রম্যরচনা-তে বিকাশ এস জয়নাবাদ

পিঁয়াজি অথবা ঘোড়ার ঘাস
পিঁয়াজ মরা ভাদ্রে গতিশীল। কবি চণ্ডি পাল লিখেছেন ” সনমঙ্গল বারে হাট পড়িছে হাসনের হাট/তায় বিকায় রসুন পেয়াজ।” উনি প্রায় চার’শ বছর আগে লিখেছিলেন সে কথা।উনার সময়ে নাসিক থেকে গাড়ি গাড়ি পিঁয়াজ বাংলায় আসত না। বাংলায় বর্গিরা ১৭৫০-৫১ সাল থেকে দাপাদাপি করলেও তারা ঘোড়ার পিঠে চাপিয়ে বস্তা বস্তা পিঁয়াজ আনত না। ১৭৩৭-৩৮ সালের ঝড়ে বাংলা বিধ্বস্ত হলে খাজনা আদায় কমে গিয়ে ছিল।বাংলার ভেতোরা খাজনা না দেওয়ার সাহস কোন দিন দেখায় নি সেদিনও দেখায় নি। শুধু সুর করে বলেছিল ” আর কটা দিন সবুর কর রসুন বুনেছি”। তখনও বাংলায় পিঁয়াজ রসুনের বাজার ছিল, তবে নাসিক থেকে দৌড়াতে দৌড়াতে আসত না। ছিপছিপে ঘোড়া ছিল আগ্রাসনের প্রতীক। ঘোড়ার পিঠে চেপে ডাকাতেরা লুটপাট করতে আসত। লুটপাটের জন্য বহু মহাপ্রভু বাংলা দখল করতে এসেছিলেন ঘোড়ায় চেপে। সাধারণ মানুষ বড় অসহায় তারা শান্তিতে থাকবে বলে আত্মসমর্পণ করে । শূন্যপুরাণে রামাই পণ্ডিত বলছেন –
দখিন্যা মাগিতে যাঅ জার ঘরে নাহি পাঅ
সাঁপ দিয়া পুড়ায় ভূবন ।
গণেশ হৈল গাজী কার্তিক হৈল কাজি
ফকির হইল্যা যত মুনি
তেজিয়া আপন ভেক নারদ হইলা সেক
পুরন্দর হইলা মলনা । ( ইত্যাদি)
সমগ্র বাংলায় ঘোড়ার খুব একটা বাজার ছিল না তার প্রকৃতির জন্য।জলকাদায় তারা অচল।ঘোড়া ছিল রাজ প্রতিষ্ঠার প্রতীক। ঘোড়ার সাথে ঘাসের সুসম্পর্ক ছিল কি ছিল না সেটা তর্কের বিষয়।তবে ঘাস কাটা কিছু মানুষের পেশা ছিল। ভারতচন্দ্রের কাব্যে ঘেসেড়ানী/ঘেসেড়া’র উল্লেখ আছে । ভারতচন্দ্রের কাব্য অনুসারে মানসিংহ বর্ধমান যশোহরের দিকে চলেছেন । সাথে অত্যাধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত টগবগে সেনা।যশোহর দিল্লির কেন্দ্রীয় সাম্রাজ্যবাদী শক্তির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো প্রতাপাদিত্যের রাজধানী । সেই রাজধানী দখল করে দিল্লির কেন্দ্রীয় সাম্রাজ্যবাদী শক্তির আগ্রাসন প্রতিষ্ঠা করাই মানসিংহের লক্ষ্য । পথে হটাৎ প্রবল ঝড় বৃষ্টি । সেনারা বিধস্ত্ব । মানসিংহ অসহায় , তিনি ভবানন্দের কাছে এই অবস্থা থেকে মুক্তির উপায় জানতে চাইলে তাঁকে “ অন্নপূর্ণা – পূজার” কথা বলা হয় । পূজা হল । বৃষ্টি থামল ।
সেই কথিত ঝড়ে ঘাস কাটতে যাওয়া “ ঘেসেড়ানী” এবং “ঘেসেড়া” কি অবস্থা হয়েছিল তা রসিক কবি সুন্দর ভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন –
ঘাসের বোঝায় বসি ঘেসেড়ানী ভাসে ,
ঘেসেড়া মরিল ডুবে তাহার হাবাসে
কান্দি কহে ঘেসেড়ানী হায়রে গোঁসাই ।
এমন বিপাকে আর কভু ঠেকি নাই ।।
এখন জুয়ার ঘোড়া বাদ দিয়ে সেই তেজী ঘোড়াও নেই ঘাস কাটা ঘেসেড়ানী/ঘেসেড়াও নেই।সব উড়ে গেছে।ফাঁকা ময়দান ।
কবি চণ্ডি পাল পেয়াজ লিখেছেন তখন অবশ্য কলকাতার বাংলা অকাদেমি বা ঢাকা বাংলা অকাদেমির বানান বিধি ছিল না। শব্দ শাসন ছিল না। অঞ্চল ভেদে উচ্চারণ ভেদে বাংলা লেখা হত। কবি ছিল কম শ্রোতা ছিল বেশি। সান্ধ্য বাংলায় আসর বসত। কবির লেখা পাঠ হত। আধো ঘুম আধো জাগরণে রাত শেষ। অবশ্য কবির চেয়ে কথকঠাকুরের দড় ছিল বেশি। পিঁয়াজি ছিল বেশি। এখন সন্ধ্যেবেলায় যে ভদ্রমহিলা দশ টাকা জোড়া পিঁয়াজি ভাজেন তিনি ঘোষনা করেছেন আর যাইহোক পিঁয়াজি ভাজবেন না। পিঁয়াজি না মারলে আড্ডা জমে নাকি! জমে না। বিকল্পব্যবস্হা হিসাবে রোল মডেল বিক্রেতা রবি সস্তার পেঁপে ঝিরিঝিরি কেটে একটু ভাঁপ দিয়ে তাজা রোল বিক্রির ব্যবস্হা চালু রেখেছে। কাগজের পোষাক ছাড়িয়ে তাড়িয়ে খাও।ভাঁও মাত্র তিরিশ।মাত্র তিরিশ টাকায় একটা গোটা শরীর।নরম তুলতুলে। তৃপ্তি! ভেজালেই মুক্তি ।
অল্প কিছুদিন আগে খবরের কাগজে প্রকাশিত মিথ্যা সংবাদ, ‘মাত্র পাঁচ টাকা পাল্লা না পেয়ে কৃষক আত্মহত্যা করেছ’। মরা ভাদ্র পর্যন্ত অপেক্ষা করতে পারল না চাষীরা? অভাবী বিক্রেতা কে মনে রাখে !কিছু লোক তিন’শ টাকা পাল্লা পিঁয়াজ কিনে খাচ্ছে ।চার টাকার মেনুতে ভাত ডাল তরিতরকারি আলুপোস্ত মাছ ডিম মাংসে হয়ত পেঁয়াজ/ পিঁয়াজ বাদ।কাঁচা লংকা দেড়’শ টাকা, রসুন দেড়’শ টাকা, আদা দুই’শ টাকা কিলো, ওগুলো বড়লোকের খাদ্য, ওগুলো রান্নায় না দিলেও চলে। পোস্তের সাথে সাদা তিল বেটে দিয়ে আলুর সাথে চালালেও কিছুটা পোস্ত তো কিনতে হয়। বাংলা বাজারে পোস্ত সস্তা, কিলো খানিক নিলে বার’শ। আগে নদীর চরে, ডাঙ্গায়, এখানে ওখানে পোস্ত চাষ হত এখন বন্ধ। চাহিদা বেশি যোগান কম তাই দাম দৌড়াচ্ছে। সামনেই অলিম্পিক। দৌড়ে প্রথম হতে হবে তো।
এক কার্টুনিস্ট ছবি এঁকেছেন এক ভদ্রমহিলা এককিলো পেঁয়াজ কিনতে দোকানীর কাছে গেলে দোকানী ক্রেতার প্যানকার্ডের প্রতিলিপি চাইছেন।পিঁয়াজ রসুন নিয়ে আলাপ আলোচনায় ইতি টানা উচিত। সুস্থ এবং স্বাভাবিক থাকতে গরম ফ্যানভাতে এক চিমটি নুন খাওয়া বুদ্ধিমানের কাজ।যারা খুঁত খুঁজে বেড়ায় তারা নিজেদের হনু প্রমাণ করতে ফ্যান ভাতের নিন্দা করে । করে করুক,তারা তো নিজেরা বাজার যায় না,ঘণ্টায় ঘণ্টায় জামা কাপড় পাল্টে গাছে গাছে লাফিয়ে বেড়ায়। তারা বাজারের, উন্নয়নের , প্রগতির , উন্নতির বোঝে টা কি !
আশ্বিন আসতে না আসতেই পিঁয়াজের ব্যাপারী লালে লাল।গাল দিয়ে রস চুঁইয়ে পড়ছে। তিন’শ পঞ্চাশ টাকা পাল্লা।হাল্লা রাজারার যুদ্ধের দাদামা বাজিয়ে লেলিয়ে দিচ্ছে সব্বাইকে। যুদ্ধ করে করবিটা কি বল বললেই গারদ। নারদ বেনাবনে চিতি সাপ খুঁজছে। চিতি সাপ কামড়ালে বিষ শরীরের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ নষ্ট করে ধীরে ধীরে। চাষী মরল পিঁয়াজের দাম না পেয়ে, পিঁয়াজি ভাজার মাসী ” মাগুর মাছের ঝোল, ভরা যুবতীর কোল” এ দে দোল দোদুল, পিঁয়াজ ব্যাপারীরা দুহাত তুলে নাচছে। পেঁয়াজ না পিঁয়াজ সেটার রেওয়াজ যারা করবে করুক, যারা এর ব্যবসা করেন তারা দিগম্বর। তারাই ঈশ্বর ।
আকাশে পেঁজা তুলো মেঘ, আগাম খবর হিক্কা সমস্ত বাংলাকে ধ্বংস করতে এগিয়ে আসছে, পিছনে ফলেছে নাগরিকদের উদ্বাস্তু হওয়ার আতঙ্ক, এই সুযোগে দুহাত নাচছে পিঁয়াজ ব্যবসায়ীরা। কোন প্রতিবাদ হবে না, প্রতিরোধ হবে না, পাঁচ টাকা পাল্লা না পেয়ে আত্মহত্যা করেছে যে চাষীরা তারা ভূত হয়ে ঘাড় কটকাবে না। ভুত বলে কিচ্ছুটি নেই । ফাঁকা আওয়াজ। সুবর্ণ সুযোগ, পিঁয়াজ বাজারে বিক্রি হবে পাঁচ’শ টাকা পাল্লা। আশ্বিনে মা আসছেন তাঁর নামে বলি হওয়া পাঁঠার মাংস রাঁধতে অবশ্য পিঁয়াজ রসুন লাগবে না। মা তো উপলক্ষ মাত্র! লতিফের দোকানে লম্বা লাইন পড়বে। কচি,বুড়ো খাসির মাংসে পিঁয়াজ রসুন না হলে চলে। মাছেরা আবার পিঁয়াজ ছাড়া সুস্বাদু হয় না।মাছেদের নিয়ে গান হতে পারে তোমার দেখা নাই, তোমার দেখা নাই।শাসনে অপ্রতিদ্বন্দ্বী মাষ্টারকে সরিয়ে ছাত্ররা পাঠ দিচ্ছে। ভেড়ি দখলে শুধু পতাকাটার রঙ পালটে সকলেই ভজহরি মান্না । খাই খাই কর কেন ,এসো বসো আহারে !জলে দৌড়াচ্ছে সোনালি মাছ।ধর। ভাজ।খাও । চুনোপুঁটি বাদ এখন সব আমেরিকান রুই ! আমেরিকা পাশে থাকলে সকলেই গর্বটর্ব অনুভব ক’রে।মরে।মারে।মাছেরা অন্ধ তবুও দৌড়াচ্ছে।বাজারে মাছ বলতে রুইকাতলা আর বাতেলা । নদীরা দেহ রেখেছেন । আগে প্রতি গ্রামে পুকুরে মাছ দৌড়াত এখন পুকুর বুজিয়ে বহুতল । ধান মাঠে বিদেশি সার খেয়ে চুনোপুঁটিরা বুদবুদ । হাওয়া । নির্মল হাওয়া স্বাস্থ্যের পক্ষে উপকারি । দরকারি প্যান আধার থাকলে বাজার থেকে ইলিশ খাওয়ার স্বপ্ন দেখা যেতেই পারে। না হলে রূপনারায়ণপুরের দিগেন বর্মণের ইলিশ পুরাণ হাতের কাছে রাখলেই তৃপ্তি । দেখ আর সাদা ভাতে আলুসিদ্ধ মাখা খাও । সব তো মনের ব্যাপার । পেট ভর্তি ডিম নিয়ে যে পোয়াতিরা হাসপাতালে তথা নদীনালায় প্রসবের আশায় আসত তাদের ঘিরে ধরেছে দালাল । নোংরা পরিবেশ অসুস্থ পরিবেশ , বাচ্চা জন্মালে তাকে ধরতে কত জাল । বাজারে তিন’শ গ্রামের ইলিশ দেদার । আর মেয়ে ইলিশ হলে তাকে ফুঁসলিয়ে বুম্বাই । ফুটপাতের ভিখারি একদিনেই কোটিপতি । সঠিক টুকতে জানলে জিনিয়াস না জানলে জালিয়াত ।
আগে বাংলার প্রতিটি গৃহস্থের বাড়িতে হাঁস বা মুরগির ঘর থাকত।সকালে দাঁত মাজার সময়ে তাদের ঘরের দরজা খুলে হাতড়ে দেখে নিত কটা ডিম।হাঁসেরা হেলতে দুলতে পুকুরে গেঁড়ি গুগলি খেতে যেত। এখন কোন দৌড় বাজি নেই। স্থবির । দেশি মুরগিরা চরে বেড়াত।এখন ডিমেরাও অন্ধ।দৌড়াচ্ছে।এখন গ্রামে নেট হীন কোন গৃহস্থ নেই , সব্বাই নেটে অভ্যস্ত।নেট না থাকলে গ্রামে কুরুক্ষেত্র। ভাইয়ে ভাইয়ে মারামারি আর নেপোতে মারাছে দই। নেপোদের জালে যারা পড়েছে তারাই জানে কি ভাবে ভিটেমাটি উচ্ছেদ করে এগিয়ে যেতে হয়। তখনও নেট ছিল। নেট ঘেঁটে ডিমের চপ বানানোর রেসিপি না শিখলে পণ্ডিত বলে প্রমাণ করা যায় না। কুঁকড়া পাঁচশ,স্থুল ফুলো বয়লার একশ দশ।অন্য মাংস নিষিদ্ধ। কারও মনে সেই নিষিদ্ধ মাংসের কথা আসা মানে পাপ।পাপ বিদেয় করতে লাঠিসোটা নিয়ে গাট্টাগোট্টা মহাপ্রভুরা দেন্দুয়া মোড়ে দাঁড়িয়ে।তারাই দেশ। সংবিধান।তারাই হর্তাকর্তা বিধাতা । কে কি খাবে , কে কি পড়বে , কে কি ভাবে যৌনাচার করবে সব ঠিক করে দেবার ঠিকাদার।বাংলার ভবিষ্যত।জাত ঠিক করতে করতে ভাতে মারবে । নেটের বাহার তাজা রাখতে বিএসএনএলের মুখে ছাই । ধুলো।ভাঙ্গা কুলো হাতে সানাইয়ের পোঁ ! বন্ধ হয়ে গেছে , যাচ্ছে সমস্ত কারখানার ভোঁ !
বাঙালি সর্বভুক গোরু ছাগল ভেড়া কচ্ছপ সব খায়। খেত । কবি তাই বলেছিলেন –
কাউঠার রান্ধে মাংস তৈল ডিম্ব দিয়া ,
তলিত করিয়া তুলে ঘৃতেতে ছাকিয়া ।।
কৈতরের বাচ্ছা ভাজে , কাউঠার হাতা ।
ভাজিছে খাসীর তৈলে দিয়া তেজপাতা ।।
ধনিয়া সলুপা বাটি দারচিনি যত ।
মৃগমাংস ঘৃত দিয়া ভাজিলেক কত ।।
রান্ধিছে পাঁঠার মাংস দিয়া খর ঝাল ।
পিঠালী বাটিয়া দিল মরিচ মিশাল ।।