জীবনের সব ভালোর যেমন একটা মেয়াদ থাকে, তেমনই আনন্দময়ী পাঠশালার ফুরফুরে দিনগুলো একসময় ফুরিয়ে এল। ক্লাস ফাইভে নতুন স্কুলে ভর্তি হতে হবে। কিন্তু কোন স্কুল? চয়েস খুব বেশি ছিল না। সঠিক ভাবে বললে একটিই চয়েস ছিল। রাসমনি বালিকা বিদ্যালয়। সারাজীবন সবাইকে বলে বলে ক্লান্ত, এই স্কুল রানি রাসমনির নামে নয়, স্কুলের মুখ্য দাতার মায়ের নামে এমন নাম। মহত্বের ব্যাপারে বিখ্যাত রাসমনির তুলনায় অখ্যাত রাসমনির কোন তফাত ছিল না, বরঞ্চ মন্দির প্রতিষ্ঠার চেয়ে মফস্বলে মেয়েদের স্কুল খোলার গুরুত্ব অনেক বেশি।
বিদ্যাসাগর বলেছিলেন বিধবাবিবাহ প্রবর্ত্তন তাঁর সর্বাপেক্ষা প্রধান সৎ কর্ম। এর খুব কাছাকাছি নিশ্চয় নারীশিক্ষা। শখানেক বছর আগের কথাও নয়, আমার দিদিমা, যিনি বড় হয়ে উঠেছিলেন কোন প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে নয়, নৈহাটির মতো শিল্পাঞ্চল সংলগ্ন গরিফা বা গৌরীভায়, যেখানে রামকমল সেনের বাড়ি, নগুদিদি বাড়ি বাড়ি ঘুরে মেয়েদের সংগ্রহ করে স্কুল খুলছেন, যথেষ্ট নৈকট্যে বংকিমচন্দ্রের ভিটে, কাছেই হালিশহরে রামপ্রসাদ, সেখানে ক্লাস ফোরে বৃত্তি পাওয়ার পর মেয়েটির আর স্কুলে যাওয়া হয়নি, ইংরেজি শিখলে মেয়েরা ফাজিল হয়ে যাবে, এই অজুহাতে তার ফার্স্ট বুক অব রিডিং প্রায়ই লুকিয়ে রাখত দাদারা, মেয়েটি তাই চালের ড্রামের মধ্যে ইংরেজি বই লুকিয়ে রেখে পড়ত। দিদার সঙ্গে আমার বালিকাজীবনের ষাট বছরের ব্যবধান। এই ষাট বছরে কী মৌলিক পরিবর্তন ঘটে গেছে, ভাবতে বিস্ময় জাগে।মেয়েরা এখন পড়াশোনা না করলে বকুনি খায়, কেরিয়ার গড়ার চাপে ছেলেদের মতো তাদেরও নাভিশ্বাস উঠছে, পশ্চিমবঙ্গ তো বটেই, হিমাচলের পাহাড়ি রাস্তায় স্কুলে যাওয়া উচ্ছবসিত বালিকার দল দেখে কোথাও একটা সুগভীর আশ্বাস পাওয়া যায়।
বাবা যেমন সব ব্যাপারেই কলকাতামুখী, স্কুলের ব্যাপারেও চেয়েছিল আমাকে কলকাতার কোন নামী স্কুলে ভরতি করাতে। কিন্তু যাতায়াত অত সহজ নয়, তাছাড়া মা-ও আমাকে নিয়ে নিত্য যাতায়াতে আদৌ উৎসাহী নয়, তাই ওই পরিকল্পনা বাতিল হল।
ক্লাস ফাইভ থেকে বড় স্কুলে চলে যাওয়া আনন্দময়ী পাঠশালা ছেড়ে।
সেই যে আনন্দময়ী পাঠশালা
যেখানে বিদ্যে হবে কাঁচকলা
যেখানে বেঞ্চিগুলো সরু সরু
মাস্টারগুলো আস্ত গরু
না না সেরকম মোটেই নয়, শিক্ষকরা যথেষ্ট ভালো ছিলেন সেই প্রাইমারি স্কুলে। তবে এই ছড়াটা আমাদের ছোট শহরে খুব চলত। বীণাপাণি বা আনন্দময়ী যেকোন পাঠশালার নামে জুড়ে দিলেই হল। ইঁটের দাঁত বার করা দোতলা বাড়িটার চারধারে বাউন্ডারির বালাই নেই, যেমন বালাই নেই স্কুল ইউনিফর্মের, বাবা ট্যুর থেকে ফিরে আসবে বা শরীর খারাপ লাগছে, কিংবা কোন অজুহাত ছাড়াই, স্রেফ কলে জল খেতে গিয়ে (কোন ওয়াটার বটলের বালাই ছিল না আমাদের) যথেচ্ছ ইস্কুল পালিয়েছি। নীল ক্ষেত দিয়ে ফলসা গাছের নিচ দিয়ে দুপুরের মতোই একলা একলা ফিরে আসা। আহা!
কিন্তু নতুন ইস্কুলে এসে সব অন্যরকম, পাঁচিল ঘেরা বিশাল বাড়ি, লম্বা লম্বা করিডর। সেই করিডর দিয়ে ঋজু ভঙ্গিমায় কে হেঁটে যান, দূর থেকে দেখি তারা-তারা চোখে। প্রেয়ার লাইনে দাঁড়িয়েও দেখি তাঁকে। সিঁড়ির ধাপে যেখানে দিদিমনিরা দাঁড়িয়ে থাকেন, সেখানে। প্রায়ই তিনি জনগণমন গাওয়ার শেষে বলেন উহ, তোরংগ নয়, তরঙ্গ, কতবার বলব তোদের! বলার সময় রাগ নয়, চোখেমুখে কৌতূক খেলা করে।কেউ পার্থনা বললে শুধরে দিয়ে বলেন ‘পার্থনা নয় প্রার্থনা, র ফলা যে কেন উচ্চারণ করতে পারিস না!’
স্মৃতির সেই তোরঙ্গ বুকের মধ্যে। মাঝে মাঝে খুলে দেখি। ক্লাস ফাইভ, সিক্স কেটে যায়। ভাবি কবে এই দিদি আমাদের পড়াবেন। তাঁর নাম কৃষ্ণকলি মুৎসুদ্দি, আমাদের স্কুলে উঁচু ক্লাসে ইংরেজি পড়ান। তাঁর কাছে পড়ার জন্যে ক্লাস নাইন পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়েছিল।দূর থেকে দেখতাম তিনি বুকে বই আর রেজিস্টারের খাতা চেপে ক্লাসে যাচ্ছেন বা ক্লাস থেকে টিচার্স রুমে ঢুকছেন। সেই টিচার্স রুমেই একদিন কী জন্যে যেন দেখা করতে গিয়ে দেখেছিলাম তিনি উল বুনছেন। আমি যে এদিকে জেদ করে সেলাই, বোনা কিচ্ছু শিখিনি। সেই আমার অনুপ্রেরণা কিনা উল বুনছেন!
ইস্কুলবেলায় এক বন্ধুর বাড়ি গিয়ে তার বাবাকে দেখেছিলাম উল বুনছেন। তাও মেশিনে নয়, হাতে উল কাঁটা দিয়ে। সেই সোজা আর উল্টো, উল্টো আর সোজা। ঘর ফেলা আর ঘর তোলা। একজন পুরুষ মানুষ বসে বসে করছেন এই মার্কামারা মেয়েলি কাজ!তাজ্জব কি বাত! সেই শুরু ছাঁচ ভাঙ্গার। গ্লোরিয়া স্টাইনেম সেই যে বলেছিলেন, যে আমরা অনেকেই আমাদের মেয়েদের ছেলেদের মতো করে মানুষ করছি, কিন্তু খুব কম বাবা মা-ই ছেলেদের মেয়েদের মতো করে মানুষ করতে চাইবেন! কারণ সমাজ বেঁধে দিয়েছে ছেলেদের মতো হওয়াটা গৌরবের, আর মেয়েদের মতো হওয়াটা চরম অসম্মানের, লজ্জার। মেয়েরা তথাকথিত ছেলেদের কাজ করলে বাহবা পান, বলা হয় কেয়াবাত মেয়ে, কিন্তু ছেলেরা রান্না করলে, উল বুনলে বা বাচ্চা সামলালে সে হয়ে যায় মেয়েলি, স্ত্রৈণ, মেনিমুখো, প্রতিটাই অবমাননাকর শব্দ। ‘মেয়েদের কাজ’ করা পুরুষ তাই বরাবর বিদ্রূপের লক্ষ্য হয়েই থেকেছে।
তাই যখন দেখলাম কৃষ্ণকলিদি উল বুনছেন, রীতিমতো মুষড়ে পড়েছিলাম। আমার চোখে ওঁর রেবেল, আধুনিক ভাবমূর্তি খানখান হয়ে গেছিল। তবে তা কয়েকদিনের জন্যেই। কারণ ঈশ্বর ছাড়া কি মানুষ একা বাঁচতে পারে? কৃষ্ণকলিদি ছিলেন আমার ঈশ্বরী। আমার মতো অনেকেরি।
তাঁর ছিপছিপে চেহারা, ঋজু হাঁটার ভঙ্গি, অনিন্দ্য হাসি, সুচিত্রা সেনকে মনে পড়িয়ে দিত। সিঁদুর বা শাঁখা পলা বর্জিত, এলো খোঁপায় একটা ফুল। সে ফুল অবশ্যই কোন ছাত্রী তাদের বাগান থেকে এনে দিয়েছে। প্রতিদিন প্রচুর ফুল পেতেন তিনি। বেশিরভাগই ডুরে তাঁতের শাড়ি- ওইরকম এলিগ্যান্ট কাউকে দেখিনি প্রায়। অনেক সময় তিনি গাড়ি চালিয়ে স্কুলে আসতেন।
তাঁর বাবা ছিলেন আমাদের শহরের নামকরা ডাক্তার, এবং অনেক বিষয়ে পথিকৃৎ। সুশীল ভট্টাচার্য। সেইবয়সেই আমাদের কানে আসত তাঁর প্রথা ভেঙে অন্য জাতে বিয়ে, কেউ কেউ বলত অন্য ধর্মের মানুষকে জীবনসঙ্গী নির্বাচন করেছেন তিনি। এইভাবে সত্যি মিথ্যে মিলিয়ে অপ্রতিরোধ্য ছিল তাঁর আকর্ষণ।একদিন সম্ভবত, সরস্বতী পুজোর প্রস্তুতি পর্বে, একটি ঘরে আমি একা কোন কাজ করছি, কয়েকজন দিদিমণি আছেন, আমি শুনছি না ভেবে তাঁরা নিজেদের মতো গল্প করছেন। কানে এল কেউ একজন কৃষ্ণকলিদিকে বলছেন ‘স্পয়েল্ট চাইল্ড হয়, তুই তো স্পয়েল্ট ওয়াইফ’ বসন্তের বাতাসের মতো উন্মনা করে দিয়ে গিয়েছিল সেই কথা।
আমাদের স্কুল ম্যাগাজিনে একজন লিখেছিল ‘কৃষ্ণকলি দিদিমণি তোমার মনে পড়ে?
সেদিন যখন কমন রুমে অচৈতন্য জ্বরে/ রিক্সা ডেকে তুমি তখন পৌঁছে দিলে বাড়ি/ তোমার স্নেহ ভালবাসার দাম কি দিতে পারি?’ ছাত্রীদের কারো কোন বিপদে, অসুবিধেয় তিনি সত্যি জননীর মতো বুকে টেনে নিয়েছেন বারবার।
হাস্কি ভয়েস কাকে বলে বলতে গিয়ে উদাহরণ দিয়েছিলেন সুপ্রিয়া চৌধুরীর। তাঁর হাত ধরে ভেঙ্গেছি কত পাঁচিল। উচ্চারণ ধরে ধরে শিখিয়েছিলেন। ক্লাসরুমটা তাঁর ছোঁয়ায় হয়ে উঠেছিল বিশ্বের জানলা। সেলফিশ জায়েন্ট পড়াবার কথা মনে পড়ে আজো।ফুলে ফুলে সাদা হয়ে যাওয়া গাছের সেই তলাটা। আর ‘দিজ আর দা উন্ডস অব লাভ!’ কবিতা লিখে দেখাতাম, উৎসাহ দিয়েছেন বরাবর। ‘দেশে’ প্রথম কবিতা বেরোলে উপহার দিয়েছিলেন কেতকী কুশারী ডাইসনের ‘নোটন নোটন পায়রাগুলি’। যা আমার জীবনের শুধু প্রায় প্রতিদিনের পড়া বই নয়, এই বইটি আমাকে অসম্ভব প্রভাবিত করেছে। সেই বইয়ের পাতায় লিখে দিয়েছিলেন –আরও বড় হবি বলে।
মাঝে মাঝেই আবদার করতাম, পড়ব না, খেলব, কিংবা গল্প শুনব। কৃষ্ণকলিদি বিচিত্র সব গল্প করতেন, যদিও তার মূল উদ্দেশ্য ছিল মনের বিকাশ। একবার বলেছিলেন কাটা ঘুড়ির আত্মকথা লিখতে। অনেক ইনডোর গেমস শিখিয়েছিলেন। একটা মনে আছে – হুইস্পারিং গেমস। শান্তিনিকেতনে স্কুল থেকে বেড়াতে নিয়ে গেলে সবাই মিলে খেলেছিলাম। সেই খেলায় ‘রবীন্দ্রনাথ’ কানে কানে ঘুরতে ঘুরতে হয়ে গিয়েছিলেন ক্রিমিনাল!শুধু লিখনে নয়, কথনেও কত কী ঘটে!