সাপ্তাহিক ধারাবাহিকে চার অক্ষর (পর্ব – ২)

রাজপুত্রের গল্প

আগে যা হয়েছে –
প্রেমে ব্যর্থ রাজপুত্র বুকের হতাশা কে বগলদাবা করে নিজের ব্রহ্মাণ্ড ছেড়ে রওনা হয় মিমাসের উদ্দেশ্যে। যাত্রা কালীন সে ও তার গোলাপি স্পেস শিপ ভুল করে অদ্ভুত এক ব্ল্যাক হোলের ভেতর ঢুকে পরে। ব্ল্যাক হোল নিজেকে কৃষ্ণদা বলে পরিচয় দেয় এবং রাজপুত্র কে প্রশ্নে প্রশ্নে জেরবার করে দেয়। রাজপুত্র কৃষ্ণদা-র কাছে প্রতিজ্ঞা করে সে কোন দিন আর বোর হবে না, কৃষ্ণদা সেই শুনে রাজপুত্রকে মুক্তি দেয়… হয়ত দয়া করেই…
চৈতন্য যেমন মাঝে মধ্যে চলে যান তেমনি ফিরেও আসেন। কিন্তু ফিরে এসে তাঁর গুছিয়ে বসতে একটু সময় লাগে বইকি। ব্ল্যাক হোলের ভেতর থেকে বেরিয়ে রাজপুত্রের মুণ্ডু ভোঁভোঁ করছিল। এটা হচ্ছে চৈতন্য থাকা আর না থাকার মাঝামাঝি একটা অবস্থা, অনেকটা সেই নেশা কেটে যাবার পর হ্যাং ওভারের মত। রাজপুত্র থম মেরে ককপিটের পুটি পুটি আলোর দিকে তাকিয়ে ছিল চুপচাপ। খপ্পরে পড়া তো দুরস্থান, রাজপুত্র তার বাবার জন্মে কথা বলা ব্ল্যাক হোলের কথা শোনেনি কোনোদিন। ভয়াবহ রকমের ইউনিক অভিজ্ঞতা। রাজপুত্রের ঘিলুর একাংশ ভাবছিল এ হয়ত নিছকই দুঃস্বপ্ন কিন্তু একটু মঝারি রকম বুদ্ধিমান হবার মুশকিল হল চট করে নিজেকে প্রবোধ দেওয়া যায় না। স্বপ্ন শেষে খুঁটিনাটি ডিটেলিং এতো স্পষ্ট মনে থাকার দুটো মাত্র মানে দাঁড়ায়, হয় অভিজ্ঞতাটা আদৌ স্বপ্ন নয়, রীতিমত বাস্তব নয়ত দেখনেওয়ালা আর মনে রাখনেওয়ালা অভিন্ন এবং পুরোদস্তুর উন্মাদ। রাজপুত্র মদের বোতলে একটা বড় ঢোক মেরে নাকমুখ কুঁচকে নিজেকে এই প্রশ্নটাই করে- “আমি কি পাগল?” এবং প্রত্যুত্তর না পেয়ে সে সামান্য নিশ্চিন্ত বোধ করে যদিও সেই নিশ্চিন্তি ক্ষণিকের।
রাজপুত্র ভেবেছিল মিমাস জনশূন্য হবে। কিন্তু মিমাসের বায়ুমণ্ডলে ঢুকতেই তার গোলাপি স্পেসশিপের কমপিউটার রাজপুত্রের সেই প্রত্যাশায় হুড়ুম করে এক বালতি জল ঢেলে দিল। রাজপুত্র মনিটরে দিব্যি দেখতে পেল মিমাসের ছাই ছাই পিঠ জুড়ে উল্টানো বাটির মত সাদা সাদা ঘর বাড়ি। আকৃতি যদিও সবগুলোর এক নয় কিন্তু এটা অন্তত পরিষ্কার, এগুলো প্রকৃতির-ও নয়। মিনিট খানেকের মধ্যেই স্পেস শিপের বেতারে প্যাঁপো, ফ্রিচ-স্ক্রিচ করে প্রচুর আওয়াজ আসতে শুরু করল সেগুলোর কম্পুনুবাদ হচ্ছে “ওড়া বারণ” “কে তুমি উটকো?” “পরিচয় দাও নয়ত ভুট্টিনাশ” এদিকে রাজপুত্রের অবস্থাও কহতব্য নয়, এতটা লং জার্নি করে কোথায় একটু শান্ত নিরিবিলি জায়গা জুটবে তা নয়, উল্টে এখন জীবন নিয়ে হা ডু ডু। ভাষা স্ক্যান করার পর কম্পিউটার রাজপুত্রকে তড়িঘড়ি জানালো এটা বাকুদের মাদারটাং। বাকুরা ব্রহ্মাণ্ডের প্রাচীন উপজাতি সম্ভবত তাদের কৃত্রিম ভাবে তৈরি করা হয়েছিল যুদ্ধে কাজে লাগানোর জন্য কিন্তু সভ্যতা যত উন্নত হতে শুরু করে দু এক পিস যুদ্ধবাজ মড়া খেগো জাতি বাদ দিয়ে মোটামুটি সব উন্নত প্রজাতির প্রাণীরাই নিজেদের মধ্যে আজকাল শান্তি চুক্তি করে ফেলেছে আর সেই কারণে বাকুদের কথা সেরকম একটা শোনা যায় না। তাদের কে তৈরি করেছিল সেটাও বেশ ধোঁয়াশাপূর্ণ আর বাকুরাও নিজেদের সংস্কৃতি ইত্যাদি নিয়ে চিরকালই একটু বেশী রকম প্রাইভেট লিমিটেড। রাজপুত্র তাই বেশি খুটুর পুটুর না করে যতটা সম্ভব দিকভ্রান্ত ছাগল যাযাবর সাজা যায় ততটা সাদা রুমাল নাড়াতে নাড়াতে মিমাসে নিজের স্পেস শিপ কে নামাতে সক্ষম হল।
স্পেসশিপ থেকে রাজপুত্র বেরিয়েই দেখতে পেল তিনজন বাকু দাঁড়িয়ে আছে। সবার হাতে একটা করে চোঙার মতন অস্ত্র । বাকুরা মোটামুটি আট থেকে দশ ফুট সাইজের স্কন্ধকাটা হুমদো দৈত্য বিশেষ। তাঁদের মুণ্ডু এবং গলা নেই। তিনটে কালো চোখ চৌকো বুকে আটকানো। নাক এবং মুখের কাজ সম্ভবত চোখের তলার বড় ফুটোটাই করে। হাত পা বেশ দসাশই। গায়ের রং কালচে বেগুনী। সেরকম কিছু পুরুষ নারীর ভেদাভেদ আছে কি নেই বোঝা গেলনা কারণ তিনজন বাকুই ঊর্ধ্বাঙ্গে বস্তা, কোমরে বেল্ট আর তলায় ফ্রক জাতীয় কিছু পড়ে আছে। বাকুরা তাদের ভয়ানক রকমের কদাকার চেহারার জন্য ব্রহ্মাণ্ডে বেশ জনপ্রিয়। রাজপুত্রের এতক্ষণে মনে এলো ছোটবেলায় তার একটা খেলনা বাকু ছিল যদিও সেটার রং ছিল ঘন নীল আর বুকে আটকানো ছিল লাল আলো বেরোনো তিন পিস চোখ। খেলনা গণ্ডার আর জ্যান্ত গণ্ডারের মধ্যে যতটা পার্থক্য বাকুদের ক্ষেত্রে সেটা তার থেকেও পাঁচগুণ বেশি পিলেচমকানিয়া তাই অমন তিন পিস জীবন্ত বিভীষিকা দেখে আপনা থেকেই রাজপুত্র মাথার ওপরে নিজের দুহাত তুলে চুপচাপ আত্মসমর্পণ করে ফেলল। স্পেসশিপের ঢালু সিঁড়ি বেয়ে নামবার সময় মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা বাকুর থেকেই প্রথম আদেশ আসলো “উটকো লোক… সাবধান… হাত নীচে।” রাজপুত্র একটু হাসার চেষ্টা করে হাত নামালো। হাতে থাকা চোঙ নাড়িয়ে বাকু রাজপুত্র কে এগোতে বলল। মুণ্ডু না থাকার ফলে রাজপুত্রের বাকু দের দিকে তাকাতে অসুবিধা হচ্ছিল কারণ চোখের দিকে তাকাতে গেলে বাকুদের বুকের দিকে তাকাতে হয় আর প্যাট প্যাট করে বুকের দিকে তাকিয়ে থাকার মধ্যে একধরণের অশালীনতা কাজ করে তাও কোন রকমে আমতা আমতা করে রাজপুত্র বাকুকেই জিগ্যেস করলো তার স্পেসশিপের কি হবে? বাকু রা নিজেদের মধ্যে মুখ চাওয়া চাওয়ি করে রাজপুত্র কে গোটা কয়েক শব্দ বললো যে গুলো জড়ো করলে এরকম শোনায় “এখন উটকোলোক চলো আকাশযান থাক ”
বাকুদের সঙ্গে রাজপুত্র কিছুটা হেঁটে শহরে ঢুকলো। রাস্তার দু পাশে ছড়ানো ছেটানো ছোটো বড় উল্টো বাটির মতো বাকু নিবাস, বাকু ভবন আর তাদের গায়ে মাথায় বিশাল বিশাল পাইপ আর সেগুলোর সঙ্গে সাঁটানো কিম্ভুত দেখতে যন্ত্র। কিছুক্ষণ এগিয়ে তিন বাকু আর রাজপুত্র অপেক্ষাকৃত ঢ্যাপা একটা বাড়ির মধ্যে ঢুকল। ঢুকেই রাজপুত্র দেখতে পেল প্রায় গোটা তিরিশেক বাকু বিশাল বিশাল মোড়াতে বসে। আর একটু উঁচু জায়গায় চেয়ারের মতন কিছু একটাতে একজন দৈত্যাকৃতি বাকু জুলজুল করে তার দিকে তাকিয়ে। রাজপুত্র খেয়াল করলো চেয়ারে বসা জাম্বো বাকুর গায়ের রঙ বেগুনী নয়, ঘন নীল! রাজপুত্রকে অবাক করে নীল বাকু পরিষ্কার কাটা কাটা শব্দে বলে উঠলো – “উটকো মানুষ, তুমি কোথা থেকে এখানে এসেছ? কি তোমার উদ্দেশ্য”
উত্তর মুখ থেকে বেরোনোর আগে এক সেকেন্ডের জন্য রাজপুত্রের মাথার ভেতর রাজকন্যার মুখটা ভেসে উঠলো। একটু গুছিয়ে নিয়ে রাজপুত্র তার পাঁচালি শুরু করলো। তার পারিবারিক ঘুগনির ব্যবসা । তার সংসারের প্রতি অনীহা, মিমাসকে নিরিবিলি জায়গা ভেবে ফেলবার ভ্রম এই সব বলে ব্ল্যাক হোলের কথা পাড়তেই রাজপুত্র দেখলো জাম্বো বাকু নড়ে চড়ে উঠলো আর প্রায় সঙ্গে সঙ্গে গোটা ঘরে বাকি বাকুদের মধ্যে রীতিমত গুঞ্জন পরে গেল।

ক্রমশ…

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।