মেহেফিল -এ- কিসসা রম্য গল্পে সাইফুল ইসলাম জুয়েল

ব্যাকরণবিদ বিলু ভাই

আমাদের বিলু ভাই। যিনি কিনা স্কুলজীবনে কখনো বাংলাতে পাস করেছেন বলে আমরা সন্দিহান, শুনলাম তিনি নাকি এখন কোন এক কোচিংয়ে বাংলা টিচিং দিচ্ছেন। তার এই টিচিংটাকে আমার কাছে উল্টো ‘চিটিং’ বলেই মনে হলো। আরে ভাই, মাথার মধ্যে কিছু থাকলেও না হয় চলতো, যার আছে কেবলই একখানা ফাঁকা ময়দান, সে কী করে আপনাকে ফুলবাগান উপহার দেবে? আর কোচিং কর্তৃপক্ষও যে কেমন! বিলু ভাইয়ের মতো এমন গাঁধাচন্দ্র ব্যাকরণের মাস্টার কেউ নিয়োগ দেয়!
বিলু ভাই একেক সময় একেক ধরনের আইডিয়ার উদ্ভাবন ঘটান, তার ওই তারছেঁড়া মস্তিষ্ক থেকে। আর তার ফলাফল যে কী মহামারি আকারই না ধারণ করে। সেটা অবশ্য না জেনে ধারণা করাও মুশকিল। যেহেতু বিলু ভাইয়ের অধিকাংশ ঘটনারই প্রত্যক্ষদর্শী আমি, তাই ভাবলাম-এবারের বিষয়টা থেকে বাদ যাব কেন? কোনো দ্বিধাদ্বন্দ্ব না করে বিলু ভাইয়ের সেই কোচিংয়ে ভর্তি হয়ে তার ছাত্র বনে গেলুম।
প্রথম দিন ক্লাশে এসে বিলু ভাই কিছুক্ষণ রুমের এপাশ-ওপাশ করলেন। হয়তোবা চিন্তায় কী পড়াবেন, কীভাবে পড়াবেন কিছুই তো জানেন না। তিনি তো শুধু জানেন কীভাবে পড়ায় ফাঁকি দিতে হয়! বিলু ভাইকে এমনটা করতে দেখে ক্লাশের ছাত্র-ছাত্রীরাও অমনোযোগী হয়ে পড়ল। ওদের ঠোকোঠুকিতে দুজন ছেলে-মেয়ের ব্যাগ টেবিলের ওপর থেকে গেল নিচে পড়ে। মেয়েটি নিজের ব্যাগটি উঠিয়ে চুপচাপ বসে রইল। ছেলেটির ব্যাগটি উঠালো না। আর সেই ঘটনা বিলু ভাই আদ্যোন্ত খেয়াল করে হঠাৎই যেন চিক্কুর দিয়ে উঠলেন, ‘আরে! এমন নিঃস্বার্থ হলে কি চলে বলে?’
মেয়েটি বিলু ভাইয়ের কথার আগামাথা কিছু না বুঝে চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল। বিলু ভাইয়ের অবস্থা দেখে বুঝলাম, তিনি ক্রমাগত কনফিডেন্স ফিরে পাচ্ছেন। এবার গলার ভলিয়্যুম ক্ষাণিকটা বাড়িয়ে দিয়ে বললেন, ‘কখনো নিঃস্বার্থ হবে না, স্বার্থপর হওয়ার চেষ্টা করো, বুঝলে?’
মেয়েটির মুখ দুটো আরো ফাঁক হয়ে গেল। চোখ দুটো হয়ে গেল গোল গোল। এটা শুধু ওর একারই নয়, আমাদের বাকি সবারও। এই জীবনে এমন উপদেশ আজ পর্যন্ত কাউকে দিতে দেখিনি বা শুনিনি।
‘স্যার, আপনি আমাদেরকে স্বার্থপর হতে বলেছেন? নিঃস্বার্থ না হয়ে?’ ক্লাশের এক ছাত্র শেষ পর্যন্ত নিজের বিস্ময় বোধটা চেপে রাখতে পারলো না।
বিলু ভাইকে দেখে মনে হলো ওর প্রশ্ন শুনে আকাশ থেকে পড়েছেন। ‘আরে এতে অবাক হবার কি আছে? তোমরা সবাই অমন গোল আলুর মতো হয়ে আছো কেন? নিঃস্বার্থ হলো যে নিজের স্বার্থ দেখে, আর স্বার্থপর মানে তো যে পরের স্বার্থ দেখে। স্বার্থ মানে বোঝো তো? ভাল, বুঝলে ভাল। তাহলে এখন তোমরাই বলো- তোমরা সবসময় কি নিজের স্বার্থই দেখবে, নাকি তোমাদের আশ-পাশের মানুষদের ভালটাও চাইবে?’
বিলু ‘ষাড়ের’ বুঝিয়ে বলার পরও সবার বিস্ময়ভাবটা কাটল না। মনে হয় এমন ভাল মানের শিক্ষকের ক্লাশ ওরা আর কখনোই পায়নি! আমি আস্তে করে বললাম, ‘জি স্যার, অনেক ভাল করে বুঝে গেছি। আমরা এখন থেকে আপনার মতো স্বার্থপর হবো, নিঃস্বার্থবান হবো না।’

এভাবেই বিলু ভাই আমাদেরকে নিত্য নতুন বিষয় শিক্ষা দিচ্ছিলেন। একদিন এলো ভাষার উৎস শেখার বিষয়টি। বিলু স্যার বললেন, ‘আমরা বাঙালি, শুধু বাংলা শব্দের উৎস জানলেই চলবে। অন্যগুলো জানার কোনও প্রয়োজন নাই। কোনগুলো দেশি শব্দ তা জানলে পরীক্ষায় তার বাইরে যা আসবে তাই বিদেশি বুঝে উত্তর দিয়ে আসবে।’
‘ব্যাকরণ কাকে বলে?’ ব্যাকরণ অধ্যায় পড়ানোর সময় বিলু ভাই আমাদেকে এই প্রশ্নের উত্তর বোঝাচ্ছিলেন, ‘ব্যাকরণ মানে হলো ব্যাকরণ! ব্যাকরণ মানে ‘গেরামার’ও হয়। তবে এটা ইংলিশ ভাষার জন্য। মানে, ইংলিশ ব্যাকরণ হলো ‘গেরামার’, আর বাংলা ব্যাকরণ হলো বাংলা ব্যাকরণ। আমাদের যেমন হাত পা আছে, ব্যাকরণেরও তেমনই হাত-পা আছে।’
‘স্ত্রী ও পুরুষ বাচক শব্দ’ অধ্যায়টি তিনি শেষ করলেন মাত্র দু মিনিটে। ‘যে শব্দগুলো তোমাদের কাছে ব্যাটা ব্যাটা মনে হবে সেগুলোই পুরুষবাচক শব্দ। আর যেগুলো মহিলা মহিলা মনে হবে, সেগুলোই মহিলাবাচক থুক্কু স্ত্রীবাচক শব্দ হবে।’
একজন ছাত্র জানতে চাইল, ‘কিন্তু স্যার, অনেক শব্দ আছে, যা আসলে দেখলেই বোঝা যায় না কোন ধরনের। এগুলো…’
বিলু ভাই ওর মুখের কথা কেড়ে নিয়ে বললেন, ‘ওগুলো হিজড়া বাচক শব্দ।’
আমরা সবাই আক্কেলগুড়ুম। বিলু ভাই গলার পাওয়ার বাড়িয়ে বললেন, ‘এনি কুশ্চেন (কোশ্চেন)? এনি ডাট (ডাউট)?’
বিলু ভাই ‘পদ প্রকরণ’ অধ্যায়টির আলোচনা করলেন, ‘পদ মানে কী জানো তো? ওই যে কবি বলে গেছেন ‘‘তোমার পদ চরণ…’’, বুঝলে তো- পদ হলো গিয়ে পা। যেমন- ডান পদ, বাম পদ। ব্যাকরণেও কয়েক প্রকারের পদ আছে।’
‘স্যার ক্রিয়া পদটি একটু বুঝিয়ে দিন না।’, জনৈক ছাত্রের অনুরোধ।
‘হ্যাঁ, হ্যাঁ, কেন বোঝাবে না বলো। তোমরা কুশ্চেন করবে, আমি বোঝাবো, না বুঝলে নিজেরাও বোঝার চেষ্টা করবে। ক্রিড়া মানে কি জানো তো? ক্রিড়া মানে হলো খেলাধূলা। আমি নিজে স্কুলজীবনে কত্ত ক্রিড়া অনুষ্ঠানে অংশ নিয়েছি! তোমারও নেবে বুঝলে, লেখাপড়ার পাশাপাশি এগুলোতেও তোমাদের পদ চিহ্ন রাখবে। জাতি তোমাদেরকে মনে রাখবে।’

দেখতে দেখতে আমাদের পরীক্ষা চলে এলো। পরীক্ষার প্রশ্ন পুরোপুরি কমন, বিলু ভাই যা পড়িয়েছেন তাই এসেছে। কিন্তু আমি তো জানি, তিনি যা পড়িয়েছেন তাতে কেউ পাশ করবে বলেই সন্দেহ। শেষে অবশ্য আমার ধারণা ভুল প্রমাণিত হল। বিলু ভাইর ছাত্র-ছাত্রীরা অন্যদের থেকে বেশি মার্কস পেল। কাহিনি কী? পরে বুঝেছি- আগে ছেলে-মেয়েরা বাংলা ব্যাকরণকে খুব ভয় করতো। কিন্তু আমাদের বিলুভাইয়ের মজার ক্লাশ করে ওরা বাংলা ব্যাকরণকে খুব সহজভাবে নিয়ে নিয়েছে। তাই বাসায় গিয়ে সবাই মনোযোগ দিয়ে ব্যাকরণের বই পড়েছে। অথচ এর আগে কেউ পরীক্ষার আগের রাত ছাড়া খুলেও দেখেনি!

এবার এক ইংলিশ মিডিয়ামের ছাত্রকে বাংলা পড়ানোর অফার পেলেন বিলু ভাই। অনেক দিন পড়ানোর পরে একদিন তাকে বিপরীতার্থক শব্দ পড়াচ্ছিলেন।
‘অগ্র-এর বিপরীত শব্দ কি?’
‘পশ্চাৎ।’
‘‘পশ্চাৎ’ বানান কী?’
‘প…’
‘হুম।’
‘শ…’
‘কোন ‘শ’?’
‘আ…আ…(আমতা আমতা করে) স্যার, ওই যে, ওই টা… বাংলা ১-এর সাথে ইংলিশ সিক্স, আর একটা দাঁড়ি লাগানো না, ঐটা…’
‘আচ্ছা, তারপর…’
‘ওইটার সাথে ‘চ’ স্ট্যাপলড (সে যুক্তবর্ণ বলতে পারে না)… সাথে আ-কার…’
‘আর…’
‘আর আরেকটা হইল…’
‘হুম, বল?’
‘আ… আ… স্যার ঐ যে… ঐটা… ঐ যে… কোশ্চেন মার্ক আছে না, ওইটার উল্টা… খালি ওর পায়ে আম্মুর মত টিপ নাই… হইছে না স্যার?’
‘ৎ’ এর ক্রিয়েটিভ বর্ণনাসহ পুরো কাহিনি বিলু ভাইয়ের মুখে শুনতে শুনতে আমার অবস্থাই ‘বিলু ভাইয়ের বাংলা ব্যাকরণ’এর মতো হয়ে গেল!

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।