সাপ্তাহিক ধারাবাহিকে অর্ঘ্য রায় চৌধুরী (পর্ব – ৯)

মুনকে লেখা চিঠিগুলোর থেকে

(নয়)

মুন,
সেই অবিরল বর্ষার মধ্যে আমি আর বিঠঠল গৃহবন্দী হয়ে পড়লাম।সারাটাদিন ওই বর্ষনমুখর বনের দিকে তাকিয়ে বসে থাকি।বৃষ্টি এক নাগাড়ে পড়েই চলে আর দূর দিগন্ত ঢেকে যায় মেঘে।পাহাড় ক্রমশ মেঘবর্ণ ধারন করল, আর আমার ভানুসিংহের পদাবলীর অসাধারণ সেই লাইনটার কথা মনে পড়ে গেল
“মেঘবরণ তুঝ মেঘ জটাজুট
রক্তকমলকর রক্ত অধরপুট…”
ওই উত্তুঙ্গ পর্বতশ্রেণী, ওই গভীর বনের ভেতর, মেঘমল্লার তার ভাবগম্ভীর মাধুর্যে বেজে চলল, আর বন পাহাড় সেই ধ্রূপদী সঙ্গীতের একনিষ্ঠ শ্রোতা, সেই সঙ্গীতে নিমগ্ন হয়ে রইল।সে সঙ্গীত আমার শ্রবণকেও সমৃদ্ধ করেছে।
মুন, প্রকৃতি এক অপূর্ব ক্যানভাস।যদি কখনও ওই বন পাহাড়ে যাও, দেখবে এক অদৃশ্য শিল্পী এক অনন্য তুলিতে এঁকে চলেছেন অসাধারণ সমস্ত ছবি।সেই ছবি সকলের অগোচরে ফুটে ওঠে, মুছে যায়, তাকে দেখার চোখ খুব কম মানুষেরই থাকে।
সেই শিল্পী সব শিল্পীর সেরা শিল্পী।তাঁর ওই সৃষ্টির সামনে মানুষ বিস্ময়ে বাকরহিত হয়ে যায়।
তোমার সঙ্গে আমার এসব বনের পথে যাওয়ার কথা ছিল।যাওয়া হয়নি কখনও।
মুন, ওই বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতেই দুজন একদিন বেরিয়েছিলাম।সামনের উঁচু পাহাড়ের ধাপ বেয়ে কিছুটা উঠে একটা ছোট্ট প্রাকৃতিক কূয়োর মতো আছে।তারপর পাহাড় জঙ্গল, ওপরে উঠলে সমস্ত উপত্যকাটা চোখে পড়ে, সুদূরে নীরাও, দেখলাম নীরার ওপর সেই কাঠের সাঁকোটা পুরোপুরি জলে ডুবে গেছে।দূউরে তোর্ণা দূর্গের প্রাকারটা শুধু দেখা গেল।তারপর আস্তে আস্তে সেই দূর্গপ্রাকার ঢেকে গেল মেঘে।ডানদিকের পাহাড় ভেদ করে একটা অস্থায়ী ঝর্ণা নেমে এসেছে।সেই ঝর্নার জল যেখানে এসে পড়েছে, তার পাশেই ফুটে আছে একগুচ্ছ নীল ফুল, সেই ফুলের নাম বিঠঠলকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, বিঠঠল বলল “কুসমী।” বললাম, যাই নিয়ে আসি।বিঠঠল না করল, ওই ফুলের ঝোপে এক ধরনের ছত্রাক জন্মায়, তাই ওই ফুল হাতে নিলে হাত লাল হয়ে ফুলে ওঠে।
শুধু শোভা দেখার জন্যই ওই ফুল।ওই ছত্রাক ওদের আত্মরক্ষার অস্ত্র। না হলে আমার মতো শহুরে লোকেরা ওদের ঠিক তুলে নিয়ে আসত।
এখন মাঝেমাঝে মনে হয়, সত্যিই, ফুল তার বৃন্তে যত সুন্দর তত সুন্দর আর কোত্থাও না।
হঠাৎ একটা ময়ূর উন্মত্ত কেকাধ্বনি করতে করতে একটু দূর থেকে ছুটে গেল।তার সঙ্গিনীও তাকে সাড়া দিল।আমরা যেখানে দাঁড়িয়েছিলাম সেখান থেকে পরিষ্কার বনের ভেতর একটু ফাঁকা জায়গা চোখে পড়ে।দেখলাম ময়ূরটা তার সম্পূর্ণ পেখম মেলে দাঁড়িয়েছে।বিরাট পেখম কেঁপে কেঁপে উঠতে লাগল, সমস্ত জঙ্গল যেন মোহিত হয়ে সেই ময়ূর ময়ূরীকে দেখে চলল।সেই রঙীন পেখম তার অপূর্ব উদ্ভাসে সমস্ত বনাঞ্চলকে এক আশ্চর্য প্রভায় ভরিয়ে তুলল।আমরা দুজন ভিজতে ভিজতে দেখে চললাম সেই বৃষ্টিস্নাত অভিসার।ওই ময়ূর তার ময়ূরীকে নিয়ে ক্রমশ গভীর বনের ভেতরে চলে গেল।মনে হল এক বলিষ্ঠ লাবণ্যময় পুরুষ তার অপরূপ সুন্দরী প্রেয়সীকে বাহুলগ্ন করে নিভৃত কুঞ্জপথে হারিয়ে গেল।
আমরা দুজন নেমে এলাম ওই পার্বত্য পথ বেয়ে।মেঘগর্জনের সঙ্গে সমস্ত আকাশ তার প্রিয়তমা প্রকৃতির সঙ্গে প্রেমালাপ করেই চলল।আর বিঠঠলের সেই পাতার ঘরে সেই আমরা দুজন বৃষ্টিভেজা বনের সম্মোহনে মোহিত হয়ে রইলাম।

চন্দ্রতাড়িত।

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।