সম্পাদকীয়

আমি তনিমা হাজরা। লিখি কবিতা, গল্প, অনুগল্প, মুক্তগদ্য, প্রবন্ধ।
প্রতিদিন সকালে বেল বাজলে
কাচড়াওয়ালা ছেলেটিকে ঘরের নোংরা বার করে দিয়ে নিজের ঘর পরিস্কার করে ফেলে সবাই।
প্রকৃত পক্ষে আমার বোধবুদ্ধি একেবারেই গেছে। সবাই যাকে কাচড়াওয়ালা বলে আমি তাকে সাফাইওয়ালা বলি।
বাড়ির পাশের মন্দিরে লাইন পড়ে। দীর্ঘ লাইন। মন্দিরের পাশে অনেক দোকান। মিষ্টি, ফুল, মালা, দেবতার অবয়ব, পূজার উপকরণ, ডালা কুলোর সারি সারি দোকান। মানুষ আসে, সুখী মানুষ, দুখী মানুষ, একা মানুষ, দলবদ্ধ মানুষ।
কি চাইতে আসে তারা??
তাদের পরীক্ষা করতে মন্দিরের গেটে দিবারাত্রি অতন্দ্র প্রহরী। তারা যন্ত্র দিয়ে পরীক্ষা করে দেখে সাথে বিপদজনক কিছু আছে কিনা। দেবতার কাছে বিপদজনক কিছু নিয়ে আসতে পারে কে? তবে কি সে বিধর্মী। এক ধর্মের চোখে অন্য ধর্মের জন্য সন্দেহ, বিদ্বেষ, তীব্র অসহন। এ কোন আধ্যাত্মিকতার মন নিয়ে দেবতার দরবারে আসে মানুষ, আমার মাথায় ঢোকে না।
আমাকে যারা অভীষ্ট সিদ্ধির মোহ দেখিয়ে দেবালয়ে নিয়ে গেছিল তারা আমার আচরণ দেখে হতাশ হয়, হয়তো দেমাকি ভাবে নতুবা ক্ষমার অযোগ্য অপরাধী।
প্রকৃত পক্ষে আমার বোধবুদ্ধি একেবারেই গেছে, তা না হলে আমিও তাদের সাথে মিশে গিয়ে ফুল মালা কিনে সাজানো গোছানো মূর্তির পায়ে লুটিয়ে পড়ি না কেন? দলে দলে মানুষ ইঁদুরের কানে কানে, ষাঁড়ের কানে কানে মনের বাসনা বলে, আমার কেন এসবে উৎসাহ আসে না? দেবতার দিকে চোখ যায় না, আমি পোড়া চোখে আমার পোড়া দেশের ডিগ্রিধারী মূর্খের দল আর ডিগ্রিহীন নিরক্ষর সমান লাগে, অর্থবান দরিদ্রের দঙ্গল আর সহায়সম্বলহীন আর্তকে সমান অসহায় লাগে।
সব ধর্মের মানুষের ভেতরের তীব্র ধর্মীয় ক্ষুদ্রতা আমার কাছে প্রকট হয়ে ওঠে। সব মানুষকে সমান নির্বোধ, সমান স্বার্থপর, সমান আত্মকেন্দ্রিক, সমান আহাম্মক, গড্ডালিকায় ভেসে যাওয়া মস্তিষ্কহীন সমান অসহায় দেখি।
আমি আমার পদবী পিতৃধর্ম মাথায় রাখি না। হাঁটতে হাঁটতে দরগার দরজায় গিয়ে দাঁড়াই।

আমার পেটের ভেতর গোরুর মাংস, মুরগির মাংস, শুকরের মাংস দিনের পর দিন সমান পরিপাকীয় দক্ষতায় দিব্যি একসাথে মিলে আনন্দেই হজম হতে থাকে।

ভুঁড়িওয়ালা দেবতা গয়নাগাটি পরে ঢেকুর তুলে আমার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসে। মসজিদ বা দরগার আলখাল্লাপরা ইমাম আমার পোশাক দেখে আমার কুল-জাতির কূলকিনারা খুঁজে বার করতে না পেরে আমার মাথায় ধপাস করে ময়ুরপালকের ঝাঁটা ঠেকিয়ে আশীর্বাদ করে দেয়।

চার্চের কনফেসন বক্সে গিয়ে আমি স্বীকার করি আমার লজ্জার কথা। যে আমি নিজেকে শিক্ষিত বলে পরিচয় দিয়ে থাকি সেই আমি এখনো আমার পৈতৃক পদবী ধারণ করে নিজের ধর্মকে নিরন্তর প্রশ্রয় দিয়ে চলেছি।
আমার নিজেকে বড় ক্ষুদ্র লাগে। আমার মনুষ্যত্ব আমাকে বিদ্রুপ করে ওঠে। আমার কলম ধরতে ইচ্ছে করে না। কি করতে পেরেছি এতদিন? কিচ্ছু না, কিচ্ছু না।
কলমের কালি যদি একজন লেখকের জীবনের সৎযাপন না হয়ে ওঠে তবে কি লাভ বড় বড় কথা লিখে?

আমার সামনে দিয়ে ফ্যাসিস্ট আগাছাগুলি বেড়ে উঠতে থাকে মাথাহীন কুসংস্কারগ্রস্ত মানুষের নিরন্তর প্রশ্রয়ে।
লালন কাঁদতে থাকে, কবীর যন্ত্রণায় কঁকিয়ে ওঠে।
বৃথা, বৃথা, সব বৃথা। আমি কিচ্ছু করতে পারছি না কেন??

মন্দিরের বাসি ফুলের মালা আর মাটির প্রদীপ , মসজিদের বাসিফুল আর খালি আতরের শিশি, চার্চের বাসিফুলের বোকে আর আধপোড়া মোমবাতি সব এবাড়ি ওবাড়ি থেকে কুড়িয়ে সেই কাচড়াওয়ালা না সাফাইওয়ালা ছেলেটা একই গাড়িতে স্তূপাকৃতি করে নিয়ে যায় একসাথে একই waste disposal site এ ফেলে দেবার জন্য।
আমার পোড়াচোখে কেন যে এই আবর্জনাগুলিকে হাজার হাজার গৃহহীন, নিরুদ্দেশ, মানুষের শবদেহের স্তূপ বলে মনে হয়।
চোখের সামনে সব মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়।
হাজার হাজার যকৃৎ, হৃদপিণ্ড, কাটা হাত পা, নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে যাওয়া ফুসফুস, বোধহীন মস্তিষ্ক, একে অন্যের দিকে উদ্যত আঙুল ডাম্পিং গ্রাউন্ডের ভেতর রাতের অন্ধকারে নিজের ধর্ম খুঁজতে, নিজের দেশ খুঁজতে কিলবিল করে বেরিয়ে পড়ে।
মৌলবাদীরা দূরবীন হাতে দূর থেকে এই স্বনিয়ন্ত্রিত স্বয়ংরচিত চলচ্চিত্র দেখে নিজেদের বুদ্ধির তারিফ করতে থাকে।
পরদিন ভোরে আবার বেল বাজে, কাচড়াওয়ালা (সাফাইওয়ালা?) ছেলেটির হাতে ময়লা বালতিটি ধরিয়ে দিই……..
সময় হেঁটে চলে অনন্তের দিকে……….
                                                                             তনিমা হাজরা
ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।