সাপ্তাহিক ধারাবাহিকে অর্ঘ্য রায় চৌধুরী (পর্ব – ৫)

মুনকে লেখা চিঠিগুলোর থেকে

(পাঁচ)

মুন,
সহ্যাদ্রীর গভীরে সেইসব বৃষ্টিপাতের রাতে বিঠঠলের রুক্মিনীর কথা মনে পড়ত।আমাকে বলত, তাম্বাড গ্রাম থেকে ও রুক্মিনীকে বিয়ে করে এনেছিল।বিয়েতে ও একটা সাইকেল পেয়েছিল।কিন্তু ওই গভীর বন পাহাড়ে, যেখানে পথ বলতে পায়ে চলা রূক্ষ পাথুরে মাটি, সেখানে সেই সাইকেল চালাবে কোথায়? তাও দুয়েকবার চেষ্টা করেছিল।তারপর অসহনীয় দারিদ্রের তাড়নায় সেই সাইকেল বিক্রি করে দিয়েছে।জানো, কত টাকায়? মাত্র তিনশো।ওই টাকাটাই ওখানে অনেক।ওদের তাতে বেশ কটাদিন বড়লোকি চালে কেটেছিল।রূক্মীনি আর ওর সেই সংসার, কিকউয়ী গ্রামের একপ্রান্তে।সে বনের ভেতর ছিল ওদের লুকোচুরি খেলার সময়, ওরা কাঠ কুড়াতে যেত নীরা পার হয়ে সিংহগড়ের পথে।বন পাহাড়ের গভীরে, যেখানে প্রকৃতি সততই আদিম।যেখানে সমস্তটুকুই আবরনহীন তাই সহজ, সেইখানে ছিল ওদের যৌথ জীবন, বিঠঠল গেয়ে উঠত
“ওওও হোওওও,
তু খুপ ছান আহে রে,
তুলা মুহ খুপ ছান।”
মুন সেই বন্য সুর, নিথর সেসব বৃষ্টিঝরা রাতের অলিন্দে প্রতিধ্বনিত হত পাহাড়ে পাহাড়ে।আর বিঠঠল, সেই বন্ধু আমার, আমার সহ্যাদ্রীর পরমাত্মীয় কিছুক্ষণ পর তার ছেড়ে যাওয়া স্ত্রীকে মনে করে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলত, “রাত হোলা রাজে, জোপলা নাহি কা তুম্হি?” রাত হল রাজা, ঘুমাবে না তুমি? ওরা যাকে ভালবাসে, শিবাজীর কথা মনে রেখে তাকেও রাজা বলে ডাকে।
মুন, সেই সেই রাতগুলো আমি এক বিরহী প্রেমিকের পাশে জেগে থেকেছি।ওই উপত্যকার বুকে বিনিদ্র রাতের মতো জেগে থেকেছি, আর মনে হয়েছে রুক্মিনীর মনে পড়ে না বিঠঠলকে?
বিঠঠল বলত, পুনে থেকে একটা ছেলে, চুড়ি বিক্রি করতে আসত ওদের গ্রামে।লাল, সবুজ কাচের চুড়ি, মারাঠি মেয়েরা বিয়ের পরে সবুজ চুড়ি পরে।সেই চুড়িওয়ালা ছেলেটা, সাদা প্যান্ট, লাল জামা, সাদা জুতো, চোখে গগলস, ও গগলস বলতে পারত না, বলত গলস।ওদের বাড়িতে এসে জল খেত, জিরিয়ে নিত।ওকে বসিয়ে রেখে বিঠঠল চলে যেত বনে।এক দুপুরে বন থেকে ফিরে এসে দেখেছিল ফাঁকা ঘর, রুক্মিনী চলে গেছে তার সাথে।
বিঠঠল বলেছিল, রাজে, আমি অনেক খুঁজেছি ওকে।কোথাও পাইনি।আমি কিনতে চেয়েছিলাম গলস, পারিনি।অত টাকা থাকলে তো একদিন পেট ভরে খেতাম।
মুন সহ্যাদ্রীর ওই রাতের বৃষ্টির শব্দ আমার বুকের ভেতর শুনতে পেতাম।আমি পুনে থেকে ওকে একটা রে-ব্যানের সানগ্লাস এনে দিয়েছিলাম, বিঠঠল নেয়নি।বলেছিল, সাহেব, রুক্মিনী তো চোখ ছিল আমার, সেই চোখই তো ছেড়ে চলে গেছে।এখন আর এটার কি কোন দরকার আছে?
মুন, সেই অসাধারণ প্রেম আমাকে সমৃদ্ধ করেছে।কোন অভিযোগ ছিল না ওর।বলত, গেছে ভালোই করেছে।এখন চুলে তেল দিতে পারে।খেতে পায় পেট ভরে।আমি ওকে কিছু বন থেকে কুড়িয়ে আনা ফুল ছাড়া আর কিই বা দিতে পেরেছি?

চন্দ্রতাড়িত।

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।