মুক্তগদ্যে সুমন মল্লিক

হিরণ্যময়ী সাহু

শিলিগুড়ি শহর থেকে খানিকটা দূরে , একেবারে পূর্ব প্রান্তে এক শাশ্বত ও মায়াময় সবুজের মাঝে বয়ে চলেছে প্রিয় সাহু নদী ৷ স্কুলজীবন থেকেই এই বৈকুণ্ঠপুর অরণ্য এবং সাহু নদীর পার আমার অবাধ বিচরণক্ষেত্র , আমাদের বন্ধুবান্ধবদের আড্ডার গুলজারভূমি ৷ এখানকার নিরালা বাতাবরণ , সবুজের ঘ্রাণ , শীতল বাতাস তনমনকে মন্ত্রমুগ্ধ করে ৷ আধুনিক সভ্যতার কৃত্রিমতা সাহুকে এখনও স্পর্শ করতে পারেনি বলেই হয়তো এই নদীটি এখনও অপরূপ সৌন্দর্যে সিঞ্চিত ৷ সবুজের গর্ভে এই ছোট্ট সাহু নদীর পারে গিয়ে বসলে প্রকৃতি এক দিব্য মুক্তির জাজিম বিছিয়ে দেয় ৷
ভরা বর্ষায় সাহু যখন টইটম্বুর হয়ে ওঠে , সবুজ অরণ্য ভেদ করে ছুটে চলে অবাধ্য গতিতে , তখন তার পারে গিয়ে দাঁড়ালে তার যে রূপ দেখা যায় তা চোখে লেগে থাকে , মনেও ৷ কাকিমার দোকানের মশলা চায়ের আমেজ নিতে নিতে না জানি কতদিন সাহুকে নতুন করে চিনেছি ভরা বর্ষায় ৷ দেখতে দেখতে ছোট শিব মন্দিরটা এখন অনেক বড় হয়েছে ৷ এখন প্রতি বছর খুব ধুমধাম করে শিবরাত্রির পুজো হয় ৷ ভাবি , এই  “অপরূপ অরণ্য নিরালা”-ই ঈশ্বরের যথাযথ গৃহ ৷
দূর্গা পুজোর সময় নিজের সাথে কথা বলার এই প্রিয় সাহুপারে গেলে দেখা যায়, সে এবং বৈকুণ্ঠপুর অরণ্য রূপ পালটে নিয়েছে – চারদিকে কাশফুলের শুভ্র খোদকারি , শ্বেতসবুজের অলৌকিক সঙ্গম ৷  আকাশের নীল ক্যানভাসে ঈশ্বর এঁকে দিয়েছেন পেঁজা তুলোর মতো মেঘমান্দাস ৷ ঢাকের আওয়াজ আর পাখিদের কলরব মিলেমিশে যে অরিষ্ট ও অদ্ভুত সুর-হিল্লোলের অবতরণ ঘটে তার রেশ রাতের ঘুমেও হানা দেয় ৷ গাছও যে গাছের সাথে কথা বলে নদীকে নিয়ে এই সময়টায় সাহুপারে না গেলে বোঝা সম্ভব নয় ৷
সন্ধ্যাবেলাও এখানে আমাদের আড্ডা হয়েছে অজস্র ৷ জ্যোৎস্নায় ভেজা অরণ্য আমাদের আদর দিয়েছে ৷ সাহুর জলে ফুটে ওঠা পূর্ণিমা চাঁদে দেখেছি ঈশ্বরের অনির্বচনীয় হাসি ৷ পাশের গ্রাম থেকে ভেসে আসা বাউল গানে কান রেখে শুষে নিয়েছি জীবনের মাঝে লুকিয়ে থাকা আরও একটা জীবনের ঔরস ৷ এসবের সাক্ষী আর কেউ নয় , শুধু সাহু নদী ৷
শীতের মরশুম শুরু হতেই বৈকুণ্ঠপুর তার রং ও রূপ আবার বদলে নেয় ৷ এর সাথে তাল মিলিয়ে সাহু নদীও অনেকটাই পালটে নেয় নিজেকে ৷ শান্ত হয় , স্থির হয় , বাধ্য হয়ে ওঠে ৷ নদী তখন পায়ে হেঁটে পার হওয়া যায় ৷ শীতল ও শান্ত জল পায়ের আঙুলে লিখে দেয় মুক্তিমন্ত্র ৷ মাঝি জাল দিয়ে মাছ ধরে আর গ্রামের ছেলেমেয়েরা ধরে লাইন করে পারে বসে ছিপ দিয়ে ৷ শীতকালে বিকেলের দিকে সাহুর পারে দাঁড়ালে দেখা যায় টিয়া পাখিদের ঘরে ফেরার যৌথ উড়ান ৷ আকাশ পরিষ্কার থাকলে এক অলৌকিক ও মনোরম দৃশ্য দেখা যায় এসময় – সাহু নদীর ওপর হলুদ-সবুজ বৈকুণ্ঠপুর অরণ্য আর অরণ্যের মাথায় নীল আকাশে মুকুটের মতো শোভা পায় কাঞ্চনজঙ্ঘা ৷
প্রতিদিন ভোরে শহর ও গ্রামের মানুষেরা মর্নিং ওয়াক করে আসেন এই সাহু নদীর পারে ঘন সবুজের মাঝে ৷ অনেকেই প্রাণায়াম করেন ; শোনা যায় নানা স্বরের হাসির কোলাজ ৷ বিকেলেও অনেকেই হাঁটতে হাঁটতে চলে আসেন এখানে ৷ ভোরসকালে অরণ্যের মাথায় সূর্যের মিষ্টি উঁকি আর বিকেলে সাহুর জলে গোধূলি সূর্যের প্রতিফলন না দেখলে বোধহয় জীবন সত্যিই অসম্পূর্ণ ৷
মহানন্দার মতো নামডাক সাহুর নেই ৷ সাহু ছোট্ট একটা নদী ৷ কিন্তু রূপে-গুণে এই নদীর একটা আলাদা সমাদর রয়েছে ৷ বৈকুণ্ঠপুর , আমাদের প্রিয় অরণ্যভূমি সযত্নে ঘিরে রেখেছে সাহুকে ৷ এই অরণ্য ও নদীর পুণ্য সঙ্গমস্থলে বোধহয় ঈশ্বরও দিনে একবার অন্তত হাজির হন ধ্যানমগ্ন হবার জন্য ৷ আমরা তা দেখতে পারিনা ঠিকই , কিন্তু দেখতে পারি নদীর বুকে চাঁদ-সূর্যের মিহি হাসি , আমরা দেখতে পারি বৃষ্টিভেজা সবুজ গাছেদের আনন্দ-হিন্দোল , আমরা দেখতে পারি কুয়াশার ভেতর প্রকৃতির দিব্য ভাস্কর্য ৷ আর তাই আমার মতো মানুষেরা বারবার গিয়ে দাঁড়াই সাহু নদীর পারে ৷ আসলে এমন একটা নদীর কাছে গেলে আমাদের ভেতরের নদীটি ক্ষরস্রোতা হয়ে ওঠে ৷
ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।