গদ্যকথনে অজিত রায়

বহির্বঙ্গ ও ডায়াসপোরা

যবে থেকে হুঁশ সামলেছি একটাই ভাঙা রেকর্ড শুনে আসছি, ‘বাঙালির চরম অস্তিত্ব সংকট’ এবং ‘বাংলা ভাষাকে আর বাঁচানো যাবে না’। হালেও চারধারে বাংলা ভাষা নিয়ে যে হাহুতাশ বা মড়াকান্না শোনা যাচ্ছে, তার পেছনে আবেগ যতখানি আছে ততটা তথ্য বা যুক্তি নেই। যাঁরা এই রোলারুলি করছেন, অল্প খোঁজ নিলেই দেখা যাবে, আদপেই তাঁরা সাহিত্য-কৃষ্টির শেকড়ের লোক নন। বড়জোর কোনো ক্লাব বা সংগঠন বা ফোরামের মাথাছাতা, যাঁদের সাহিত্যকর্ম তো ঘোড়াড্ডিম বটেই, লেখালেখির দৌড় বলতে ক্কচিৎ আধপশলা কামিনী রায় মার্কা পদ্য, আর বছর জুড়ে ফেসবুকে ডজনভর কপচা। এঁরা আবার মধ্যেমধ্যে মাইক-লশকর ভাড়া করে ‘,বাঙালি বাঁচাও’ ‘বাংলা বাঁচাও’ হেঁকে খুব কুকুর-বাওয়ালি করেন। এঁরা সাহিত্যের ইতিহাস মানেন না, পরম পাত্তা দেন নিছক ভূগোলকে। মানে, পশ্চিমবঙ্গ নামক রাজ্যটির পলিটিক্যাল চতুরন্ত ছাড়ালেই বাকি এরিয়াটা এঁদের কাছে ‘বহির্বঙ্গ’ প্রতিভাত হয়। এটা কিন্তু এক জঘন্য চক্রান্ত। কলকাতা আর পশ্চিমবঙ্গের মুষ্টিমেয় কিছু শেকড়ভীতু লোক নিজেদেরকে ‘এ-গ্ৰুপ’-এর সিংহাসনে বসানোর জন্য তথা বাইরের বাঙালিদের ‘অপর’ বা ‘বি-গ্ৰুপে’ চালান করার অভীপ্সায় ‘বহির্বঙ্গ’ কথাটা বাজিয়ে চলেছেন। আর পশ্চিমবঙ্গের বাইরে যাঁরা এই ঢোল পিটে চলেছেন, তাঁরা কিছু করার নেই একটা কিছু করা যাক, এই মংশায় রামাহো নৌটঙ্কির মাফিক মাঝেমধ্যে এই ধুড়কি তুলে যাচ্ছেন। ‘বহির্বঙ্গ’ দেখতে দেখতে একটা নিউ মার্কেট ব’নে গেল। এই ‘বঙ্গভঙ্গ’ খেলা বেশ দ্রুত আর ধাঁইধাঁই হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে, বকোয়াসি ওয়েবসাইটে মোটা হয়ে ধরা পড়ছে ওই ক্র্যাক। তথাকথিত বহির্বঙ্গে এই মড়াকান্না যাঁরা কাঁদেন (আসলে কুম্ভীর-কাঁদন), তাঁরা যে আদৌ সাহিত্যের লোক নন, আগেই বলেছি, এমনকি সাহিত্যফাহিত্য নিয়ে তাঁদের মাথাপিচ্চিও নেই। তাঁরা শীতকালীন মেলার মরশুমে একবার করে ছিঁচকাঁদুনে-সমারোহের আয়োজন করে থাকেন। সেখানে কলেজের মুখস্থবীর বাাংলা অধ্যাপক সহ কিছু বাতিল প্রোফাইলের লোকাল হাফগান্ডু নেতা গোছের মফস্বলী মুুরুব্ববিদের পায়তারা-
ভাষণ মঞ্চস্থ করা হয়। তাঁহারা সমবেত কণ্ঠে ‘গেল-গেল’ কলরব সমাপনে প্রচুর কান্নার করতালি সহ বছরান্তের নিমিত্ত বিদায় গ্রহণ করেন।

বাংলা ভাষা-কৃষ্টির ওপর আক্রমণ তো নতুন কিছু নয়, —- বঙ্গভঙ্গ, দেশভাগের মতো মারাত্মক হামলাও এ-জাতির কিছু বিগড়োতে পারেনি। তারপরেও আঘাত এসেছে নানা কৌশলে। দেশি-বিদেশি পুঁজিবাদের হামলা, সাম্প্রদায়িকতা, ধর্মান্ধতা, দাঙ্গা, ভোগবাদের ঢালাও প্রচার — কোনো সঙ্কটেই বাংলা ভাষার অবলুপ্তি ঘটেনি। বাঙালির ভাষা নিয়ে দূরান্তেও দুশ্চিন্তার কারণ আছে বলে মনে হয় না; যদিও বাঙালির ভবিষ্যৎ নিয়ে নানাবিধ উদ্বেগের পরম কারণ উপলব্ধ আছে — সে কথা ভিন্ন। প্রসঙ্গত বিশিষ্ট ভাষা-ভাবুক রামকৃষ্ণ ভট্টাচার্যকে খানিক কোট করি, — “আবেগটা সরিয়ে রেখে (বাঙালির পক্ষে যা খুবই কঠিন), বেশি নয়, গত তিনশ বছরের ইতিহাস দেখলেই বোঝা যায় : ইংরেজ আসার আগে আর ইংরেজ বিদায় নেওয়ার পরে বাঙলা ভাষাকে কতরকম ওঠাপড়ার মধ্যে দিয়ে যেতে হয়েছে। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের কব্জায় যাওয়ার আগে পর্যন্ত বাঙলাই ছিল গোটা উত্তর-পূর্ব ভারতের কাজকর্মের ভাষা। তার পরে এলো ইংরেজি — যেমন তার আগে ছিল ফার্সি। ইতিহাসের নিয়মেই ফার্সির দিন শেষ হয়েছে। একই নিয়মে, হয়তো একুশ শতকেই, ইংরেজির দিনও শেষ হবে। সমস্তটাই নির্ভর করছে আর্থিক-রাজনীতিক পরিস্থিতির ওপর। বাঙালি ছেলেমেয়েরা যদি বাঙলাতেই (এখনকার পশ্চিমবঙ্গে ও বাংলাদেশে) কাজ পায়, সরকারি কাজকর্মে বাংলাভাষার চল হয়, তবে তার ভবিষ্যৎ নিয়ে দুর্ভাবনার কিছু নেই। কুড়ি কোটি সত্তর লক্ষ মানুষ যে-ভাষায় কথা বলে সে-ভাষা মরবে কী করে?” আরও জুড়ি, —- কোনো মুরুব্বি ছাড়াই রামমোহন-ঈশ্বরগুপ্ত থেকে শুরু করে এখনকার দূর শহরতলি ও গ্রামের এবং তথাকথিত বহির্বঙ্গের ছোটখাটো পত্র-পত্রিকার সম্পাদক তথা লেখকরা যে-কৃতিত্ব দেখিয়ে চলেছেন এবং যে-ভাষায় কবি-সাহিত্যিকের ঘাটতি নেই, তথা মাতৃভাষার প্রতি মমতায়, বিনা দক্ষিণায় যাঁরা সাহিত্য, অর্থনীতি, ইতিহাস, দর্শন, ভূগোল, বিজ্ঞান নিয়ে লিখে চলেছেন — তাঁরাই তো বাংলার ভবিষ্যৎ। বাজারি খবরের কাগজ আর ব্যবসাদার পত্র-পত্রিকাই বরং বাংলা ভাষা ও বাঙালি সমাজের পক্ষে, হুতোমের ভাষায় বললে, “প্রকৃত জোলাপ”। শ্রদ্ধেয় ভাষাভাবুক সুভাষ ভট্টাচার্য একদা ‘শহর’ পত্রিকায় খটকা জাহির করেছিলেন যেদিন বাঙালি ‘কেননা’র জায়গায় ‘কেন কী’ উচ্চারণ করবে, সেদিন বুঝতে হবে বাঙালি গেল। ‘কেন-কী’ ডিঙিয়ে বাঙালির ভাষা এখন দাঁড়িয়েছে এইরকম : “আপনি সুনছ্যান নাইন্টি এইট পয়েন্ট থ্রি এফ-এম, ইয়ে আপকা অপনা বলিউড স্টেশন ইটস হট …।” এতে তো বাংলা ভাষা কেন, বাঙালির হেজিমনিটাই সাবাড় হবার কথা ছিল। তবু বাংলা, বাঙালি, বাঙালিয়ানা সাবাড় হয়নি। বড়জোর সাধারণ গেরস্থ ও হাফ-লিটারেট বাঙালি পোশাকছাঁদে, আচরণে, চিন্তায়, কর্মে সিকি-বাঙালি, সিকি-ভারতীয় আর সিকি-আন্তর্জাতিক হয়ে উঠতে উঠতে মাঝপথে দোআঁশলায় পরিণত। কিন্তু বাঙালি একুনে সাবাড় হয়নি। সব বাধা সত্ত্বেও বাংলা ভাষাকে গত দুশো বছর ধরে বাঁচিয়ে রেখেছেন কিছু ক্ষমতাবান লেখক ও বক্তা, কিছু উদ্যোগী প্রকাশক আর বিশেষত লিটল ম্যাগাজিনের লেখক-সম্পাদকরা। তাতে তথাকথিত ‘বহির্বঙ্গের’ লেখক-সম্পাদকরাও সামিল। এত দুর্দশা সত্ত্বেও বাংলা ভাষা যদি বহাল তবিয়তে বেঁচে থাকে, তার জন্যে যাবতীয় সাধুবাদ এঁদেরই প্রাপ্য। আজ যাঁরা বাংলা ভাষাকে ‘বাঁচানোর জন্য’ রোজকার কথাবার্তা থেকে প্রতিটি ইংরেজি শব্দ ছেঁটে ফেলতে প্রাণপণ চেষ্টা করেন (ও পদে পদে বিফল হন), টেলিফোনকে ‘দূরভাষ’ বলেন ও কথা শুরু করেন ‘সুপ্রভাত’ দিয়ে, অংকচিহ্ন লেখেন 1,2,3..-এর বদলে ১,২,৩ …, ধর্মীয় অনুষ্ঠানের মতো নিষ্ঠাভরে আজ এ-দিবস কাল ও-দিবস ‘উদযাপন’ বা ‘পালন’ করেন —– তাঁরা আসলে পুতুলখেলায় ব্যস্ত। “বহির্বঙ্গ” নিয়ে যাঁরা মত্ত, তাঁরাও খেলছেন পুতুলই।

না না, চিন্তাধীর বাবু, আপনি পাক্কা নিজের ওপর নিয়ে নিলেন, আমি বললাম ‘বহির্বঙ্গ’ মানি না, আপনি বুঝলেন, আমি নাকি আপনাকেই ঘুন্নি দেখিয়ে বললাম সে-কথা। মানে, আমি চিন্তাধীর নস্করকেই মানি না। দুর্ছাই! আসলে, বলতে চাইছি, ‘বহির্বঙ্গ’, এটা কিন্তু বাংলা সাহিত্যের বিচারে মান্য হতে পারে না। কারণ শিল্প সাহিত্য, এসবের স্থানিক গ্রেড হয় না। যদি নিজেকে ‘বহির্বঙ্গীয় সাহিত্যিক’ হিসেবে দাগায়িত করতেই চান, নিজেকেই করুন, অর্থাৎ নিজেকেই ‘বি-গ্রেড’ বলে চালান, কার কী আপত্তি থাকতে পারে!! আজন্ম তো বাস করছি এই (তথাকথিত) বহির্বঙ্গেই, এহেন মানসিকতার পরিচয় আমাদের ঢের পাওয়া হয়ে গেছে। ঐথি-আর্থিক দৃষ্টিতে, জাতিগত ঐতিহ্যে, ভাষাতত্ত্ব ও যৌন-কৃষ্টির দিক থেকে, তা আমাদের কাছে, মানে, সনাতন ভারতীয় চিন্তাবিশ্বে, নয়াল কিছু নয়। শুধু যে শব্দাবলি, বিশ শতকেই হারপার মেনে নিয়েছিল, আজ একুশ শতকে, চিন্তাধীর বাবুগণ, আপনাদের এঁদো নয়ানঘুঁটি ফুঁড়ে উঠে আসছে। এটিই বহির্বঙ্গের সাহিত্যিকদের স্বাভিমান প্রতিরক্ষার বিপক্ষে ‘নিজের বাঁশ নিজে লাগাই’ প্রতিসন্দর্ভ প্রসারের মৌলভিত্তি। একারণেই, তিরিশ-চল্লিশ বছর আগেই যে শব্দটি ঘৃণ্য, আত্মপীড়ক তথা আত্মহন্তারক এবং তামাদি ও ত্যাজ্য হয়ে গিয়েছিল, তাকে আপনারা ওই মাইঠাল ঘেঁটে তুলে আনলেন।

কিছুকাল হলো ‘ডায়াসপোৱা’ ভাবকল্পের সঙ্গেও ‘বহির্বঙ্গ’ শব্দের একটি অলীক ধুড়কি বাংলা বাজারে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। সেই ষড়যন্ত্রে আপনিও, নিজের অজান্তেই, জড়িয়ে পড়লেন, এবং আমি যে আপনাকে ঐ এঁদো নয়ানজুলি থেকে বেরিয়ে আনার জন্যই গতকালের পোস্টটা দিলাম, চিন্তাবাবু, সেটাও আপনি বুঝলেন না। এর ফলে আপনার-আমার মাঝে ভুল বোঝাবুঝির একটা ফালতু অবসর তৈরি হল। এটাই ওরা চাইছে, ওরা, যারা আপনার ভরাডুবি প্রত্যক্ষ করতে মরিয়া।

খারাপ লাগছে এটুকুই, যে, যখন বহির্বঙ্গের ডায়াসপোরিক লেখকরা মূল সাধনপীঠের যাবৎ অনুশাসনীয় ঘট উল্টে নিজেদের তাজপোশি ছিনিয়ে নিতে বদ্ধপরিকর, এমন পীককালীন মুহূর্তে আপনারা তিন দশক পুরোনো তকমা আমাদের পিঠে সেঁটে দিতে চাইছেন!!! ডায়াসপোরিকদের হামলায় কেন্দ্র বরাবরই ভয়াতুর তথা আক্রমন্মুখী, অথচ আপনারা সেই কেওস আর সংকরায়নের পথ রুদ্ধ করতে চাইছেন সেই তামাদি তকমায় আমাদের নিছক ‘বহির্বঙ্গীয় সাহিত্যিক’ হিশেবে পরিচিহ্নিত করে?? মনে রাখবেন স্যার, হাইব্রিডিডিটি চিহ্নিত করে একীভবন প্রক্রিয়াকে, আবার একই সঙ্গে তা বর্ণনা করে ডায়ালেকটিক্যাল গ্রন্থিলতাকে, রুশদি যাকে বলেছেন মংরিয়ালেইজেশন। তাবৎ উত্তর-ঔপনিবেশিক বাংলা সাহিত্য এবং সংস্কৃতির সমঝোতামূলক চারিত্র্যকে এই দুমুখো সংকরতার দ্বারা শনাক্ত করা যায়। যে কারণে কল্কাত্তাই মেইনস্ট্রিম সাহিত্য-মুরুব্বিদের পোঁছা ধরে বহির্বঙ্গের কলকাতার অনুশাসনবাদী অবুঝ সাহিত্য কর্মীরাও নিজেদের কাছ থেকে দূরে সরিয়ে রাখতে চান। আপনিও, জেনে বা না-জেনে সেই পঙ্কিল হিংস্রযন্ত্রে জড়িয়ে।

আপনি অন্তত এটুকু বুঝুন চিন্তাধীরবাবু, বাংলা সাহিত্যে তথাকথিত সংকরত্বের হামলা জৈব প্রক্রিয়ায় মিশে গেছে। এদের জন্যই বাংলা গল্প, উপন্যাস, নাটক, প্রবন্ধ, পত্রিকা ইত্যাদিতে নতুন জঁরের সূত্রপাত হতে পেরেছে। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের বাচ্চাদানি স্প্রেড করেছে এই ডায়াসপোরিক বা তথাকথিত বহির্বঙ্গীয় হামলার দরুনই। আপনারা, বিশুদ্ধতাবাদী চিন্তাবাবুগণ যতই খচাখচি করুন, এতে বাংলা সাহিত্যের লাভ ভিন্ন ক্ষতি মোটেই হয়নি। ডায়াসপোরিকদের ভাষা, বাক্যগঠন, শ্বাসচিহ্নের ধাক্কা খেয়ে বাংলা সাহিত্যের এলাকা বাড়ছে।

তাহলে হেন স্বর্ণ-মুহূর্তে নিছক ‘বহির্বঙ্গ’ কেন? সত্যিই আপনি যদি আমাদের, বহির্বঙ্গের বাংলা সাহিত্যের ঋদ্ধি কামনা করেন আপনি, চিন্তাধর বাবু, তাহলে আসুন ‘, বহির্বঙ্গে’র তকমা সরিয়ে ‘ডায়াসপোৱা’র জয়গান করি। এতে বাংলারও আপত্তি নেই, বহির্বঙ্গেরও থাকবে না। সর্বোপরি, জয় হবে আখেরে আমাদের বাংলা সাহিত্যেরই। ‘বহির্বঙ্গ’ নয়, বলুন ‘বাঙালি ডায়াসপোরা’। দেখবেন, সীমিত দিয়াআঁধারি ছাড়িয়ে বহির্বঙ্গীয় বাংলা সাহিত্য ছড়িয়ে পড়বে মহাবিশ্বে, মহাজগতের এরিনায়।

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।