সাপ্তাহিক ধারাবাহিকে শাশ্বতী নন্দী (পর্ব – ৩)

নিশিভোর

পর্ব – ৩

সুমনা হঠাতই যেন উবে গেল। ফোন টোন নেই, মেসেজ পাঠালেও নো রিপ্লাই। কী যে হল! শুধুই যে দুশ্চিন্তা, তা নয়। দুজনের সম্পর্ক এখন এতটাই নিবিড়, বেশিদিন একে অপরের কন্ঠস্বর শুনতে না পেলেই ফাঁকা লাগে। গৌরী একদিন ফোন করেই বসে। তড়িঘড়ি ফোন ধরল সুমনা, -‘সরি, ভেরি সরি। অনেকদিন যোগাযোগ করতে পারি নি গো’।
স্বস্তির শ্বাস ছাড়ে গৌরী, হাসেও। -‘মহারানী কীসে এত বিজি?  ভিকির সঙ্গে জমিয়ে প্রেম চলছে, বুঝি?’
উত্তরে উচ্ছ্বাস ফুটল সুমনার গলায়, ‘কাছাকাছি গিয়েছ, বাট পুরোটা ঠিক হল না। হ্যাঁ, এখন ভিকির সঙ্গেই বেশি সময় কাটাই, ও ফিরে যাবে সামনের মাসে, তবে প্রেম মোটেই চলছে না। বরং ওকে নতুন প্রেমে উদ্বুদ্ধ করছি। বলেছি, বাড়ির ডিসিশনটা মেনে নাও। নতুন এক ফুটফুটে কনে ট্যাঁকে গুঁজে বিদেশে ফেরো। – হা হা হা।
হাসিটা মোটেই ভাল লাগল না কানে। এরপরেই সুমনা প্রসঙ্গ পাল্টে ফেলে, ‘বাই দা ওয়ে, পদ্মার ওদিক থেকে কোনও ফোন নেই, জানো। খুনই হয়ে গেছে হয়তো মেয়েটা বাবাজীর লোকের হাতে। ইস, আমি কিছুই করতে পারলাম না’।
এরপর আরও দু চারটে কথা বলে ফোন ছেড়ে দিয়েছে দুজনেই। কিন্তু তারপর থেকে আবার সুমনা চুপ।
গৌরী আজ একটু হাল্কা। অনেকখানি গুছিয়ে নিয়েছে পেন্ডিং  কাজকর্ম। যে কোনদিনই ঝিলমিলপুরের উদ্দেশে যাত্রা করতে হবে। চেয়ার ছেড়ে সে দক্ষিণ খোলা জানলায় দাঁড়ায়। এই তেরো তলার ওপর থেকে আকাশটাকে বড্ড কাছাকাছি মনে হয়। দুপুর, বিকেল, সব যেন হাত নাড়তে নাড়তে বাড়ি ফেরে। এখন যেমন সূর্যের রঙ ফিকে হতে শুরু করেছে। গাছের মাথায় হাল্কা রোদ। অন্যমনস্ক চোখে দেখল ও আকাশটাকে। দুটো একটা পাখি ঘরে ফিরছে। শরত আসছে। পুজো পুজো গন্ধ বাতাসে। কিন্তু এবার পুজোয় কলকাতা ছেড়ে যেতে হবে। ঝিলমিলপুরের অপারেশনটা শুরু হবার দিন আগত।
নতুন করে ব্লু হেভেনের নীল নকশা তৈরি হয়ে গেছে। এবং তৈরির সাথে সাথেই তা নিজের পাসওয়ার্ডে বন্দী করে ফেলেছে কমপিউটরে। আগেরবারের ভুল আর কখনও নয়।
গতকালই ফাইলটা জমা পড়ে গিয়েছে ডিজিপি অফিসে। এবার শুধু তাঁর অনুমোদনের অপেক্ষা। তারপরই দিনক্ষণ ঠিক করে ফরওয়ার্ড মার্চ টু ঝিলমিলপুর।
আজ সকাল থেকেই মন শুধুই সুমনাকে শুনতে চায়। মুখে যাই বলুক, ভিকির বিয়ের ব্যাপারটা মেয়েটাকে খুব আঘাত দিয়েছে। স্বাভাবিক, প্রথম প্রেম। তবু ও দুর্বল নয়। ব্যক্তিগত জীবন আর কর্মজীবনকে আলাদা রাখতে জানে। সময় মতো ঠিক সুইচ অন, সুইচ অফ করে দেবে।
পদ্মার নম্বরগুলোতে সেও লাগাতার চেষ্টা করেছে। প্রথমবার লাইন লাগল বটে, একজন পুরুষ কন্ঠ, তারপর থেকেই ফোন নট রিচেবল। ব্যাপারটা তাকেও ভাবিয়েছে।
যাই হোক, সুমনাকে আবার সে ফোনে ধরে। একটু হাঁপিয়েই ধরল ও লাইনটা, ‘থ্যাঙ্ক গড, তুমি ফোন করলে। পদ্মা ইজ ইন ডেঞ্জার। কিছু কর, প্লিজ। এইমাত্র ফোন পেলাম, ও যেখানে শেল্টার নিয়েছে, বাবাজীর লোকেরা ছেয়ে ফেলেছে সেই গ্রাম’।
গৌরীর শান্ত গলা, ‘গ্রামের নাম কিছু জানিয়েছে?’
-হ্যাঁ। টিয়াগঞ্জ। ঝিলমিলপুর থেকে অনেক দূর। পালাতে পালাতে ওখানে এসে ও পৌঁছেছে। শোন, আরও কিছু ইনফর্মেশন পেলাম। সামনেই বাবাজীর জন্মদিন। প্রতিবারই গ্র্যান্ড সেলিব্রেশন হয়। এবারেরটা ডাউটফুল। তবে সবাই আশা করছে, সে আসবে ছদ্মবেশে।
     -বেশ। – গৌরীর গলা তাপ উত্তাপ হীন।
সুমনার উদ্বেগ আবার ফুটে ওঠে কথায়, ‘পদ্মা এখন প্রেগন্যান্ট। এ অবস্থায় তাড়া খাওয়া কুকুরের মতো পালিয়ে বেরাচ্ছে। জাস্ট ভাবো! আমি কিছুতেই মানতে পারছি না গো। সত্যি কথা বলছি, পদ্মার ওপর আমি খানিকটা দুর্বল। ওর এভিডেন্স আমি কাগজে ছাপিয়েছিলাম। হয়তো তার জন্যই আজ ওর …
-ওকে, ওকে। বুঝলাম। – গৌরী ওকে আশ্বস্ত করার চেষ্টা করে। – তুমি নম্বরটা পাঠাও। দেখছি, কী করা যায়’।
নম্বরটা পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সে টাওয়ার লোকেশনের জন্য পাঠিয়ে দিল জায়গা মতো। আশ্চর্য, লোকেশনে দেখাচ্ছে, ওই সময়ে নম্বরটি খোদ ঝিলমিলপুরের আশ্রম থেকেই এসেছে। তার মানে, পদ্মা মোটেই এখন টিয়াগঞ্জে নেই! গৌরী আপন মনে মাথা দোলায়। তাহলে তার আন্দাজ সঠিক। বাবাজীর চোখ এখন সুমনাকে খুঁজে বেরাচ্ছে। পদ্মা একটা টোপ!
সঙ্গে সঙ্গে সে সুমনাকে খবরটা দেয়। ও হতভম্ব। ‘তাই! ওটা  একটা ফাঁদ?’
-এগজ্যাক্টলি। – গৌরী হাসে, ‘যাক, তোমার একটা  ফাঁড়া কাটল। পদ্মা ছলে বলে তোমাকে ওখানে নিয়ে যেতে চাইছিল। আর শোন, এবার ওর ফোন এলে, জাস্ট ইগনোর হার। নয়তো সাফ জানিয়ে দেবে কলকাতায় বসে তোমার পক্ষে কিছু করা সম্ভব নয়। ও যদি সত্যিই বাঁচতে চায়, নিজে যেন কোনও থানায় গিয়ে আত্মসমর্পণ করে’।
-থ্যাঙ্কু ফ্রেন্ড। – সুমনার গলায় হাসি। -লট অফ থ্যাঙ্কস। শোন, যে যত ফাঁদই পাতুক, এত সহজে আমি মরছি না। ভিকি বিয়ে করছে, ওর বউ, ওর নতুন সংসার, সব দেখে যেতে হবে না!- সুমনা হেসেই চলে। হাসির মধ্যে যেন দানা দানা কান্না।
ফোন ছাড়ার পরও মনটা খারাপ হয়ে থাকে তার।
টেবিলে ইন্টারকম বাজছে। চমক ভাঙল গৌরীর। রিসিভার তুলতেই ওপাশে জয়েন্ট কমিশনার, অরিন্দম পালের গলা। অসম্ভব গম্ভীর, ‘একবার ঘরে এসো’।
একসময় তার প্রতি যথেষ্ট অনুরাগী ছিল এই মানুষটা। কিন্তু ব্লু হেভেনের দায়িত্ব পেতেই, একেবারে একশো আশি ডিগ্রী ঘুরে গেছে। আগের সেই মুগ্ধতা এখন ঈর্ষায় রূপান্তরিত।
-মে আই কাম নি স্যার? – গৌরী অরিন্দম পালের দরজায় মুখ বাড়ায়।
একটা কাগজের দিকে চোখ রেখেই হাতের ইশারায় অরিন্দম তাকে সামনের চেয়ার দেখিয়ে বসতে বলল। সময় গড়াচ্ছে, তবু তার যেন পড়াই শেষ হয় না। অস্বস্তি লাগে গৌরীর, সামান্য অসম্মানিতও বোধ করল।
হঠাৎ হাতের কাগজটার দিকে চোখ রেখে অরিন্দম দুম করে প্রশ্ন ছুঁড়ে দেয়, ‘হঠাৎ সাধু সন্তদের নিয়ে পড়লে কেন? রিপোর্টটা কে চেয়ে পাঠিয়েছিল? বলেই টেবিলের ওপাশ থেকে রিপোর্টটা আলতো ছুড়ে দেয় তার দিকে।
তার চোখমুখ রাগে থমথমে, ভ্রু-তে উঁচু নীচু গ্রাফ। সামান্য সময় নিল অপমানটা হজম করতে।
তা দেখেই বোধহয় পাল নিজেকে খানিক সামলালো। -তুমি ঠিক কী করতে চাইছ বল তো ম্যাডাম? শুধু শুধু কতগুলো ঝামেলা ইনভাইট করছ দেশে। এবার তো দেখছি রায়ট বাঁধবে।
গৌরী কাগজটা হাতে নেয়, দেখে আই জি ল অ্যান্ড অর্ডারের অফিস থেকে এসেছে। সাধু সন্তদের এক আখড়া পরিষদের চিঠি। আই জি, গৌরী সিনহার নামে সেটা ফরওয়ার্ড করে দিয়েছে।
আদ্যোপান্ত পড়ল সে কাগজটা। তারপর খুব শান্ত মুখে তাকায় অরিন্দমের দিকে, ‘এই রিপোর্টটা তো আমার নামে এনডোর্স করাই আছে, পাঠিয়ে দিলেই পারতেন স্যার। এনিওয়ে, আমি আসি তাহলে?’
   -না। – আদেশের সুর অরিন্দমের গলায়। তারপরেই সামান্য নরম, -আমার কাছে বসতে কি তোমার আপত্তি আছে? আরে বাবা, আমি তো বাঘ ভাল্লুক নই। আই অ্যাম ইওর বস।
গৌরী চুপ, নিজেকে সামলে নেয় চটপট। খামোকা উত্তেজিত হয়ে লাভ নেই।
-তুমি যথেষ্ট ইনটেলিজেন্ট অফিসার। তাহলে কেন এই তামাম সাধু সন্তদের কমিউনিটিটাকে ক্ষেপিয়ে চলেছ? তোমার ফোকাস শিবশম্ভু থেকে সরে কেন অন্যত্র যাচ্ছে?
অরিন্দম চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ায়, তারপর অস্থির ভাবে পায়চারী করতে থাকে ঘরে। ‘একটা কথা না বলে পারছি না গৌরী, তোমার সেই আগের ক্ষুরধার বুদ্ধি কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে না। আসলে এতবড় অপারেশন আগে কখনও হ্যান্ডেল কর নি তো। চাপটা নিতে পারছ না’।
গৌরী প্রাণপণ নিজেকে সামলায়। অরিন্দম পাল যে তার মনোবল ভাঙতে চাইছে, এটা পরিস্কার।
লোকটা আবার নিজের চেয়ারে ফিরে আসে। একেবারে সরাসরি তার চোখের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করে, ‘শিবুর নম্বর সার্ভিলেন্সে রেখেছ?’
মাথা নাড়ে গৌরী, ‘না, সে এখন নিজের মোবাইল ব্যবহার করে না’।
-সেটাই স্বাভাবিক। এ ক্ষেত্রে তোমার কী করা উচিত?
গৌরী কাঠ কাঠ হয়ে বলে, ‘এ ক্ষেত্রে আপনার অ্যাডভাইজ কী?’
অরিন্দম গাল ভরে হাসে। – যে সব স্পর্শকাতর জায়গা আছে, আই মিন, যেখানে যেখানে বাবাজীর আনাগোনা বেশি, বা শিষ্য, শিষ্যাদের আখড়া, সেখানে টাওয়ার ডাম্পিং সিস্টেমকে হাতিয়ার কর। এলাকার ফোনের টাওয়ারগুলি থেকে কতগুলি ফোন কল হচ্ছে, কোন নম্বরগুলি থেকে বেশি বার ফোন ঢুকছে, বেরোচ্ছে, সেই ফোনগুলিকে ওয়াচে রাখো। তাদের তথ্য বিশ্লেষণ করলেই সূত্র বেরিয়ে যাবে’।
গৌরী মনে মনে তারিফ করে, দারুণ সাজেশন। মুখেও একটা কৃতজ্ঞতার ভাব ফোটাল। ‘থাঙ্ক ইউ স্যার। আমি মনে রাখব’।
-ওয়েলকাম। এরকম হাজার টিপস আমি তোমায় দিতে পারি। বাই দা ওয়ে, তোমার অ্যাকশন প্ল্যানের ড্রাফটটা, আই মিন রাফ স্কেচটা একবার আমায় দেখিয়ে নিতে পারো। যদি কোথাও কোনও ত্রুটি থাকে। আমি চাই, তুমি জয়ী হয়ে ফিরে এসো গৌরী। বিকজ আই … – থামল একটু অরিন্দম। গৌরী স্থির চোখে তাকিয়ে থাকে।
– ইয়েস, আই লাইক ইউ। – বলেই ফেলে অরিন্দম পাল।
গৌরীর ভেতরে একটা হাসি গুলগুল করে পাকিয়ে ওঠে। মেয়েদের সেন্টিমেন্ট নিয়ে সবাই খেলা করতে চায়। হায় রে! তারা জানে না, বেশির ভাগ মেয়েরা সেন্টিমেন্টাল, কিন্তু ফুল নয়।
-সরি স্যার, ব্লু হেভেন একটা সিক্রেট মিশন। এ ভাবে ওই বিষয়ে তো আমি খোলাখুলি আলোচনা করতে পারব না।
-বাট আই অ্যাম ইওর বস। আমি কিছু জিজ্ঞাসা করলে তুমি বলতে বাধ্য।
-ভেরি সরি স্যার। আমার নতুন অ্যাসাইনমেন্টে, যা কিছু রিপোর্টিং, সরাসরি সেটা ডিজিপি সাহেবের কাছে যাবে। – বলতে বলতে গৌরী উঠে দাঁড়ায়। -আমায় ভুল বুঝবেন না প্লিজ। আমি আসছি, অনেক জরুরি কাজ ফেলে এসেছি।
-গৌরী। – পেছন থেকে ডেকে ওঠে অরিন্দম। – ভুলে যাচ্ছ,  এখনও তোমার নতুন অ্যাসাইনমেন্ট শুরু হয় নি, সো, আমি অ্যাম স্টিল ইওর বস। কিছু জানতে চাইলে তুমি অস্বীকার করতে পার না।
গৌরী দু এক মুহূর্ত চিন্তা করে নেয়। লোকটা যেমন ধূর্ত, তেমনি *বিপজ্জনক। এমন কিছু বলতে হবে যাতে আপনা আপনি সে থেমে যায়।
ও মোবাইলটা ডান হাত থেকে বাঁ হাতে করে। কিছু ভাবে। তারপর বলে, ‘স্যার, আমি আপনাকে আমার প্ল্যানটা বলতে পারি। তবে …
-তবে কী ? – অরিন্দম চকচকে চোখে ওর দিকে তাকিয়ে আছে। -কোনও শর্ত? ওকে, আই প্রমিস …
-না, না। সে সব কিছু নয় স্যার। আমি ভাবছিলাম ডি জি পি সাহেবকে একবার ফোন করে নেব কিনা?
-মানে! হঠাৎ তাকে ফোন কেন?
-বলব, এই অপারেশনে যদি আপনাকে উনি অ্যাডভাইজার হিসেবে ডেপুট করেন। তাহলে গোটা প্ল্যানটা আপনাকে দিয়ে একবার চেক করিয়ে নেব। উপরন্তু ওই সাধু সন্তদের ব্যাপারটাও।
অরিন্দমের চোখ দুটো ধকধক জ্বলছে। মাছি তাড়ানোর ভঙ্গিতে ওর দিকে তাকিয়ে বলে ওঠে, ‘তুমি এখন আসতে পারো’।
(৪)
চেম্বারের ল্যান্ড লাইনটা বেজে উঠল। তুলতেই ওপাশে রোহিত।  ‘ম্যাডাম, একটা সাংঘাতিক খবর পেলাম। এই মাত্র, সোর্স মারফৎ’।
-কী? – গৌরীর গম্ভীর স্বর।
-ফোনে নয়, আমি আসছি আপনার ঘরে।
দু মিনিটের মধ্যেই রোহিত হাজির। বেশ উত্তেজিত চোখ মুখ। একটু দম নিল হাঁ করে। তারপর ওর সেই পুরনো স্টাইল, ডান হাতের মুঠিকে মাইক ধরার কায়দায় মুখের সামনে এনে কাশি দিয়ে বলে, ‘সোর্স মারফৎ খবর এসেছে বাবাজীর পঞ্চাশতম জন্মদিন খুব সামনেই, এই দিন পাঁচেকের মধ্যে।
আরে! পদ্মাও এরকম একটা জন্মদিনের খবর দিয়েছিল না সুমনাকে! খবরটা তাহলে সত্যিই! তবু সে সব না ভেঙে চুপচাপ ও শুনে যায় কথাগুলো। রোহিত থামলে জিজ্ঞাসা করে, ‘সোর্সটি কে? কোথ থেকে শুনলে?’
-এক প্রাইভেট কার ড্রাইভারের কাছ থেকে। আমাদের ব্লু হেভেনের জন্য যে রিজার্ভ টিমটা দার্জিলিং এ তৈরি আছে, ওখানকারই এক টিম মেটের মারফৎ খবরটা পেলাম। ও কোনও কাজে শিলিগুড়ি থেকে দার্জিলিং ফিরছিল গতকাল। সেই ভাড়া গাড়িরই ড্রাইভার গল্পে গল্পে কথাটা বলেছে তাকে। শুধু তাই নয়, একটা ভিডিয়ো ক্লিপিংসও দেখায়। দাঁড়ান, আপনাকেও দেখাচ্ছি। এই মাত্র হোয়াটস অ্যাপে সেই বন্ধু পাঠাল আমায়। – বলেই রোহিত ফোনে হাত দেয়।
গৌরীও ঝুঁকে দেখে ভিডিয়োটা। শিবুশম্ভুর গত বছরের জন্মদিনের উৎসব। হাজার হাজার ভক্তের সমাগম। কয়েক হাজার ফিটের আশ্রম কমপাউন্ডে বসেছে এক মিউজিক কার্নিভাল। রাত ঠিক বারোটা, ঢং ঢং করে চার্চের ধ্বনির মতো ঘন্টা বাজল। ভক্তদের উল্লাসের মধ্যে দিয়ে হেঁটে এল শিবশম্ভু বাবা, পরনে জমকালো লাল পোশাক। ধীর পায়ে সে হেঁটে চলেছে, মুখে স্নিগ্ধ হাসি। হঠাৎ ক্যামেরার ফোকাস ঘুরে গেল। দূরে ধবধবে সাদা ডিম্বাকৃতির কিছু রাখা। বাবাজীকে ঘেরাও করে ভক্তরা ওদিকেই নিয়ে চলেছে। সকলের হাতে একটা করে মোমবাতি।
গৌরী আরও একটু ঝুঁকে দেখার চেষ্টা করে। কী ওটা?
রোহিত বলে, ‘ওটা কেক। বাবাজীর জন্মদিন উপলক্ষে তৈরি। তিন ইঞ্চি মোটা আর মাপে ৪২৭.২৫ বর্গফুট। ওখানে এবার একলক্ষ মোমবাতি পোঁতা হবে’।
গৌরী ভিডিয়োটা বন্ধ করে দেয়। বলে ‘এত স্পেসিফিকেশনও পেয়ে গেছ? ইঞ্চি, বর্গফুট, সব?’
-হ্যাঁ, ওই ইনফর্মারই জানিয়েছে।
গৌরীর কপালে সরু সরু রেখা। কখনও সেগুলো সরল, কখনও বক্র। যে ইনফর্মারের কথায় তারা এত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পেল, যদি অন্য কোনও চাল থাকে এর পেছনে? নইলে বাবাজীর এত খবর, ভিডিয়ো ক্লিপিংস হঠাৎ সেই ড্রাইভারই বা রাখবে কেন? আর যদি বা রাখে, বেছে বেছে একজন পুলিশের সঙ্গেই তার দেখা হল, এবং সব ফাঁসও করে দিল! পুরোটাই কি কাকতালীয়?
গৌরীর মুখ গম্ভীর হয়ে ওঠে। হাজার প্রশ্নের ছোবল চলছে মাথার মধ্যে। রোহিতের দিকে তাকিয়ে বলে, ‘একটা কাজ করবে?  তোমার সেই পুলিশ বন্ধুটিকে একটু ফোনে ধর তো।
-ম্যাডাম, বন্ধু বলছি বটে, কিন্তু ঘনিষ্ঠতা তেমন নেই। ব্লু হেভেন অপারেশনে আছি, একই টিম, যদিও হেড কোয়াটার্স আলাদা আলাদা, তাই মাঝে মধ্যে কথাবার্তা হয়। ওর নাম লোবো তেনজিং।
গৌরী নিজের মোবাইল এগিয়ে দেয়, ‘বলই না কথা। নাও, এখান থেকে ফোনটা কর’।
রোহিত অবাক, ‘আপনার মোবাইল থেকে?’
-হ্যাঁ, নো প্রবলেম। কর।
-ওকে ম্যাডাম।
প্রায় মিনিট পাঁচেক লোবোর সঙ্গে কথাবার্তা বলে রোহিত জানায় এবারও নাকি বাবাজীর জন্মদিন ঘটা করেই হবে, তবে এ ব্যাপারে ভক্তরা মুখে কুলুপ এঁটেছে। কোথায় হবে, কী ভাবে হবে, বাবাজী সেদিন আদৌ উপস্থিত হবে কিনা ভক্তদের সামনে, পুরোটাই ধোঁয়াশার মধ্যে রেখেছে ভক্ত বৃন্দ। তবে ওই ক্যাব ড্রাইভারটি কথা দিয়েছে তার কানে কোনও খবর পৌঁছলে সে অবশ্যই জানাবে এবং পুলিশকে সে যথাযথ সাহায্য করবে।
রোহিত নিজের ঘরে চলে গেল।
দু হাত পেছনে রেখে ঘরময় পায়চারী শুরু করল গৌরী। শিবশম্ভু কি কখনও এত সহজে পতঙ্গের মতো আগুন খাওয়ার নেশায় লকলকে শিখার দিকে ছুটে আসবে? কে জানে। হয়তো আসবে, হয়তো বা, না। পুলিশ যে চতুর্দিকে জাল বিছিয়ে রেখেছে, এ নিশ্চয়ই তার অজানা নয়। তারপরেও …
বেশ খানিক পর গৌরী সিদ্ধান্ত নেয় কলকাতা থেকে রিমোট কনট্রোল চালিয়ে এ কেসের সমাধান হবে না। অন-স্পট পৌঁছতে হবে এবং যত তাড়াতাড়ি সম্ভব। যদিও দার্জিলিং এ এই টিমের আর একটি শাখা তৈরি করা হয়েছে। তবু টিম হেড হিসেবে, আই পি এস গৌরী সিনহার সেখানে পৌঁছনোটা জরুরি।
মনের কোণে একটা দুরাশা জাগছে ক্ষণে ক্ষণে। ঝিলমিলপুর বাবাজীর প্রিয় স্থান। একবারটি কি সে আসবে না জন্মদিনে লাখো ভক্তদের অভিনন্দন কুড়োতে? পুজো পেতে কে না ভালবাসে!
কী মনে হতেই ইন্টারকমে আবার ও ডেকে পাঠাল রোহিতকে।
রোহিত ঢুকতেই গৌরী একটু অন্যমনস্ক ভাবে বলে, ‘লোবো ছেলেটি কেমন?
-ও আমাদের পুলিশ সার্ভিসেরই, ম্যাডাম। দার্জিলিং এর লোক।
-শোন, বলছিলাম আজ থেকে আমাদের দুটো নম্বরকে সারভিলেন্সে রাখতে হবে। তুমি এখুনি মনিটরিং ইউনিটের সঙ্গে কথা বল। – বলেই সে হাসে। – এনি গেস? কার কার নম্বরের ওপর নজরদারির কথা ভাবছি?’
রোহিত আমতা আমতা করে, ‘আসলে বাবাজী বা তার সঙ্গী সাথীদের ট্যাপ করা তো অসম্ভব। তারা এমন গভীর জঙ্গলে ঢুকে আছে, যেখানে নেটওয়ার্ক নেই’।
 -হুম। – গৌরীর দু আঙুলের ফাঁকে পেন। – এখানে একটা কথা ভাবার আছে। জঙ্গলে এভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে বসে ওরা বেঁচে বর্তে আছে কীভাবে? তার মানে, ওদের কাছেপিঠে নিশ্চয়ই এমন কেউ আছে যারা নিয়মিত সব জোগান দিয়ে চলেছে ফ্রম ফুড টু ইনফরমেশন। এবং সেই লোকগুলো আমাদেরও আশেপাশেই ঘুরে বেরাচ্ছে।
-আপনি কি ওই ক্যাব ড্রাইভারকে সাসপেক্ট করছেন ম্যাডাম?
-ইয়েস। এবার আসি দ্বিতীয় জনের কথায়। লোবোকেও আমি সন্দেহের তালিকার বাইরে রাখব না।
রোহিত অবাক, কিছু বলতে যাচ্ছিল। গৌরী হাত দিয়ে থামাল ওকে। ‘অপারেশন শুরু হবার পর, সব সময় চোখ কান খোলা রাখতে হবে। কে কখন কোন চালে অপারেশনের মুখ ঘুরিয়ে দেবে তুমি জানো না’।
রোহিত মাথা নামিয়ে নেয়, ‘বুঝেছি ম্যাডাম’।
-মনে রেখো দার্জিলিং বেল্টটা খুব সেনসিটিভ। ওখানে বাবাজী বহুদিন ঘাঁটি গেড়ে বসে ছিল। চারিদিকে তার শিষ্য শিষ্যার ডালপালা। এই ভক্তরাই বাবাজীকে আড়াল করে রেখেছে।  – কথা থামিয়ে গৌরী দম নেয়। -আর তোমায় ডিস্টার্ব করব না। নিজের ডেস্কে চলে যাও।
(৫)
প্রথমে ট্রেন, তারপর বাস, মাঝে একটা রোগা নদী পারাপার, শেষে ভ্যান রিক্সা। তবু নাকি বাসুবাবার ছাউনি এখনও মাইলটাক দূর। একটা লোককে জিজ্ঞাসা করতেই সে আঙুল তুলে দূরের দিকে কী দেখিয়ে চলে গেল। রোহিত বেচারার পা আর চলে না। টলমল করে এবড়োখেবড়ো রাস্তা দিয়ে হেঁটেই চলেছে। অমন ফর্সা লম্বা চওড়া চেহারা, ঘেমে নেয়ে একসা এখন। রুমাল দিয়ে মুখ মুছছে বার বার। একসময় দাঁড়িয়ে পড়ল একটা ঝোপের সামনে। রাগী রাগী মুখ, জুঁইয়ের দিকে তাকিয়ে বলে, ‘আর কত দূর?’
সে মেয়ের কোনও ক্লান্তি নেই। লাফাতে লাফাতে চলেছে। হেসে হেসে বলে, ‘কী সুন্দর গ্রামটা। চল বরং রাস্তা দিয়ে না হেঁটে, ওই আলের ওপর দিয়ে যাই।
 রোহিত এক জায়গায় দাঁড়িয়ে পড়ল, -বাজে কথা থামিয়ে, বল
এখনও কতটা বাকি।
            জুঁই এবার আমতা আমতা করে, ‘মনে হচ্ছে এসে গেছি। এত অল্পে হাঁপিয়ে যাও কেন? তোমরা না পুলিশ!’
            বলেই ও হি হি হাসতে থাকে। রোহিত অবাক। আচ্ছা, পাগলি তো। এত হাসির কী হল। চেঁচিয়ে বলে, ‘অ্যাই, অত হি হি কীসের তোমার?’
            ধমক খেয়ে হাসি থামল বটে, কিন্তু জুঁইয়ের মুখ চোখ ফেটে যেন হাসির দমক বেরিয়ে আসতে চাইছে। এত ছেলেমানুষ জুঁইটা। জোর জবরদস্তি করে এই এক অজপাড়াগায়ে নিয়ে এসেছে। আজ ডে অফ ছিল রোহিতের। ভেবেছিল এগারোটার আগে বিছানা ছাড়বে না। কিন্তু ভোর থেকেই ওই পাগলী পেছনে পড়ল।
রাগে গজগজ করতে করতে আবার হাঁটা লাগায় সে। এই বাবাজীর লম্বা ফুঁয়ের জোর নাকি এমনই, সব বিপদ আপদ কেটে যায় মানুষের।
চলতে চলতে আবার একটু থামল রোহিত। কাঁধের ব্যাগে হাত ঢুকিয়ে জলের বোতল বার করে। ঢকঢক করে জল খেতে গিয়ে হঠাৎ লাগে বিষম। জুঁই খানিকটা এগিয়ে গিয়েছিল। পেছন ফিরে তাকে কাশতে দেখে ছুটে এল, তাড়াতাড়ি পিঠে হাত রাখে, ‘আহা, সাট, সাট। ধীরে খাও, ধীরে খাও’।
রোহিত এক ঝটকায় ওর হাত সরিয়ে দেয়। জুঁইয়ের ভ্যাবাচ্যাকা মুখ। ‘আমি কী করলাম? বিষম খেলে, তাই সাট সাট বলছি’।
-চুপ, অনেক হয়েছে। তোমার বাবাজী আর কদ্দুর?
 -এই তো, প্রায় পৌঁছেই গেছি। আচ্ছা, তুমি তখন থেকে বাবাজী বাবাজী করছ কেন? একটা সিম্পল ধরনের লোক, এ গ্রামের সকলের কাছে বাসুবাবা। বিপদে আপদে ঝাঁপিয়ে পড়ে। তবে শক্তি আছে। তা ওকে কি তুমি তোমাদের শিবশম্ভু বাবাজীর সঙ্গে গুলিয়ে ফেলছ?
রোহিত কঠিন চোখে তাকিয়ে মুখে আঙুল রাখে, ‘চুপ, ওই নাম যেখানে সেখানে মুখেও আনবে না। আর শোন, আমি যে পুলিশে আছি, ঘুণাক্ষরেও যেন এসব ফাঁস না হয়। বিশেষ করে এই সব ডেরায়’।
জুঁই ভাল মেয়ের মতো মাথা নাড়ে, ‘না, না, আমি কাউক্কে বলি নি’।
আরও প্রায় মিনিট কুড়ি হেঁটে তারা পৌঁছল ‘বাসুবাবার ছাউনি। একটা ময়লা পলিথিন এর নীচে গিজগিজ করছে মানুষজন। এই সকাল আটটাতেই জনা পঞ্চাশ ষাট তো হবেই। একটা নড়বড়ে হাতলওলা কাঠের চেয়ারে গ্যাঁট হয়ে বসে আছে এক রোগা ভোগা লোক। পরনে গেরুয়া পাঞ্জাবী, সাদা ময়লা ধুতি, মাথায় একটা গেরুয়া ফেট্টি।
ওরা পৌঁছতেই হাত দিয়ে ইশারায় জুঁইকে ডাকে, ‘তুই-ই ফোন করেছিলি? কলকাতা থেকে আসছিস? আহা, মুখ কালো হয়ে গিয়েছে মেয়ের। এই বুঝি জামাই বাবা? বসেন বাবু, বসেন। এই গরীবের ছাউনিতে বসে একটু জিরান দ্যান। এই কে কোথায় আছিস এনাদের দুজনকে একটু ডাবের জল খাওয়া তো’।
রোহিত আর জুঁই, দুজনেই হাত দিয়ে থামায় বাসুবাবাকে। সে তবু নাছোড়বান্দা, ‘আরে বাবা, মিষ্টি ডাবের জল। খেয়ে দেখেনই না। এইটুকু নারায়ণ সেবা করার ক্ষ্যামতা আছে এই গরীব মানুষডার’।
মিনিট পাঁচেকের মধ্যেই দুটো ডাব দু হাতে নিয়ে একটা বাচ্চা ছেলে সামনে এসে দাঁড়ায়। রোহিত তবু কিন্তু কিন্তু করে। জুঁই কানের কাছে মুখ এনে ফিসফিস করল, ‘খেয়ে নাও, ওটাই বাবার প্রসাদ। আমরা লাকি, আসার সঙ্গে সঙ্গে প্রসাদ পেলাম’।
তবে ডাবের জলটা সত্যিই মিষ্টি। ভেতরের তেষ্টা অনেকখানি মিটল। অন্যান্যরা ছেঁড়া চটের ওপরে বসলেও তাদের জন্য একটা মাদুর পাতা হল। সেটাও তেলচিটে, ময়লা।
দু চারজন মহিলার সমস্যা শুনতে শুনতে বাসুবাবা বার বারই রোহিতের দিকে তাকাচ্ছে পিট পিট করে। একসময় দূর থেকেই বলে ওঠে, ‘কোনও চিন্তা করিস নে জামাই, তোর জীবন আমি সুরক্ষিত করে দিব। একটা ভূত জিন যদিও ঘুরপাক খাচ্ছে তোর আশেপাশে, এতক্ষণ ধরে আমি তাকেই নজরে নজরে রাখছিলাম। কিন্তু ঘাবড়াস না। এমন মন্ত্র চার্য করব, ও পালাবার পথ পাবে না!’
জুঁই বড় বড় চোখে তাকায় বাসুবাবার দিকে, ‘তাই নাকি? ভূত জিন! সেটা কী বাবা?’
-আরে জিন হল দৈত্য দানো। তা তোমার অতশত জেনে কাজ কী মা? তোমার স্বামীকে আমি বাঁচিয়ে রাখব, কথা দিলাম তো। কত মানুষের কত ভূত ভাগালাম এত বছর ধরে’।
রোহিত অনেকক্ষণ ধরেই উসখুস করছিল। এই বাসুবাবাকে একবার বাজিয়ে দেখার লোভ যাচ্ছে না।
তামাটে রঙের ঢ্যাঙা লোকটার দিকে তাকিয়ে সে বলে ওঠে, ‘আচ্ছা বাবাজী, আপনার কাছে আমার কতগুলো প্রশ্ন আছে। দয়া করে জবাব দেবেন?’ – ভালমানুষের মতো মুখ রোহিতের।
বাসুবাবা চোখ বুজে কী একটা অং বং চং মন্ত্র পড়ছিল। ওই অবস্থাতেই আরও মিনিট কয়েক কাটল। তারপর ঘোর ঘোর চোখ খুলে তাকায় তার দিকে, ‘প্রথমেই বলি, আমার কাছে যারা আসে, সকলকে আমি সন্তান ভেবে কাছে টেনে নিই। সকলের কাছে আমি বাসুবাবা। তুমি আমায় ওই নামেই ডাকবে জামাই। কোনও বাবাজী টাবাজী নয়’।
ব্যাটা সেয়ানা নাম্বার ওয়ান! রোহিত বিড়বিড় করে। কানে খবর পৌঁছে গেছে, নামের সঙ্গে বাবাজী জুড়লেই পুলিশের ধরপাকড় হচ্ছে, তাই লেজুরটাকে ছেঁটে হাজার সন্তানের বাবা সেজেছেন।
জুঁই দাঁত চিপে বলে, ‘ভুলভাল কিছু বল না যেন। বাসুবাবা রাগী লোক। কামাখ্যায় দশ বছর ধ্যান করে সিদ্ধ পুরুষ হয়েছেন। রাগিয়ে দিলে একটা কাজও হবে না’।
রোহিত মনে মনে হাসে। বাসুবাবা! দেখাচ্ছি মজা এবার। এমন মন্ত্র আমি নিজেই চার্য করব, ভূত জিন ওর মাথা থেকেই তাড়িয়ে ছাড়ব।
গলা ঝেড়ে রোহিত বলে, ‘ঠিক আছে, তাই হবে, বাসুবাবা বলেই ডাকব’খন। কিন্তু বাবা, মানে বাসুবাবা, আপনার নজর তো সাংঘাতিক। দূর থেকে দেখেই বুঝে গেলেন আমার চারপাশে ভূত জিন ঘুরছে’।
-শুধু ঘুরছে? একেবারে তোমার মাথায় চড়ে পা দোলাচ্ছে। নাছোড়বান্দা এমন, কত চোখ রাঙাচ্ছি, তবু সে মাটিতে নামবে না।
-ই বাবা! কী হবে তাহলে? – রোহিত লম্বা জিব বার করে।
বাসুবাবা পট করে আবার চোখ বুজে ফেলে। একটা আঙুল নিজের নাকের চারপাশে চক্রাকারে ঘোরাতে ঘোরাতে এবার অং বং চং এর বদলে অন্য কী একটা মন্ত্র বলে চলে।
-ওটা কি আর একটা মন্ত্র? সব একই রোগের? মানে ভূত ভাগানোর? – রোহিতের চোখে মুখে কৌতূহল। – আচ্ছা, ভূতগুলো খামোকা মানুষকে ধরে কেন?
-সে আমি কী জানি। ভূতেরাই জানে কেন ওরা মানুষ ধরে। – অসন্তুষ্ট মুখ বাসুবাবার। ভ্রু কোঁচকানো। – আমার কাজ ভূতেদের হটিয়ে দেওয়া, ব্যস।
-আচ্ছা, ভূতেরা হটে যাওয়ার আগে কোনও কিছুর জন্য বায়না ধরে? যেমন মানুষদের বেলায় হয়, মুক্তিপণ দাবি।
বাসুবাবার চিলতে গোঁফ নেচে ওঠে, ‘চায় না আবার। কেউ চায় পুজো, পিন্ডি। কেউ কেউ আবার পাঁঠা, মুরগি বলি … কোনও ঠিক নেই।
-কখনও মহা ঝামেলাবাজ ভূতের পাল্লায় পড়েছেন? সরতেই চায় না, এমন?
চিমটি কাটল জুঁই, ‘চেপে যাও না। এত প্রশ্ন কীসের?’
কিন্তু বাসুবাবা হেসে বলে, ‘পাই নি আবার? সেবারই তো একটা মেয়ে এসেছিল, আইবুড়ো। ওকে ধরেছিল এক রাজপুত ছেলে। একেবারে যোদ্ধা পরিবারের, হাট্টা খাট্টা। ব্যাটা নড়তেই চায় না। একেবারে গ্যাং নিয়ে এসেছে।
-বলেন কী, ভূতের গ্যাং? কতজন ছিল টিমে?
-চারজন। সব কটাকে একে একে তাড়িয়েছি। উফ, যা পরিশ্রম হয়েছিল! ওই জন্যই কেসটা মনে আছে।
বোঝদারের মতো মাথা দোলায় রোহিত, ‘বুঝেছি। আপনার সত্যি ক্ষমতা আছে। কিন্তু আমার কেসটাতেই বোধহয় কুপোকাত হয়ে যাবেন। বার বার চেষ্টা করছেন, বার বার ফেল।
-না, না, অত সহজে ছাড়ব নাকি। আবার দেখছি প্রথম থেকে মন্ত্রটা পড়ে।
রোহিত মাদুর থেকে উঠে পড়ে। বলে, ‘তার চাইতে আমাকেই মন্ত্রটা শিখিয়ে দিন না। একবার চেষ্টা করে দেখি। কী যেন বেশ বলছিলেন মন্ত্রটা?  আমার তো শুনতে শুনতে দুলুনি আসছিল। মারেগা ধারা ভাগেগা ভূত, ইয়ে হাত সিদ্ধিকা পুত। – অ্যাই জুঁই ওঠো, অনেক বুজরুকি হয়েছে’।
বাসুবাবার চোখ বড় বড় হয়, তাকিয়ে আছে একদৃষ্টে। তারপর বেশ ক্রুদ্ধ কন্ঠে বলে ওঠে, ‘তুমি দেখছি ঘোর অবিশ্বাসী। ওই জন্যই অমন নাছোড়বান্দা ভূতের পাল্লায় পড়েছ। ওই মন্ত্র খবরদার আওড়িয়ো নি, ধ্বংস হয়ে যাবে। তোমার মাথায় যে চেপেছে, সে স্বদেশী ভূত নয়, ভিন দেশের, নাক চ্যাপ্টা, কুতকুতে চোখ’।
জুঁইকে একপ্রকার টেনেই বার করে নিয়ে আসে বাসুবাবার ছাউনি থেকে। তারপর হনহন হাঁটতে হাঁটতে বলে, ‘শালা বাটপাড়, বেশি বাড়াবাড়ি করলে, কালই পুলিশের গাড়ি নিয়ে এসে তুলে হাজতে পুরে দেব’।
জুঁই তখন থেকে মুখ গোঁজ করে চলেছে। সারা পথে একটাও কথা বলে নি। খিদে চেপে শুধু ঢকঢক জল খাচ্ছে। একবার শুধু কান্না চাপা গলায় বলে, ‘বাসুবাবাকে ওভাবে না চটালেই পারতে। দেখলে তো কেমন বলে দিল, তোমার মাথায় নেপালি ভূত চেপেছে। তুমি তো নেপালের কাছাকাছিই এবার অপারেশনে চলেছ’।
রোহিত অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল তার ভাবি স্ত্রীর দিকে। তারপর হঠাৎ হো হো হাসিতে ফেটে পড়ে। কথাটা মন্দ বলে নি তো বাসুবাবা।
ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।