সুমনা। ‘শুধুই সত্য’, কাগজের সেই সাংবাদিক মেয়েটি, বয়স ত্রিশের মধ্যেই হবে।
শিব শম্ভুর ব্যাপারে বহু তথ্য মিলল ওর কাছ থেকে। পত্রিকাটি সত্যিই দুঃসাহসিক কাজ করে চলেছে। ক্রমশ একটা সম্ভ্রম জাগে গৌরীর। ধীরে ধীরে কখন যেন বন্ধু হয়ে ওঠে ওরা দুজন। একদিন দেখা করল একটি ক্যাফেতে। গৌরীর পরনে একটা নীল জর্জেট। সন্ধ্যের আগেই ফিরে এসেছিল অফিস থেকে। নাম মাত্র প্রসাধন করে চুলে একটা টপ নট বেঁধে বেরিয়ে পড়ল নিজেই ড্রাইভ করে। তবে বেরোবার আগে আয়নায় নিজেকে দেখে নিজেই অবাক। তার ধবধবে ফর্সা রঙে নীল জর্জেটটা বেশ দেখাচ্ছে তো!
তবে ক্যাফেতে পৌঁছে, সুমনাকে দেখে সে রীতিমত চমকে যায়। কী সুন্দর মেয়েটা! পরিপাটি সাজগোজ। লম্বা বেণিতে বেলি ফুল জড়ানো, ভুর ভুর সুগন্ধ। খানিকটা কেরালিয়ান মেয়েদের স্টাইল। লম্বা ফিগার, এক ইঞ্চিও মেদ নেই, সামান্য চাপা রঙ।
সুমনাকে সাক্ষাৎ করার আগে, ওর ছবি আর ওর প্রোফাইল ঘেঁটে দেখে নিয়েছিল গৌরী। তবু প্রথম দর্শনে এত অন্য রকম লাগল! সাংবাদিকতার কাজে যখন তখন বেরিয়ে পড়তে হয় ওদের, তবু এত পরিপাটি চেহারা! ভালও লাগল যদিও। মনে হচ্ছিল সুমনা বুঝি কোনও পার্টিতে বন্ধুর সঙ্গে দেখা করতে এসেছে।
স্ন্যাক্স খাওয়া আর কথার ফাঁকেই সুমনা মাঝে মাঝে আলতো নজর বোলাচ্ছিল ওর হাত ঘড়িতে।
-কোথাও যাওয়ার আছে ? – গৌরী স্যান্ডউইচে একটা কামড় বসিয়ে প্রশ্ন করে।
সুমনা লাজুক হাসল, ‘হু, একটা অ্যাপয়েন্টমেন্ট আছে’।
ওর হাসিতে যেন মুখে রামধনু ফুটল। বেলফুলের ভুর ভুরে গন্ধটাও এক ঝাপটায় নাকে এসে লাগে।
গৌরী জলের গ্লাসটা হাত বাড়িয়ে নিতে নিতে বলে, ‘অফিশিয়াল? আর্জেন্ট কিছু?’
-না। – সুমনা এক ঢোঁকে কফি শেষ করে আবার ঘড়ি দেখল। -ম্যাডাম, অন্য আর একদিন যদি বসি আমরা …
গৌরী ওর হাতে চাপ দিল, ‘এখন থেকে নো ফর্মালিটি। নো ম্যাডাম, নো আপনি। গৌরী আর তুমি। অফ কোর্স, আর একদিন বসা যেতেই পারে। কতদূর যাবে? তোমায় একটা লিফট দিই?’
-না, ও আসবে।
‘ও’ বলার মধ্যেও একটা লাজুক হাসি। গৌরী লক্ষ করে, সুমনার রঙ চাপা হলেও মুখটা ঝকঝকে। আর প্রতিবারই হাসির পর ও যেন ব্লাশ করছে।
সুমনার ফোনটা বেজে উঠল। টুকরো কথার মধ্যে যা বোঝা গেল, যার আসার কথা, সে জ্যামে আটকে পড়েছে, আরও আধ ঘন্টার ধাক্কা পৌঁছতে। গৌরী হেসে বলে, ‘তাহলে আর এক রাউন্ড কফি হোক’।
সুমনা হাসে, ‘হোক’। কফিতে চুমুক দিতে দিতে এবার সুমনাই তুলল কথাটা, ‘আজ আমাদের অ্যানিভরসারি’।
মুখের কাছে কাপ এনেও প্লেটে নামিয়ে রাখে গৌরী, ‘সে কী! তাহলে তুমি এখানে যে! ছিঃ! এভাবে তোমাদের দিনটায় আমি ভাগ বসালাম’।
সুমনা হাসছে। কিন্তু এখন ওর মুখে রামধনুর সাত রঙ থেকে কয়েকটা রঙ মুছে গেছে। ‘কীসের অ্যানিভরসারি জানতে চাইলেন না?’
ঠোঁটের কাছে কাপটা ধরে রইল গৌরী, ‘ওয়েডিং, নিশ্চয়ই। তবে এখন তো শুনি লাভ অ্যানিভরসারিও সেলিব্রেট করা হয়। প্রথম ভালবাসার কুঁড়ি ফোটার দিন। সে রকম কিছু?’
সুমনার মুখে সব সময় হাসি লেগে আছে, হাসির রঙ শুধু পাল্টে যায়। বলে, ‘না, আমাদের ব্রেক আপ অ্যানিভরসারি। তিন বছর আমরা সেপারেটেড’।
হাঁ হয়ে গেল গৌরী। বিচ্ছেদেরও উদযাপন হয়!
-আমি আর ভিকি ক্লাসমেট ছিলাম। বাড়ির অমতে বিয়ে। ভিকিরা ক্রিশ্চিয়ান, গোড়া পরিবার। তবু আমাদের ভালবাসার কাছে গোড়ামি হার মানল। কিন্তু বিয়ের পর ভিকি নিজেই পাল্টে গেল। আমাদের মধ্যে যে এত অমিল, আগে বুঝিনি। আমার প্রতি ভিকির হাজারটা অভিযোগ। একসময় পড়ল আমার চাকরি নিয়ে। সাংবাদিকতা করা চলবে না। সাইকোলজির ওপর আমার ডিগ্রী ছিল। ভিকি বলল, সাইকোলজিকে পেশা করতে, বাড়িতে চেম্বার সাজিয়ে বসতে। নইলে শিক্ষাকতা। এ ছাড়া নাকি সংসার টিকবে না। টিকবে না তো, টিকবে না। আমি বরাবরই একবগগা। সাংবাদিকতা ছাড়লাম না। ফলে দু বছরের মধ্যে ডিভোর্স। কিন্তু অবাক কান্ড, বিচ্ছেদের পর আমাদের মধ্যে যা যা অমিল, সব দূরে সরে গেল। আমরা আবার আগের মতো বন্ধু হলাম, সেই পুরনো ভালবাসা ফিরে এল। বুঝলাম ওটাই আমাদের ডেস্টিনি। দূরে দূরেই আমাদের ভালবাসা। এমন কী, গৌরী তুমি শুনলে অবাক হবে, সেদিন আদালতেও আমরা দুজন দুজনের আঙুল পেঁচিয়ে বসেছিলাম। জজ সাহেব দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলেছিলেন, ‘কিছু কিছু ফুল আছে, দূর থেকেই সুগন্ধ ছড়ায়, কাছে এলে গন্ধটা মিলিয়ে যায়। আপনাদের রাস্তা আলাদা হলেই, ভাল থাকবেন’। -সুমনা বোধহয় চাইছিল মুখ আড়াল করতে। জলের গ্লাসটা সামনে ধরল। – ভিকি এখন ইউ এস এ তে সেটেল্ড। তবে প্রতি বছর এ সময় দেশে ফেরে। এই দিনটা আমরা একসঙ্গে কাটাই। কোনও একটা হাই রাইজের ওপেন এয়ার রেস্তোরাঁয়। একটা ডিংকস নিয়ে ঘন্টার পর ঘন্টা কেটে যায় নিঃশব্দে। তবে বাইরেই নৈঃশব্দ, ভেতরে ভেতরে দুটো মন অনর্গল কথা বলে চলে। অনেক সময় ও আগের মতো আকাশের তারা চেনাতে বসে। – শেষ দিকে সুমনার কথাগুলো কান্না মাখা।
এসময়ই ওর ফোন বেজে ওঠে। চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে ইশারায় বোঝাল, ভিকি এসে গেছে। গৌরী দেখে ওর যাওয়ার পথে বেলফুলের গন্ধ ছড়িয়ে গেল। অজান্তে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে। কেন এমন হয়? কোনও কোনও জীবনের গল্প লিখতে গিয়ে বিধাতা কী যে রসিকতা করেন! প্রিয় মানুষকে কাছে পাঠিয়েও দূরে সরিয়ে নেন। যেন এক জীবনে ভালবাসার সঙ্গে দেখা হল, পরের জীবনে হবে মিলন।
সুমনা চলে গেছে অনেকক্ষণ, গৌরী তবুও বসে, ভাল লাগছে, ছিমছাম এই নিভৃত কোণ। সুন্দর একটা মিউজিক চলছে। চেনা সুর, বিথোবেন। অনুরাগ সংগীত প্রিয়। বিথোবেনের প্রচুর কালেকশন ঘরে। অফিস থেকে ফিরেই ও ব্যালকনিতে গিয়ে বসে। নিজেই একটা ড্রিংক্স বানিয়ে বহুক্ষণ একা কাটায়। তখন খুব নীচু ভলিউমে প্লেয়ারে ওর পছন্দের সুরগুলো বাজতে থাকে।
মোবাইলটা টেবিলে ছিল, ভাইব্রেশনে কেঁপে উঠল। তুলতেই শুনল ওপাশে সুমনা। -গৌরী? একটা খবর আছে, সিরিয়াস নিউজ।
বিথোবেনের সুর তখন তার শরীর মন আচ্ছন্ন করে আছে। গৌরী হাসে, ‘এই মুহূর্তে তুমি ভিকিতে মন দাও সুমনা। জাস্ট লেট গো অল আদার নিউজ। কাল থেকে ওগুলো নিয়ে আবার পড়া যাবে’।
-ডোন্ট টেক ইট সো লাইটলি। ম্যাটারটা সিরিয়াস। -সুমনা একটু যেন হাঁপাচ্ছে, ‘ঝিলমিলপুর থেকে ফোন এসেছিল। সেই মেয়েটির ফোন, যার সাক্ষী আমি নিয়েছিলাম। ফোনেই কান্নাকাটি করছিল। বলল, ও প্রেগনেন্ট। কিন্তু আশ্রমের মামনির নির্দেশে ওরা ওর বাচ্চাকে নষ্ট করে দিতে চায়।
-বাকিটা জানা গল্প। – গৌরী সুমনাকে থামিয়ে দেয়। এখন ও কী চাইছে?
-পদ্মা আশ্রম ছেড়ে পালিয়ে এসেছে। কিন্তু ভয় পাচ্ছে, যে কোন সময় ও খুন হয়ে যাবে। গৌরী, ওকে একটা শেল্টার দেওয়া খুব জরুরি। মেয়েটা ইনোসেন্ট, গরীব পরিবার থেকে এসেছিল।
স্নায়ু থেকে দ্রুত বিথোবেন মুছে যেতে শুরু করল তার। শিরদাঁড়া টানটান করে ধীর স্বরে বলে, ‘ভিকি কোথায় এখন?’
-আমার সঙ্গে।
-ওকে ফাইন। ভিকিকে সময় দাও। আজ আকাশ ভর্তি তারা। ও তোমায় আজ তারা চেনাবে না! – গৌরী হাসল। -আচ্ছা শোন, পদ্মার নম্বরটা আমায় পাঠাও প্লিজ।
-আশ্রম কন্যাদের কোনও মোবাইল অ্যালাউড নয়। তবে ও বোধহয় রাস্তা থেকে কারও মোবাইল থেকে ফোন করেছিল আমাকে। এরকমই তখন কী একটা যেন বলল।
-সেই নম্বরটাই পাঠাও। – তারপরই গৌরী আপন মনে বিড়বিড় করে, -পদ্মা সত্যি যদি এখন আশ্রমের বাইরে থাকে, উই ক্যান গেট আ লট মোর ইনফরমেশন। প্রচুর গোপন খবর আমাদের হাতের মুঠোয়।
-কিন্তু পদ্মাকে বাঁচানোটাও তো আমাদের কর্তব্য।
গৌরী মনে মনে হাসে। সুমনা দুঁদে সাংবাদিক, কিন্তু মনটা নরম। নিষ্ঠুর সত্যটা মানতে পারছে না। পদ্মা যদি সত্যিই সন্তান সম্ভবা হয় এবং আশ্রম থেকে বর্তমানে নিখোঁজ হয়, ওর মৃত্যু কেউ আটকাতে পারবে না। ওই আশ্রম বাগানের মাটিতেই ওর দেহ … তবে তার আগে যদি পুলিশের ঘেরাটোপে গিয়ে পড়ে, কিছুদিন নিশ্চিন্ত। তার জন্য ওকে খুঁজে বার করা প্রয়োজন। তারও আগে যাচাই করা জরুরি, খবরটা সত্য কিনা। এটা নতুন কোনও ফাঁদও হতে পারে, সুমনার জন্য। কারণ ওর কাগজ এখন বাবাজীর ও তার সঙ্গে যুক্ত অনেকেরই ঘুম কেড়েছে।
-শোন সুমনা, – গৌরী গলা ঝাড়ে, – তুমি পদ্মার প্রতিটি কল রিসিভ করবে এবং ভয়েস রেকর্ডার অন রাখবে। আশপাশের সাউন্ড থেকে অনেকখানি আঁচ করা সম্ভব, পদ্মা সত্যি এখন রাস্তায় আছে কিনা। যাক, এখন ছাড়ছি, তুমি ভিকিকে সময় দাও।
ফোন ছাড়তেই অন্য আর একটা কল। জ্বালাতন! কিন্তু মোবাইলে তাকিয়েই হেসে ফেলে।
-জিয়ো, ডিয়ার হাজব্যান্ড, এইমাত্র ভাবছিলাম তোমার কথা। – নিজের কথার ধরনে নিজেই অবাক হল গৌরী। সচরাচর এভাবে সে কথা বলে না আজকাল অনুভবের সঙ্গে। আসলে মনটা এখন সামান্য হাল্কা।
-ইজ ইট! মনে করছিলে! কী সৌভাগ্য আমার। এখন কোথায়? – অনুভবের হাসিখুশি গলা।
-বাইরে, এক বন্ধুর সঙ্গে।
অনুভব গলায় একটা মেকি রাগ ফোটায়, ‘বন্ধু না বান্ধবী?’
-আমার কাছে বন্ধু, বন্ধুই। তার কোনও জেন্ডার হয় নাকি?
অনুভব চুপ খানিকক্ষণ, ‘শ্যাল আই জয়েন?’
-সরি, বন্ধুটি এইমাত্র চলে গেল। তোমার সঙ্গে আলাপ করানো যাবে না।
গৌরী মনে মনে খুশি হয়, বহুদিন তাদের মধ্যে এমন হাল্কা মেজাজে কথাবার্তা হয় নি। কিন্তু অনুভবের ফোন হঠাৎ এসময়! ও এখন বাইরে, এটা তো জানার কথা নয়। অন্যান্য দিন এসময় অফিসই ছাড়া হয় না।
আলপিন! গৌরী হেসে ফেলেছিল। ওয়েট মেশিনে দাঁড়াতে ইদানিং ভয় করে। আগে প্রতিদিন সকালে জগিং এ বেরোত, এখন সব বন্ধ। শুতে শুতে এত রাত হয়! গেল মাসে, ওজন করেছিল, আটান্ন। এখন নিশ্চয়ই দশ কেজি অ্যাড হয়েছে।
বটুকদা বহুদিনের লোক। বিয়ের পর বাপের বাড়ি থেকে নিয়ে এসেছে। ও আছে বলেই সংসার সাজানো গোছানো।
-কী হল বল, কোথায় আছো? গাড়ি ঘোরাতে বলি তাহলে। – অনুভবের কথায় হুঁশ ফেরে। এখনও ও লাইনে!
-আমার সঙ্গে তো গাড়ি আছে। – গৌরী বলে।
-ও নাইস। তাহলে বরং আমিই তোমার গাড়িতে একটা লিফট নিই। বল, কোথায় যেতে হবে।
মনে মনে সে হাসে, একেবারে নাছোড়বান্দা যে আজ! অগত্যা রাস্তার নাম জানিয়ে দেয়। মিনিট পনেরোর মধ্যেই অনুভব হাজির। অফিসের গাড়ি ছেড়ে স্ত্রীর পাশে বসল। চেহারায় ক্লান্তি ছাপ, তবু মুখে হাসি। বলে, ‘আহা, কী সুন্দর দেখাচ্ছে গো তোমায়? একেবারে নীলাম্বরি। আমি কিন্তু মনে মনে জেলাস। কে ছিল বন্ধুটি? কেমন দেখতে?
অনুভবের এমন আচরণ সচরাচর চোখে পড়ে না। ইদানিং তো কথাবার্তাও প্রায় গুনে গুনে বলার মতো। ব্রেকফার্স্ট টেবিলে যা একটু দেখা হয়, তারপর সারাদিন যে যার মতো। রাতেও দুজন আলাদা আলাদা ঘরে। গৌরী ব্লু হেভেন নিয়ে এতখানি ব্যস্ত, নিজের স্টাডিতেই ল্যাপটপে কাজ সারে। তারপর ছোট বেডটায় ঘুমিয়ে পড়ে। ঘরে আলো জ্বললে অনুভবের ঘুম আসে না, সেদিক থেকে এ ব্যবস্থাই ভাল।
-তোমার বন্ধুটি কেমন, বললে না তো?
-শী ইজ আ নাইস লেডি।
অনুভব এবার একটা শ্বাস ছাড়ে, ‘যাক বাবা, শান্তি’। কথাগুলোর মধ্যেও একটা অভিনয় আছে, হেসে ফেলল গৌরী। কখনও কখনও ভালোবাসার ভানকেও ভাল লেগে যায়।
– চল, আজ একটু রাতের কলকাতা ঘুরে বাড়ি ফিরি। তুমি টায়ার্ড? তাহলে ছাড়ো, আমি স্টিয়ারিং ধরছি’।
গৌরী মুচকি হাসে, ‘না, আমি কমফর্টেবল। আইডিয়াটা ভাল, কিন্তু যাব কোথায়?’
-প্রথমে, গঙ্গার ঘাট। তারপর আমার সঙ্গে এক জায়গায়।
-এত রাতে গঙ্গার ঘাট!
-চল না। এই নিস্তব্ধতায় গঙ্গার অন্য রূপ। কখনও কোনও মাঝি গান ধরে ওঠে। আমি মাঝে মাঝে এসে গান শুনি। অদ্ভুত সুরগুলো।
গৌরী ঘাড় ফিরিয়ে তাকাল। অনুভবকে কি একটু অন্যরকম লাগছে আজ?
গঙ্গার পার সত্যিই শুনশান। তবে ফটফটে সাদা আলোয় ভেসে যাচ্ছে চারপাশ। দূরে একটা জাহাজ থেমে থেমে ভোঁ দিচ্ছে। শব্দটার প্রতিধ্বনিতে বুকটা কেমন খালি খালি লাগল।
অনুভব হঠাৎ বলে ওঠে, ‘আমি ট্রান্সফারের জন্য একটা প্রেয়ার করলাম আজ। দার্জিলিং চয়েস করেছি, পাহাড় বড় ডাকছে। জানি না, অ্যাপ্রুভ হবে কিনা’।
গৌরীর ভ্রু কুঁচকে যায়! ঝিলমিলপুর তো দার্জিলিং এর খুব কাছে। ইচ্ছে করেই কি অনুভব ওখানে পোস্টিং চাইছে? স্ত্রীকে সাহায্য করা নাকি ব্লু হেভেন মিশনের দায়িত্ব পাওয়ার একটা রাস্তা তৈরি করে রাখা। যদি গৌরী সিনহার অপারেশন অসফল হয়, অনুভবই সেটায় লিড দেবে?
মনে যাই ভাবুক, মুখ খুব স্বাভাবিক রেখেই গৌরী প্রশ্ন করে, ‘তাহলে তোমার বাবা! তোমাকে ছাড়া উনি থাকতে পারবেন?’
যদিও জ্যোতিপ্রিয় সিনহা, একাই থাকেন বালিগঞ্জ প্লেসে নিজের বাড়িতে। শৌখিন মানুষ, ঠাটে বাটে বাস করেন। পয়সার দম্ভ প্রচুর, এই সত্তর পেরোন বয়সেও দু হাতে রোজগার করছেন। নিজের গার্মেন্টসের ব্যবসা। ছেলের বাড়িতে, গুনে বলা যায়, কবার পা রেখেছেন। তবে ছেলেকে না দেখেও থাকতে পারেন না। তাই ঝড়, বৃষ্টি, তুফান, যাই আসুক, অনুভবকে বাবার কাছে পৌঁছতেই হবে শনি রবিতে। নইলে সকাল দশটা পেরোলেই জ্যোতিপ্রিয়র ফোনের পর ফোন।
শ্বশুর মশাইয়ের সঙ্গে মতাদর্শে মেলে না গৌরীর। দুজন দুই মেরুর। তবু বাবা ছেলে সপ্তাহে দুটো দিন একসঙ্গে কাটায়, মানতে কোনও অসুবিধে নেই তার। পাঁচ বছর বয়সে মা-কে হারিয়ে অনুভবের বুকে বাবার জায়গাটা অন্য কেউ নিতে পারে নি।
-এই সব কথা কি খাটে চাকরির জগতে? – অনুভব গৌরীকেই যেন প্রশ্ন করল। -চাকরি ক্ষেত্রে যখন যেখানে টান মারবে, চলে যেতে হবে। বাবাকেও সেটা বুঝতে হবে।
-কিন্তু তুমি তো স্বেচ্ছায় এই বদলি চাইছ! হঠাৎ দার্জিলিং বাছলে কেন? পাহাড় এখন অশান্ত।
অনুভব এক দৃষ্টে তাকিয়ে রইল, ‘তুমিও তো সেধেই এই অশান্তি নিলে। – বলতে বলতে সে হাত ধরে গৌরীর। – এখনও বলছি, কাম ব্যাক। ওই মিশন থেকে বেরিয়ে এসো। এটায় লিড দেওয়া একটা মেয়ের পক্ষে জাস্ট ইমপসিবল। শিবশম্ভু একটা নটোরিয়াস এলিমেন্ট। ঝোঁকের বসে কাজটায় নামছ।
অনুভবের সঙ্গে কথা বলতে বলতেই সে দেখে একটা অচেনা নম্বর বার বার স্ক্রিনে আসছে। ইচ্ছে করেই ধরল না। আজকাল উল্টো পাল্টা নম্বরের উৎপাত বেড়েছে। তবে একবার ট্রু কলারে নাম উঠল, স্মিথ। কে এই স্মিথ? অনুভবের নজর তীক্ষ্ণ। ব্যাপারটা লক্ষ করেই ইশারায় বলল, ছেড়ে দাও, ধরতে হবে না।
গঙ্গার ধার থেকে উঠতে ইচ্ছে করছিল না। এত হাওয়া! দ্বিতীয় হুগলী সেতুর আলোগুলোকে মুক্তার বিন্দুর মতো দেখাচ্ছে! কী অপূর্ব! তবে নদীর জল আজ শান্ত। মাঝিরা বোধহয় বিশ্রামে, কোনও গান নেই। শুধু জলের ছপছপ এক অন্যরকম সুর তুলছে।
অনুভব পিঠে হাত রাখে, ‘জানি শিবশম্ভুর অপারেশনটার সঙ্গে তুমি মানসিক ভাবে জুড়ে আছো, এখন ফেরা মানে …
-হেরে যাওয়া। – অনুভবের অসমাপ্ত কথা গৌরীই শেষ করে। -কোথায় যাওয়ার কথা বলেছিলে, চল, উঠি। বাড়ি ফিরতে হবে তো’।
রাতের কলকাতা, ফাঁকা রাস্তা। হু হু করে গাড়ি ছুটল। থামল একটা ব্রিজের নীচে। সামনে একটা ঝুপড়ি চায়ের দোকান। টিমটিমে কুপির আলো। তার পাশে গাড়ি সারানোর দোকান। এখন ফাঁকা। গৌরী অবাক, এখানে কী?
অনুভব হাসে, ‘আশা আর উষাকে দেখবে এসো’।
-ওরা কারা?
-আমার দুই সন্তান। – অনুভব লাজুক হাসছে।
একটু ধাক্কা খেল গৌরী। কোথাও কি সুক্ষ্ম খোঁচা আছে কথাটায়? কিন্তু অনুভবের খুশি উপচে পড়া চোখ তেমন কুট কিছু খুঁজে পেল না। ও এক মুঠো লজেন্স বার করল পকেট থেকে।
-আশা, ঊষা। – এক সাথে দুটো নাম ধরে হাঁক পারল অনুভব। -কোথায় তোরা?
সঙ্গে সঙ্গে একটা ত্রিপলের ছাউনি থেকে দুটো মিষ্টি মেয়ে ছুটে এল। উচ্চতায় অনুভবের হাঁটুর কাছে। ওর পা দুটোকে বড় গাছের গুড়ির মতো জড়িয়ে আছে, মুখ ঘষছে, নাক ঘষছে, সে কী আদর! অনুভবের মুখেও হাসি, এমন হাসি গৌরী কবে দেখেছে মনে করতে পারল না। শিশুদের ছোঁয়ায় ও-ও যেন আর এক শিশু। ছোট্ট মুঠিগুলোয় ভরে ভরে লজেন্স গুঁজে দিচ্ছে। টুপটাপ দু একটা পড়েও গেল মাটিতে। সেগুলো তুলতে উবু হয়ে বসল দুই বোন মিলে। তারপর জামার কোঁচরে নিয়ে দৌড় ছাউনি ঘরের ভেতর।
গৌরী অবাক, এদের কথা কখনও বল নি তো আগে!
অনুভব চুপ, হাসিটা এখনও আলতো ছুঁয়ে আছে ঠোঁট দুটোয়। -ঘরে ফেরার পথে মাঝে মাঝে দেখে যাই ওদের, কী শান্তি লাগে!
-এদের চিনলে কীভাবে?
-একদিন গাড়ি খারাপ হয়েছিল এখানে, আশা ঊষার বাবা সারাই করে দিল। ভাল মেকানিক। দোকানটা অবশ্য অন্য লোকের। রাজস্থান থেকে পরিবারটা উঠে এসেছে। মা চায়ের দোকানটা চালায়। সারা দিন খদ্দেরের ভাল ভিড় সামলায়। ওরই মধ্যে সন্ধ্যের দিকে গরম গরম রুটি আর একটু গুড় খাইয়ে দেয় মেয়ে দুটোকে। ওরা ফুটপাথের মেঝেতে লাইটপোস্টের নীচে বই খুলে ঢুলে ঢুলে পড়ে। ভাঙাচোরা ওদের এই ভালবাসার সংসারটা কী যে টানে আমায়! বলতে বলতে অনুভব এগোয় গাড়ির দিকে, – চলো। যাওয়া যাক।
বাচ্চা দুটোর মা ছুটে এসেছে। -স্যার, স্যার দোকান সবে বন্ধ করেছি। একটু স্টোভ জ্বেলে দু কাপ চা বানাই?
ঘোমটার আড়ালে ভাল করে মহিলার মুখ দেখা গেল না। তড়িঘড়ি ওরা দুজনেই হাত তুলে নিষেধ করল, ‘আরে না, এই রাত দশটায় চা! অন্যদিন হবে’।
-তাহলে এই টোস্ট বিস্কুট কটা খেতে খেতে চলে যান।
গৌরী হাত বাড়িয়ে নিল, ‘দাও’।
গাড়ি স্টার্ট নিল, দুজনেই অনেকক্ষণ চুপ। অনুভবের ভেতরে যে এমন একটা নরম, তুলতুলে হৃদয় আছে, ভেবেই অবাক গৌরী। এই মানুষটাই মাঝে মাঝে এত কঠিন, কর্কশ একটা লোক হয়ে যায় কীভাবে? কোনও হিনমন্যতায়? উঁহু, তা হওয়ার কথা নয়। দুজনেই পুলিশের পদস্থ অফিসার। দায়িত্ব পূর্ণ জায়গা সামলাচ্ছে।
-চেষ্টা করছি, ওদের বাবার জন্য যদি একটা পাকা চাকরির ব্যবস্থা করা যায়। – অনুভব গাড়ি চালাতে চালাতে বলে। -তবে আগে ওদের একটা ঘরের ব্যবস্থা করতে হবে। এই ফুটপাথে অমন ফুটফুটে দুটো মেয়ে নিয়ে … দিনকাল ভাল নয়। কিন্তু ওদের আত্মমর্যাদাবোধ এত প্রবল, শুধু শুধু কারো দান নেবে না।
গৌরী স্বগতোক্তির মতো বলে ওঠে, ‘আশা, ঊষা। কী সুন্দর নাম দুটো!’
-হ্যাঁ, যেন স্বপ্ন মাখা। – অনুভব বাঁ দিকে বাঁক নিতে নিতে বলে।
গৌরী ফিরে তাকায় স্বামীর দিকে। আজ নতুন করে যেন অনুভব আবিষ্কৃত হল। তবে শিশু বরাবরই ওর প্রিয়। এখানেই একটা কাঁটা মাঝে মাঝে খচখচ বিদ্ধ করে তাকে।
বিয়ের দু বছরের মধ্যেই গৌরী অন্তঃসত্ত্বা হয়। কিন্তু বাচ্চাটাকে রাখা গেল না। ছ মাস পড়তেই মিসক্যারেজড। এরপরেই একটা ট্রমার মধ্যে সে চলে যায়। মনে হত ভবিষ্যতেও বুঝি আবার কোনও দুর্ঘটনা ঘটবে। তাছাড়া ওর যে ধরনের চাকরি, টেনশনের সঙ্গে সহবাস, ওর পক্ষে ভাল মা হওয়া সম্ভব নয়। চিন্তাটা সাঁড়াশির মতো মাথায় চেপে বসছিল, ফলে ঘন ঘন অসুস্থ হওয়া। মনে হত চাকরিটাও রাখতে পারবে না। অনুভবই একদিন সহজ সমাধান খুঁজে দেয়। ওকে বুঝিয়েছিল, ‘সবার জীবনে সব সুখ আসে না। কত মানুষই তো নিঃসন্তান থেকে দিব্যি জীবন কাটিয়ে দিচ্ছে। আমরাও দেব। আমার কাছে সুখ মানে তোমার আমার ভাল থাকা’।
এ ব্যাপারে অবশ্য গৌরীর আত্মীয়স্বজনরা এক সমুদ্র জ্ঞান দিতে ছাড়ে নি, আহা অনুভবের কত বড় মন। স্ত্রীর জন্য কত বড় স্যাক্রিফাইস।
বাড়ি ফিরে ফ্রেশ হয়ে মোবাইল হাত নিতেই দেখে তিনটে মিসড কল। কই, টের পেল না তো! ট্রু কলারে, সেই স্মিথ। তাড়াতাড়ি ফোন লাগাতেই শুনল, সুইচড অফ।
মেসেজ নয়, সুমনা ফোনই করে বসল, মুখে একটা নিস্তেজ হাসি, ‘হ্যাঁ। ওই একরকম কাটল। তোমাকে অনেকবার ধরার চেষ্টা করেছি গৌরী, কাল রাতে। রিং হল, বাট নো রেসপন্স। ভিকির নম্বর ছিল ওটা। হয়তো বোঝ নি। আমার ফোন হ্যাংগ হয়ে গিয়েছিল।
-আমাকে! – গৌরী ভ্রু কুঁচকে ভাবার চেষ্টা করে, ‘আচ্ছা, স্মিথ বলে কি …
-হ্যাঁ, ভিকি স্মিথ। আমার হাজব্যান্ড। সরি এক্স।
গৌরী হেসে উঠল, ‘এক্সটাকে সরিয়ে ফেলা যায় না?’
-না। আমরা দুটো সমান্তরাল রেখা। প্যারালাল লাইন। পাশাপাশি চলব, কিন্তু কেউ কারোর সঙ্গে মিলতে পারব না। ওটাই ডেস্টিনি। মেনে নিয়েছি। এখন অসুবিধা হয় না। তাছাড়া ভিকির পরিবার চাপ দিচ্ছে বিয়ের। – সুমনা হেসে উঠল কথার মাঝখানে, ‘আমি অবশ্য বলেছি, তোমার ফার্স্ট লাভ কিন্তু আমিই থেকে যাব’।
গৌরী গালে হাত দিয়ে শুনছে। শুনতে শুনতে যেন দেখতে পাচ্ছে সুমনার দু চোখেই দুটো অশ্রু বিন্দু থমকে আছে। যে কোনও মুহূর্তে ঝরে যাবে।
-এনিওয়ে, শোন কাজের কথা বলি। পদ্মা আরও দুবার ফোন করে ফেলেছে। আমি ভাবছি, আজ কিংবা কালই রওনা দেব দার্জিলিং। ওকে বাঁচাতেই হবে।
গৌরীর ভ্রু দুটো কুঁচকে গেল, ‘খবরদার না। তুমি যাবে না একা। তুমি ওর ঠিকানাটা দাও, আমি রেসকিউ করার ব্যবস্থা করছি।
-কিন্তু ও তো ঠিকানাটা বলতে পারছে না। রাস্তাঘাট ওদিকের ভাল চেনে না।
গৌরী কথাগুলো শুনতে শুনতে একটা হিসেব ভেতরে ভেতরে করে চলে। একটা গোটা দিন কাটিয়ে দিল পদ্মা, কিন্তু কোথায় আছে, নিজেই বুঝতে পারছে না। বার বার ফোনগুলো তাহলে আসছে কোথ থেকে? সুমনার এত তীক্ষ্ণ বুদ্ধি, অথচ এই মুহূর্তে নিজেকে হারিয়ে ফেলেছে। দার্জিলিং যাওয়ার জন্য উঠে পড়ে লেগেছে।
-শোন গৌরী, আমি তোমায় পদ্মার নম্বরটা দিচ্ছি। দেখো তো, একটু কথা বলে।
-ওকে, দাও।
এস এম এসে নম্বরগুলো পৌঁছতেই সে ভাল ভাবে নিরীক্ষণ করল। একই নম্বর দু তিন জায়গায় রিপিট হয়েছে কেন? তার মানে পদ্মা এইসব জায়গা থেকে বার বার ফোন করেছে। বিষয়টা খুব একটা সরল মনে হল না।
আপন মনেই মাথা দোলাতে থাকে সে। সুমনা ইজ আন্ডার ট্র্যাপ। ওর জন্য ফাঁদ পাতা হচ্ছে। যেভাবেই হোক ওকে দার্জিলিং বা ঝিলমিলপুরের দিকে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা হচ্ছে, তারপর … কিন্তু কেন? ওর পত্রিকা বাবাজী এবং তার সঙ্গে যুক্ত অনেকের হাল হকিকত জানিয়ে দিচ্ছে, এর প্রতিশোধে। গৌরী মনে মনে ঠিক করে ফেলে, সুমনাকে বাঁচানোও এখন একটা অবশ্য কর্তব্য বিষয় হয়ে গেল।