প্রবন্ধ মৃদুল শ্রীমানী

আমি বাংলার কথা ক‌ই

কবি লিখলেন, “অত‌এব লিখি ভাষা যাবনী মিশাল”। ঠিক ধরেছেন, ওই “ভাষা ” শব্দটা দিয়ে কবি একটি নির্দিষ্ট ভাষাকেই বোঝাতে চাইছেন। আর সেটি বাংলা ভাষা। বাঙালির ঘরের পণ্ডিত সে যুগে জ্ঞানচর্চার মাধ‍্যম হিসেবে বাংলাভাষাকে পাত্তা দিত না। সে সংস্কৃত ভাষায় জ্ঞানচর্চা করত। অথচ সে কোনো কালিদাস বা ভবভূতি নয়। বাগদেবীর আশির্বাদ, সে তো সোজা জিনিস নয়। তাই বাঙালির সংস্কৃত ভাষায় লেখা সাহিত্য তেমন কোনো বড়ো জায়গায় গেল না। বাংলাভূমির কবি কৃত্তিবাস ওঝা ও কাশীরাম দাস বাঙালির ছেলেমেয়েদের হাতে দিলেন রামায়ণ মহাভারত। সে জিনিস বাঙালির প্রাণের সামগ্রী হল।
বাংলাভূমিতে কি বাংলায় কথা হত না? হত। কিন্তু বাংলার প্রাচীনতম লেখ‍্যরূপ ওই চর্যাগাথা। কেউ বলবেন চর্যাচর্য বিনিশ্চয়। তবুও সে যেন ঠিক ঠিক এখনকার বাংলা নয়। ওকে বলব প্রত্নবাংলা। তারপর শ্রীকৃষ্ণকীর্তন। তখনও লেখার হরফ, আর বানান এখনকার থেকে অনেক আলাদা। ভাগ‍্যিস, চর্যাগাথা আর শ্রীকৃষ্ণ কীর্তন, এই দুটোই লোকচক্ষুর আড়ালে ছিল। ন‌ইলে তাদের নিয়ে লিপিকর আর পণ্ডিতরা কি চেহারা দিতেন, তা খোদায় মালুম। চটকাতে চটকাতে দশম দশা হত। আমাদের লিপিকরদের ওই দোষ ছিল। এখানে সেখানে নিজের খুশিমতো বানান লিখতেন। এমনকি টুকটাক নিজের মনের মাধুরী মিশিয়ে দিতেন চুপি চুপি। এই সাত নকলে আসল খাস্তা হওয়া পুঁথির আদিরূপ আজ খুঁজে পাওয়া ভারি শক্ত। লোকচক্ষুর আড়ালে না থাকলে চর্যাগাথা ও শ্রীকৃষ্ণ কীর্তনের‌ও ওই অবস্থা হত।
সময়ের সাথে ভাষা বদলে যায় , লিপি বদলে যায়। বানান‌ও। ইসলামের বিজয় পতাকা উড়লে কবি সাহিত্যিকগণ আরবি ফারসি শিখতে উঠে পড়ে লাগলেন। শাসক বদলালে স্তাবক নিজেকে বদলে নেয়। শাসকের মন বুঝে চলে সুবোধ কবির দল। ইসলামী শাসনে বাংলা ভাষায় আরবি ফারসির হাওয়া বাতাস বইল। আবার ইউরোপের বণিকরা এলে তাদের সাথে মিশে তাদের শব্দগুলি নিয়ে নিজের ঘর সাজানো হয়েছে। ভাষা এই রকম। সে বদলায়, সে পালটে যায়।
ইংরেজ শাসন এলে বাঙালির ছেলে চাকরি খোঁজার দায়ে ইংরেজি শব্দ মুখস্থ করতে বসল। পামকিন লাউ কুমড়ো কুকুম্বার শসা। বাংলায় ঢুকে পড়ল প্রচুর ইংরেজি শব্দ। বাঙালি ব‍্যবসা করতে গিয়ে বলল, টেক তো টেক, নো টেক তো নো টেক, একবার তো সী। গালগল্প করার সময় পানাপুকুরে তেঁতুলে বাগদির ডুবে মরার কথা বলল, লেগ নো পণ্ডে ডুবে মরেছে। উপকারও একটু হল। যতিচিহ্ন বিকশিত হল। বাংলা ভাষার বাক‍্যগঠন প্রণালী আদৌ সংস্কৃতানুসারী নয়। ইংরেজি ভাষা তাকে বিস্তর প্রভাবিত করেছে।
বাংলা ভাষার অজস্র পুঁথি পড়ে দেখে বুঝে বিশ্লেষণ করে বাংলার মান‍্য হরফ খাড়া করলেন চার্লস উইলকিনস সাহেব। তিনি তালিম দিয়ে পঞ্চানন কর্মকার আর তার জামাই মনোহরকে লোহার হরফ বানাতে পটু করে দিলেন।
বাঙালির মধুকবি লিখলেন ক‍্যাপটিভ লেডি। বাঙালি ব্রাহ্মণ সন্তান ডেপুটি ম‍্যাজিস্ট্রেট হয়ে লিখলেন রাজমোহন’স ওয়াইফ। বাঙালির ইংরেজি ভাষার লেখা জগৎ বিখ্যাত হয় নি। টেরটি পেয়েছিলেন মধুসূদন দত্ত। তাঁর স্বপ্নে কুললক্ষ্মী কয়ে দেন বাংলায় লিখতে। লিখলেন তিনি মেঘনাদবধ কাব্য। ভিতরে যদিও র‌ইল প্রচুর ইংরেজি পড়ার অভিজ্ঞান আর গ্রিক ও রোমক পুরাণ মহাকাব‍্য আত্মস্থ করার সাধনা। আর এক ধাক্কায় বাংলাকে পৌঁছে দিলেন বিশ্ব সাহিত্যের অঙ্গনে।
ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।