এখন দুপুর বেলা খামোখা গল্প বলতে যাব কেন? চুপ করে শুয়ে থাক৷ কথা বলিস না৷ কিছু ভাবাভাবি করিস না৷ মাথাটাকে একটু বিশ্রাম দে৷
মা…!
হুম্
বলোনা ! আমার সোনা মা ! পন্টু মা! মা গো… মা…! কত্ত ভাল মা আমার !
ধুর! পটাস না৷
মা! হুউউউ…
মা,আমাদের মত? আমি দুধ রুটি, বাবা পরোটা আর তুমি ওটস?
থাম্ , মাঝে কথা বলিস না৷ তারপর শোন কি হল৷
কৈলাসে সেদিন খাওয়া হবে পান্তাভাত৷ শিবঠাকুর বলেছেন ভাঙের বড়া কাসুন্দি কাঁচালংকা দিয়ে পান্তাভাত আর দুগ্গি খাবেন লইট্যা শুঁটকির ঝাল আর পান্তাভাত ৷ অথচ কৈলাসে জনে জনে পদে পদে খাবার নিয়ম নেই, গরীব মানুষ,ইয়ে,মানে, গরীব শিবঠাকুরের অত সঙ্গতি নেই! এদিকে কাত্তিক- গণেশ, নন্দী ভৃঙ্গী, ভূত-প্রেত-পিশাচ পড়েছে মহা বিপদে,ওদের খিদের চোটে পেটে পিঠে অবস্থা,অথচ মা বাবার ঝগড়া থামার কোন লক্ষণই নেই৷
শিব বললেন,” দ্যাখো দুগ্গারাণী,ওসব শুঁটকি টুঁটকি দিয়ে কৈলাস গন্ধ করা চলবে না ৷ যত সব ছোটলোকের মত খাবার দাবাড়! ছ্যা ছ্যা !”
দুগ্গা বিষম রেগে বললেন, “মেদো মাতাল বুড়ো ! ছেলেপিলের পাতে আমি ভাঙের বড়া দেবো? আর ছোটলোকের খাবার বলছো কি! আমার বাবার বাড়ির দেশে…….” কথা শেষ করতে না দিয়ে শিব ঠাকুর তান্ডব শুরু করলেন৷ উনি মোটেই খিদে সহ্য করতে পারেন না ৷ দুগ্গাও থামবার পাত্রী নন ৷উনি ত্রিশূল উঠিয়ে বললেন , “আজ মিনসের ভুড়ি ফুটো না করে আমি খাবার কেন , জলও খাবনা ৷”
গোটা কৈলাস জুড়ে সে কি দাপাদাপি ! শিবঠাকুর কোনো রকমে ত্রিশূলের খোঁচা এড়াচ্ছেন আর চেঁচামেচি করছেন ৷ কৈলাসে যে কয়েকটা পাখ- পাখালি ছিল তারা মহা বিরক্ত হয়ে ক্যালোর ব্যালোর করতে করতে উড়ে গেল, যে দু একটা গাছ পালা ছিল তারা শান্তি তে ঘুমোবে বলে বরফের ভেতর সেঁদিয়ে গেল; কাত্তিক -গণেশ ছুটে ছুটে একবার মা মা বলে , একবার দোহাই বাবা বলে ! কিন্তু কিসের কি ! কৈলাস থরথর করে কাঁপতে লাগলো ৷
এমন সময় নারদ এসে উপস্হিত৷
যাক বাবা ! আমি তো ভাবছিলাম এবার পৃথিবীটাই গেলো বুঝি! তারপর ?
তারপর , নারদ কে দেখে কৈলাসে সকলের প্রাণে জল এলো ! সকলে ছুটে এসে নারদ কে বললে , “দোহাই লাগে মুনিবর, আপনি ছাড়া এই বিপদ থেকে কে আর বাঁচাবেন !”
নারদ সব কথা শুনে বললেন , “ওহ এই ব্যাপার, আমি এক্ষুনি আসছি ৷” বলেই উনি ঢেঁকিতে চড়ে বৈকুন্ঠে চম্পট দিলেন৷
এদিকে শিব-দুগ্গার ঝগড়া চরম পর্যায়ে পৌছে গেছে ততক্ষণ ! দুজনার গালাগালির চোটে ভূতেরা সব পালিয়ে কলকাতায় আস্তানা নেবে কিনা ভাবছে..কৈলাসের চূড়ো থেকে বরফ নেমে আসছে ঝপাৎ ঝপাৎ করে ! নদীর জল একলাফে অনেকটা বেড়ে গিয়ে পৃথিবী ভাসিয়ে দেবে দেবে অবস্থা ! এমন সময়….
কী হল , কী হল ?
এমন সময় বৈকুন্ঠে নারায়ণের অনন্ত শয্যা নড়ে উঠল ৷ নারায়ণ তো তখনও ওঠেন নি ৷ উনি ঘুমোতে ভালবাসেন, অসময়ে শয্যা নড়ে ঘুম ভেঙে যাওয়ায় মহা বিরক্ত হয়ে উঠে বসলেন ৷
নারদ এই সুযোগে মুচকি হেসে গুডমর্নিং বলতে বলতে ঢুকে পড়লেন ৷
নারায়ণ দাঁতমুখ খিঁচিয়ে বললেন , ” এত গোল কোথায় জানলে বল নয়তো বিদেয় হ ৷”
নারদ তখন ভাঙের বড়া আর লইট্যা শুঁটকির সমস্যা নিবেদন করলেন ৷ শুনে নারায়ণ কোনক্রমে বমি চেপে লক্ষীদেবী কে বললেন , ” দেবী, নার্দা ব্যাটা কে শিগ্গিরি একফানা কাঁঠালি কলা আর এক সের চাল দিয়ে বিদেয় কর ৷”
লক্ষীদেবী একটা মালসা করে একসের সুগন্ধী গোবিন্দভোগ চাল আর পাকা টসটসে একফানা কলা দিয়ে নারদকে কৈলাসে রওনা করালেন৷
নারদ সেই সুগন্ধী চাল-কলা নিয়ে ত্রিভুবন মাতিয়ে কৈলাসে এসে নামলেন৷ দেবী লক্ষীর ভাঁড়ারের অমৃততুল্য চাল-কলা পেয়ে শিব ঠাকুর আর দুগ্গা ঝগড়া ভুলে একসাথে একখাবলা মুখে দিলেন ৷ আহা ! সে কী স্বাদ ! এর কাছে পৃথিবীর সব খাবার তুচ্ছ৷ পেট ঠান্ডা হতেই শিব ঠাকুর আর দুগ্গারাণী লজ্জা লজ্জা মুখে একে অপর কে জিভ টিভ কেটে সরি বললেন ৷ আর শিব ঠাকুর তো বলেই দিলেন , “নারদ, মর্ত্যলোকে বলে দিও আমাদের যেন এবার থেকে একটু চাল-কলাও দেওয়া হয়৷”
সবাই স্বস্ত্বির নিশ্বাস ফেললো ৷
ব্যাস, গল্প শেষ৷ এবার যা ৷
মা, এটা সত্যিই গল্প ছিল? সত্যি সত্যি হয়নি?
হয়েছে তো!
কোথায় লেখা আছে?
আছে কোথাও ৷
মা !
মা গো !
………..
ঘরে চাল আছে?
কলা আছে?
……কেন?
বিকেলে আমাকে একটু চাল-কলা মেখে দিও, তাহলে তোমাকে আর জ্বালাতন করব না ৷
মা, দেবে?