না, গুরুদেবের হয়ে এখানে ছুটত, সেখানে ছুটত। আর বীরু দিল ব্যবসাটাকে ছিবড়ে করে। সংসারী মানুষের সংসার পালনটাই ধর্ম। ওটা পাল বুঝতে বড় দেরি করেছে। তোমার দিদির ভাল বিয়ে হয়েছে। ব্যাঙ্কের ম্যানেজার। কোনো অসুবিধা নেই। কিন্তু ভাইগুলোর বদনাম শুনতে পাই। তাই তোমার জন্য দুশ্চিন্তা হয়।
শ্যামলী শুকনো মুখে বলল, কি দুশ্চিন্তা হয়?
বৃদ্ধ বললেন, সে সব থাক। আমার ভীমরতি হয়েছে। আমার কথা বাদ দাও। আমার বুড়িকে কেমন লাগল?
শ্যামলী বলল, খুউব ভাল। কিন্তু, আমি যে এবার উঠব।
বৃদ্ধ বললেন, শ্যামলী কি জন্য এসেছিলে, তা তো বললে না?
শ্যামলী বলল, ভীমরতি হলে মানুষকে কেমন দেখতে হয়, তা বুঝতে এসেছিলাম।
বৃদ্ধ বললেন, তোমার জন্য চিন্তা রইল। ফোন নম্বর তো জানো। সুবিধা অসুবিধার কথা বোলো। শ্যামলীর খুব বলতে ইচ্ছে করছিল, আমি একটা মাথা গোঁজার জায়গা খুঁজছি, কিন্তু কিছুতেই বলতে পারল না।
বৃদ্ধ শ্যামলীকে বললেন, তোমার হাতটা আমার হাতে দাও। বলে সোনার ঘড়িপরা শীর্ণ ডান হাতটি বাড়ালেন। শ্যামলী অকুণ্ঠিত ভাবে করস্পর্শ করল। বৃদ্ধ অস্ফুটে বললেন, ভাল থেকো। তারপর চশমা খুলে কাচটা পুঁছতে ব্যস্ত হলেন। সেই অবসরে শ্যামলী বেরিয়ে পড়ল। বাইরে তখন কনে দেখা আলো।