৫ই জুলাই
আমার বড় হয়ে ওঠার ভেতর অনেক স্বাধীনতা ছিল, কিন্তু একটা পরিবার হয়ে থাকতে গেলে যে বন্ডিংটা দরকার হয় তার হয়তাে একটু অভাব ছিল । প্রত্যেকেই খুব ইন্ডিভিজুয়াল ছিল আমাদের বাড়িতে । উল্টোদিকে শৌনক আমাকে আঁকড়ে থাকত । এত পজেসিভ ছিল যে, কে আমায় ফেসবুকে কী মেসেজ করছে, কোন নম্বর থেকে আমার ফোন আসছে সব কিছু ঘেঁটে দেখতে চাইত। তাতে আমার কষ্টের বদলে আনন্দই হত । আমি তাে ওকেই আমার সবটা দিতে চাইতাম । কিন্তু প্রত্যেকটা দিন সবটা পাওয়ার পরেও শৌনক কোথাও একটা ইনসিকিওরিটিতে ভুগত বলে খারাপ লাগত আমার। শৌনকের মা একটু গোঁড়া ছিলেন, কোথাও একটা দীক্ষা নিয়েছিলেন বলে মানামানি ছিল ওর খাওয়াদাওয়ার ব্যাপারে । বাবা একদম নিপাট ভালােমানুষ; টি বাের্ডে বড় চাকরি করতেন বলেই চা নিয়ে একটু বেশি খুঁতখুঁতুনি ছিল । মাঝেমাঝেই বােঝাতেন কীরকম ভাবে চা পাতা শুকোনাে হয়, কীভাবে রােল করা হয়, তারপর ফারমেন্টশন, ফায়ারিং, কীভাবে টেস্টাররা টেস্ট করে ইত্যাদি ইত্যাদি । এনজিওর চাকরিতে শৌনকের কথাতেই জযেন করলাম না। শৌনক বলল, বিয়ের পরপরই আমার একটা প্রমােশন হল । তােমার জন্যই তাে। এখন আর তােমার চাকরির কী দরকার? এই ‘তােমার জন্যই’, ‘আমার কপালে তুমিই লক্ষ্মী’ শুনলে আমার ভয় লাগত । মনে হত কাল যদি কিছু খারাপ হয়, তাহলেও কি আমায দুষবে? উত্তরে কিছু বলতাম না। শুধু ভাবতাম সারা দিন কাটবে কীভাবে! টিভি দেখে? ফোন কিংবা ফেসবুক করে? মাঝে মাঝে বাবার সঙ্গে কথা বলতাম। একদিন বাড়ি থেকে ঘুরেও এলাম কয়েক ঘণ্টার জন্য। দেখলাম, বাবার চেহারা খারাপ হয়ে গেছে আর বাড়ির দায়িত্ব প্রতিমার হাতে । রত্নামাসি অসুস্থ হয়ে বাড়ি চলে যাওয়ার সময় ওকে দিয়ে গিয়েছিল। সেটা আমার বিয়ের আগে আগেই । প্রতিমা তখন কাজ করত, কিন্তু এখন দেখলাম পুরাে বাড়িটারই ও বেশ দায়িত্ব নিয়ে নিয়েছে এবং কথায় কথায় বাবাকে ধমকাচ্ছে । কথন স্নান করতে যেতে হবে, কখন ওষুধ খেতে হবে, বলে দিচ্ছে সব । আমার ভালােই লাগল । প্রতিমা যে বাবাকে কোথাও দায়িত্ববােধ নিয়ে আঁকড়ে ধরেছে তাতে অনেকটা নিশ্চিন্ত হলাম । ভাই ক্যাম্পাসিং এ চাকরি পেয়ে আমেদাবাদে চলে গেছে, বাবাকে দেখার কাউকে তাে চাই ?
কে জানে, আমাদের ছন্নছাড়া বাড়িতে ঘুরে আসার জন্য নাকি প্রতিমাকে এক্তিয়ার পেরিয়ে ‘গিন্নি’ হতে দেখে, মনের ইচ্ছাটা একটা আকার নিল। মনপ্রাণ দিয়ে সংসার করা আরম্ভ করলাম । খুব রান্না করার শখ জেগে উঠল হঠাৎ করে। রেসিপি বই দেখে, নেট ঘেঁটে নানারকম নতুন রান্না খুঁজতাম সেভাবেই একদিন একটা নতুন রান্না খুঁজে পেয়ে সবাইকে খাওয়ানাের ইচ্ছে হল। ভেটকির ফিলেগুলাে স্লাইস করে সাদা তেলে ভেজে নিযে, আর একটা কড়াইতে তেলটা গরম করে, আদা রসুন দিযে সব কাটা সবজি ভালাে করে টস করে নিলাম প্রথমে । তারপর নুন মরিচ দিয়ে বাকি সবজিগুলাে ভালাে করে নেড়ে চেড়ে একটু হােয়াইট ওয়াইন আর তারপর ভেটকির ফিলেগুলাে দিয়ে ভালাে করে স্টার করলাম। এবার কর্নফ্লাওয়ার দিয়ে গ্রেভিটা একটু হেভি করে নিলাম । মাথাে মাথাে হলে কড়াই নামালাম । ডাইনিং টেবিলে সবাই খুব প্রশংসা করল আমার রান্নার । কিন্তু, খাওয়ার শেষে এমন একটা ঘটনা ঘটল যার জন্য একেবারেই প্রস্তুত ছিলাম না । আমার শাশুড়ি জিজ্ঞেস করলেন রান্নাটায় কী কী জিনিস ব্যবহার করেছি। | খুব উৎসাহ নিয়ে বলতে গেলাম ভেটকির ফিলে, কর্নফ্লাওয়ার, হােয়াইট ওয়াইন … উনি আমায় থামিয়ে দিয়ে বললেন, ওয়াইন? আমি বললাম হ্যাঁ। সেই আমরা যখন শপিং মলে বাজার করতে গেলাম তখনই তাে আপনার ছেলে ওয়াইন কিনে এনেছিল।। শৌনকের দিকে তাকিয়ে আমার শাশুড়ি বললেন, টুবলু তুই ওয়াইন কিনে এনেছিস বেশ করেছিস, কিন্তু আমাকে বলিসনি তাে যে সেটা রান্নায় দেওয়া হবে? আমি বুঝতে পারলাম না বাড়িটা দুম করে অষ্টাদশ শতাব্দীতে চলে গেল কী করে। শৌনক তাে ড্রিংক করে । বাড়িতেও মাঝে মাঝে দু-এক পেগ খায় । শ্বশুরমশাইকেও খেতে দেখেছি । আর রান্নায় একটু ওয়াইন দেওয়া হয়েছে তাতে কোন মহাভারত অশুদ্ধ হল? আমার শাশুড়ি চিৎকার করে উঠলেন, আমি দীক্ষা নিযেছি, আমার এ সমস্ত কিছু খাওয়া বারণ, আর তুমি আমাকে কিছু জিজ্ঞাসা না করেই রান্নার মধ্যে হােয়াইট ওয়াইন দিয়ে দিলে? ছিঃ ছিঃ। এখন আমাকে স্নান করতে হবে রাতে । | উনি আচমকা বােলটা হাত দিয়ে ঠেলে দিলেন টেবিলের এদিক থেকে ওদিকে । বাসনটা মাটিতে পড়ে গিয়ে সশব্দে ভাঙল । ভয়ে কেঁপে উঠলাম। সেদিন রাতে আমার আর খাওয়া হল না। মেঝে পরিষ্কার করে রাতে যখন ঘরে শুতে এলাম, দেখলাম শৌনক জেগে আছে, সিগারেট খাচ্ছে । আমি ঘরে ঢুকতেই একবার আমার দিকে তাকিয়ে চোখ সরিয়ে নিয়ে বলল, সরি, মা যে কী করে একেক সময় । তবে তােমারও উচিত ছিল ওইসব ব্যবহার করার আগে একটু জেনে নেওয়া ।
– আমি কি কোনাে বৈষ্ণব মঠের রান্না করছিলাম যে একটু হােয়াইট ওয়াইন দেওয়ার আগে জেনে নেব? যদি কারাে কোনাে বাতিক থাকে… – না বাতিক নয়… এটা তােমাকে বুঝতে হবে । এটা একটা মানুষের সেন্টিমেন্ট । – আর আমার কোনাে সেন্টিমেন্ট থাকতে পারে না? আমি একটা রান্না করেছিলাম। সেটা উনি নাই খেতে পারেন; তাই বলে ওভাবে ফেলে দেবেন! আমি আর কক্ষনাে রান্না করব না। – সেটা বলিনি । কিন্তু এই যে আবার রাতে স্নান করতে গেল, এখন যদি নিউমােনিয়া-টিউমােনিয়া হয়ে যায় ।
শৌনকের কথাগুলাে এত খারাপ লাগছিল যে আমি চুপ করে গেলাম । তারপর থেকে আর রান্নাঘরে পারতপক্ষে ঢুকিনি । ওর মা অবশ্য বুঝতে পেরেছিলেন যে ব্যাপারটা ঠিক করেননি। দু-তিন দিন পর উনি নিজেই একদিন আমার ঘরে এসে, ‘সরি’ বলে গেলেন। আমি কোনাে ঝগড়ায় গেলাম না। – আসলে কিছু কিছু জিনিস খাওয়া বারণ থাকে জানাে তাে দীক্ষার পরে । আমার শাশুড়ি এক্সপ্লেন করতে গেলেন নিজের থেকে । আমি শুনব না বলেই বললাম, বাবাকে একটা ফোন করার কথা, আমি একটু কথা বলেই আসছি ।। উনি কোথাও নিশ্চয়ই ক্ষুন্ন হলেন, কিন্তু সেটা প্রকাশ করলেন না ।
ওই একটা ঘটনা ছাড়া আমার দিনগুলাে ভালই কাটছিল। একদিন শৌনক ওর বন্ধুদের একটা পার্টিতে আমাকে নিয়ে গেল আর মুহুর্তের মধ্যে সেখানে সবার চোখের মণি হয়ে উঠলাম আমি । টের পাচ্ছিলাম, প্রত্যেকটা চোখ আমার দিকে তাকিয়ে আছে। আমি চাইনি তবু শৌনকের জোরাজুরিতেই একটা ব্যাকলেস ব্লাউজ পরেছিলাম। দুম করে একটা সময় ঘরের বড় আলাে নিবিয়ে দেওয়া হল । আর বলা হল প্রত্যেকটা কাপল নাচবে একসাথে । ওই নাচ শুরু হওয়ার আগে, নাচের সময়, আমি আমার পিঠে কতগুলাে যে স্পর্শ পেলাম! বুঝতেই পারছিলাম যে ওই স্পর্শগুলাে শৌনকের নয় । আর মজা লাগছিল । হায় রে পুরুষ, সে একটু ছুঁয়ে দেখতে চায়। যা সে পাবে না, তাকেও একবার ছুঁয়ে যেতে চায় । যেন কোনাে আনন্দই দূর থেকে সম্ভব নয় । নাচের আগে পরে প্রচুর খাওয়া দাওয়া মদ্যপান হল । তখন দেখছিলাম, অনেকেরই একটা চাপা হিংসা শৌনকের প্রতি । সেই হিংসার কারণ আপাত অর্থে শৌনকের প্রমােশন বা নতুন কেনা গাড়ি মনে হলেও আসলে যে আমিই তা বােঝা এমন কিছু শক্ত ছিল না । আমি মানে আমার এই রূপ । আমার গালে যদি একটা কাটা দাগ থাকত, গলার কাছে একটা আর পিঠে আরাে একটা তাহলেই হিংসে কমে যেত অনেকটা । কিন্তু আমি বাইরের দিক থেকে, ‘স্পটলেস’ বলেই তা আর হল না। বেশ কিছুটা মদ খেয়েছিল শৌনক তবু ভালই গাড়ি চালাচ্ছিল । চালাতে চালাতে বলল, দেখছিলে তাে সবাই কেমন হিংসা করে আমায় তােমার জন্য ।
আমি ভাবছিলাম, আমিই কি সেই রাজত্ব, যা সবাইকে ফাঁকি দিয়ে শৌনক জিতে নিযেছে? আমিই সেই কোহিনূর যা আর কারাে কাছে নেই? শৌনক সেদিন রাত্রে ওই নেশার ঘােরেও খুব সেক্স-ড্রিভেন ছিল । পারফরম্যান্স যেরকমই হােক, আমাকে সেই রাত্রিটা ও ছাড়তে চাইছিল না একেবারে হাড়মজ্জা সমেত পেতে চাইছিল । নাকি অন্যের যা নেই তা ওর আছে এই সত্যিটায় বারবার করে রং লাগাতে চাইছিল?
আমার শ্বশুরবাড়ির দোতলার বারান্দা থেকে দারুণ বৃষ্টি দেখা যেত । পরদিন দুপুরে সেই বৃষ্টির দিকে তাকিয়ে মনে হল, শৌনক যেমন আমার সবটুকু অ্যাবসর্ব করে নেয়, আমাকেও ওর সবটা অ্যাবসর্ব করে নিতে হবে । আমার আর আলাদা সত্ত্বার দরকার নেই । সেদিন শৌনক একটু আগেই বাড়ি ফিরে এল । আর ফিরে এসে অদ্ভুত আচরণ করতে লাগল। আমি যখন ওর কাছে কফি নিয়ে গেছি, ও টাইটা খুলতে খুলতে আমাকে জড়িয়ে ধরল। তারপর আমার পিঠের ওপর মুখটা রেখে একটা কান্নার আওয়াজ করল । অবাক হয়ে গেলাম, কী হয়েছে শৌনক? শৌনক মুখ তুলে বলল, তােমার বাবার জন্য যে এরকম কিছু ফেস করতে হবে ভাবিনি। আমার বাবার জন্য? বাবা তাে সংসার বিছিন্ন একটা লােক । তার জন্য কী ফেস করতে হল শৌনককে? মাথার মধ্যে একশােটা প্রশ্ন ঘা মারলেও কিছু না বলে, শৌনকের দিকে তাকিয়ে রইলাম । শৌনক বলল, আমার অফিসের যিনি ডেপুটি ম্যানেজার উনি তােমার বাবাকে খুব ভালাে চেনেন। তােমাদের ওদিকেই বােধহয় থাকতেন আগে। হঠাৎ করে আমাকে ডেকে বললেন, তােমার শ্বশুর তাে একটা কাজের মেয়ের সঙ্গে ইনভলভড । এলাকার সবাই বলছে | শুনে লজ্জায় আমার মাথা হেঁট হয়ে গেল একদম। – প্রতিমা বাবাকে দেখেশুনে রাখে। বাবার তাে শরীর ভালাে না মায়ের মৃত্যুর পর থেকে। আমি শান্তভাবেই উত্তর দিলাম । – তুমি জানাে না! তােমার ভাই চাকরি নিয়ে আমেদাবাদ চলে গেছে। তুমি বিয়ে হয়ে চলে এসেছ । এখন ওই বাড়িটা একটা লীলাক্ষেত্র হয়েছে । তােমার বাবা আর ওই মেয়েছেলেটা ফুর্তি করে বেড়াচ্ছে। আমার কানে যেন কেউ গরম সিসে ঢেলে দিল । আমি কোনাে খাঁচা বা শেকলে বাঁধা নই। তবু আমার বাবা বাড়ির কাজের মেযে থুড়ি মেয়েছেলের সঙ্গে ফুর্তি করে বেড়াচ্ছে, এমনটা শুনব, তাও আবার শৌনকের মুখ থেকে, আশা করিনি। তক্ষুনি বাবাকে একটা ফোন করলাম । মােবাইলে না পেয়ে বাড়ির ল্যান্ডলাইনটা করলাম। প্রতিমা ফোনটা ধরল । -বাবাকে ফোনটা দাও তাে ।আমি গম্ভীর গলায় বললাম। -দাদা তাে পায়চারি করতে বেরিয়েছে । হাঁটতে বলে দিয়েছে তাে ডাক্তার । প্রতিমা জবাব দিল ।
-কখন ফিরবে?
তবু আমার বাবা বাড়ির কাজের মেয়ে থুড়ি মেয়েছেলের সঙ্গে তা তাে বলতে পারব না। প্রতিমা তেজি গলায় জবাব দিল। —ফিরলে, ফোন করতে বােলাে আমাকে। ফোনটা কেটে দিযে মনে হল, ‘দাদা’ বলল কেন প্রতিমা? ‘কাকু’ বলত না আগে? শৌনককে বললাম, তুমি গাড়িটা বের করাে । আমি এক্ষুনি যাবাে । নিজের চোখে গিযে সব দেখে আসব । শৌনক আমাকে থামিয়ে দিল তখনকার মতাে। ততক্ষণে ও বােতল খুলে ফেলেছে। আমাকেও সাধল খেতে । দু’পেগ খেলেই নাকি মাথাটা ঠান্ডা হয়ে যাবে।
সারারাত ছটফট করলাম। বাবার ফোন এল না বলে আরাে। প্রতিমা নির্ঘাত বাবাকে বলেনি যে আমি ফোন করেছিলাম। ওকে সামনে পেলে তখন বােধয় চিবিয়েই খেয়ে ফেলতাম ।এল না বলে আমার রাগ আমাকেই দংশাচ্ছিল। শৌনক আমার কাছে আসতে চাইলেও ওকে ফিরিয়ে দিলাম । শৌনক একা একা তৃপ্তি পাওয়ার চেষ্টা করে গেল। আমি কিছুতেই সাড়া দিতে পারলাম না। ওটা কী শুনলাম? আমার বাবা কাজের মেয়েছেলের সঙ্গে! কিন্তু খুব খারাপ লাগার মধ্যেও মনে হল লােকের বাড়ি কাজ করে বলে সে কি মানুষ নয়? প্রতিমাও তাে একটা মেয়ে । যদি সে নিজের সঙ্গ দিয়ে বাবার লােনলিনেস কিছুটা হলেও কাটিয়ে দিয়ে থাকে তাহলে কাজের মেয়ে বলে তাকে দুচ্ছাই করতে যাব কেন? আমি তাে বাবার কাছে গিয়ে থাকতে পারছি না, বাবাকে সেই সময়টা দিতে পারছি না । প্রতিমা যদি তা দ্যে… পরস্পরবিরােধী শুম্ভ নিশুম্ভের যুদ্ধে জেগে রইলাম । সকালে দেরি করে ঘুম ভাঙল । সেদিন বাড়িতে শৌনকদের এক রিলেটিভের আসার কথা ছিল । সে আর তার স্ত্রী চলে গেলে বারবার করে শৌনককে বললাম, আমি একবার সরেজমিনে গিয়ে দেখতে চাই আমার বাড়ির অবস্থাটা । বুঝতে চাই ঠিক কী চলছে বাড়িতে। – আচ্ছা আচ্ছা কাল হবে, বলে শৌনক আমায় থামিয়ে দিল ।
পরদিন সন্ধ্যায় বাড়ির সামনে হর্ন বাজাতে লাগল শৌনক । ব্যালকনি থেকে জিজ্ঞেস করলাম, হর্ন বাজাচ্ছ কেন? শৌনক তাড়াতাড়ি ওপরে উঠেই আমাকে পাঁজাকোলা করে কোলে তুলে নিয়ে অনেকগুলাে চুমু খেল ।। আমি অবাক হযে শৌনকের দিকে তাকিয়ে বললাম, প্রমােশন? – প্রমােশন কি প্রতি মাসেই হয় নাকি? বাট একটা সাডেন ছুটি দু’দিনের । অ্যান্ড উই উইল ইউজ ইট ফুললি । হানিমুনটাকে আরাে একবার ঝালিয়ে নেব বুঝলে! গাড়িতে স্ট্রেট মন্দারমণি । এক্ষুনি স্টার্ট করব | শৌনক হাত দিয়ে উড়ে যাওয়ার ভঙ্গি করল । – এভাবে হয় নাকি, ধ্যাৎ! আমি রেডি নই । কিচ্ছু রেডি হতে হবে না। দু’দিনের তাে ব্যাপার। যেটুকু যা দরকার নিয়ে নিচ্ছি।
শৌনক আমার একটা স্কার্ট, একটা কুর্তি, একটা নাইটি আরাে টুকিটাকি নিজেই ট্রাভেল ব্যাগের ভেতরে ভরে নিল । আর সারাক্ষণ তাড়া লাগাতে থাকল । আমি একটা ম্যাক্সি পরেছিলাম । তার ওপরেই শাড়ি জড়িযে আমাকে নামিয়ে আনতে চাইছিল শৌনক । কোনােমতে একটা সালােয়ার কামিজ পরে নিয়ে মাকে একবার বলে নীচে নেমে এলাম । আমার শ্বাশুড়ি অবশ্য প্রশ্রযের দৃষ্টিতেই তাকালেন নিজের ছেলের দিকে আর শৌনক আমাকে একরকম টেনে হিঁচড়ে গাড়িতে বসিয়ে স্টার্ট দিয়ে দিল। আমরা হানিমুনের সেকেন্ড পার্টটার দিকে রওনা দিলাম । ঘণ্টা তিনেক পর গাড়ি যখন হােটেলের কাছাকাছি শৌনক বলল, দাঁড়াও একবার সমুদ্রটা ঘুরেই যাই । মন্দারমণির সমুদ্র শান্ত । সেই শান্ত সমুদ্রের সামনে শৌনক আমাকে জড়িয়ে ধরল। আকাশের মস্ত চাঁদ ছাড়া আর কেউ কি এই দৃশ্য দেখতে পাচ্ছে ভাবতে ভাবতে টের পেলাম আমার ওষুধটা আনা হয়নি। শৌনককে একবার বলব ভাবলাম । তারপর, বললাম না। ও এত আনন্দ নিয়ে এসেছে, এই আটচল্লিশ ঘন্টায় ও কালকের পরশুর সমস্ত কুৎসার টানাপােড়েন থেকে মুক্ত হতে চাইছে। সেখানে আমি ওকে আমার ওষুধ না আনার কথা বলে ব্যতিব্যস্ত করতে চাইলাম না । রাত্রে ডিনার’এর পর অনেক্ষণ ভালােবাসাবাসি হল আমাদের । তারপর শৌনক ঘুমিয়ে পড়লেও আমি জেগে বসে রইলাম, জানলা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে । আমার তেমন কিছু অসুবিধে হচ্ছিল না। সেই চোরাকুঠুরির মেয়েটাও বেরিয়ে আসেনি। হঠাৎ মনে হল যে ওষুধের ওপর এত নির্ভরতা সেই ওষুধ যদি দু’দিন না খাই, কী হবে! আর দেখিই না কী হয় । ঘুমােবার চেষ্টা করলাম । আর একসময় ঘুমিযেও পড়লাম। ঘুম ভাঙল শৌনকের আদরেই । ভাের তখনও হয়নি। শৌনক আবার আমাকে পেতে চাইল । ওর ওই অহরহ চাওয়ার ভিতর থাকতে থাকতে মনে হচ্ছিল আমরা যেন আসলে দুটো ভিন্ন মানুষ নই। আমরা যেন দুটো আকাঙ্ক্ষা যা এক হয়ে গেছে, শুধু আলাদা আলাদা অবয়ব তার । সেই আকাঙ্ক্ষা মাঝে মাঝেই জেগে ওঠে, আর ঘুমিয়েও পরে আবার জেগে উঠবে বলে । দুপুরের দিকে সামান্য একটা অস্বস্তি শুরু হল। মাথাটা একটু টিপটিপ, সবকিছু অল্প হেজি লাগতে লাগল । আমি নিজেকে বললাম, একদিন ওষুধ না খেলে কিচ্ছু হয় না। বিকেলে সমুদ্রের কাছে গেলাম । শৌনক অনেক ছবি তুলল, আমাকে নানান পােজে দাঁড় করিয়ে । আর সঙ্গে সঙ্গে ছবিগুলাে ফেসবুকে পােস্টও করে দিল । রাতে ড্রিঙ্কস নিয়ে বসে আমাকেও অফার করল । খেতাম না আমি। কিন্তু ওই যে ওষুধ খাইনি সেই টেনশন কাটাতেই খেলাম; একটা বড় আর একটা ছােট পেগ। । শৌনক একটু বেশিই খাচ্ছিল। আমি টিভিটা চালিয়ে দিলাম। কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার টিভির ভিতর থেকে সিনেমা নয় পুরনাে দৃশ্যগুলাে ভেসে আসতে শুরু করল । ওই যে ফুলকি, ওই যে ভাই থানার মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে, ওই যে বাবা ছবি এঁকে যাচ্ছে, ওই যে মা শুয়ে আছে আর মায়ের বুকে ছুঁচ ফোটাচ্ছে ডাক্তার, ওই যে সেই লাল চিতাটা নীল আকাশের তলায় জেগে উঠছে, সমীরণকাকুকে ভেতরে নিয়ে।
অনেক রাত হয়ে গিয়েছিল। শৌনক বলল, ডিনার করবে না? বললাম, ইচ্ছে করছে না। শৌনক কিছু না বলে ফের একটা পেগ নিয়ে বসে গেল । সেটা শেষ করেই টলতে টলতে আমার দিকে এগিয়ে আসতে লাগল। ওর গায়ে কিছু নেই, পরনে শুধু একটা বারমুডা । অনেক ছােটবেলায় আমি বেড়াতে গিয়ে কোনাে একটা খনিতে নেমেছিলাম, মাথায় হেলমেট পরে । সেই খনির ভিতরে কী অসম্ভব অন্ধকার আর চারপাশের দেওয়ালগুলাে আমার দিকে এমন ভাবে এগিয়ে আসছিল মনে হচ্ছিল আমার দমবন্ধ হয়ে যাবে । মনে হল, ওই দেওয়ালের মতই শৌনক আমার দিকে এগিয়ে আসছে যেন । আমার দিকে এগিয়ে আসছে প্রতিষ্ঠা, এগিয়ে আসছে প্রতিমা । আমার সামনেই টেবিলে একটা ছােট্ট ছুরি ছিল । আমি সেই ছুরিটা হাতের মধ্যে তুলে নিলাম । তারপর আমার আর কিছু মনে নেই।
– মি লর্ড, গ্রামে গঞ্জে ডাইনি সন্দেহে অনেককে পুড়িয়ে মারা হয়, পাথর ছােড়া হয়, কিন্তু ওরা আসল ডাইনি না। আসল ডাইনি হচ্ছে সেই মেয়েটা যাকে আমি বিয়ে করেছিলাম । ওকে কী দিইনি আমি! দুনিয়ার সব সুখ দিয়েছি। বেস্ট পসিবল ফাইভস্টার হােটেলে নিয়ে গেছি ইন্ডিয়ার, লাখ লাখ টাকা খরচ করেছি; যে শাড়িটা, যে জুতােটা পছন্দ, না চাইতেই এনে দিয়েছি। কিন্তু ও আমার সঙ্গে, আমার বাড়ির সঙ্গে কোনােদিন মানিয়ে নিতে পারেনি। বিয়ের আগে-পরে ওর সঙ্গে অনেক পুরুষের রিলেশন ছিল। আমার ভুল হয়ে গেছে মি লর্ড, একটা ডাইনিকে আমি বিশ্বাস করেছিলাম। সুযােগ পেয়েই ডাইনি আমাকে মারতে এসেছিল । আর মারবেই বা না কেন! কোন ফ্যামিলি থেকে এসেছে। বাবা একটা কাজের মেয়ের সঙ্গে ফস্টিনষ্টি করে । ছিঃ ছিঃ। না, আমি ফালতু কথা বলছি না। আসল কথাটাই বলতে চাইছি, শি ট্রায়েড টু মার্ডার মি । আমি চাই ওকে সব থেকে কড়া শাস্তি দেওয়া হােক । আমি যদি ওখানে নিজেকে না বাঁচাতে পারতাম, হাত দিয়ে ওকে চেপে না ধরতে পারতাম, তখনই যদি হােটেলের লােক ছুটে না আসত, তাহলে আমি আজ এই কথাগুলাে বলার জন্য বেঁচে থাকতাম না । আই ওয়ান্ট দা সিভিযারেস্ট পানিশমেন্ট ফর হার । এটা শুধু ডিভাের্সের মামলা না । আমার জীবনকে শেষ করে দিতে চাওয়ার জন্য এই মেযেটা যেন কঠোর শাস্তি পায় । ওকে শাস্তি দিন, হুজুর।
১লা অগাস্ট
কত কিছু ভুলে গেছি কিন্তু কোর্টে দাঁড়িয়ে বলা শৌনকের কথাগুলাে স্পষ্ট মনে আছে । ডাইনি আমি! হতেই পারি। ওকে খুন করতে গিয়েছিলাম যখন । কিন্তু ও কীভাবে বলল আমার সঙ্গে অন্য অনেকের রিলেশন আছে । আমার জীবনে শৌনক ছাড়া অন্য কোনাে পুরুষ তাে ছিল না; নেইও । আমি এজলাসের বাইরে শৌনককে ব্যাপারটা জিজ্ঞেস করব বলে একবার ডাকলাম, ও এমন চোখে আমার দিকে তাকাল যে চোখে মানুষ পকেটমার ধরা পড়লে তার দিকে তাকায় ।আমি ওর সেই দৃষ্টি দেখে পিছিয়ে গেলাম । শৌনকরা ক্ষতিপূরণ চেয়েছিল কুড়ি লাখ টাকা। সেই ক্ষতিপূরণের হাত থেকে বাঁচানাের জন্য আমার উকিল, আমার ওষুধ, আর অসুখ নিয়ে প্রতিদিন সাতকাহন করে বলত হাইকোর্টে । খারাপ লাগত । কিন্তু ওটা ছাড়া আর কোনাে উপায় ছিল না লড়াই দেবার । লড়াই দেবার জন্য দাঁড়াবার যে জায়গাটা দরকার সেটাই পাচ্ছিলাম না । পায়ের নীচে যেন চোরাবালি, কোনাে মাটি নেই। বাড়িতে ফিরে গিয়ে দেখেছিলাম ওখানে টিকতে পারব না। প্রতিমা আমাকে উঠতে বসতে এমন সব কথা শােনাত, যা শােনার জন্য প্রস্তুত ছিলাম না । কথাগুলাে যে সরাসরি আমাকে বলত তা নয়, সে সাহস ও দেখালে, আমিও পাল্টা পাঁচটা কথা বলতাম। কিন্তু একটা আড়াল তৈরি করে তির ছুড়ত প্রতিমা আর প্রত্যেকটা তিরের ডগায় আমার নামই লেখা থাকত। আমি বুঝতে পারতাম না ওর আমার ওপর কী রাগ? পাড়ার একজন ওইসময়ই আমায় বলল যে আমি আসায় ও দোতলায় বাবার ঘরে গিয়ে থাকতে পারছে না, নীচে শুতে হচ্ছে ওকে। এতটা? সত্যি এতটা? আমার বিশ্বাস হচ্ছিল না। কিন্তু বাবার আচরণ আমায় বিশ্বাস করতে বাধ্য করত। প্রতিমা আমায় ঘুরিযে-পেঁচিযে যাই বলুক, বাবা চুপ করে থাকত ।আমার মামলার খরচ বাবদ বাবা থােক পঞ্চাশ হাজার টাকা দিয়েছিল আমাকে, প্রতিমাকে লুকিয়ে। আমি চিৎকার করতে গিয়ে চুপ করে গেলাম কারণ জলের মতাে পরিষ্কার হয়ে গিয়েছিল যে সংসারের রাশটা আসলে প্রতিমার হাতে চলে গেছে। তবু বাবাকে দোষ দিতেও বাধত আমার। বাবাও তাে একটা মানুষ । কী করবে, একাকীত্ব সহ্য করতে না পারলে? মনের যা অবস্থা তখন তাতে প্রতিমার সঙ্গে প্রক্সি যুদ্ধ নিতে পারছিলাম না আর। বাড়ি ছাড়ব ঠিক করে নিয়েই বিকল্প ব্যবস্থার খোঁজ করছিলাম। সেই সময় একদিন রাস্তায় আবিরার সঙ্গে দেখা হয়ে গেল। আবিরা আমার সঙ্গে কলেজে পড়ত । কলেজে যে ও আমার খুব ঘনিষ্ঠ ছিল তা নয়, কিন্তু আমায় রাস্তায় দেখে সামনে এসে হাতটা ধরে বলল, কী হল তুই টলছিস কেন? আমি কি টলছিলাম? না, বােধহয় । কিন্তু টলি বা না টলি আমি ওর হাতটা ছাড়লাম না। আবিরা আমাকে একটা রেস্টুরেন্টে নিয়ে গিয়ে বসাল। সেখানে বসে আমার সমস্ত কথা বললাম ওকে। বলে অনেকটা হালকা হলাম । আমার কথা শেষ হতেই আবিরা যা অর্ডার দিয়েছিল সেটা প্যাক করে দিতে বলে বলল, আমার বাড়ি চল । অবাক হযে ওর দিকে তাকালাম, তাের বাড়ি? – আমার বাড়িতে আমি একাই থাকি । আজ থেকে তুইও থাকবি । – যদি তােকেই মার্ডার করতে যাই? আমি জিজ্ঞেস করলাম । আবিরা হেসে উঠল, আরে মরনা হি তাে জিনা হ্যায় । আমি সেই হাসিতে যােগ দিতে পারলাম না । আবিরার থেকে আলাদা হতেও পারলাম না ।
সুন্দর টু বেড রুম ফ্ল্যাট আবিরার । আর ও চাকরি করে একটা প্রাইভেট ইনশিওরেন্স কোম্পানিতে। বিয়ে হয়েছিল কিন্তু ডিভাের্স হয়ে গেছে । বর নাকি নিজেরই কোনাে আত্মীয়ের সঙ্গে ইনভলভড ছিল । আবিরা সহ্য করতে পারেনি, চেঁচামেচি করেছে । তখন ওর গায়ে সিগারেটের ছ্যাঁকা দেওয়া হয়েছে, মারধাের করা হয়েছে । – ৪৯৮ এ করে দিসনি কেন? – ওদের অনেক কানেকশন । রাস্তায় গাড়ি দিয়ে ধাক্কা মেরে দিত । – অ্যালিমনি পাসনি? – লাখখানেক টাকা অফার করেছিল, নিইনি । কে ছুঁচো মেরে হাত গন্ধ করবে? – তাহলে এই ফ্ল্যাটটা? – ওখানে কোনাে ডিসপিউট নেই বস । এটা আমার নিজের ফ্ল্যাট। – কিনলি কীভাবে? লােন নিয়ে? আবিরা একটা দুর্দান্ত গল্প শােনাল । ও শ্বশুরবাড়ি থেকে বেরিয়ে এসে একটা এক কামরার ঘরে ভাড়া থাকত। একদিন রাতে ঘরে ফিরে দেখে, বাইরে কেউ একটা বড় চকোলেট আর ফুল রেখে গেছে । আবিরা অবাক হয়ে যায়। পরদিন আবার একই ঘটনা ঘটে। এবার আবিরার একটু ভয় করতে শুরু করে। কিন্তু তার পরদিন এই ঘটনাগুলাে যে ঘটাচ্ছিল সে সামনে এসে হাজির হয়। ছেলেটার নাম রাজু । সে আবিরার সঙ্গে একই স্কুলে, একই ক্লাসে, পড়ত । ফেল করে পিছিয়ে পড়েছিল দু’বছর। আবিরা নাকি ওর জীবনের ফাস্ট লাভ । তাই রাজু এখনাে ভুলতে পারেনি আবিরাকে । এখন রাজু মস্ত বড় প্রােমােটার । নিজের মেয়ের নাম ‘আবিরা’ রেখেছে। এককথায় রাজুর জীবনের ইন্সপিরেশন আবিরা । রাজু তাই আবিরাকে একটা ফ্ল্যাট উপহার দিতে চায় একদম নিখরচায়। – সত্যযুগের গল্প বলছিস তাে? – এ যুগেরই গল্প । আমি রাজুর এরিয়ায় ভাড়া থাকতে গেছিলাম সেটা আমার সৌভাগ্য। সবসময় খারাপ হবে লাক? – তুই ফ্ল্যাটটা নিয়ে নিলি? – ‘না’ বলে দিয়েছিলাম কিন্তু পরে ভেবে দেখলাম নেব নাই বা কেন? আরে বাবা আমরা যেমন পুরুষের কাছে ভালনারেবল, পুরুষও তাে আমাদের কাছে ভালনারেবল, তাই না? – কিন্তু তাই বলে তুই এমনি এমনি নিবি? ছেলেটা তাে কিছু পায়নি তাের থেকে । ওকে পছন্দ নয় বলে রাস্তায় দাঁড়িয়ে যাচ্ছেতাই অপমান করেছিলাম। কিন্তু তারপরও যে ছেলেটা দশ বছর ধরে, ভালবাসা বা ডিজায়ার যাই বল, ধরে রেখেছে আমার জন্য, তার থেকে আমি কিছু তাে ডিজার্ভ করি । যেখানে আমার পাওয়ার ছিল সেখান থেকে যদি আমি কিছু না পাই তাহলে যেখানে পাওয়ার কথাই না সেখান থেকে কিছু পেলে ফিরিয়ে দেব কেন? আবিরার সহজ যুক্তির কাছে আমি হেরে গেলাম । একবার মনে হল রাজু মাগনা দিল ? ওর কোনাে প্রত্যাশা নেই? কিন্তু রাজু কী করল সেটা রাজুর ব্যাপার, ম্যাক্সিমাম আবিরার । আমার তাতে কী? সব প্রশ্ন সরিয়ে রেখে আমি আবিরার ঘরে থাকতে শুরু করলাম। ভালনারেবেল তাে আমিও ।
আবিরার সঙ্গে রাজুর সম্পর্কটা যে ফ্ল্যাট দেওয়া-নেওয়াতেই শেষ হয়ে যায়নি আমি বুঝতে পারছিলাম । কিন্তু তা নিযে বেশি ভাবার অবকাশ ছিল না আমার।
নিজের মামলার জন্য দিনের পর দিন যেতে হচ্ছিল । অ্যালিমনি তাে দূরস্থান, আমাকে কত ক্ষতিপূরণ দিতে হবে সেই ভয়েই আত্মারাম খাঁচাছাড়া । তাও ভাগ্য ভাল যে পুলিশ আমাকে গ্রেফতার করেনি। আমি রিকল করার চেষ্টা করছিলাম কি হয়েছিল; শৌনকের কথা থেকে, শৌনকের উকিলের কথা থেকে । আমার তাে কিছু মনে ছিল না তাই ধরে নিচ্ছিলাম ওদের কথাই সত্যি ।। আমি কি স্বাভাবিক কথা বলতে বলতে হঠাৎ বেসামাল হয়ে গিয়ে ফলকাটার ছুরি উচিয়ে শৌনকের বুকে স্ট্যাব করে দিই? নাকি আমি সারাক্ষণই অসংলগ্ন আচরণ করছিলাম? প্রথমটা বললে আমি পাগল প্রমাণ হই আর দ্বিতীয়টা বললেও । ওরা তাই মাঝ বরাবর কথা বলছিল । শুনলাম, সেই স্ট্যাবিং এর পরে শৌনক ছিটকে বেরিয়ে যায় ঘর থেকে । আমি ওর পিছনে তাড়া করে ধরেও ফেলেছিলাম ওকে কিন্তু আবার স্ট্যাব করার আগেই শৌনক আমার হাত চেপে ধরে ছুরিটা ফেলে দিতে বাধ্য করেছিল । তথনই ওর চিৎকারে হােটেলের কর্মীরা দৌড়ে আসে, তারা এসে আমার হাত পিছমােড়া করে বেঁধে দেয়। তারপর ডাক্তারকে ডাকা হয়। ডাক্তার এসে সিডেটিভ ইনজেকশন দেওয়ার পরে আমাকে ওখানে ফেলে রেখেই শৌনক হাসপাতালে যায়, ফিরতি পথে থানাতে একটা ডায়েরি করে কলকাতা রওনা দেয় ।
আশ্চর্য ব্যাপার যে শৌনকের কথাতে পুলিশ আমাকে গ্রেফতার করেনি । একবার শুধু আমাকে থানায় যেতে হয়েছিল ঘটনা জানানাের জন্য । আমি ওই একই কথা বলেছিলাম। আমার অসুখের কথা, আমার ওষুধ নিতে ভুলে যাওয়ার কথা। থানায় সাধারণত যে রকম এক্সপেরিয়েন্স হয় লােকের তার থেকে একটু আলাদাই অভিজ্ঞতা হয়েছিল আমার । থানার এক অফিসার আমাকে দরজা অবধি এগিয়ে দিয়ে বলেছিলেন, আপনার হাজব্যান্ডের আরও কেয়ারফুল হওয়া উচিত ছিল আপনার ব্যাপারে ।। থানায় হ্যারাসড হতে হয়নি। কিন্তু আমি হ্যারাসড হচ্ছিলাম ঘরে বাইরে, ফেসবুকে । ইনবক্সে মেসেজ পাচ্ছিলাম, শুনলাম আপনি মার্ডারার? আমি যে মার্ডারার, এই নিয়ে চার পাঁচটা পােস্টি আমার বন্ধুরাই দিয়েছিল।প্রতিষ্ঠা একজন ইঞ্জিনিয়ারকে বিয়ে করে দুবাই চলে গিয়েছিল সেখান থেকেই হেট ক্যাম্পেইন চালাতে লাগল। এখান থেকে যেরকম খবর পেত তার ভিত্তিতেই ওর পােস্টিংগুলাে হত বলে মাঝেমাঝে গােলমাল করে ফেলত কিন্তু ওর প্রচণ্ড উৎসাহে ততদিন ভাটা পড়েনি যতদিন না ওর প্রােফাইলে গিযে কেউ লিখে এল যে ওর নিজের বরই তাে প্রথম বউযের সঙ্গে মারপিট করে জেল খেটে এসেছে। খবরটা লিক হয়ে যেতে প্রতিষ্ঠা লাস্ট হাওয়া হয়ে গেল ফেসবুক থেকে কিন্তু আমার বিরুদ্ধে বিষ উগরােনাের লােক কম পড়ল না তাই বলে। এত যে শত্রু আছে আমার, ঘটনাটা না ঘটলে জানতামই না।
আমাদের কলেজের একটা অ্যালামনি অ্যাসােসিয়েশন আছে; তাদের বছরে চারবার প্রােগ্রাম হয় । আমি আবিরার সঙ্গে এরকমই একটা প্রোগ্রামের আগের মিটিঙে গেলাম, এই পাগল পাগল অবস্থা থেকে একটু বেরিয়ে আসতে চেয়ে। কিন্তু আমি ঢুকতেই ঘর অর্ধেক ফাঁকা হয়ে গেল । আর বাকি অর্ধেক ফিসফিস করতে শুরু করল । দশবছর ধরে রিইউনিয়নের সমস্ত দায়িত্ব সামলানাে প্রতিমদা আমাকে এসে বলল, সুলগ্না, তােকে একটা রিকোয়েস্ট করছি, তুই এখানে থাকিস না । তুই থাকলে বাকিরা কেউ থাকবে না। – কেন ওকে চলে যেতে হবে? আবিরা চিৎকার করে উঠল । গুজগুজটা বেড়ে গেল । আমি আবিরার দিকে তাকিয়ে জোরে জোরে বললাম, কারণ আমি মার্ডারার। কিন্তু মুশকিল হল আমি যাকে মার্ডার করেছি সে তাে বেঁচে আছে। হেসে উঠল কয়েকজন । কিন্তু ঘরের পরিস্থিতি হালকা হল না । আমি বেরিয়ে এলাম। কোর্ট থেকে বেরিয়ে আসার সময় দেখতাম চেনা অচেনা লােকজন আমার দিকে তাকাচ্ছে। পৃথিবীতে কত লােক ধর্ষণ করছে, মাস বম্বিং করে হাজার লােককে মেরে দিচ্ছে, ভােজালি দিয়ে কোপাচ্ছে, তলােয়ার দিয়ে গলা নামিয়ে নিচ্ছে কিন্তু সবার থেকে আমি আলাদা । আমি সেই একমাত্র মহিলা যে সেকেন্ড হানিমুনে গিয়ে নিজের স্বামীকে খুন করার চেষ্টা করেছে। আমার চেয়ে বড় ডাইনি এই পৃথিবীতে জন্মায়নি আর। আমি যদি ক্ষতিপূরণ দেওয়ার হাত থেকে বেঁচেও যাই, আমাকে সারাজীবন এইসব শুনে যেতে হবে ।
শুনতে শুনতে মাথায় ঘুরত কথাগুলাে। আমি আবিরার সঙ্গে এক ঘরে থাকতাম না। ইচ্ছে করে পাশের ঘরে গিয়ে শুতাম । আমার নিজের ওপর থেকে বিশ্বাস চলে গিয়েছিল । মনে হত যে কোনাে মুহুর্তে যে কোনাে কিছু করে দিতে পারি।