• Uncategorized
  • 0

সাপ্তাহিক ধারাবাহিক প্রবন্ধে সম্বুদ্ধ সান্যাল (পর্ব – ৯)

কিডনি এবং সপ্তেন্দ্রিয়

কিডনি নিয়ে পড়েছিলাম সেই ক্লাস এইটে। তারপর থেকে পিঠের পাঁজরের নীচে থাকা এই অঙ্গজোড়ার কথা বহু বছর মনেই ছিল না। যাবতীয় জীবন বিজ্ঞান ভুলে বিয়ের আগে পর্যন্ত ধারণা ছিল তরল পানীয় গলা দিয়ে নিচের দিকে যেতে যেতে মনুষ্যচরিত আরও নিচের দিকে নামাতে নামাতে একসময় বেরিয়ে যায়। মধ্যে কিছু উপকারও করে তার যাত্রাপথে। যেমন নর্দমায় ময়লা জমলে জলের গতিবেগের মাধ্যমে সেই ময়লা পরিষ্কার হয়, তেমনি মানুষের মাথার থেকে শুরু করে দেহে জমা যাবতীয় অপ্রয়োজনীয় চিন্তা ও পলিউশনের মাধ্যমে জমা ময়লাগুলোকে দূর করার উপায় হল নানারকম ওষধিস্বরূপ পানীয়। আজকাল করিনা কাপুর বিজ্ঞাপনে বলছে বটে যে বাইরের স্নানের মতো দেহের ভিতরের স্নানের জন্য প্রয়োজন লিমকা, কিন্তু আমরা কবিরা তা বহু আগের থেকেই জানি। তাই কবিতা লেখার জন্য নিজেদেরকে শারিরীক ও মানসিকভাবে সুস্থ ও সবল রাখতে নানারকম পানীয়ের জোগান দিয়ে থাকি। মধ্যে মধ্যে বিলিতি ওষুধের ব্যবস্থা হলেও করিনা কাপুরের বক্তব্যের বহু আগের থেকে কাঁচের বোতলে ভরা স্ফটিকরঞ্জিত টলটলে খাঁটি বঙ্গদেশীয় ও বঙ্গনামযুক্ত পানীয়ই লিমকাসমৃদ্ধ হয়ে আমাদের মধ্যে বেশি চলত।
কিন্তু বিয়ের পর নানা ধারণার মতোই আজকাল সেই ধারণাতেও কিছু আপত্তি এসেছে। বিবাহপূর্ব ধারণাগুলি যে সর্বৈব ভুল বা মিথ্যা তা নন্দিনী বারেবারেই সদর্পে দাবি করে সেই চত্বর থেকে বিদায় নিতে বাধ্য করেছে। এতে আমার কবিত্বশক্তিও খানিক বেসামাল। দু’কলম লেখার সময়ই নোলা দিয়ে টপ টপ করে কবিতা ঝরে ঝরে খাতার উপরে পড়ে আজকাল। কোনও কোনও সময় বঙ্গজ সেই মহৌষধির স্মৃতিসমৃদ্ধ আবেগাশ্রু তার সঙ্গ নিয়ে খাতা ভিজিয়ে তোলে বটে, তবে তা কালিরূপ নিয়ে খাতায় একটি আঁচড় হয়েও দাঁড়ায় না। উপরন্তু বিয়ের পরেই আমি মানব দেহস্থিত কিডনিদ্বয়কে নিয়ে অগাধ জ্ঞান লাভ করেছি এ যাবৎ। ক্লাস এইটে যদি নন্দিনী এসে জুটত, তবে জীবনবিজ্ঞানে লেটার মার্কস সংশয়হীনভাবে বাঁধা ছিল।
বইয়ে অবশ্য আগেই পড়েছিলাম যে কিডনি হল মানব দেহের সবচেয়ে জটিল অঙ্গের মধ্যে একটা। এর মধ্যে ছাঁকনির মতো প্রায় দশ লক্ষ নেফ্রন থাকে তা দেহের জলীয়ভাগকে পরিশ্রুত রেখে শরীরকে তরতাজা রাখে। চায়ের ছাঁকনির মতো তা পরিষ্কার না রাখলে অবশ্য কিছু পাথরটাথর জমে বিশৃংখলা ঘটায় বটে, কিন্তু সর্বোপরি কিডনি একটি গুরুতর বিষয়। বিয়ের আগে অবধি জানতাম আমাদের মস্তিষ্ক দেহের মধ্যে সবচেয়ে জটিল ও কার্কর বস্তু, কিন্তু নন্দিনী না এলে জানতেই পারতাম না কিডনি তার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ একটি অঙ্গ।
এই যেমন কয়েকমাস লো ভোল্টেজ আলোয় বই পড়তে পড়তে বেশ মাথা ধরেছিল। শোওয়ার আগে নন্দিনীকে বললাম একটু মাথা টিপে দিতে। ইচ্ছা ছিল মাথা টেপানোর ছলে একটু সোহাগ করার, কাছে আনার। কিন্তু প্রসঙ্গোত্থাপন করতেই সে সারারাত ধরে আমাকে অর্ধেক জীবন বিজ্ঞান ভালো করে বুঝিয়ে দিল। ডিনারের পরে সে এসে শুতেই আমি বললাম, “আজ মাথাটা বড় ধরেছে, বুঝলে? একটু টিপে দেবে গো?”
অবশ্য গলা ব্যথা হলে এই ঝুঁকি আমি নিই না। প্রেয়সীকে সর্বহারারূপে দেখতে কেই বা পছন্দ করে! ইচ্ছে ছিল মাথাটা যখন সে টিপে দেবে, তখন তাকে জীবনানন্দ, রবীন্দ্রনাথ উগলে দিয়ে তারপর…। যাইহোক, কাব্য ও বিজ্ঞানের মধ্যে বিস্তর ফারাক। আর গৃহকর্ত্রীদের মতো তাবড় বিজ্ঞানী মেঘনাদ সাহা বা নাসাতেও খুঁজে পাওয়া যাবে না। কদিন আগেই অক্ষয় কুমার এই থিওরি অবলম্বন করে মঙ্গল গ্রহে স্যাটেলাইট পর্যন্ত ছেড়ে বসেছে। ইসরো থেকে খুব সুনামও করেছে তার।
আবদার শুনে নন্দিনী বলল, “মরণ, মাথা ব্যথা হয়েছে তো আমি কী করব?”
বললাম, “একটু কাছে এসে টিপে দাও না। কতদিন তো দাও না।”
তাতে সে মুখ ঝামটা দিয়ে বলল, “তোমায় বার বার বলেছি সকালে উঠে করলার রস খাবে। শুনেছ সেই কথা? ঘুম থেকে উঠেই তো চা চা করে আমার মাথা ধরিয়ে দাও।”
“করলার রস খেলে মাথার ব্যথা সারে নাকি? বৌ যদি রাত্তিরে পতির একতু সেবা না করলে এ মাথাব্যথা যে কমে না।”
“রাখো তো তোমার কাব্যকথা! কাল সকালে চা-টা বন্ধ। জানতাম আমি। ঠিক একদিন কিডনিতে কিছু বাধাবে।”
আমি তো হতবাক। আমতা আমতা করে বললাম, “হচ্ছে তো মাথায় ব্যথা। ওখানে কিডনি এল কোত্থেকে?”
“হুঃ, ভারী এসেছেন আমার দিগ্বজ। বলি বিয়ের আগে যে সব ছাইপাঁশ খেতে কাব্যি করার নাম করে, তার ফল তো একদিন পাবেই। ভালো করে জল খেয়ে এসো যাও। সব ওই কিডনির দোষ। আমার বোন ললিতার বর কলকাতার বড় সার্জেন। কিডনিমিডনি সব মুখস্ত তার। কালই আমি একটা অ্যাপয়েন্টমেন্ট দেখছি।”
আমি অবাক হয়ে বললাম, “সে তো গলার ডাক্তার, আমার হচ্ছে মাথা ব্যথা। আর তুমি কিনা তার কাছে আমার কিডনির চিকিৎসা করাতে নিয়ে যাবে? কী কাণ্ড!”
“তুমি বেশি বোঝো তো। তাই তো কবি বাদে আর কিছুই হতে পারলে না জীবনে। অত বড় ডাক্তার আর তোমার ছাইপাঁশ গিলে চুপসে যাওয়া কিডনি বুঝবে না? বেঁচে আর আছেটা কী বলো দেখি ওই কিডনিতে?”
“কেন, দশ লক্ষ দশ লক্ষ করে মোট কুড়ি লক্ষ সূতোর নতো নেফ্রন!”
“ওগুলো আর সূতো নেই। সব দড়ি দড়ি হয়ে গিয়েছে। তোমায় ডাক্তার দেখিয়ে এনে বাজার দেখে আরো এক প্যাকেট জামাকাপড় মেলবার ক্লিপও কিনে আনতে হবে।”
কথা শুনে ভারি আশ্চর্য হয়ে বললাম, “মরেছে, ক্লিপ দিয়ে কী হবে আবার?”
নন্দিনী উত্তর দিল, “সে যদি তোমার কিডনির থেকে দড়িদড়া বের করে তবে সেগুলো ফেলে দেব নাকি? বারান্দায় টাঙ্গিয়ে জামাকাপড় মেলব।”
শুনে আর কথা না বাড়িয়ে সেই রাতের মতো উল্টোপাশে ফিরে ঘুমিয়ে পড়লাম। কথা বাড়ালে যদি পায়ের হাড় খুলে রান্নার খুন্তি বানায় তবে ভারি বিপদ।
তা কিডনি সম্পর্কে বাঙালি বেশ ভারিক্কি সমঝদার তার প্রমাণ আগেও পেয়েছি। যেমন পাশের বাড়ির ঘোষদা, সকাল সন্ধ্যে যখনই হোক না কেন বাইরে ছোটাছুটি করছেন, হেব্বি ফিট। সেদিন রাত্রে বাড়ি ফেরার পথে দেখি রাস্তা দিয়ে হন হন করে কোথায় চলেছেন। দেখা হতেই শুধোলাম, “ঘোষদা, চললেন কোথায় এমন হন্তদন্ত হয়ে?”
ঘোষদা উত্তর দিলেন, “আর বোলো না ভায়া, এই একটু মর্নিং ওয়াকে বেরিয়েছি। কদিন ধরেই শরীরটা ভালো ঠেকছে না।”
ঘোষদার মর্নিং ওয়াকের প্রতি নজর না দিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, “তা আপনি তো ব্যায়াম ট্যায়াম করেন রোজ, সবসময় দৌড়চ্ছেন, লাফাচ্ছেন, ঝাঁপাচ্ছেন, গাছে উঠছেন। নন্দিনী তো আপনার প্রশংসায় পঞ্চমুখ। তা আপনার আবার শরীর খারাপ কীসের?”
“আর বোলো না ভায়া। এই দিন সাতেক হল পিঠের ঠিক নীচের দিকটায়… এই এই এই দেখো…” বলে জামাটা তুলে কোমর বেঁকিয়ে এসে দেখালেন, “…এই যে, এই জায়গাটায় কেমন ঢিপ ঢিপ করতছে। হাত দাও, হাত দা… এই যে… বুঝতে পারছ?”
পিঠ টিপে কিছুই বুঝলাম না, বললাম, “কই, কিছুই তো বুঝলাম না। কী হয়েছে?”
“ও তুমি বুঝবে না। প্রাণায়াম করো না কিনা। করলে বুঝতে। আর বোলো না, কদিন ধরেই এই ডানদিকের কিডনিটা ধুকপুক ধুকপুক করছে বড়। রোজ পাঁচ লিটার করে জল খাই। কিছুই হচ্ছে না। তাই ভাবছি এবার একটু ভেলোরে দেখিয়ে আসি।”
তা বিদ্যুৎভবনে চাকরি করা ঘোষদা ভেলোর যেতেই পারেন। ওনারা এমন অনেক কিছু বুঝতে পারেন। আমার আমার মাথার কাজ কিনা, তাই কোথায় কিডনি, কোথায় চশমা সব ভুলে বসি। সেদিন তো চেয়ারে বসে একটা প্রবন্ধ লিখতে গিয়ে ভুলেই গিয়েছিলাম পায়ের কথা। চেয়ার ছেড়ে উঠতে সটান ধরণীপাত। নন্দিনী এসে তুলে ঝেড়েঝুরে খাটের উপরে শুইয়ে দিতে বুঝলাম পা মচকেছে। অনেকক্ষণ বসে থাকার জন্য পায়ে ঝিঁঝিঁ ধরেছিল কিনা। ধীরে ধীরে মনে পড়তেই ব্যথা বাড়ল।
কিডনি সংক্রান্ত বিষয়ে এর পর থেকেই নানা মুনির নানা মত নিয়ে আজকাল চলাফেরা করি। মনে মনে একদিন ভেবে দেখলাম পাড়ার পাঁড় মাতাল রঘুদার কথা। বয়েস হয়েছে অনেক। তবে আজও নিয়মিত তিন বোতল দেশি না হলে তার দিনযাপন হয় না। মনে পড়ায় উৎসাহও বাড়ল। খাঁটি দেশিতে যদি কিডনি সমস্যার কোনও সমাধান লুকিয়ে থাকে, তবে তা নন্দিনীকে বোঝালে সে বুঝতেই পারে। যদি বোঝে তো আমার খুব সুবিধাও। তা একদিন তথ্যভাণ্ডার বাড়াতে রাস্তায় রঘুদাকে পাকড়াও করে বললাম, “আচ্ছা রঘুদা, শুনেছি দেশি-বিদেশি পানীয় পান করলে নাকি কিডনির ক্ষতি হয়। তা তুমি তো এতদিন ধরে স্রেফ দেশির উপরে আছ। কোনও সমস্যাটমস্যা বুঝেছ?”
রঘুদা অভিজ্ঞ মানুষ। আমার প্রশ্ন করার ধরণেই চট করে ধরে ফেলে বললেন, “ও, বুঝেছি। বাড়িতে বৌ খিট খিট করে, এই তো? তা বাপু আমারও এক কালে ছিল এই সমস্যা। এখন আর নেই।”
শুনে তো লাফিয়ে উঠলাম। আগ্রহ নিয়ে বললাম, “আর বলবেন না দাদা, কতদিন যে ওই বস্তু ছুঁই না কিডনির ভয়ে। তা দাদা উপায়টা যদি বলে দেন তবে বড় উপকার হয়।”
“তা শোনো বাপু, তুমি বলেই বলছি। পাঁচকান যেন না হয়। আমারও তো এই সমস্যা ছিল বছর কুড়ি আগে। অত অল্প বয়েসে কিডনির সমস্যা শুনে ডাক্তারে দিল সব বাদ দিয়ে। মনখারাপ করে ঘুরে বেড়াতে বেড়াতে একদিন মাথায় একটা বুদ্ধি আসল। চলে গেলাম আজ যেখানে রাজারহাট, ওই রাস্তায়। তখন জানো তো, ওই রাস্তার ইতিহাস?”
মাথা নাড়িয়ে বললাম, “না তো, কিচ্ছু জানি না। দাদা আপনি বলে আমায় বাঁচান।”
“তা জানবে কেন, এদিনকার ছোকড়া কিনা তোমরা। তখন ওই রাস্তায় বড় কিডন্যাপ হয়।”
অবাক হলাম, বললাম, “সেকি, এ তো আরও বর ঝামেলা। ছাড়ানোর পয়সা পাব কোত্থেকে? আমি লেখক মানুষ, অত পয়সাকড়ি নেই।”
“আরে ধুত্তেরি, পুরোটা শোনো তো আগে। কিডন্যাপ করে ওরা পয়সা নিত না। শুধু কিডনি দুটো কেটে নিয়ে বিলের ধারে ফেলে দিত।”
“সেকি দাদা, তাহলে আপনার কিডনি নেই নাকি? পুরো বাইপাস কেস? বেঁচে আছেন কীভাবে?”
“আবার বড়দের মুখের উপর কথা বলে! পুরোটা শোনো আগে। তা আমাকেও কিডন্যাপ করল। আমি তো জানতামই যে ওরা কিডনি কেটে নেবে। তা তাদের দিলাম একটা শর্ত। বললাম শেষ ইচ্ছে হিসেবে আমার কথাটা যদি রাখেন তবে আমি আপনাদের আরও কাস্টোমার ধরে দেব। কমিশন দিলে দেবেন, না দিলে না দেবেন। তবে আমার শেষ ইচ্ছে হল আপনারা একখানা নধর ছাগলের দুটো কিডনি আমাকে লাগিয়ে দেন। শুনেছি ছাগলে যা খায় তাই হজম করে ফেলে। তার চেয়েও বড় কথা হল আজ অবধি কোনও ছাগলের কিডনির রোগ পাওয়া যায়নি। সেই থেকেই চলছে এইভাবে। তা আমার কথা কিন্তু পাঁচকান কোরো না। এখনও চেনাশোনা আছে, বলো তো অ্যাপয়েন্টমেন্ট করিয়ে দিই। কত সুস্থ লোককে আমি পাঁড় মাতাল বানিয়ে দিলাম রাজারহাটে পাঠিয়ে আর তোমায় পারব না? মুখখানা দেখে তো মনে হচ্ছে কিডনিগুলো বেশ সুস্থই আছে, গায়ের রংটাও চাঁপাফুলের মতো, একটুও ফ্যাকাশে নয়।”
প্রক্রিয়ার কথা শুনে মাথায় ধাঁধাঁ লেগে গেল। জীবনে কখনও রঘুদাকে কোনও কাজকর্ম করতে দেখিনি। এবার পরিষ্কার হল তার উপার্জনের উপায়। বেশ বিনয়ের সঙ্গে তাকে মিথ্যে সম্মতি জানিয়ে জান হাতে করে কেটে পড়লাম। আমার চাঁপাফুলের মতো গায়ের রঙে কমিশনটা তার বেশ ভালোই জুটবে বোধ হল।
বাড়ি ফিরে শাস্ত্রমতে কোনও উপায় আছে নাকি তাই নিয়ে বসলাম। খুঁজতে খুঁজতে পুরাণের দধিচি চ্যাপ্টারে চোখ আটকে গেল। মনে মনে ভাবলাম যে মানূষের হাড় দিয়ে বজ্র বানানো হয়েছিল, তার কিডনির খোঁজ কোথাও নেই। সেই কিডনির খোঁজ যদি কোথাও পাওয়া যায়, তবে মুশকিল আসান হয়। রাতের পর রাত জেগে পড়াশোনা করলাম। সাত দিন ধরে দিনরাত এক করে মাথা ঘামিয়ে যে তথ্য জানতে পারলাম, তা জাতির উদ্দেশ্যে তুলে ধরছি।
দধিচির দেহ থেকে হাড়গোড় বের করে নেওয়ার পরে তার দেহ দেবতারা দাহ করেনি। ফেলে দিয়েছিল রাজস্থানে তার আশ্রমের পাশেই সবরমতি নদীতে। সেখান থেকে ভাসতে ভাসতে গুজরাটে এসে এক চড়ায় আটকায় তার দেহ। বহু যুগ ধরে সেখানেই আটকে থাকা যত্বেও তার যোগীদেহে পচন ধরেনি। কালো রংয়ের ফসিল হয়ে পড়েছিল সেখানেই। ১৯৮৫ সালে আমাদের গান্ধিজীর পিতা মারা যাওয়ায় দাহকার্যের পর সবরমতীর তীরে নাইতে গেলে সেই ফসিলে তার চোখ পড়ে। মহাজ্ঞানী গান্ধিজী ততদিনে পুরাণ, শাস্ত্র, বেদ, কোরান সম্পর্কে বেশ অভিজ্ঞ। সেই অভিজ্ঞ চোখে তিনি বুঝতে পারেন ওই কালো পাথরই হল স্বয়ং দধীচির দেহাবশেষ। সেখান থেকে তিনি তাঁর বেঁচে থাকা অঙ্গগুলি উদ্ধার করে দক্ষিণ আফ্রিকায় পাড়ি দেন, এবং সেখানেই উন্নত শল্যচিকিৎসার দ্বারা সেই অঙ্গগুলি নিজদেহে স্থাপন করেন। এর পরের ইতিহাস তো সবারই জানা রয়েছে। পাঠকেরা পরীক্ষা করে দেখতে পারেন যে শীর্ণকায় দধিচীর সঙ্গে গান্ধীজীর এই কারণেই শারিরীক বহু মিল আছে। কিন্তু কখনওই গান্ধিজীর কিডনি বা হার্ট বা ফুসফুসের কোনও রকম গোলযোগ লক্ষ করা যায়নি।
তবে আমি আমার গবেষণার মাধ্যমে নিশ্চিত যে তাঁর দেহ দাহ করা হলেও রাজঘাটের সমাধিবেদীর নীচে ভস্মের মধ্যে আজও সেই কিডনিদ্বয় মজুত, যা একদিন সবার সামনে আসবেই যদি না আমাদের পূর্বতন প্রধানমন্ত্রী তা নিজদেহে প্রতিস্থাপন করে থাকে। অবশ্য এই তথ্য জানার পর অনেক রঘুদাই ভবিষ্যতে তার চিতাশয্যার পাশে ভীড় জমাতে পারে। সুতরাং আমার এই দাবি সরকারের নজরে আনার জন্যই এই প্রবন্ধটি উপস্থাপন করছি।
সে যাই হোক, আমার ব্যক্তিগত চিন্তায় সঠিক তথ্য তুলে আনা বাদে আর কোনও অভীপ্সা নেই। তথ্যটি সঠিক হলে নন্দিনীর চোখে আমার মাহাত্ম্যবিকাশই পরম পাওনা। অবশ্য এই তথ্য আমি তাকে একবার জানাতে গিয়েছিলাম, কিন্তু সে হঠাৎ তার খুড়তুতো দাদাকে ফোন করে বসল। দাদাটি তার রাঁচি মানসিক হাসপাতালের প্রখ্যাত ডাক্তার। টেলিফোনে নন্দিনীকে বলতে শুনলাম, “দাদারে, কদিন ধরেই ওর মধ্যে কেমন পরিবর্তন লক্ষ করছি। সেদিন একটু কিডনির সমস্যা হয়েছিল। আমার মনে হয় সেই ইনফেকশন বেড়ে মাথায় ধরে গেছে। তুই প্লিজ কিছু কর।”
এর পর আমি চাইনি নন্দিনী আরও চিন্তায় ফেলতে। সর্বোপরি গলার ডাক্তার অবধি ঠিক ছিল, কিন্তু বাধ সাধল দুইদিন বাদে তার দাদা সশরীরে আমাদের বাড়িতে হাজির। আমাকে উলটেপালতে কিডনি, নাড়ি পরীক্ষা করে নানা রকম ওষুধ লিখে দিয়ে চলে গেল। তার পর থেকে এই আজ অবধি আমার কবিতা পেলে কিডনি চুলকায়। লেখার মানও উন্নত হয়েছে। সিটি স্ক্যান করে জানা গেছে ব্রেনের মাধ্যমে আজকাল দেহের রক্ত বেশ ভালোই পরিষ্কার হচ্ছে। মেডিক্যাল কলেজে এই গবেষণা নিয়ে বাংলার কবিতা চর্চার উন্নতিতে একটা যুগান্তকারী আবিষ্কার চলে আসছে নন্দিনীর দাদার কৃপায়। সামনেই কাব্যজগতে এক বিপুল পরিবর্তন আসছে, যেখানে কবিদের কিডনি খাটিয়ে চিন্তার বিকাশ হবে এবং ব্রেনের মাধ্যমে রক্ত শোধন।

ক্রমশ…

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।