সাপ্তাহিক ধারাবাহিকে রূপক সামন্ত (পর্ব – ৩)
হরেক পেশা, অবাক নাম – ৩
কুলাচার্য বা ঘটক
সুপ্রাচীন কাল থেকে ভারতীয় জনসমাজ আর্য এবং অনার্য -এই দুই মূল শ্রেণীতে বিবক্ত ছিল। বঙ্গদেশেও তার ব্যতিক্রম ঘটে নি। ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য- এই তিন বর্ণ নিয়ে গঠিত ছিল আর্যসমাজ। আর্যরা রক্তের বিশুদ্ধতা বজায় রাখতে বিশেষ যত্নশীল ছিলেন। আপন বংশমর্যাদা ও গৌরব-গাথা রক্ষা করা ছিল তাঁদের বৈশিষ্ট্য। বেদসংহিতার নারাশংসী গাথায় ব্যক্তিগত আদি ইতিহাসের অঙ্কুর লক্ষিত হয়, তেমনই বেদের ব্রাহ্মণাংশে ও কুলকীর্তি প্রসঙ্গে বংশবিবরণ বিবৃত হয়েছে। বিবাহাদি মাঙ্গলিক ক্রিয়াকর্মে অভিজাতগণ স্ব-স্ব কুলপরিচয় ও বংশের ইতিহাস কীর্তন করতেন। আর্যসমাজে স্বগোত্রে বিবাহ নিষিদ্ধ ছিল। সেকারণে বিবাহসভায় উভয়পক্ষকে আপন গোত্রও উল্লেখ করতে হত। বেদের সময় থেকেই এই প্রথা লক্ষিত হয়। রামায়ণে রাম-সীতার বিবাহসভায় দশরথের কুলপুরোহিত বশিষ্ঠ বরপক্ষের এবং স্বয়ং রাজা জনক কন্যাপক্ষের আদ্যন্ত কুলকীর্তন করেছিলেন।—
এবং ব্রুবাণঃ জনকঃ প্রত্যুবাচ কৃতাঞ্জলিঃ।
শ্রোতুমহসি ভদ্রং তে কুলং নঃ পরিকীর্ত্তিতম।।
প্রদানে হি মুনিশ্রেষ্ঠ কুলং নিরবশেষতঃ।
বক্তব্যং কুলজাতেন তন্নিবোধ মহামতে।।
(রামায়ণ ১/৭১/১০২)
–বশিষ্ঠ এই প্রকার বলিলে রাজা জনক কৃতাঞ্জলি হইয়া তাঁহাকে বলিলেন, হে মুনিশ্রেষ্ঠ! মহামতে! কন্যাদানকালে সদ্বংশজাত ব্যক্তির আদ্যন্ত কুলকীর্তন করা উচিত, তাই আমি কীর্তন করিতেছি, অবধান করুন।
মহাভারতেও দেখা যায় যে উলুপী অর্জুনকে নাগরাজ্যে নিয়ে গিয়ে বিবাহের ইচ্ছা প্রকাশের সাথে সাথে আপন কুল ও বংশগৌরব কীর্তন করছেন। কুলকীর্তনের এরকম অনেক উদাহরণ মহাভারতে আছে। বিভিন্ন পুরাণেও চন্দ্রবংশ, সূর্যবংশ প্রভৃতির দীর্ঘতালিকা ও গৌরবগাথা দেখা যায়।
জৈন ও বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীগণও বংশানুচরিতের আবশ্যকতা বুঝেছেন। বেদ ও রামায়ণের যুগে কেবলমাত্র রাজা ও ঋষিগণের বংশানুচরিত লেখা হত। বৌদ্ধযুগে কিন্তু অভিজাত আর্যসন্তান মাত্রই আপন বংশানুচরিত এবং স্ব স্ব আচার্য বা গুরুপরম্পরা লিপিবদ্ধ করা অবশ্যকর্তব্য বলে মনে করতেন। কে কোন বংশে জন্মেছেন, কোথা থেকে এসেছেন, কে কার পরিবারভুক্ত, কে কোন গুরুর শিষ্য, কে কোন মতাবলম্বী — এসব তথ্যাদি বিশদে লিপিবদ্ধ করা হয়েছে। নানা প্রাচীন গ্রন্থ, শিলালেখ, তাম্রশাসন ইত্যাদিতেও কুলপরিচয় লিপিবদ্ধ হয়েছে। কোন বংশ কুলদীপক, কোন বংশ কুলাঙ্গার–এসকলও লিপিবদ্ধ হয়েছে। এই কুলপরিচয় ও বংশতালিকাগুলি হল ভারতবর্ষের সামাজিক ইতিহাসের অমূল্য দলিল। আধুনিককালেও অনেক শিক্ষিত বনেদি বাড়িতে বংশতালিকা আছে ও বংশের গৌরবেতিহাস কিছুকিছু রচিত হয়েছে। কিছু গবেষণাকর্মও হয়েছে এবং হচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, জোড়াসাঁকোর ঠাকুর পরিবারের ইতিহাস, বর্ধমান রাজবংশের ইতিহাস, বিষ্ণুপুর মল্লরাজবংশের ইতিহাস, হুগলির জেজুরের মিত্রবংশের ইতিহাস–ইত্যাদি ইত্যাদি। আজও, এই প্রজাপতি নিবন্ধন অফিস, কাগজের বিজ্ঞাপন, ম্যাট্রিমোনিয়াল সাইট-এর যুগেও বিবাহকার্যের আলোচনায় বংশ ও গোত্র সর্বাধিক গুরুত্ব পায়। আজও স্বগোত্রে বিবাহ নিষিদ্ধ, যদিও প্রেমজ বিবাহ কারণে অনেকসময়ই এই নিষেধ মানা সম্ভব হয় না।
রাজা বল্লালসেন তাঁর রাজত্বকালে (১১১৯-১১৬৯ খ্রি.) সমাজসংস্কার করে কুলবিধি প্রচলন করেন। এইসময় থেকেই ‘কুলাচার্য’ নিয়োগের ব্যবস্থা হয়। তার আগে কুলপুরোহিত ও কুলবৃদ্ধগণ কুলপরিচয় লিখে রাখতেন। কুলগৌরব কীর্তন যাঁরা করতেন তাঁদের বলা হত ‘ভাট’। বর্তমানে ভাট শব্দটি নিতান্ত অবজ্ঞাসূচক (যেমন-বেশি ভাট বকিস না।) শব্দে পরিণত হলেও সেইসময়ে ভাটগণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করতেন। সম্ভ্রান্ত ও মান্যগণ্য ব্যক্তির আবাসে বিবাহ বা শ্রাদ্ধকার্যে ভাটগণ এসে কর্মকর্তার কুলগৌরব কীর্তন করতেন। বল্লালসেন প্রবর্তিত কুলাচার্য নিয়োগের ব্যবস্থা হওয়ার পর ভাটদের কাজটা মোটামুটি এক থাকলেও বংশানুচরিত ও কুলমহিমা লেখার কাজ থেকে কুলপুরোহিত ও কুলবৃদ্ধগণ রেহাই পেলেন। বিবাহকালে কেবল তিনপুরুষের পরিচয় দেবার রীতি চালু হল। আজও বিবাহে, শ্রাদ্ধে, পূজাপাঠে তিনপুরুষের নামোল্লেখের রীতি প্রচলিত আছে।
এই কুলাচার্যগণের অপর নাম ‘ঘটক’। গৌড়বঙ্গের ব্রাহ্মণ ও কায়স্থ -উভয় সমাজেই সামাজিক ও পারিবারিক গৌরবরক্ষার জন্য প্রত্যেক পরিবারের কার্যকলাপের ও নিয়মনীতির উপর দৃষ্টি রাখা ও তা লিপিবদ্ধ করাই কুলাচার্যগণের একমাত্র উপজীবিকা ও কর্তব্যকার্য হয়ে উঠল। এঁদের রচিত গ্রন্থই ‘কুলপঞ্জিকা’ নামে অভিহিত হত। কুলগ্রন্থে লিখিত আছে—
অংশ বংশং ততা দোষং যে জানন্তি মহাজনাঃ।
ত এব ঘটকা জেয়া ন নামগ্রহণাৎ পুনঃ।।
–যে মহাজনগণ আদান প্রদানাদি সম্বন্ধনির্ণয়, পূর্বাপর বংশাবলি এবং প্রত্যেক কুলের দোষ অবগত আছেন, তাঁহারাই প্রকৃত ঘটক, কেবল ঘটক নাম লইলেই ঘটক হয় না।–
প্রত্যেক সামাজিক কাজে কুলাচার্য বা ঘটক এবং কুলপঞ্জিকার প্রয়োজন হত। তখন সমাজতত্ত্বজ্ঞ জ্ঞানী ও ধার্মিক ব্যক্তিগণকেই এই পদে নিয়োগ করা হত। ব্রাহ্মণ ও কায়স্থ উভয় সমাজেই কুলাচার্য বা ঘটকের বিশেষ প্রভাব প্রতিপত্তি ছিল। সামাজিক রীতিনীতি প্রণয়নে ও দণ্ডবিধানে এঁরাই শাসনকর্তার ও সমাজপতিদের ডানহাত ছিলেন। এঁরা ছিলেন কুল-বিষয়ক উপদেষ্টা। প্রতিটি পরিবারই আপন বংশের মর্যাদা রক্ষায় বিশেষ যত্নবান হতেন। নতুবা সমাজে তাঁর কুল পতিত হত।
কয়েকবছর আগেও কোনও পরিবারে বিবাহযোগ্য যুবক বা বিবাহযোগ্যা কন্যা থাকলে ঘটকঠাকুর বগলে খেরোর খাতা নিয়ে হাজির হতেন। ওই খেরোর খাতায় বিবাহযোগ্য / যোগ্যা পাত্র ও কন্যার বংশের ঠিকুজি কুলুজি লেখা থাকত। অনেকসময় পরিবার থেকেই ঘটক নিয়োগ করা হত। ঘটক পাত্র বা কন্যার বংশের গুণাবলী কীর্তন করতেন। যদি সম্বন্ধ দৌত্য কার্যকরী হত, তখন এই ঘটকঠাকুরই দেনাপাওনা নিয়ে মধ্যস্থতা করতেন। বিবাহ সম্পন্ন হলে আসত ঘটকবিদায়ের পালা। প্রায়শঃ এই বিদায় নিয়ে ঘটকের সঙ্গে কর্মকর্তার বিবাদ ঝগড়া হত। আজও গ্রামেগঞ্জে এই ঘটকদের দেখতে পাওয়া যায়। আজও বিবাহের নমস্কারী দেওয়ার সময় ঘটকের জন্য জামাকাপড়ের ব্যবস্থা রাখা হয়।
প্রাচীনকালে সামাজিক অনুষ্ঠানে, বিশেষ বিবাহসভায় সকলকে ডেকে, গান গেয়ে, কুলগাথা শোনানোর যে প্রথা ছিল তাকে বলা হত ‘ডাক’। যেহেতু ডাকগুলি সাধারণের উপস্থিতিতে শোনানো হত সেহেতু এগুলিতে যথাযথ বংশেতিহাস রক্ষিত হত। বাড়িয়ে বা খর্ব করে কিছু বলা সম্ভব হত না। প্রাচীন এই ডাকএর অনুকরণে বা আদর্শে আধুনিক ডাক বা ডাকুর বা ঢাকুর বা ঢাকুরি অভিধায় কুলগ্রন্থগুলি রচিত হত। এগুলি বাংলা সাহিত্যেরও আদি নিদর্শন। সেকালের সমাজচিত্রের আদি আকরগ্রন্থ। ডাকগাথার মতই ঢাকুরগুলিও সভামন্ডপে গীত হত। কুলাচার্যগণ সমবেতকণ্ঠে কবির সুরে এগুলি গাইতেন।
তথ্যসূত্র- নগেন্দ্রনাথ বসু প্রাচ্যবিদ্যামহার্ণব সিদ্ধান্তবারিধি; ‘বঙ্গের জাতীয় ইতিহাস’ (রাজন্যকাণ্ড, কায়স্থ কাণ্ডের প্রথমাংশ)