মেলা মানেই তো মিলন।প্রাচীন কাল থেকে আমাদের দেশের বিভিন্ন ঐতিহ্য,সংস্কৃতি ধর্মকে আশ্রয় করে লোক উৎসব ও মেলার আবির্ভাব ঘটে।ধর্ম তো বিভেদ নয়।ধর্ম শেখায় মানুষকে ভালবাসতে।তাই যুগ যুগ ধরে মানুষ বিভিন্ন ধর্মীয় উৎসব অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে ঐক্যবদ্ধ হয়েছে।বিশ্বের সেরা শান্তিপূর্ণ ধর্মীয় সমাবেশ হল ভারতের কুম্ভমেলা।পৃথিবী,চন্দ্র সূর্যকে কেন্দ্র করে এই ধরনের উৎসব মেলার আয়োজন করা হয়।যা মূলত নদী কেন্দ্রীক।ধর্ম প্রাণ মানুষ ভক্তি নম্রতায় উৎসব-অনুষ্ঠানে অংশ নেয় ।জাতি ধর্মবর্ণনির্বিশেষে মানুষের অংশগ্রহণে কুম্ভমেলা সেরা উৎসবে পরিণত হয়।দেশের চার জায়গায় প্রয়াগ [এলাহাবাদ] নাসিক উজ্জয়নী ও হরিদ্বারে ছয় বছর ও বারো বছর অন্তর কুম্ভমেলা এলাকার নদীকে কেন্দ্র করে অনুষ্ঠিত হয়। মকর সংক্রান্তির পবিত্র স্নান থেকেই কুম্ভ মেলার শুভারম্ভ।সনাতন ধর্মাবলম্বিদের কাছে মকর সংক্রান্তি ‘ উত্তরায়ণের সূচনা। মানুষের বিশ্বাস এটি অশুভ সময়ের শেষ।তারপর থেকে শুভ সময় শুরু।সূর্যের মকর রাশিতে প্রবেশ কে বোঝায়।এই উৎসব মেলাগলি সব নদী কেন্দ্রীক।বৃহস্পতি যখন বৃষ রাশিতে এবং সূর্য যখন মকর রাশিতে প্রবেশ করে তখন মহাকুম্ভ মেলা বসে এলাহাবাদ বা প্রয়াগে৷প্রয়াগে কুম্ভ মেলা গঙ্গা যমুনা সরস্বতী নদীর সঙ্গম স্থলে অনুষ্ঠিত হয়।যা ত্রিবেণী সঙ্গম নামে পরিচিত।বিন্ধ্যা পর্বতে উৎপন্ন চম্বল, বেতবতি নদী গঙ্গার সর্ব প্রধান উপনদী যমুনার সঙ্গে মিলিত হয়ে যমুনা নামে গঙ্গার প্রধান প্রবাহে মিশেছে।অপরদিকে ত্রিবেণীতে পুরাণ কথিত ধারনা সরস্বতী অন্তঃ সলিলা হয়ে যমুনার নিজে বয়ছে।আর সেটায় পবিত্র ত্রিবেণী সঙ্গম।মধ্যপ্রদেশের প্রাচীন নগর মোক্ষপুরী উজ্জয়নী যা বর্তমানে অবন্তী নগর নামে পরিচিত।উত্তর বাহিনী নদী শিপ্রা উজ্জয়নীর কাছে বিন্ধ্যা পর্বত থেকে উৎপন্ন হয়েছে।পৌরাণিক কাহিনী অনুসারে বিষ্ণুর দেহ থেকে সৃষ্ট শিপ্রা।মন আর দেহের বিশুদ্ধতার প্রতীক।মোক্ষ লাভের আশায় শিপ্রা নদীর দক্ষিণে মোক্ষপুরী উজয়নীতে কুম্ভমেলায় লক্ষ লক্ষ তীর্থ যাত্রীর পুন্য স্নানের ঢল নামে।
ভারতের নদী অববাহিকার মধ্যে অন্যত্তম নদী অববাহিকা গোদাবরী নদী অববাহিকা।দক্ষিণ ভারতের পশ্চিম বাহিনী নদীর তীরে কুম্ভমেলার আয়োজন করা হয়। মহারাষ্ট্রের নাসিকের ত্র্যম্বকেশ্বরে এই সূর্য স্নান উৎসব অনুষ্ঠিত হয়।লক্ষ মানুষের সমাগমে।সূর্য ও বৃহস্পতি গ্রহ যখন সিংহ রাশিতে প্রবেশ করে তখন মহাকুম্ভ মেলা হয় মহারাষ্ট্রের নাসিকে৷হিমালয়ের গঙ্গোত্রী হিমবাহ থেকে ভারতের আদর্শ নদী গঙ্গার সমভূমি প্রবাহ শুরু হয় হরিদ্বারে৷এখানকার কুম্ভমেলায় সভা যাত্রা করে আশা সাধুদের মন্ত্র উচ্চারণেও সঙ্গীতে এক স্বর্গীয় পবিত্র আবহ তৈরি হয়৷সূর্য যখন মেষ রাশিতে প্রবেশ করে তখন মহাকুম্ভ মেলা অনুষ্ঠিত হরিদ্বারে৷ হরিদ্বার ও প্রয়াগে অর্ধকুম্ভ আয়োজিত হয় প্রতি ছয় বছর অন্তর।পূর্ণকুম্ভ আয়োজিত হয় বারো বছর অন্তর প্রয়াগ,হরিদ্বার, উজ্জ্বয়িনী ও নাসিকে বারোটি পূর্ণকুম্ভ অর্থাৎ প্রতি ১৪৪ বছর অন্তর প্রয়াগে আয়োজিত হয় মহাকুম্ভ।
বৃহস্পতি ও সূর্যের অবস্থান অনুসারে চারটি স্থানে কুম্ভমেলা আয়োজিত হয়। পৌরাণিক কাহিনী অনুসারে সমুদ্র মন্থন করে অমৃতের হাঁড়ি নিয়ে যখন দেবতারা পালাছিলেন তখন চার ফোঁটা অমৃত চার জায়গায় পড়ে যায় আর সেখানেই বসে কুম্ভমেলা।হর্ষবর্ধনের রাজত্ব কালে চীনা সন্ন্যাসী হিউয়েন সাঙের বিবরণ থেকে জানা যায় এই প্রাচীন মেলার কথা।ভারতীয় ঐতিহ্য সংস্কৃতির ধারক এই কুম্ভমেলা।ইউনস্কোর সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের তালিকায় কুম্ভমেলাকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
বিভিন্ন তিথিতে বিভিন্ন স্নানের মহাত্ব রয়েছে।যেমন মকর সংক্রান্তিতে মকর স্নান,যা প্রথম স্নান রাজযোগী স্নান নামে পরিচিত।শুভ কাজের সূচনা হয়।মৌনী আমাবস্যার দিনের স্নান।ওই দিন বড় মেলা বসে।বসন্ত পঞ্চমীর দিন,মাঘী পূর্ণিমার স্নান ও মহা শিবরাত্রির স্নান সবই পুণ্যতোয়া গঙ্গা-যমুনার সঙ্গমে ডুব দেয় ধর্ম প্রাণ মানুষ মোক্ষ লাভের আশায়।বিশ্বে ধর্মের উদ্দেশে সেরা জমায়েত কুম্ভমেলা।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছেন, ‘আমাদের দেশ প্রধানত পল্লীবাসী।এই পল্লী মাঝে মাঝে আপনার বাড়ির মধ্যে বাহিরের বৃহৎ জগতের রক্ত চলাচল অনুভব করিবার জন্যে উৎসুক হইয়া উঠে।তখন মেলাই তাহার প্রধান উপায়।এই মেলায় আমাদের দেশে বাহিরকে ঘরের মধ্যে আহ্বান করে।এই উৎসবে পল্লী আপনার সমস্ত সংকীর্ণতা বিস্মৃত করে।তাহার হৃদয় খুলিয়া দান গ্রহণ করিবার এই প্রধান উপলক্ষ্য….’ নদীকে জড়িয়ে প্রকৃতি,মানুষ আর ধর্ম সব মিলেমিশে মিলনের মহাপীঠ তৈরি করে ঐতিহ্যের কুম্ভমেলায়।আর তখনি উৎসব সর্বজনীন হয়ে যায়।আর সেখানেই প্রতিফলিত হয় সনাতন ভারতের সহনশীল মানবিক ধর্মের কালজয়ী উদারতা।সংবাদে প্রকাশ আসন্ন কুম্ভ মেলার রাস্তা সম্প্রসারণের সহযোগিতায় মসজিদের সরকারি রাস্তায় থাকা অংশ স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে ভেঙে দিয়ে সম্প্রীতির অনন্য নজির গড়লেন প্রয়াগ রাজের[এলাহাবাদ]মুসলিম সমাজ।ভ্রাতৃহত্যার রক্তরেখা পেরিয়ে মানবাত্মার আত্ম পরিচয়ের গহন পথরেখাটি কুম্ভমেলার মতো ধর্মীয় লোকাচার ও দেশ গণ্ডির শুদ্ধ আলোকে আমাদের মানবসত্তা ও মানব ধর্মের যে বর্ণালী চালচিত্র নীরবে নির্মাণ করছে ভারতের সনাতন সভ্যাতার সেই সরলগ্রাহ্য সেই সতা দর্শনের কথাই বলে।