ভ্রমণকথায় ফাল্গুনী ঘোষ

শাম্মী কাপুরকা দিল হ্যায়

আ যা আয়ী বাহার…. ও মেরে রাজকুমার… থুক্কুড়ি। কন্যা যখন নামে জুড়ে আছে তখন রাজকুমারের জায়গায় কুমারী বসিয়ে টিউনং সেরে নিলেই কাম তামাম। রাত বারোটার দিন জাগা স্টেশনে শুটিং শুরু হলো। ডিরেক্টারের নির্দেশাবলি  বর্তমানে তরঙ্গায়িত হওয়ার ফলস্বরূপ সশরীরে উপস্থিতির প্রয়োজন পড়ে না সবসময়। ডিরেক্টার ও তৎসহ নবরত্ন বর্গের উদ্বেগ কর্ম সবই তরঙ্গাঘাতে প্রাপ্ত হন নায়িকা। 
‘ব্যোম ভোলে তারক ব্যোম….. ভোলে বাবা পার করেগা!…..’ বিনা নোটিশে নিখাদ রোমান্সের মাঝে ভক্তিরস বোমাবাজি হলে বর্ষীয়ানদের চৌত্রিশ পাটি সাড়ে চৌত্রিশ হতে পারে কিন্তু লাস্যময়ী নায়িকার দেহবিভঙ্গ সাম্যাবস্থায় না রাখতে পারায় হাতে ধরা থাকে ঢাউস ট্রলি, বুকে লেদার লেডিস ব্যাগপ্যাক। যেখান থেকে মোবাইল ক্রমাগত প্যাক প্যাক শব্দে রাজকুমারের আসার সম্ভাবনা শ্লথ করে দেয়। নায়িকা রোমাঞ্চিত হতে গিয়ে ভুলক্রমে  স্বেদান্বিত হন। ভ্রুভঙ্গী, অঙ্গুলি মুদ্রা আরো তীব্র, তীক্ষ্ণ হয়ে ওঠে রাত্রির সঙ্গীত মূর্ছনায়। ওদিকে শাম্মী কাপুর ডুবে ডুবে জল খাচ্ছেন। হাতে ধরা নিঃশ্বাস নেওয়ার বাঁশি সোঁ সোঁ করছে। শাম্মী কাপুরের শুটিং-এ ‘ভোলে বাবা পার কারেগা’ ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক যদি দিতেন মিউজিক ডিরেক্টর, তো শাম্মী কাপুরের থুতনি ১২০ এঙ্গেল- এর পরিবর্তে ১৮০ ডিগ্রীতে ঘুরে বনবনিয়ে চারপাক দিয়ে ক্ষান্ত হতো। নায়িকার লাস্যের পরিবর্তে চোখে ঠেকত রোগা প্যাংলা ঢলঢলে চুড়িদার পরা মুখ। কানে ধ্বনিত হতো “আপনি কি মালদাতে বি.এড করতে যাচ্ছেন!”
উফফ! যে ভাঁটের শিক্ষাপদ্ধতিতে দুবিঘা জমির ইঁট কাঠ পাথরে অপার মুন্সিয়ানায় কুলুপ এঁটে এলাম সেই রাত্রি বারোটার বিভীষিকায় নারী অবতারে আবির্ভূতা। এসবের মাঝে গান শেষের দিকে। সাধনাজী সিক্তবসন শুকানোর অভিপ্রায়ে অপার শান্তির খোঁজে ইতিউতি চেয়ে বেড়াচ্ছেন।  রাজকুমার দেখলেন অবস্থা হাতছাড়া হবার যোগাড়। অগত্যা নিঃশ্বাসের বাঁশি ছুঁড়ে ফেলে উল্টো স্রোতে ঝপাং করে নায়িকার সামনে। প্রধান ডিরেক্টরের নির্দেশে ততক্ষণে সেট গোটানো হয়ে গেছে। অর্থাৎ প্যাক আপ।
রাজকুমার/কুমারী যাই হোকগে! দেখা পাওয়া গেলে স্বপ্ন দেখতে হয়, টিভি বন্ধ করে। কিম্বা যদি এনার্জি থাকে তো রাত জেগে রাজনীতির কচকচি নাহোক হাতের পাঁচ খেলাসহ খেলোয়াড়ের গুষ্টি উদ্ধারে বসুন। তবু নায়ক/ নায়িকার খোঁজ করবেন না। তাদের রাত্রেও প্রচুর ব্যস্ততা থাকে। সেসব আপনাদের বেশি না জানাই ভালো। 

#আগস্টে_বাহারি_ডুয়ার্সে ১

আহা উত্তম বাহা উত্তম

রামায়ণের যুগে কুম্ভকর্ণ একটিই। বাকিরা মাথার ঘাম পায়ে ফেলে দিন/রাত জাগিয়ে,  জেগে বন, পাহাড়, সমুদ্র তোলপাড় করে বেড়াচ্ছিলেন। পাড়া তোলপাড়িয়ে উঠলেও ঘুম ভাঙবে না, এমন কুম্ভকর্ণ আজকাল পাওয়া ভার। ওহো! এই এপিসোডে রাজকুমারী/রাজকুমার কাঁহা গেয়ে হ্যায়….  তিন আঙ্গুলের ভরে থুতনি রেখে এসব ভাবছেন তো! ওদিকে ডিম পাউরুটি পেটে ঠুসে সীতা অভিযোগ করছেন—- ” নাকছাবিটা হারিয়ে গেছে হলুদ বনে বনে”—— নাহ, হলুদ কথাটি রূপকার্থে। সে যাই হোক না, নারীর সুখ নেইকো মনে।  কাচের দেওয়ালের ওপারে সুখ ফোঁপাচ্ছে। দুঃখ টগবগিয়ে ছুটছে। যেন রেসের মাঠে নাম লিখিয়েছে। 
ওধারে লক্ষণ গন্ডীর দৈববাণী তো ছিলই। না মানলেই হরণ এসে ঘাড়ে চড়বে। হৃদয় হরণ!  সবই দেওয়া নেওয়ার পালা। উত্তমবাবু—– আরে সেই যে আমাদের এক উত্তম কুমার। দেওয়া-নেওয়া বাংলা চলচ্চিত্রে হৃদয় হরণ সাজলেন। কোনও দরকার ছিল না। উনি বাঙালির হৃদয় এমনিই হরণ করে বসে আছেন। হারিয়ে যাওয়া নাকছাবির কি কাউন্টার ইফেক্ট রাম– উত্তম একাকার!  ব্যাকগ্রাউন্ডে কোথাও কী বাজছে— ” সবুজ সবুজ গাছে লালমনুয়া নাচে….”
কেউ কেউ হাঁ হাঁ করে উঠবেন মনে মনে। আরে! রাজকুমারীর রোমান্স ছেড়ে কচি বাচ্চাদের নিয়ে পড়লাম কেন! আমি নিজেই সেই খোঁজে আছি মশাই। যত হারিয়ে যাওয়ার ঝাঁপি পেতে বসেছি, যত দৌড়াচ্ছে, মিটার, কিলোমিটার, মাইল, তত লাল মনুয়ার খোঁজ তীব্র থেকে তীব্রতর হয়ে উঠছে। চূড়ান্ত দশায় রেডিয়ার গান বন্ধ হয়ে গেলে উত্তম, অতি উত্তমতায় নির্বাক। কেবলই ছবি তিনি। আর তালগোল পাকানো এক অস্তিত্ব টেনে হিঁচড়ে ছায়া ছায়াছায়া শান্ত রেলপথের ধারে হাঁ করে বসে আছে তখন।

#আগস্টে_বাহারি_ডুয়ার্সে ২

জলকে যাবি

“ডাক লো ডাক তোরা, বল লো বল
বেলা যে পড়ে এলো, জলকে চল…”
পড়ন্ত বেলা অবধি অপেক্ষা করার কোনও  প্রয়োজন নেই এই দেশে। এ এমন এক দেশ, যেখানে অনন্ত অন্তহীন। কোনো সকাল, দুপুর, বিকেল রাত্রির ভাগ নেই দামালপনার আকাউন্টে। বেহিসেবী মালিক। ঘর দুয়োর এলো রেখে বাইরের সব সামলে বেড়াচ্ছে। চাবি হারিয়ে গেলে খুলে রাখা তালার কাজ কমে। একসময় সে আলসে কুঁড়ের উপাধি পায়। আলসেমির স্বাদ নিতে হারিয়ে যাওয়া’রা গাছের তলায় পা ছড়িয়ে বসে দ্যাখে পথচলতি পথিক। দুদন্ড কথা বলার মানুষ পায় যেন। যে সব সুখ, দুঃখ, হাসি কান্না’রা বোবা হয়ে দেওয়ালে মাথা কুটে মরেছে এতদিন ধরে, তারা আজ উচ্ছ্বলতায় সরব। 
সবার মাঝে একলা ফিরে বেড়ানো, জলকে অসম্ভব ভয় পাওয়া মানুষটাকে মুচকি হাসি হেসে ছলছল করে হেসে যায় জলস্রোত। তার বুকের সূক্ষ্মতম অস্তিত্বও কারো অজানা নয়, কারণ গোপনীয়তার পাঠ সে পায়নি। শহরিয়া অতি চালাকেরা থম মেরে থাকে এই নির্মলতার কাছে। কখনও বা অচিন গাঁয়ের ভিনদেশী এসে দাঁড়ায় তার সামনে। জলের গভীরতা আর চলনশীলতা তাকে বড্ড ভাবায়। কত গভীর অথচ কি হালকা! কত প্রাণ চঞ্চলতা অথচ কি রাশভারী! 
প্রকৃতি মানুষকে গ্রাস করে পাগলপারা করে তোলে যখন তখন আদ্যিকালের পচা পুকুরে স্নান করার স্মৃতি খলবলিয়ে হাসে। এক নোনাধরা গ্রামে বধূরা সেকালে জলকে যেত পড়ন্ত বেলায়। গ্রীষ্ম দুপুরের উত্তপ্ত জল কেটে গহন গভীরে দিনমানের সাংসারিক জ্বালা জুড়োত। জমে উঠত মহিলামহল।  শানবাঁধানো ঘাটে হাত চুড়ির টুংটাং স্বামী নিন্দায় মুখর হতো। কেউ বা স্বামী সোহাগে গরবিনী। শূচি বায়ুগ্রস্ত মধ্যবয়স্কা এদের দিকে বাঁকা মুখের হাসি ছুঁড়ে অন্য ঘাটে নামত। দুটো বড় পাথরের মজবুত বাঁধনেই সে ঘাট গড়ে উঠেছে হয়ত। আগাছার জঙ্গলে ঘিরে রেখেছে ঘাটের পথ। তাই ভালো তার! তবু তো মানুষের ছোঁয়াচ বাঁচে। স্বামী নিয়ে আদিখ্যেতার বয়স যে তার পেরিয়ে গেছে। ওপাশেই বটের ঝুরি ধরে ঝাঁপাঝাপি ক্ষুদে জলদস্যুদের।  মায়ের অনারে সে খেতাব জুটেছে। 
এসবের মাঝে এক দুরু দুরু বুক, শানবাঁধানো ঘাটে পায়ের গোড়ালি ভিজিয়ে মুখ কালো করে ঘরে ফেরে। তার মন তখন সামলে থাকা মন। গভীর অন্ধকারে হারিয়ে যাওয়ার ভয়। কিন্তু বহু সময় পেরিয়ে এসে এখানে আজ জলসোহাগী হওয়া যায়। তার আঁতের নিবিড়তায় কান পাতলে মনে ধুন ওঠে— “মুসাফির হুঁ ইয়ারোঁ/ না ঘর হ্যায় না ঠিকানা/ মুঝে চলতে যানা হ্যায়/ ব্যাস চলতে যানা…” হৃদয় ছোঁয়া যায় জলের। ছুঁয়ে দিলে মানুষেরা হয় জলকুমার- জলকুমারী। যাদের জলজীবন, মনের ভিজে থাকা নিরন্তর।

#আগস্টে_বাহারি_ডুয়ার্সে ৩

সবুজ দ্বীপের রানি ১

এখানে রানিদেরই রাজত্ব। রাজ্যপাট দখলদারির হুড়ো নেই। এদের শরীর সবুজের আবহে বাঁধা। সবুজের নিবিড় অন্ধকার গর্ভে জন্মলগ্নের কুন্ডলী লেখা হয়েছিলো কোনোকালে। শরীরের সেই সুস্বাদু বহন করে চলেছে আজনম। পায়ে সবুজ মাড়িয়ে, শরীরে সবুজ ছেনে এদের রাতকথায় স্বপ্ন নামে ঘুসুর ঘাসুর, ফুসুর ফাসুর শব্দে। ঝিমঝিমে সবুজ স্রোতের মাঝে মাঝে কংক্রিটের শয়তান বাসা বেঁধেছে, এগুলোই সবুজ দ্বীপের রানির মনঃযন্ত্রণা।  তাই সে গহীন রাত্রির অপেক্ষায় থাকে। একটু নিবিড়তায় নিজেকে জড়িয়ে নেবে বলে। 
আবার সক্কাল সক্কাল কত কাজ। ভোরে উঠে গোবর ছড়া দাও। বড়বাড়ির মর্জিমাফিক রোদের পর্দা টাঙাও। গোলকধাঁধায় ঘুরে পড়ুক। সবুজ-নীলের এলোমেলোতে ডুবে মরুক বেহায়াদের দল। একটা তুলি বুলিয়েই রানির কাজ শেষ। শুধু ঘনত্বের পার্থক্যে কিছু দৃষ্টিসুখ এঁকে রেখে যায় নিমেষে। টলটলে নীলের গায়ে ঘনশ্যাম নীলের অজস্র রেখা। আরও উপরে, তারও উপরে সোনালি-ঘিয়া রেখা, গলে পড়া সাদার সাথে রূপের দর কষাকষি যেন!
তবে এসব আদিখ্যেতা বেশি দেখার সময় নেই রানির। তার দামাল ছেলেটা যে কোন পাথরের খাঁজে হাঁটতে গিয়ে হিঁচড়ে পড়ে থাকবে! কেই বা ওষুধ লাগায়, কেই বা তার চোখ মোছায়। হয়ত চোখের জল চোখেই শুকিয়ে যাবে। সমবয়সী সঙ্গীর হাত ধরে দৌড়ঝাঁপের আনন্দে খিদে তেষ্টা ভুলে যাবে। 
এসব সময়ে ছোট্টবেলার কোনও মানুষ এসে পথ জুড়ে দাঁড়ায়। যখন কথা ফোটেনি, আধো বোলে চারদিক মুখরিত হতো। নিতান্ত ধূসর বলে জীবনকে চিনতে শেখেনি সে মানুষ। প্রবল বেখেয়ালিপনায় দুদ্দাড় ভেঙে চুরে ছুট লাগানো বেয়াড়া মানুষটা যখন পেয়ারা পাড়তে গিয়ে সঙ্গীর ঢিলে মাথা ফাটাত তখন তার দোসর ছিলো চিল চীৎকার কান্না।  শশব্যস্তে মা আসবেন, শুশ্রূষার আঙুলে কষ্ট মোছাতে। ধুয়ে যাবে যন্ত্রণা। কয়েক পলে সেসব ভুলে দৌড়াবে ফের দস্যিপনায়। নড়বড়ে সেতু, পথের ইঁট পাথর তুচ্ছ তার কাছে তখন। জীবনের স্বাদ পানে ব্যস্ত সে। 

#আগস্টে_বাহারি_ডুয়ার্সে ৪

সবুজ দ্বীপের রানি ২

সকালবেলার কুয়াশামাখা পান্নাবাহার কিশোরী নদীর প্রেমে পা ভিজিয়ে নিঃসীমতার হাত ধরে। এখন দামাল হাওয়ারা জোট বেঁধেছে, নিরুদ্দেশের মেঘকে ধরে আনবে বলে। এইসময় খুব একচোট না ভেজালে ইজ্জত থাকে না তাদের। অভিমানী মেঘ গলে পড়বে। তাদের চোখের জমানো কান্নায় খলবলিয়ে উঠবে কচি কচি স্কুলফেরত পায়ের দল। তবে তো মনে শান্তি। 
ঐ দেখা যায়, স্কুলঘরের জানলার খোপ। ড্যাবা ড্যাবা চোখ নিয়ে উঁকিঝুঁকি দিচ্ছে চঞ্চলমতির দল। অঙ্ক ক্লাসের প্লাস মাইনাসের কড়া পাহারা এদের মনকে বেঁধে রাখতে পারে না। রাস্তার পাশের ফুচকা দাদা তড়িঘড়ি গুটিয়ে পাটিয়ে রাস্তার ওপারের শেডের নীচে চলে গেলো। খুব জোরে চোখ টিপে ছেলের দল প্রার্থনা করে, হে ঠাকুর রাস্তায় জল জমুক। কিন্তু ফুচকা, আইসক্রিম দাদা’রা যেন না ভেজে। 
এখন শুধু ছুটির ঘন্টা বাজার জন্য কান সজাগ হয়ে আছে। এরপর….  ছাঁই ছাপা ছাঁই, ছাপাকে ছাঁই……আতি হুয়ে লহেরোঁ পে যাতি হুয়ি লড়কি…  জলেই চলবে ধুন্ধুমার ফুটবল, দাপুটে ক্রিকেট — জলে, কাদায় সবুজ ঘাসে মাখামাখি। জল ছিটকে পড়বে দ্রুত পাশ কাটিয়ে যাওয়া কোনো বিনুনি দোলানো কিশোরীর নীল সাদা স্কুল ড্রেসে। হা হা, হি হি,  হো হো হাসির ছররা ছুটবে। চুপড়িভেজা মন আড় ভাঙবে ফুচকার আসর জমিয়ে। এসব অতি সাধারণ ধূসর রঙের দিনগুলো পাহাড়ের কোলে এসে ভিড় করে দাঁড়ায়। 
দূরে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ভিজতে থাকা একটি দুলন্ত নড়বড়ে সেতু। দিগন্তরেখায় সবুজের ঘ্রাণ নিতে মেঘেরা ঝাঁপ দিয়েছে— এমনই পাহাড়তরঙ্গে, সবুজের মদিরায় ডোবানো ছোট্ট বাড়ির দোতলার ছাদে অন্নঘ্রাণ নিতে নিতে অস্তিত্বের শিকড়ে টান পড়ে। মদের মতো সবুজ গেলাসে গেলাসে পান করে, চোখ ভিজে ওঠে পিছনে ছেড়ে আসা দয়িতের মুখরেখায়। কারো ফুরিয়ে যাওয়া প্রেম অশ্রুধারায় মেশে গিয়ে এঁকেবেঁকে হারিয়ে যাওয়া নদীটিতে। বুকের তীব্র দহন ভিজে স্বাদের চাদর জড়ায় ওমে— “পানি পানি রে…… খাড়ে পানি রে…..”

#আগস্টে_বাহারি_ডুয়ার্সে ৫

    

মেঘমুলুকের চিঠি

পাহাড়ের পাঁজরগলা অভিমান বয়ে যেতে যেতে মূহুর্ত হয়— মূহুর্ত থেকে প্রহর— প্রহর থেকে সময়— সময় থেকে কালস্রোত। ফিরে ফিরে আসে।  মহাসমুদ্রে ঝাঁপিয়ে পড়ে, দীর্ঘ অকথনের ক্ষোভ নিয়ে। যেতে যেতে পথে এক ছোট্ট গ্রামে খানিক জিরিয়ে নেয় সে। সরকার বাড়ির লাজুক গৃহবধূটি এসে বসে পারঘাটায়। হয়ত জবরদস্ত সরকারগিন্নী দুকথা শুনিয়েছে চাঁছির প্রতি লোভী দৃষ্টির জন্য। সোহাগিনীর ঠোঁট উল্টে গেছে। জলের বুকে হাত রেখে যত্ত অভিযোগ– দ্যাখো, দ্যাখো! কত যন্ত্রণার পাথর বুকে বুকে বয়ে সংসার করি। তুমি আর কি বুঝবে! এসব যন্ত্রণা তোমায় সইতে হয় না তো! বুকে পাথর নেই, শুধু বালি আর কাদা– কি নরম তারা, আঘাত দিতেই জানেনা। ফুঁসে ওঠে নদীর বুক। পর পুরুষের অভিমান বুকে নিয়ে সোহাগিনী বধূর হাতে ধরিয়ে দেয় চিঠি। 
কখনও আমার জন্ম ঠিকানায় গিয়ে দেখো! পাহাড়ের বুক ফেটে বেরিয়ে আসার গর্ভযন্ত্রণা বুঝবে– সন্তান আসুক কোল আলো করে। ঐ জন্মকালীন কলকল ডাকে ঝামড়ে ওঠে শরীর। বেঁহুশ হয় পথিক। টলোমলো চড়াই -উৎরাই বেয়ে চলে। মেঘ তখন একমাত্র সঙ্গী। এসে সামলে ধরে। নিয়ে যায় ছোট্ট এক অচিন জনপদে। ভীতু মন অবাক বিস্ময়ে দেখে ঝুমুর ঝামুর পাহাড়ি মেয়ের দল দুলদুলিয়ে চলাফেরা করছে। রঙ বেরঙ-এর সবজির পসরা সাজিয়ে বসেছে কোনও বয়স্কা। আবার কোনও বৃদ্ধা দোকান দিয়েছে রঙবাহারি ছাতার। সাথে আছে হরেক কিসিমের পাহাড়ি ফল, চকলেট,  মেয়েলি গয়নার দোকান। 
সেই কোন গ্রামের হাটে যা নেবে তাই দশ টাকাওয়ালা আসত। এবাড়ি ওবাড়ির জানলা দরজা ভরদুপুরে কানাকানি করে জানান দিত সে কথা। ভিড় উপচে পড়ত মনোহারীওয়ালার ঝাঁপিতে। মুখে তার বিজয়ীর হাসি। হাসি এপাড়া বেপাড়ার মহিলাদের মুখেও। কেউ বা কিনেছে চুলের লাল, নীল ফিতে। কারো হাতে ধরা বেলোয়ারি চুড়ি– ছটা লেগে তার চোখমুখ চকচকে। 

#আগস্টে_বাহারি_ডুয়ার্সে ৬

 

ঈশ্বর থাকেন জলে

এরপর সাঁঝের বুড়ি আসবে ঘরের দরজায় দরজায় কড়া নেড়ে রূপকথা শোনাতে। বুড়ো বুড়ি হাত ধরে ঠুকঠুক করে হাঁটবে। ঈশ্বরের বসবাস তো সেই দেশেই। ঘন বনানীর রূপে, মেঘের চাদরে ঢেকে সাদা চুল দাড়ি নেড়ে বৃদ্ধ ঈশ্বর নেমে আসবেন। তাঁর ভাঁজ পরা শীর্ণ হাত বুলিয়ে যাবেন অজস্র অদ্বিতীয় সত্তায়। তাঁরই প্রতিচ্ছায়া যারা, আজ বসেছে প্রার্থনা গৃহে। ‘ওম মণি পদ্মে হুম’ মন্ত্রের দোদুলে হাসি ফোটে ঈশ্বরের ফোকলা দাঁতে।
 দরজার বাইরে বসে থাকা চড়া মেক আপ ও সাজগোজের মেয়েটি যে ঔদাসীন্যের রাজত্বে খেই হারিয়েছে, তার মাথায় টুপটাপ হাসি ঝরে অশীতিপর ঈশ্বরের। তিনি মায়াবী চোখে তাকান। রাগতে ভুলে যান। হাসিমুখে চুমু দিয়ে মাথায় হাত বুলিয়ে দেন। চোখ বেয়ে জল পড়ে তাঁর সারি সারি বিষণ্ণ মুখ দেখে। ঐ জল বহু পথ বেয়ে সুখ দুঃখে তার নাও বোঝাই করে পাড়ি দেয় সাত সমুদ্দুরে। দল ভারী নাহলে যে ঈশ্বরের কানে পৌঁছায় না সে ধ্বনি। তাদেরকে তাই উড়ে উড়ে যেতে হবে কোন সুদূর আকাশে। যেতে হবে ধোঁয়া ধোঁয়া মেঘের জগতে। ঝরে পড়তে হবে কোনও এক পাহাড়ি গ্রামের প্রার্থনা সভায়, পথে ঘাটে, দুর্গম গুহার পাঁজর ভেঙে।
  

#আগস্টে_বাহারি_ডুয়ার্সে ৭

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।