গল্পকথায় সম্বুদ্ধ সান্যাল

সময়

গত দু’বছর ধরে একটা স্থায়ী আস্তানা খুঁজছিলাম কোলকাতায়। পাড়া-গাঁয়ের ছেলে আমি। সারাজীবন গ্রামের তরতাজা হাওয়া ছেড়ে কোলকাতায় এসেছিলাম জীবিকার খোঁজে। তখন সবে কলেজ থেকে বেড়িয়েছি। বাবা কৃষিজীবি, সামর্থও ছিলনা তেমন। উচ্চবৃত্তির ব্যাবস্থা যে আমাকেই করতে হবে তা বুঝে গেছিলাম বেশ ছোট থাকতেই। স্কুলজীবনে সময়ও ছিলো প্রচুর। পড়াশোনার পর সেই সময় যে মাঠে ঘাটে নষ্ট করা যাবে না সেই জ্ঞানও পোক্ত হয়ে উঠেছিলো দৈনিক জীবনযাপনের অভিজ্ঞতায়। তাই বন্ধুবান্ধবও ছিলো না বিশেষ। আমারই মত আরও একজন ছিলো আমাদের বাড়ির পাশে, শ্যামল। তার সাথেই ছিলো আমার যত ভাব। শ্যামলের বাবা অবশ্য কৃষিজীবি ছিলোনা, ছিলো সেই আমলের প্রাইমারী স্কুল মাষ্টার। অবস্থাও ছিলো আমাদের তুলনায় অনেকটাই সচ্ছল। শ্যামলের বাবা আমাদের খুব ভালোবাসতেন। দুজনকে রাতের আকাশের তারা চেনানোর থেকে শুরু করে পরীক্ষার পড়া তৈরী করে দেওয়া অবধি তার জগত ছিলো যেন আমাদের দুজনকে ঘিরে। তার যত সময় ছিলো যেন আমাদের মানুষ করে তোলার জন্য।
শ্যামল ছিলো খুব উদ্যমী ছেলে। ফিস্টের রান্না, বাৎসরীক সরস্বতী পুজোর প্যান্ডেল, খিচুরী সবেতেই শ্যামল। আমি ভাবতাম শ্যামল এত কাজ করে, এত সময় ও পায় কি করে! এখনও স্পষ্ট মনে আছে সেই দিনগুলোর কথা। তার মায়ের রান্নাঘরের কাজ সেরে আমাদের বাড়িতে এসে গরুর জাবনা ওই তৈরী করতো। আর পড়াশোনার বই থেকে মুখ তুলে তা দেখে ভাবতাম, ইস! ন’টা বেজে গেল আর নিরাপদ স্যারের ইতিহাস নোটই মুখস্ত হ’ল না এখনও! বাবার সাথে গরুর জাবনা তৈরী করে আমার ঘরে এসে শ্যামল প্রশ্ন করেছিলো, “কিরে, নিরাপদ’র নোট মুখস্থ করেছিস? আজ পড়া না পারলে তোকে যা মারবে না!”
নোট মুখস্থ হয়েছিলো না। ওকে বরঞ্চ বলেছিলাম, “তোর মনে হচ্ছে খুব হয়েছে? আমি একাই মার খাবো না নিশ্চয়ই।”
“রাখ! রাখ! আজকে নিরাপদকে তাক লাগিয়ে দেবো। সেই পাঁচটার সময় উঠে পাক্কা দু’ঘন্টা ধরে মুখস্থ করেছি।” আমি তার গড় গড় মুখস্থ বলাটাকে সেদিন সেলাম করে ওকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, “তুই এত সময় পাস কি করে সব কাজ করার?”
সে উত্তরে বলেছিলো, “সময় পাই! কোথায়! আমার তো মনে হয় যদি সময় থেমে থাকতো, আর কখনও না চলতো, তবে যেন আমি শান্তি পেতাম।”
সেই সময়ই একসময় গ্রাস করে ফেলে শ্যামলকে। উচ্চমাধ্যমিকের বছরই মারা যায় তার বাবা। বিশেষ কিছু রেখেও যেতে পারেননি তার পরের প্রজন্মের জন্য। শ্যামল সেবার উচ্চমাধ্যমিক দিতে পারেনি। আমিও তার সাথে থাকতে পারিনি আমার বাবার দিকে তাকিয়ে। শ্যামলও আমার উপর অবশ্য কখনও কোনও ক্ষোভ দেখায়নি এর জন্য। তবে কিছুদিন যেতেই বুঝে গেছিলাম ও অনেক পালটে গেছে নিজের ভেতরেই। কোনকিছুর থেকে পালাতে চাইছিলো যেন সে। হয়তো সবার থেকে। ওর অবস্থাটা তখন বোঝার মতো ক্ষমতা আমারও ছিলো। তাই যখন পরেরবার উচ্চ-মাধ্যমিক পাস করে কোলকাতায় চলে গেল ছাপাখানার কাজ ধরে, তখন ওর ওপরে একটুও রাগ হয়েছিলো না। প্রথম প্রথম কিছু পত্রালাপ চলতো, আমি পোষ্ট করলে উত্তরও দিতো প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই। কিন্তু কোথাও যেন একটা অস্বস্তিও লেগে থাকতো সবসময়। আন্তরীকতাটা আস্তে আস্তে যেন তার সারাদিনের কাজের ইস্তেহার হয়ে উঠেছিলো। সে ফর্দও কম নয়। আমি প্রতিবার চিঠিগুলো শেষ করার পরে ভাবতাম ওর সময়ের সত্যিই বড় অভাব।
কোলকাতায় আমার যাওয়াটাও খানিক ওর সুবাদেই। উচ্চমাধ্যমিক পাস করার পর আমাকে কলেজে পড়ানোর সামর্থটুকু বাবার কোনমতে হলেও শ্যামলের হয়ে কোনদিন আবদার করতে পারিনি তার কাছে। তাই কলেজে পড়ার সময়ে একবারও মনেও পড়েনি শ্যামল কিভাবে তার পড়ার খরচা চালাচ্ছে। তার মতো শারীরিক ও মানসিক সক্ষমতাও আমার ছিলো না যে নিজের চেষ্টায় ওর সঙ্গে কোলকাতায় থাকবো। তাই বছর তিনেক দুজনের জীবনের স্রোত যেন দুটো ধারা হয়ে গিয়েছিলো মাঝে। যদিও কলেজ ছাড়ার পরে শ্যামল একটা বেসরকারী কোম্পানীতে গ্রাফিক ডিজাইনার পদে যোগ দেয় ক’দিন বাদে। সেই খবর পেয়ে আমিও তার দ্বারস্থ হই। কারণ ততদিনে বুঝে গেছি পারিবারিক সাহায্যের পরিধিটা। না, শ্যামল আমাকে ফেরায়নি, তার সেই পুরোনো ছাপাখানায় হিসবরক্ষকের একখানি কাজের ব্যাবস্থা আমাকে করে দেয়। যৎসামান্য সেই ব্যাবস্থা, কিন্তু ডুবন্ত দুই বাহুর একান্ত আশ্রয়। এর পরে নানা সময়ে নানাভাবে শ্যামলের সঙ্গে আমার যোগাযোগ হলেও আস্তে আস্তে পড়াশোনার চাপে আর কাজের মাঝে তা হয়ে উঠেছিলো ক্ষীণতর। ততদিনে মেস ছেড়ে বাড়িও ভাড়া নিয়েছি একটা। শ্যামলের বাড়িও আমার ভাড়া বাড়ির থেকে বেশী দূরেও ছিলো না। কিন্তু দেখাটা ঠিক হয়ে উঠত না নিয়মিত।
শ্যামল অবশ্য নিজের চলার পথটা যথেষ্ট মসৃণ করে ফেলেছিলো সেখানে। উন্নতিও হয়েছিলো প্রচুর। আমি যখন বাড়িটা ভাড়া নিই ততদিনে কোলকাতায় পাঁচ বছর কেটে গেছে। শ্যামলও ততদিনে চাকরী ছেড়ে নিজের কোম্পানী খুলেছে। কর্মোদ্যমী ছেলে, তার এই গুণটির জন্য উন্নতিও ছিলো লক্ষ্য করার মতো। যদিও ছাপাখানার চাকরীটা পাওয়ার পর আমিও তার কাছে আর কোনও আশা নিয়ে যাইনি। করিৎকর্মা না হলেও যে জড়ভরত নই, তা এই পাঁচ বছরের খানিকটা উন্নতিতেই বুঝে গেছিলাম। কিন্তু শ্যামলের তরফে যোগাযোগ কমে যাওয়াটা যত না ছিলো সময়াভাবে, আমার তরফে ঘটনাটি ছিলো সম্পূর্ণ অন্য। আমি যেন শ্যামলের দিকে তাকালে মনে করতাম কোথাও যেন হেরে যাচ্ছি। তাই যেন পর্যাপ্ত সময় কখনও থাকলেও নিজের দিকে তাকাতে যেন ভয় পেতাম।
বছর দুয়েক ভাড়া বাড়িতে কাটানোর সময়টাতে আমার ভাগ্যদেবী যেন খানিক সুপ্রসন্ন হয়। এর মধ্যে একটা চার্টার্ড ফার্মেও কাজ জুটে গেছে বেশ ভারী মাইনের। সি. এ. পাস করাটা ছিলো নিজের কাছেই খানিকটা বিস্ময়ের। মন আমার ছিলো, কিন্তু সুযোগটা যে এত তাড়াতাড়ি চলে আসবে ভাবিনি। একবছর চাকরীটা করার পর ভাড়া বাড়িতে থাকাও আর পোষাচ্ছিলো না। এবার একটু শান্তি চাই। খানিক পয়সাও জমেছিলো হাতে। প্রায় নিখরচা আমি, মাসের শেষে মোটা অঙ্ক হাতে আসলে যা হয় আর কি। একটা ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার প্রয়োজন সর্বাগ্রে। বাবা-মা কতদিনই বা ওই গ্রামে পড়ে থাকবে। সংসারী হওয়াও ঘোর প্রয়োজন তা বোধ করছিলাম তখন। কিন্তু লেখাপড়া আর চাকরীর ফাঁকে বিষয়-আশ্রয় সম্পর্কে ওয়াকিবহাল হওয়া তখনও বাকী রয়ে গিয়েছিলো। আত্মীয়-স্বজনও তেমন কেউ ছিলো না যাদের সাথে উচ্চমানের কিছু সম্পর্কে আলোচনা করা যায়। সুতরাং আবার শ্যামলই অগত্যা। একটা কিন্তু কিন্তু সমেত ওকে আবার মনে করতেই হ’ল। ততদিনে শ্যামলের ব্যবসাও ফুলে-ফেঁপে উঠেছে। মধ্য কোলকাতার বহুতলে তার অফিসও হয়েছে। জনহিতকর কাজের জন্য কিছু পুরস্কার, চ্যানেলে মুখ দেখানো – সে এক স্বপ্নের জগতের বাসিন্দা তখন। কোলকাতার ইয়ং অ্যাচিভার্সদের মধ্যে জ্বল জ্বল করে শ্যামল রায়ের নাম। তার এখন সময়ের বড্ড বেশী অভাব। কিন্তু আপন বলতে কার কাছেই বা যাই এত বড় সিদ্ধান্ত নিয়ে। সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতে একদিন শ্যামলকে ফোনে ধরে বসলাম।
খানিক্ষণ রিং হওয়ার পরে ওপ্রান্ত থেকে সম্ভাষণ আসলো, “কিরে ব্যাটা, ডুমুরের ফুল হয়ে উঠেছিস তো, পাত্তাই নেই!”
“যাঃ যাঃ ব্যাটা, তুই যেন নিত্য-নৈমিত্ত খোঁজ নিস্‌?” ইয়ার্কি মারা স্বভাবটা চাইলেও রুখতে পারলাম না ওর কাছে।
“বল, কি খবর? বিয়ে করছিস কবে? বলবি তো?”
“আগে তোরটা খাই, তারপর তোর অবস্থা দেখে তখন ভাববো।”
“আমার বিয়ে করার সময় কোথায়? এখনও সামনে কত প্রোজেক্ট বাকি জানিস? আগামী দু’বছর ভাববারই সময় নেই এসব নিয়ে।” তুই বিয়েটা কর, তাতে সময় করে যাবোই এটুকু কথা দিতে পারি।”
“আরে দাঁড়া, আগে নিজের একটা ঠিকানা স্থির করি এখানে। ভালো কথা, একটা মাথা গোঁজার মতো বাড়ি চাই রে, কিনবো।”
“আরিশশালা, ছেলে তো বড়লোক হয়ে গেছে।” শ্যামল মস্করা করে হেসে উঠেছিলো, কিন্তু তার সে হাসির মধ্যে ছিলো গর্ব, যেন সে এটাই চেয়েছিলো আমার কাছে। “বল, কি করতে পারি এর জন্য?”
“কি আর করবি, তুই তো আগেই কিনেছিস। সবকিছুই জানিস। আমি প্রায় কিছুই জানিনা এই ব্যাপারে।”
ফ্ল্যাট না বাড়ি তাই নিয়ে শ্যামলের সাথে অনেক্ষণ আলোচনা করে ঠিক করলাম বাড়িই কিনবো উত্তর কোলকাতায়। সারাজীবন মানুষের মধ্যে থাকতে পারিনি। তা ছাড়া বাবা-মাও মানুষজন পছন্দ করে, আমি কতটুকুই বা সময় দিতে পারবো তাদের? তাই ঠিক করা হ’ল আপাততঃ ঠাঁইয়ের জন্য উত্তর কোলকাতার কোথাও দোতলা ছোট একটা বাড়ি নেওয়া হোক। শ্যামল তার পরিচিত এক ডিলারকে পরেরদিন পাঠালো আমার কাছে। সে কয়েকটি বাড়ি সম্পর্কে বলা ও তাদের ছবিও দেখানোর পর তিনটি বাড়ি পছন্দ হলেও দাম যা হাঁকলো, তাতে খানিক দমেই গেলাম। তাকে বিদায় করে মনোঃক্ষুণ্ণ হয়ে শ্যামলকে জানিয়ে ইচ্ছেচুলোয় জল ঢালবো ভাবছি, এমন সময় রাতে শ্যামলের ফোন পেলাম। সেই ডিলার আমার মনের কথা সম্পূর্ন বুঝতে পেরে শ্যামলকে আরও একটা বাড়ির সূত্র দিয়েছে। বাড়িটা বেশ পুরোনো। তবে গঙ্গার থেকে দূরত্ব বেশি নয়। দোতলা, গঙ্গার দিকটা বেশ খানিকটা খোলা। বাজারও আছে পাশেই, গিরীশ পার্কও খুব দূরে নয়। মেট্রো, মহাত্মা গান্ধী রোড সবই বেশ কাছে। কিন্তু বাড়িটা পুরোনো বলে বেশ কিছু সাড়াইয়ে দরকার পড়লেও তা আস্তে আস্তে করা যাবে। সর্বোপরি এর দাম। ভাগ্যদেবী আমাকে যেন দত্তকপুত্র নিয়েছেন। দামটা বেশ মনমতো হয়েছে আমার। এর থেকেও আরো কিছুটা কমলো শ্যামলের হস্তক্ষেপে। এরপর একদিন সে বাড়ি আইনগতভাবে আমার হ’ল। বাড়িটার নিচের উপরের তলায় মোট চারখানি ঘর, নীচে একখানি ড্রয়িংরুম, লাগোয়া রান্নাঘর, বাথরুম ও শোওয়ার ঘর। রাস্তা লাগোয়া একচিলতে বারান্দার পাশে দোতলায় ওঠার সিঁড়ি। দোতলায় দু’খানি শোওয়ার ঘর, একখানা বাথরুম। উপরের একখানা শোওয়ার ঘর বেশ বড়। দেওয়ালে সদ্য প্লাস্টার করে তার উপর রঙ করা হয়েছে। রঙ করার দায়িত্বটা অবশ্য বাড়ির পূর্বতন মালিকই নিয়েছিলো। বলেছিলো তার দেওয়ালের অবস্থা খারাপ থাকায় সে পুরো প্লাস্টার খসিয়ে আবার নতুন করে দেবে। সবকিছু এত সহজে হয়ে যাওয়ায় ভেবেছিলাম বাড়িটার কোন ভৌমদোষ আছে কিনা। কিন্তু চারপাশের লোকেদের মুখে পূর্বতন মালিকের সুখ্যাতিই বেশি শুনলাম। আগের মালিকের নাম দীনবন্ধু সরকার। আগে কোন বেসরকারী অফিসের কর্মচারী ছিলেন। তার মূর্তি বানানোর একটা বিশেষ গুণ ছিলো। তা অনেকটা দেরীতে তা প্রকাশ পেলেও গত ছয় বছরে ষ্ট্যাচু তৈরীতে তার যথেষ্ট সুনাম হয়েছে। এখন তো বিদেশেও যায় তার তৈরী মূর্তি। এখন থেকে তাই সে এই বাড়ি বিক্রী করে তার ব্যবসাটি ইটালীতে জমাতে চায়। সে উপায়ও তার হয়ে গেছে, শুধু বাড়িটার মায়া ত্যাগ করার অপেক্ষা। তাই বোধহয় এমন দামে রাজী হয়ে গেছিলেন। দীনবন্ধুবাবু শিল্পী মানুষ, খামখেয়ালিই হবেন। তার শিল্পনমুনাও চোখে পড়েছিলো আমাদের দুজনের। উপরের বড় ঘরটায় তখনও প্রায় এক ডজন মূর্তি রাখা। বাড়িটা সাজিয়ে তোলার মধ্যেই তিনি মূর্তিগুলো সরিয়ে নেবেন কথা দিয়েছিলেন। তার হাতের কাজের প্রশংসাও করেছিলাম দুজনে। মূর্তিগুলো নাকি প্রথমে সিমেন্ট দিয়ে তৈরী করে তার উপরে সাদা প্লাস্টার অফ প্যারীস দিয়ে কোটিং। সমস্তটাই হস্তনির্মিত, তার প্রমাণও পেলো শ্যামল। আঙুল দিয়ে টেনে টেনে প্লাস্টার মাখানো হয়েছে তাতে। এমন ভাস্কর্য আমরা কোনদিন স্বচক্ষে দেখিনি। দেখেছি রোম-গ্রীস প্রভৃতি সভ্যতায়। ডেভিড বা হের্মেজের মতই তাদের প্রত্যেকটিই যেন জীবন্ত।
ঘরটির দেওয়ালগুলিতে আমাদের পছন্দ করা রঙ করা হয়েছে। দেওয়ালসজ্জাও করেছেন অতি চমৎকার। যদিও ভদ্রলোক আমার এই ঘরটিকে সাজিয়ে তুলতে চান বলে প্রস্তাব রেখেছিলেন, আমিও তা সাদরে গ্রহণ করেছিলাম। এমন মাপের আর্টিস্ট আমার বেডরুম সাজাবে এ তো খুবই আনন্দের কথা। আসবাবপত্র এখনও আনা যায়নি তেমন। শুধু গ্রামের বাড়ি থেকে দু’টো আলমারী আর একটা খাট পৌঁছে গেছে। আরো কিছু স্মৃতি মুছে বাবা-মাও পরের সপ্তাহে চলে আসবে এখানে। অবশ্য দোতলার এই ঘরটিতে এখনও কিছু ঢোকেনি। এটা হবে আমার ঘর, ভবিষ্যতে আমাদের। ভদ্রলোক পশ্চিমের দেওয়ালে একখানি কার্পেট লম্বালম্বি টাঙিয়ে রেখেছেন দেখলাম। জিজ্ঞাসা করায় বললেন ওটা তাদের পারিবারিক সম্পত্তি, ফারসি। কার্পেটটার সামনে দুটো চেয়ার রাখলে মন্দ লাগবে না দেখতে, দিব্যচক্ষে দেখতে পেলাম। ভদ্রলোকের রুচির তারিফ করতেই হবে। এছাড়াও জানালা, দরজা ও কার্পেটটার চারপাশে বর্ডার আঁকিয়েছেন খুব সামান্য, কিন্তু দৃষ্টিনন্দন। তারই কোন শিল্পী বন্ধুর কাজ। এছাড়াও খাট যেখানে থাকবে তার মাথার দিকের দেওয়ালে ইনকা চিত্রকল্প। পরে বুঝেছিলাম বর্ডারগুলোও তারই ছোঁয়া।
ভাড়ার বাড়ি থেকে আমার আনার জিনিষ ছিলো অল্পই। বাকি সবকিছু বেচে দিয়েছিলাম। নতুন বাড়ি, নিজের ঘরটাকে নতুন ভাবে সাজাবো। তাছাড়া মূর্তিগুলোর জন্য ক’দিন ফাঁকাই থাকুক। এমন একটা বড় ঘরের স্বপ্ন দেখেছিলাম কত বছর ধরে। বাড়িতে প্রথম দিন একা কাটাতে ইচ্ছে করলো না। শ্যামলকে ফোন করলাম, সেও উৎসাহী। তার ঠাসা সূচীর মধ্যে সে গোটা একটা দিন আমার বাড়িতে কাটাবে ও সেটাকে আস্ত একটা বাড়ি করে তুলবে কথা দিলো। ততদিন আমার ঠাঁই হ’ল তাদের বাড়িতে। সে তখনও বিয়ে করেনি, তবে তার মা’কে এনেছিলো বেশ কয়েকবছর আগেই। তার সময়াভাবে মায়ের সেবায় এতটুকু কার্পন্য করেনি সে। আমিও কয়েকটা দিন প্রায় নিজের মায়ের কাছে থাকার সৌভাগ্য পেয়ে গেলাম।
প্রায় সমস্ত কিছুই সে বাড়িতে এসে জমা হওয়ায় নীচের তলাটা ছন্নছাড়া হয়ে ছিলো। শ্যামল আর আমি সকাল থেকে একজন মুটেকে নিয়ে লেগে পড়লাম ঘর পরিস্কার করতে। শ্যামলের উৎসাহ সেই ছোটবেলার মতই প্রবল। কি এক আনন্দে মেতে আছে সে। একাই দায়িত্ব নিয়েছে যেন সে আমার ঘর সাজানোর। মুটেটি বিকেলে যখন বিদায় হ’ল তখন প্রায় গুছিয়ে ফেলেছি আমরা। নীচের বাথরুমের সবচেয়ে কাছের ঘরটা বাবা-মায়ের। এই ঘরটা পুরোপুরি সাজানো হয়ে গেছে। বসার ঘরটির আসবাব এখনও কেনা হয়নি। উপরে আমার ঘর সাজানো বাকি ও গেস্টরুমে ঢুকে গেল ভাড়াবাড়ির খাটসমেত অন্যান্য জিনিস। সব শেষ করতে রাত হয়ে গিয়েছিলো। এইরকম অবস্থায় শ্যামলই প্রস্তাবটা দিয়েছিলো, “আজ আমি এখানে থেকে যাবো?”
“সে কি রে! থাকবি না মানে! এ তো তোরও বাড়ি।” আমি হেসে বলেছিলাম। না, কোন মেকি হাসি ছিলো না সেই রাতে। “কতদিন হ’ল বলতো আমরা দু’জনে একসাথে সময় কাটাই না। আজও যা চললো সারাদিন, একে অন্ততঃ সময় কাটানো বলে না।”
শ্যামল হেসে উঠলো, বললো, আজ তাহলে এখানেই কাত। প্রথম দিন, গোলবাড়ির মাংস খাবো, সঙ্গে রুটি।”
“আর কিছু?” চোখ টিপে বললাম আমি।
“না রে, কাল থেকে আবার সেই একই রুটিন। এমনিতেই আমি ওই রসে বঞ্চিত। তার উপর আজকের রাতটা শুধু ছুটির ঘোরেই কাটাতে চাই। আজ অনেকদিন বাদে আবার ইচ্ছে করছে সময়টাকে থামিয়ে দিই। এই রাতটা যেন ততক্ষণ থাকে যতক্ষণ আমি চাই। সারাজীবন সময়ের পেছনেই দৌড়লাম রে, বেঁধে রাখতে পারলাম কই? তাই এই রাতটাকে বেঁধে রাখতে চাইছি থেমে থাকতে। জীবনে প্রথমবার এইরকম চাইছি আজ।”
“তাহলে আজকের রাতটা গল্প করেই কাটিয়ে দিই, কি বলিস?” খাবারগুলো আনতে একটু পরে বেড়োলেই চলবে। এসে খেয়েদেয়ে ভালো করে গল্প করে মা-বাবার ঘরে শুয়ে পড়া যাবে, সব ব্যাবস্থাও আছে।”
“ঠিক আছে, সে সব পরে হবে। চল, তোর উপরের ঘরে বসি। মূর্তিগুলো জানিস বেশ ভালো লেগেছে আমার। ভদ্রলোক যাওয়ার আগে একটা কিনবো ভাবছি।”
দীনবন্ধুবাবু নিজের নামেই ইলেক্ট্রিক কানেকশনটা রেখেছিলেন তখনও। বলেছিলেন নাম ট্রান্সফার করা পর্যন্ত তার আপত্তি নেই। পাশেই কোথাও তার ছেলের বাড়ি। বিদেশে না যাওয়া অবধি সেখানেই থাকবেন দুজনে। বাড়ির সব আলো জ্বালিয়ে দিলাম। নতুন আলোয় ঝক ঝক করতে লাগলো ঘরগুলো। বাতিরা যেন ঢেলে দিচ্ছিলো আমার একরাশ তৃপ্তি। দুজনে বারান্দায় বেড়িয়ে এসে উঠতে লাগলাম সিঁড়ি বেয়ে।
উপরে উঠেই প্রথম ঘরটা গেস্ট রুম। খানিকটা গিয়ে আমার ঘর। উপরের লম্বা সরু বারান্দার একপাশে লম্বা গ্রীল দেওয়া। বাইরে তাকালে কালো কালো ভুতের মত বাড়ি তার উপরে রাতের কোলকাতার লাল আকাশ। জানালার বাইরেই তারের সারি, তাই বারান্দার গ্রীলটা বেশি ঘন।
বারান্দা পেড়িয়ে আমার ঘরে ঢুকলাম দুজনে। ঢুকেই শ্যামল একটা মূর্তির সামনে দাঁড়িয়ে স্পর্শ করে পরীক্ষা করছিলো, সঙ্গে বেশ প্রশংসাসূচক বিশেষণ, “যতদূর জানি ইউরপে মিডল এজের পর এরকম নিখুঁত মূর্তি বানানোর চল উঠেই গিয়েছিলো প্রায়। আমাদের দেশেও তা আরো কিছুদিন পর্যন্ত বহাল থাকলেও এখন এমন শিল্পকার খুঁজে পাওয়া মুস্কিল। যারা আছে, তাদের বেশিরভাগই বাজারী, ছাঁচে ফেলে মূর্তি তৈরী করে, পার্কে-টার্কে বসে। আর কলামন্দিরে যে এদের প্রবেশ নিষেধ তা বলাই বাহুল্য। বড়লোকের বাড়ির বাগানেই এগুলো এখন শোভা পায়।”
আমি শুনে বলেছিলাম, “তাই বুঝি একখান কেনার শখ। তা একটা কেন, যা বাগান বানিয়েছিস তাতে চার-পাঁচটার অর্ডার দিয়ে দে।”
“ওরে, এ অর্ডারী মাল নয়।” সে বলতে থাকলো, “দেখেছিস এদের প্রত্যেকের মুখের আদল আলাদা। প্লাষ্টার করা হয়েছে কর্ণিকের জায়গায় আঙুল দিয়ে ঘষে ঘষে। আরেকটা ব্যাপার কিছুতেই মাথায় ঢুকছে না, এদের সবার চোখগুলো দ্যাখ বন্ধ!”
আমি এগিয়ে এসে দেখলাম সত্যিই তাই। সবকটা মূর্তিরই চোখ বন্ধ। হেসে বললাম, “গ্রীক মূর্তির কথা বলছিলি তো, ওদের চোখেও মণি নেই।”
“সেটা আলাদা, ওদের চোখগুলো খোলা, এদের বন্ধ।”
“ওদের মূর্তিগুলোর চোখের মণি নেই কেন রে?” আমি প্রশ্ন করি।
“ওটা ওদের নিজস্বতা হতে পারে, আমি ঠিক জানি না।”
“তাহলে এটাও এনার নিজস্বতা। তাছাড়া মুখগুলো দ্যাখ কেমন নিষ্পাপ, সরল। ঠিক যেন ঘুমন্ত মানুষের মতো। তাই বোধ হয়…” ব্যাপারটাকে হাল্কা করার চেষ্টা করি। কিন্তু একটা খটকা মনে থেকেই যায়। শ্যামলকে তবু বলি, “চল চল, ওদিকে বসি।”
শ্যামল চলে আসে। দেওয়ালচিত্রটির নিচে হেলান দিয়ে বসে পড়ে। বলতে থাকে, “উফ্‌, আজকের দিনটা ভাবা যাচ্ছে না। সেই কতদিন পরে নিজের মতো একটা দিন কাটাচ্ছি। ভাগ্যিস বাড়িটা কিনলি। এবার থেকে মাঝে মাঝেই চলে আসা যাবে।”
আমার একখানা দেওয়াল ঘড়ি ছিলো আগের বাড়িতে। এরমধ্যে সেটা খুঁজে তাতে সময় দেখলাম সবে ৭-৫৫ বাজে। ঘড়িটাকে দেওয়ালের একদিকে ঝুলিয়ে দিলাম। খাবার আনার সময়টা দেখতে সুবিধা হবে। এরপর তার পাশে এসে বসলাম। আজ কতদিন বাদে আবার ছোটবেলার মত আমরা একসাথে।
কথা চলতে থাকে দুই বন্ধুর। কত কথা, ছোটবেলা, বাবা-মা, স্কুল, নিরাপদ স্যারের বেত, গ্রামের সেই দিন, এখনকার গ্রামের কথা, গ্রামীন লোকেরা যারা বেঁচে আছেন তাদের খোঁজ, স্বর্গতদের প্রতি স্মৃতি বা দুঃখবোধক অস্ফূট আওয়াজ। কত কথা থাকে দুই বন্ধুর? যত কথা বলেও শেষ করা যায় না! সে বলছিলো নিজের মতো। তার প্রতিটা কথাতেই বিশ্বাস করছিলাম তার সরলতা। এত কাজ, এত কষ্ট-আনন্দর মাঝেও শ্যামল এখনও কত সহজ সরল। আমি বসেছিলাম চুপ করে। কিই বা বলবো? যা যা চিন্তা করেছি এতদিনে? তার সব কথা কি ওর কাছে বলা যায়? যার কাছে যতবার অসুবিধায় পড়েছি, ছুটে গেছি, কিন্তু সুখের সময়গুলোর কথা ভেবে তার দিকে তাকানোর ক্ষমতা আমার নেই বোধ করলাম। একটা অজানা দূরত্ব যেন সবসময় বজায় রেখেছিলাম ওর সাথে। আমি ওর মতো উদ্যমী নই। ওর সাফল্যের একমাত্র কারণই ওর কর্মোদ্যম। তাই বার বার বোধ করছিলাম আমি শ্যামল নই। শ্যামল চাইলে পারে তার বন্ধুর সাথে অন্ততঃ একটা পুরোনো দিন ফিরিয়ে আনতে, আমি আর পারিনা। পারি না, কারণ চাই না। সে চায়, তাই পারে।
বেশিক্ষণ বসে থাকতে পারছিলাম না। শ্যামলই বলেছিলো, “মাটিতে পাতার কিছু আছে? নীচ থেকে দু’খানা বালিশ নিয়ে আয়, আমি কার্পেটটাকে নামাই।”
“কার্পেট নামাবি কিরে? আছে, থাক না। আবার জুড়তে হবে।” আমি বাধা দিয়েছিলাম।
“দেখেছি। কার্পেটটার কোনায় দড়ি দিয়ে টাঙানো। পরে আবার ঝুলিয়ে দেওয়া যাবে।” শ্যামল প্রত্যয়ী হয়ে বললো, “যা যা, বালিশগুলো নিয়ে আয়, ভালো করে বসি। অনেকটা সময় কাটানোর আছে আজ।”
সে উঠে পড়লো। আমিও নিচে গেলাম বালিশ আনতে। দুটো বালিশ নিয়ে এসে দেখি সে কার্পেটটা মাটিতে নামিয়ে ফেলে রেখেছে জড়ো করে, উদাসীন। আর তার উৎসাহ অন্যদিকে। কার্পেটটা দেওয়াল থেকে নামাতেই বেড়িয়ে এসেছে একটা দরজাপ্রমাণ কালো ফলক। তার দিকে চেয়ে আছে শ্যামল।
আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম, “কি রে এটা?”
দু’আঙুলের গিঁট দিয়ে সে সেটাতে আওয়াজ করলো। একটা ধাতব ঠং করে আওয়াজ উঠলো। সে তার উপরে হাত ঘষতে লাগলো।
আমি আবার জিজ্ঞেস করলাম, “কোন দরজা নাকি?”
শ্যামল বললো, “ধুর বোকা, দেওয়ালের ওপাশে কোন ঘর নেই, ভেবে দ্যাখ।”
“তাহলে এটা কেন? কি এটা?” বলে আমি লক্ষ্য করতে লাগলাম জিনিষটা দেওয়ালের সাথে একেবারে গাঁথা। নড়ানোর উপায় নেই একটুও।
শ্যামল বললো, “আগেই দেখেছি, এটা দরজাও না, ঝোলানো কিছুও না। কিন্তু কি এটা? উপরে কালো রঙ করা। ঠোকা দিলে আওয়াজ হচ্ছে, মনে তো হচ্ছে কোন প্লেট হবে। কিন্তু কালো রঙ করা কেন?”
অনেক্ষণ ধরে দেখতে থাকলাম বস্তুটাকে দু’জনে মিলে। শ্যামল যথারীতি জিনিষটাকে নিয়ে উঠেপড়ে লেগেছে। মনে হচ্ছে সারা রাতের খোরাক সে পেয়ে গেলো। এটা কি, কেন এখানে – কোনও প্রশ্নের উত্তর না পেয়ে আরো আধঘন্টা কেটে গেল।
এমন একটা জিনিষের কৌতূহল ঘোর লাগিয়ে দিলো দু’জনের মধ্যে। কাটলো শ্যামলেরই গলায়, “তুই এক কাজ কর। খাবারগুলো নিয়ে আয়। আমি এটাকে দেখছি।”
কথাটা মন্দ বলেনি। এতক্ষণে অনেক রাত হয়ে গেছে। সম্বিৎ ফেরার সঙ্গে সঙ্গে আবার মূর্চ্ছনা। লোডশেডিং। শ্যামল একটা বিরক্তিসূচক আওয়াজ করে উঠলো। অন্ধকারে সাবধান বলবো কি, সামনের থেকে ঠং করে একটা জোরালো আওয়াজ এলো। কিছু একটা জোর ঠুকে গেছে বস্তুটার সাথে।
বলে উঠলাম, “কি রে!”
“কিছু না, আংটিটা ঠুকলো। তুই আলোর ব্যাবস্থা কর, যা।” শ্যামল বললো। তার কৌতূহল গলায় ফুটে বেড়োচ্ছে।
আমি কোনমতে ঘর থেকে বেড়িয়ে বারান্দায় এলাম। রাতের কোলকাতার আকাশের আলো পথ দেখাচ্ছে বারান্দা ভরে। সেই আলোয় এগিয়ে সিঁড়ি ধরে নিচে নামতে থাকলাম। এমন সময় আলো জ্বলে উঠলো। সঙ্গে সঙ্গে শ্যামলের গলার চীৎকার, “রজত, ভাই এটা কাঁচের।”
আমি সিঁড়ির থেকে উত্তর দিলাম, “কি করে বুঝলি?”
“আমার আংটিটা ঠুকে গিয়ে খানিকটা রঙ উঠিয়ে দিয়েছে, দেখা যাচ্ছে। তুই জলদি খাবারটা নিয়ে আয়। আমি এটাকে দেখছি। দেরী হলে ঘরে খাবার কিছুই নেই। চা’ও আনা হয়নি।”
তার কথায় সায় দিয়ে বেড়িয়ে পড়লাম গোলবাড়ির উদ্দেশ্যে। রাত সবে দশটা বাজে। শ্যামলের গাড়ির চাবিটা নিয়ে স্টার্ট দিলাম। এরপর আর দেরী করা যাবেনা রহস্য উদ্ঘাটনে।
কৌতূহল কার্যকে ত্বরান্বিত করে প্রমাণ দিয়ে আধঘন্টার মধ্যে ফিরে আসলাম। রান্নাঘরে খাবারগুলো রেখে আবার উপরে গিয়ে দেখি শ্যামল তখনও কাঁচটির দিকে তাকিয়ে ঠায় দাঁড়িয়ে। তার হাতে একটা ভাঙা কাপের টুকরো। তাই দিয়ে সে ঘষে ঘষে তার মুখের দিকের খানিকটা রঙ উঠিয়ে ফেলেছে। কিন্তু এইভাবে কি দেখছে সে! তার কাপধরা ডান হাতটা বুকের কাছে, বাঁহাতটা নামানো, স্থির। তার কাছে গিয়ে বললাম, “কি দেখছিসরে অমন ভাবে?”
উত্তর পেলাম না কোনও। আবার প্রশ্ন করলাম, এবারও কোনও উত্তর নেই! হটাৎ গলার কাছটা কেউ খামচে ধরলো। তার কাছে গিয়ে গলার জোরে তাকে ডাকলাম, “শ্যামল!”
এখনও কোনও উত্তর নেই। কোন অজানা আতঙ্ক যেন আমাকে গ্রাস করলো। আরেকবার জিজ্ঞেস করতে গেলাম। এবার মুখ দিয়ে কোনও আওয়াজ বেড়োলো না। তাকে স্পর্শ করলাম, তবুও সে নির্বাক, নিঃশব্দ। তার সম্বিৎ ভাঙাতে সর্বশক্তি এক করে তাকে একটা জোরে ধাক্কা দিলাম। মূর্তিগুলোকে জোরে ধাক্কা দিলে যেমন কাঁপতে কাঁপতে আবার সোজা হয়ে দাঁড়ায়, শ্যামল তেমন ভাবে ঘুরে দাঁড়ালো আমার দিকে। তার ডান হাতে তখনও কাপের টুকরোটা। সেটাকে আমি ছাড়িয়ে নিতে তার আঙুলের মুদ্রার কোনো পরিবর্তন হ’ল না। ঘটনাটি দেখে আমি সভয়ে চীৎকার করে খানিকটা পেছনে ছিটকে পড়লাম। সেই অবস্থায় কোনমতে পেছোতে পেছোতে দেওয়ালে পিঠটা ঠেকে গেলো। আমি পিঠ দিয়ে দেওয়ালটাকে ঠেলতে লাগলাম নিজের চোখকে বিশ্বাস না করতে পেরে। শ্যামলের চর্মনেত্র যেন আমার দিকে তাকিয়ে আছে।
তার সামনের থেকে সরে যেতে চাইছিলাম প্রাণপনে। কোনমতে তার দৃষ্টির বাইরে আনতে পারলাম নিজেকে। ঘরের মাঝখানের মূর্তিগুলোর সাথে শ্যামলের কোনও তফাৎ নেই। তার সাথে কি ঘটেছে কিছুই বুঝতে পারলাম না। ভয়ে সারা শরীর কাঁপছে, আর্তনাদ করতে চেয়েও পারছি না। কি দেখেছে সে ওই আয়নায়? সে কি জীবিত, না মৃত! নানা প্রশ্ন ঘুরতে লাগলো মাথায়।
শরীরের সর্বশক্তি এক করে ছিটকে দাঁড়ালাম মূর্তিগুলোর মাঝে। বার বার লক্ষ্য করতে থাকলাম তাদের চোখগুলি। তাই যদি হবে, তবে শ্যামলের চোখ কেন খোলা? এদের প্রত্যেকেরই বন্ধ। হ্যাঁ, এই তো, এইতো দেখতে পেয়েছি একজনের চোখের নিচ থেকে কিছু বেড়িয়ে আছে সুতোর মতো। চোখের পল্লব তো নয়! সুতোটা ধরে টানলাম। খানিকটা প্লাস্টার গুঁড়ো হয়ে ঝরে পড়লো। তাই দেখে মূর্তিটার চোখের উপর থেকে প্লাস্টার সরাতে লাগলাম। খানিকবাদে সুতোটা নজরে আসলো স্পষ্টভাবে। দুই আঙুলের চাপ দিয়ে টানতে সুতোটা খুলে আমার হাতে চলে এলো। তার পরের দৃশ্যটা আমি চাইলেও ভুলতে পারবো না কোনদিন। সুতোটা খুলে আসায় চোখের থেকে বাকি প্লাস্টারটুকু খসে পড়লো এবং চোখটা খুলে গেলো পুরোপুরি। এ চোখে মণি আছে। সেটা মানুষের চোখের মতই জীবন্ত। কিন্তু স্থির, নিমেষহীন।
হটাৎ করে মনে পড়ে গেলো মেডুসার কথা। যার চোখের দৃষ্টির দিকে তাকালেই যেকোন পুরুষ প্রস্তরীভূত হয়ে যেত। তবে কি মেডুসা এখনও পার্থিব আছে? এই আয়নাই কি তার চারণক্ষেত্র? কৌতূহল আমাকে টেনে নিয়ে চললো আয়নার দিকে। আমি চাইছি না তার দিকে তাকাতে। কিন্তু এক অদম্য ইচ্ছাশক্তি আমাকে তার দিকে নিয়ে চলেছে। শয়তানী মেডুসা আরো একটা শিকারের লোভে তার মোহদৃষ্টি বাড়াচ্ছে যেন। অজগরের আমায় মতো গিলতে আসছে আয়নাটা। একবার, শুধু একবার দেখার অদম্য ইচ্ছে, জানি যদিও তা মারণাত্মক।
প্রবল ইচ্ছের বিরুদ্ধে যেতে যেতে হটাৎ আমার চোখ পড়লো আয়নাটার রঙ পরিস্কার করা অংশটুকুর উপর। দেওয়াল ঘড়িটা দেখা যাচ্ছে তার মধ্যে দিয়ে। ঘড়িটার ঘন্টা, মিনিট, সেকেন্ডের কাঁটা সবই উলটো। কিন্তু একি! এ ঘড়িতে তখনও ৭-৫৫ বেজে। হটাৎ সম্বিৎ ফিরে আসে। আয়নার পাশ থেকে ছিটকে এসে দাঁড়াই। তারপরেই দেওয়ালে ঝোলানো ঘড়িটার দিকে চোখ পড়ে। সে ঘড়িতে তখন ১১-৪৩। আবার আয়নাটার মধ্যে দিয়ে ঘড়িটাকে দেখি। এখনও ৭-৫৫।
ধোঁয়াশা কেটে যায় এক মুহূর্তে। এ আয়না অভিশপ্ত। যুগ যুগ ধরে এ আয়না হাজার হাজার মূর্তি তৈরী করে চলেছে। এ আয়নার মধ্যে সময় স্থির, তা অপরিবর্তনীয়। যে বা যারাই এই আয়নায় নিজেদের দেখেছে, সবাই আটকে গেছে সময়ের মাঝে। এই মূর্তিগুলো এই আয়নারই নিদর্শন। দীনবন্ধুবাবুর শিল্পমাহাত্ম আর বুঝতে অসুবিধা রইলো না। তার তৈরী মূর্তিগুলোর চোখ আর যাই হোক তার স্বকীয়তা নয়। এ আয়না সময়-সন্ধানী শ্যামলকেও রেহাই দেয়নি। তাকেও আটকেছে নিজের ফাঁসে। হয়তো শ্যামল এই মুহূর্তে আমার সামনেই আছে, চেঁচিয়ে সে বলছে, “রজত, আমায় উদ্ধার কর এই কয়েদখানা থেকে। আমার যে এখনও অনেক সময় বাকি আছে ব্যবহার করার জন্য।” কিম্বা সে চলে গেছে তার স্বপ্নের জগতে, যেখানে সময় বলে কিছু নেই।
ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।