মেহফিল-এ-কিসসা নুসরাত রীপা

রোদ্দুরে ভেসে যায় জোসনার রাত
এগারো তলার ছাদে উঠে, আকাশের দিকে মুখ করে চুপচাপ বসে আছে নাবিলা। আকাশটা এমন মসৃন যেন ঘন গভীর নীলাভ কালো জর্জেট শাড়ী বিছিয়ে দেয়া হয়েছে। আকাশে কোন তারা নেই। কী অদ্ভূত সুন্দর আকাশ। তাকিয়ে থাকতে থাকতে একটা আসক্তি ভর করে চোখে,তাকিয়ে থাকার আসক্তি।
জীবনে এমন আকাশ আর কখনো দেখেছে কী না মনে পড়ে না।
অনেকক্ষণ হয় ছাদে এসেছে। এখন কয়টা বাজে? কথাটা মনে হতেই এদিক ওদিক একবার অকারণেই দৃষ্টি বোলায়। আশেপাশে কাছে-দূরের ভবন গুলোয় আলো জ্বলছে। স্থির। সেই সন্ধ্যা বেলার মতোই। ছাদটা অনেক বড়। বড় বড় টবে গাছও আছে। তবে অন্ধকারে কোনটা কি গাছ ঠাওর করা যায় না।
এটা ভাই এর বাসা। নাবিলা বেড়াতে এসেছে।এ ছাদে ও আর মাত্র একদিন এসেছিলো। এখানে আসার পরদিন।সেদিনও রাত ছিলো। হঠাৎ কারেন্ট চলে যাওয়ার পর এপার্টমেন্টের আই পি এস কাজ করছিলো না। প্রচন্ড গরম। ভাবি বললো, চল নাবিলা ছাদে যাই।ছাদে বাতাস আছে। কিন্তু ওরা ছাদে আসতে না আসতেই ইলেকট্রিসিটি চলে এসেছিলো তাই ছাদটা আর দেখা হয়নি।
নাবিলা গ্রামেই থাকে। পড়াশোনা করেছে ঢাকাতেই, হোস্টেলে থেকে। পাশ করার পর ঢাকায় থেকেই চাকরীর জন্য চেষ্টা করবে ভেবেছিলো।কিন্তু মায়ের এক কথা, মেয়ে যদি চাকরী করেই তবে ক্যাডার সার্ভিস। ব্যস্। ক্যাডার সার্ভিস না পেলে ঘর সংসার করবে,বাচ্চাকাচ্চা লালন পালন করবে। আউল ফাউল কোন চাকরী করতে হবে না। বিসিএস ছাড়াও যে আরো ভালো ভালো চাকরী আছে এখন একথা মা কে বোঝায় সাধ্য কার। অগত্যা ঢাকা ছেড়ে গ্রামে গিয়ে বাবা মায়ের সাথেই থাকে এখন নাবিলা। আর বিসিএস এর জন্যে পড়াশুনো করে।
কয়েকদিন আগে মা হঠাৎ করে অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে চিকিৎসার জন্য ঢাকা আনা হলো। বাবা মায়ের সাথে তাই নাবিলাকেও আসতে হলো। গতকাল হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেয়ে মা বাসায় এসেছে। মা বাবা ঢাকায় আছে জেনে দলে দলে ঢাকায় থাকা আত্মীয় স্বজন দেখা করতে আসছে। বাসা ভরতি মানুষ আর মানুষ। এতো মানুষের মাঝে বড্ড অস্বস্তি লাগছিলো নাবিলার। ও তাই ভাবীকে বলে ছাদে চলে এসেছে।
ছাদে এসেছে অনেক্ষণ হয়। হাতে ঘড়ি বা মোবাইল নেই। এ প্রজন্মের মানুষ হয়েও মোবাইল, ফেসবুক এসব টানে না নাবিলা কে। এখনো ফেসবুকিং এর চাইতে বই পড়া কিংবা অডিওতে গান শোনা অনেক বেশি পছন্দ ওর।অনেক সময় পেরিয়েছে আন্দাজ করা যায়। তবে সেটা কতোটা?
নাবিলা বসা থেকে উঠে দাঁড়ালো,ছাদটা একটু ঘুরে দেখা যাক। বাসায় মেহমানের দল নিশ্চয়ই এখনো আছে। চলে গিয়ে থাকলে নীচে থেকে ডাক আসতো। কিংবা তানহা নিজেই হয়তো চলে আসতো। নাবিলা ছাদে হাঁটতে শুরু করে। আকাশে চাঁদ নেই,তারা নেই অথচ তারপরও আশে পাশের বিল্ডিং এর আলোয় চারপাশ পরিষ্কার দেখা যায়। পাশের ছাদের তারে এখনো দিনে শুকাতে দেয়া শাড়ি দুলছে। ঐ দিকের একটা বাসার জানালায় হঠাৎ হঠাৎ ছোট বাচ্চাদের ছুটোছুটি করতে দেখা যাচ্ছে। নাবিলা ছাদের একমাথা থেকে আরেক মাথা পর্যন্ত একবার হেঁটে আসে। আবার ঘুরে হাঁটতে শুরু করে। ফুরফুরে বাতাসে কি একটা ফুলের সুবাস ভাসছে। হাঁটতে ভালো লাগছে। সিঁড়ির দরজার পাশে চিলেকোঠা। কালো কাঁচের দরজার ঘরটা আগের বার হাঁটবার সময় চোখে পড়েছিলো। এবারও হাঁটার ফাঁকে সেদিকে দৃষ্টি পড়তেই নাবিলা অবাক হলো। ঘরের ভেতর বাইরে থেকে আসা অথবা ভেতরেই জ্বলতে থাকা অস্পষ্ট আলোয় দিব্যি দেখা যাচ্ছে একটা দোল চেয়ারে বসে আছে একজন মানুষ। মাথাটা চেয়ারে এলানো। ঘাড়ের পেছনে দুটো হাত তুুলে রাখা। মানুষটা আস্তে আস্তে দোল খাচ্ছে।
এ ঘরে মানুষ থাকে? নাবিলা ভ্রু কোঁচকায়। তারপর ভাবে থাকতেও পারে। ঢাকায় ভালো জায়গায় ভালো একটা বাসা পাওয়া খুব কঠিন। আবার সে বাড়িওয়ালার লোকও হতে পারে। দরজার দিক থেকে দৃষ্টি সরিয়ে নাবিলা পা বাড়ায়। তখুনি দেখে ছায়া মূর্তিটা দরজা খুলে বেরিয়ে এসেছে।
। মাথায় কোঁকড়ানো এলোমেলো চুল। অস্পস্ট আলোতেও তার সুশ্রী মুখশ্রী পরিষ্কার দেখা যায়।
অপরিচিত কোন তরুণের সাথে ছাদে দাঁড়িয়ে থাকার প্রশ্নই আসে না। নাবিলা ছাদ থেকে নেমে যাওয়ার জন্য সিঁড়ির দিকে পা বাড়াতেই ছেলেটি বলে ওঠে,চলে যাচ্ছেন?আপনার সাথে কথা বলবো বলেই না বেরিয়ে এলাম।
আপনি তো আমাকে চিনেনই না। কি কথা বলবেন? নাবিলা দাঁড়ায়। ছেলেটা ছাদের রেলিং এ হেলান দিয়ে দাঁড়াতে দাঁড়াতে বলে,আপনি তো চলে যাচ্ছেন। চলে গেলে আর চিনবো কিভাবে? কথা বললে তবে না চেনা পরিচয় হয়। বেশ তো হাঁটছিলেন। আমাকে দেখে চলে যাচ্ছেন যে?
অনেকক্ষণ ছাদে আছি,তাই—
নাবিলার কথা শেষ হয় না। ছেলেটা হেসে ওঠে,আসলে আপনি আমাকে দেখে ভয় পেয়েছেন।
নাবিলা বলে,মোটেই তা নয়।
ছেলেটা বলেই চলে,অবশ্য ভয় পাওয়াটা দোষের কিছু নয়। দেশের যা অবস্থা। চারিদিকে যে হারে নারী নির্যাতিত হচ্ছে। শিশুরা পর্যন্ত বাদ যাচ্ছে না। সেক্ষেত্রে আপনার মতো সুদর্শনা ভয় পেতেই পারে।
সুদর্শনা শব্দটা কানে বাজলো।
নাবিলা অবাক হয়ে বললো,সুদর্শনা?
ছেলেটা বললো,হুমম। যার ভেতর বাহির সবটা সুন্দর সে সুন্দর বা সুন্দরী। কিন্তু আমি তো কেবল আপনার বাইরেটা দর্শন করছি। আপনার ভেতর অর্থাৎ মন-মানসিকতা কেমন জানি না। তাই আপনাকে সুন্দরী বলতে পারলাম না। সুদর্শনা বললাম।
ছেলেটার ব্যাখ্যায় নাবিলা চমৎকৃত হলো।
বাহ। আপনি তো দারুন গুছিয়ে বলেন।
বাংলার ছাত্র নিশ্চয়ই?
উঁহু! আমি মূর্খ মানুষ। পড়াশুনো করি নাই।
বলতে না চাইলে বলতে হবে না।মিথ্যে বলার দরকার নাই।
নাবিলার কথা শেষ হতেই হা হা করে হেসে উঠলো ছেলেটা। নাবিলার বেশ বিরক্ত লাগে। এরকম হাসার কী মানে? নাবিলা কী হাসির কথা বলেছে? বিরক্তি টা না লুকিয়েই নাবিলা বললো,আচ্ছা থাকুন তাহলে। আমি নীচে যাই।
দাঁড়ান,দাঁড়ান-হাসি চাপতে চাপতে ছেলেটা বললো,রেগে যাচ্ছেন কেন?
রেগে যাইনি। বাসায় কাজ আছে। তাই যাচ্ছি। নাবিলা কন্ঠ স্বাভাবিক করে বললো।
বাসায় আপনার কোন কাজ নেই ম্যাম! বরং এখন গেলে আপনার ই সমস্যা। অপরিচিত,দূর সম্পর্কীয় আত্মীয় স্বজন বলতে শুরু করবে এখনো বিয়ে হয়নি? আমরা কি পাত্র খু্ঁজবো?
ছেলেটার কথা শুনে নাবিলা অবাক হয়ে যায়। বলে,আপনি এসব জানলেন কীভাবে?
প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে ছেলেটা বলতেই থাকে, আপনি যে ভয়ে ছাদে এসেছেন। এখন বাসায় গেলে আপনাকে সে ভয়ের মুখেই পড়তে হবে। তারচে’ বরং আমার সাথে গল্প করুন। ভালো লাগবে। আমি খারাপ ছেলে নই।
নাবিলাও জানে, বাসায় এখনো মেহমানেরা আছে।চলে গিয়ে থাকলে ওর ডাক আসতো। কিন্তু এই ছেলেটা এসব কথা জানলো কীভাবে? আন্দাজে? মানুষের আন্দাজ এতো সঠিক হয়?
কি ভাবছেন? এসব জানলাম কীভাবে?
ছেলেটার কথায় নাবিলা মাথা ঝাঁকায়। তাইতো,আপনি এসব জানলেন কীভাবে?
ছেলেটা আবার হেসে ওঠে। তারপর বলে,কোন বুজুরকি নয় ম্যাম! আপনি উপরে আসার আগে ভাবীর সাথে বলছিলেন, চলে গেলে ডেকে দিও, আমি সেটা শুনেছি। পাশে সিঁড়িতেই ছিলাম তো। বাকিটুকু ওর ওপর বেস করে বানিয়ে বললাম। এতোটা মিলে যাবে,আমিও বুঝিনি।
নাবিলা বোকার মতো বললো,ও তাই!
২)
রোজ সন্ধ্যা হলেই ছাদে আড্ডা জমে ওঠে নাবিলা আর আদিত্যের। সারাদিন বাসায় ভাবীর সাথে গল্প করা,শপিং করতে যাওয়া,নানা রকম মুভি দেখার ফাঁকে খুব গোপনে মনে মনে সন্ধ্যার জন্য অপেক্ষাটা টের পায় নাবিলা। কতো বিষয় যে জানে ছেলেটা। বিশ্বের সব ক্ল্যাসিক বই যেন তার পড়া। আর আবৃত্তি করে দারুণ। কবিতা আবৃত্তি বিষয়টা ভীষণ পছন্দ নাবিলার। সেই শৈশব থেকেই। আদিত্য তাই কবিতা শোনায়, আবৃত্তি করে, এক একদিন এক একজন কবির লেখা নাবিলার প্রিয় কবিতা। নাবিলা চমৎকৃত হয়! বলে এটাও আমার পছন্দের! তুমি কীভাবে আমার সব পছন্দের কবিতা গুলো জানো,বলোতো!!
এই কয়দিন এর পরিচয়, কথাবার্তায় ওদের সম্পর্ক তুমিতে নেমে এসেছে। নাবিলার কথায় আদিত্য হেসে বলে, সুন্দর সবার কাছেই সুন্দর!
ওহ্।
আদিত্য হাসে।
সন্ধ্যার নীলচে কালো আলো আস্তে আস্তে গাঢ় অন্ধকারের মধ্যে ডুবে যায়। আশে পাশের বাড়ির জানালায় সাদা, হলুদ আলো জ্বলে ওঠে।কাছের দালানগুলো সমান উচ্চতার নয়, বরং কম,নীচু। ফলে সেসব বাড়ির আলো এ ছাদের গম্ভীরতা ভাঙতে পারে না। ঐ সব ছাদে লাগানো রকমারী গাছপালাগুলো ওদের সঙ্গী হয়ে থাকে। মাঝে মাঝে বাতাসের স্পর্শে দুলে ওঠে সরসর শব্দে, যেন ওদের গল্পে তাল মেলাচ্ছে! দু’জনে গল্প করতে করতে কতো শহর-বন্দর-গ্রাম-মরুভূমি-পাহাড়-
দশটা বাজতেই নাবিলার ডাক পড়ে। বাসার কাজের মেয়ে পান্না ছাদে উঠে আসে। টেন্থ ফ্লোরে লিফট থামার শব্দ শুনলেই আদিত্য ত্রস্থ পায় নিজের ছোট্ট ঘরটার দিকে এগিয়ে যায়।! কখনোই কথা শেষ করে বা বাই বলে বিদায় নেয়ার সুযোগ হয় না ওদের।
পান্না সিঁড়ি বেয়ে উঠে আসার আগেই আদিত্য ওর ঘরে ঢুকে পড়ে। দরজা বন্ধ হওয়া পর্যন্ত নাবিলা এক দৃষ্টে সেদিকে তাকিয়ে থাকে। ঐ সুঠাম,ঋজু ছায়ামূর্তি টার জন্য বুকের খুব নিভৃত কোনো কোণে
কিছু একটা অনুভব করে নাবিলা। এর নাম কি প্রেম? নাবিলা জানে না। তবে কথাটা মনে হতেই ওর সারা শরীরে একটা কাঁপুনি জাগে।
৩)
প্রেম শব্দটা মনে হলেই রাফায়াত কে মনে পড়ে নাবিলার। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির পর পর,তখন সদ্য কৈশোরত্তীর্ণ নাবিলাও স্বপ্ন দেখতো একটা বলিষ্ঠ মায়াময় হাতে হাত রেখে কাশবনে ঘুরে বেড়ানোর, স্বপ্ন দেখতো একটা স্বপ্ন পুরুষের,যে তীব্ররকম ভালোবাসা দিয়ে ভরে দেবে ওর দিন আর রাত গুলো। মন খারাপ হলে কবিতা শোনাবে। মাঝরাতে ওকে নিয়ে রিকশায় করে রাজপথে ঘুরবে! হঠাৎ হঠাৎ বই কিনে এনে ওর বালিশের নীচে লুকিয়ে রাখবে!
রাফায়াত এর সাথে পরিচয়ের পর নাবিলার মনে হতো এইতো সেইজন
যাকে নাবিলা মনে মনে ভাবে, কল্পনা করে।
একই ক্লাসে পড়ার সুবাদে প্রায়ই একসাথে আড্ডা দেয়া, চা খাওয়া, মুভি দেখতে যাওয়া হয়। তখন রিয়াই নাবিলার ক্লাস মেট, রুমমেট এবং একমাত্র বান্ধবী। এবং দুজনে দুজনার সর্বক্ষণের সঙ্গী।
নাবিলার মাঝে মাঝে ইচ্ছে করে রাফায়াত এর সাথে একা বসে গল্প করতে। ইচ্ছে করে রাফায়াত এর হাত ধরে রাস্তা পার হতে।আসলে রাফায়াতকে ভালোবেসে ফেলেছে নাবিলা। মোবাইল ওর পছন্দ না। ফেসবুকটাও ও খুললো কেবল রাফায়াত এর জন্য। লুকিয়ে লুকিয়ে রাফায়াত এর প্রোফাইল দেখে। কতো ছবি, লেখা, গান পোস্ট দেয় রাফায়াত। সব পোস্ট ভালো লাগে নাবিলার। কিন্তু প্রকাশ করে না। কতো রাত মোবাইল হাতে নিয়ে বসে থাকে যদি রাফায়াত ফোন করে, সেই আশায়!
সামনে দেখা হলে রাফায়াত এমন আন্তরিকতা দেখায়,এতোটাই কেয়ার করে যে মাঝে মাঝে রিয়া নাবিলাকে ওসব নিয়ে ক্ষ্যাপায়। কৃত্রিম রাগ দেখালেও রিয়ার ক্ষ্যাপানোটা ভালো লাগে নাবিলার। হঠাৎ হঠাৎ ইচ্ছে করে নিজের বুকের ভেতর জমে থাকা ভালোবাসার কথাটুকু রিয়াকে জানিয়ে দেয়। পরে আবার কী এক সংকোচে গুটিয়ে যায়!
বিধাতার ইচ্ছের বিরুদ্ধে কিছু হওয়ার নয় বলেই হয়তো হুট করে বদলে গেলো নাবিলার স্বপ্নময় দিন। এক বৃষ্টির দিনে ক্যাম্পাস থেকে হলে ফেরার পথে একটা হোঁচট খেয়ে পায়ে আঘাত লেগে রক্তপাত শুরু হলো। সে আর বন্ধ হয় না।
পরীক্ষা নিরীক্ষার পর ধরা পড়লো নাবিলার বাঁ পায়ে ক্যানসার হয়েছে। বাঁ পা টা কেটে ফেলতে হবে। তা না হলে অসুখটা সারা শরীরে ছড়িয়ে যাবে!
নাবিলার পা কেটে ফেলা হলো।ও স্ক্র্যাচে ভর করে ক্যাম্পাসে ফিরলো। মনে মনে আশা ছিলো রাফায়াত ওকে দেখে ছুটে আসবে। কিন্তু রাফায়াত ক্লাসের অন্যদের সাথে গল্পে মশগুল। নাবিলার দিকে একবার শুধু সৌজন্য হাত তুললো।
রাফায়াত এর এমন আচরণে ভীষণ কষ্ট পেয়েছিলো নাবিলা। রুমে ফিরে কাঁদতে কাঁদতে নিজের ভালোলাগার সব কথা বলেছিলো রিয়াকে।
কিছুদিন পর একদিন রিয়া এসে বললো, রাফায়াতকে ভুলে যা নাবিলা। আজ আমি ওকে তোর কথা বলেছিলাম।
কী বললো ও? নাবিলার কন্ঠস্বরে ব্যাকুলতা।
রাফায়াত প্রথমে বললো, তুই ওকে এতো ভালোবাসিস একথা কখনো বলিসনি কেনো কোনোদিন ? সেও তোকে পছন্দ করে। তবে এখন তুই যে ভালোবাসার কথা ভাবিস সেটা আর হওয়া সম্ভব নয়। কারণ রাফায়াত বাবা মায়ের একমাত্র ছেলে। একটা পঙ্গু মেয়েকে তারা ছেলের বউ হিসাবে গ্রহণ করবে না!
রাফায়াত “পঙ্গু” বলার পর বুকটা ভেঙে গিয়েছিলো নাবিলার। তবে জীবন থেমে থাকে না, শোকও চিরস্থায়ী নয়। বড় বড় কষ্টগুলোও সময়ের সাথে চাপা পড়ে যায়।নাবিলাও এর ব্যতিক্রম নয়।
তবে তখনই নাবিলা বুঝে গেছে ওর জীবনে আর প্রেম আসার নয়। বুঝে গেছে পঙ্গু বলে ওর বিয়ে দিতে বাবা মায়ের অনেক কষ্ট হবে। জেনে শুনে কে আসবে পঙ্গু মেয়েকে বিয়ে করতে? আর তখুনি বিয়ে না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে এবং প্রেম বিষয়টাকে মন থেকে দূরে সরিয়ে দিয়ে নিজের ভূবন গড়ে নিয়েছে নাবিলা।
৪)
চাঁদটা আজ বড্ড আলো ঢালছে। সম্ভবত দু’দিন পর পূর্ণিমা। ছাদে মুখোমুখি বসে কথা বলছে নাবিলা আর আদিত্য। ঝিরঝির বাতাসে নাবিলার খোলা চুল মৃদু মৃদু উড়ছে। হঠাৎ হঠাৎ হাসনাহেনার গন্ধ ভেসে আসছে।
তোমাকে না পরীর মতো লাগছে-আদিত্যর কথায় হেসে ফেললো নাবিলা। পরী না পেত্নি বলো!
পেত্নি কখনো জোসনায় আসে না। পেত্নির এমন রেশমের সূতোর মতো চুল থাকে না। পেত্নির কন্ঠস্বর পিয়ানোর সুরকে হার মানায় না- গম্ভীর কন্ঠে বলে আদিত্য।
নাবিলা আবার হেসে ফেলে। আদি,তুমি কি কবিতা লিখো?
কেন?
যে রকম শব্দ বলছো সব!
ম্যাডাম! তোমার মতো এমন একজন সামনে থাকলে আপনা আপনি কথা সব কবিতা হয়ে যায়–
আদিত্যর কথা শেষ হয় না। তোমাকে না মাইর দেয়া দরকার-নাবিলা সত্যি হাত তুলে মার দেয়ার জন্য। এসময় লিফট থামার শব্দ ভেসে আসে।
আদিত্য বলে, যাও। তোমার ডাক চলে এসেছে!
তোমার ফেসবুক আছে? জিজ্ঞেস করে নাবিলা।
তোমার আছে? উল্টো প্রশ্ন করে আদিত্য।
আমার নেই। তবে তোমার থাকলে আমি না হয় একটা একাউন্ট খুলবো। তুমিই একমাত্র বন্ধু থাকবে —
কিন্তু আমার তো ফেসবুক একাউন্ট নেই।
তাহলে তোমার ফোন নাম্বারটা দাও—
নাবিলার কথা ছাপিয়ে পান্নার কন্ঠ শোনা যায়।
সিঁড়ির দরজায় পান্নার ছায়া। নাবিলা সেদিক থেকে দৃষ্টি ফিরিয়ে আদিত্যকে দেখতে পায় না।
৫)
রাতে খাওয়ার টেবিলে জানা যায়,আগামীকাল বাবা, মা আর নাবিলা বাড়ি ফিরছে। সকাল ন’টার বাসের টিকেট কাটা হয়ে গেছে। কথাটা শোনার পর নাবিলার মনে মেঘের ছায়া নামে। মাংসের ভর্তা, মোচার চপ প্লেটে একই রকম পড়ে থাকে।
সামনের মাসে ছুটি নিয়ে ভাইয়ারা বাড়ি যাবে। এ নিয়ে বাবা মায়ের সাথে ভাইয়া কথা বলতে থাকে। নাবিলা আঙুল দিয়ে ভাত নাড়াচাড়া করছিল। ওর একটু ও বাড়ি যেতে ইচ্ছে করছে না। মন খারাপ লাগছে আদিত্যর সাথে কথা হবে না ভাবতেই।
ভাবী বিষয়টা খেয়াল করে বললো, কী হলো নাবিলা! কিছু খাচ্ছো না যে!
ভালো লাগছে না।
অমা! কেন! শরীর খারাপ করলো নাতো। বলতে বলতে ভাবী নাবিলার কপালে হাত ছোঁয়ালো।
এ সময় ভাইয়া বলে উঠলো, যাই বলো বাবা, এবার আমি বাড়ি আসি, তোমাদের বাকি ছেলেমেয়েদেরও আসতে বলো, সবাই মিলে নাবিলাটার বিয়ে খাই! চাকরি বিয়ের পরে খুঁজবে—
বিয়ের কথা উঠতেই নাবিলা টেবিল ছেড়ে উঠে পড়ে।
৬)
সারারাত ঘুম হয় না। কাল থেকে আর প্রতি সন্ধ্যায় অমন সুশ্রী মুখ ,অমন সুকন্ঠে কবিতা শোনা হবে না। বহু বহু দিন পর একটা মানুষের দেখা পেয়েছিলো নাবিলা। যার সাথে মন খুলে মনের কথা বলা যায়।
খুব ইচ্ছে করছে যাওয়ার খবরটা এক্ষুণি আদিত্যকে জানাতে। কিন্তু মধ্যরাতে এভাবে ছাদে যাওয়াটা ঠিক হবে না ভেবে ভোরের অপেক্ষা করতে করতে ঘুমিয়ে পড়ে একসময়।
ঘুম ভাঙে সকাল সাতটায়, ভাবির ডাকে। আটটায় বেরোতে হবে। নইলে বাস মিস। তাড়াতাড়ি উঠে তৈরী হতে বলে ভাবী ঘর ছাড়ে।
চোখ মেলতে মেলতে কেমন একটা শূণ্য শূণ্য কষ্ট কষ্ট অনুভূতি হতে থাকে নাবিলার। কেন সেটা প্রথমে বুঝতে পারে না। তারপর মুহূর্তেই আদিত্যর কথা মনে পড়ে। দ্রুত বিছানা থেকে নেমে স্ক্র্যাচটা টেনে নিয়ে ছাদের দিকে হাঁটতে থাকে।
লিফট থেকে নেমে সিঁড়ি বেয়ে উঠে চলে । সকালের সোনা রোদ বেশ তেতে উঠেছে। দরজা দিয়ে সেই রোদ সিঁড়ির ওপর সোনালি কার্পেট হয়ে শুয়ে আছে।
নাবিলা সিঁড়ি ভেঙে ছাদে উঠে আসে। চিলে কোঠার দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আদিত্যর নাম ধরে বেশ কয়বার ডাক দেয়। আদিত্যর সাড়া মেলে না। নাবিলা অধৈর্য হয়ে দরজা ধরে টান দিতেই দরজাটা খুলে যায়।
চোখের সামনে ডাই হয়ে থাকা মই,রঙের বালতি, বাতিল টেবিল,সিমেন্টের বস্তা ইত্যাদির উপর পুরু ধূলোর আস্তরণ। ভ্যাপসা গন্ধ। হঠাৎ করে রোদের ফালি ছড়িয়ে পড়ায় সরু সরু মাকড়শার জাল গুলো ঝিকমিক করে উঠছে। হতভম্ব দৃষ্টিতে নাবিলা তাকিয়ে থাকে।বাতাস খানিকটা মিহি ধূলো উড়িয়ে ছড়িয়ে দেয়।
পান্না আর ভাবীও পেছনে এসে দাঁড়িয়েছিলো। এভাবে চিলেকোঠার স্টোর রুমের সামনে নাবিলাকে দেখে ভাবী প্রশ্ন করলো,কী হলো?
নাবিলা বিহ্বল দৃষ্টিতে ভাবির দিকে একবার তাকিয়ে আবার ঘরটার দিকে তাকালো। রোজ তো এ ঘরটাতেই আদিত্য কে ঢুকতে দেখেছি— বিড়বিড় করে বললো ও।