প্রবন্ধে জয়ন্ত সরকার

রামমোহন, দেবেন্দ্রনাথ ও রবীন্দ্রনাথের চিন্তামানসে উপনিষদের প্রভাব

উনবিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধ থেকে বাংলার নবজাগরণ বা রেনেসাঁর অধ্যায় শুরু হয়। এই আন্দোলনের যাঁরা পুরোধা ছিলেন তাঁদের মধ্যে রামমোহন, দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর ও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নাম উল্লেখযোগ্য। সেই সময় বাংলার বুদ্ধিজীবী মহলে এক নতুন শিক্ষার জোয়ার এসেছিল এবং প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের সাহিত্য, বিজ্ঞান ও দর্শন এই বুদ্ধিজীবী মহলে নতুন চিন্তাধারার উন্মেষ ঘটিয়েছিল।
প্রাচীন ভারতীয় সংস্কৃতির মূল উৎস ছিল বেদ এবং উপনিষদ। কালের বিবর্তনের সাথে সাথে এবং সামাজিক অবক্ষয়ের গ্লানিতে ভারত তার এই মহান ঐতিহ্যকে প্রায় ভুলে যেতে বসেছিল। এই বিলুপ্তপ্রায় ঐতিহ্যকে নতুন ভাবে সাহিত্যের মধ্যে প্রতিভাত করার প্রয়াস করেন রামমোহন, দেবেন্দ্রনাথ, রবীন্দ্রনাথের মতো মনীষীরা। এঁদের মধ্যে রবীন্দ্রনাথ তাঁর কাব্যের মধ্যে দিয়ে বেদ উপনিষদের মর্মকে মূর্ত করে তুলেছেন অন্যদের তুলনায় বেশী। তবে রবীন্দ্রনাথের পূর্বসূরী রামমোহন ও পিতা দেবেন্দ্রনাথ যে অগ্রণী ভূমিকা নিয়েছিলেন তা বিশেষভাবে উল্লেখের দাবী রাখে।
ব্রাহ্মধর্মের অন্যতম প্রধান উদ্যোক্তা রাজা রামমোহন রায় ছিলেন উনবিংশ শতাব্দীর একজন প্রগতিশীল চিন্তানায়ক। পাশ্চাত্য ধ্যান-ধারণায়, বিশেষ করে খ্রীষ্টধর্মের প্রেরণায় উজ্জীবিত রামমোহন কিন্তু সনাতন হিন্দুধর্মের প্রধান অলংকার- বেদ-উপনিষদকে কোনদিন অগ্রাহ্য করেননি। খ্রীষ্টধর্মকে যথেষ্ট মর্যাদা দিলেও হিন্দুধর্মের আধ্যাত্মিক এবং দার্শনিক তত্ত্বকে তিনি বিশ্বের সব ধর্মের চেয়ে বেশী মূল্যবান বলে মনে করেছেন।
ফ্রান্সের বিশপ এ্যবে গ্রেগয়ার রামমোহন সম্পর্কে বলেছিলেন, “He asserts likewise that he has found nothing in European looks equal to the scholastic philosophy of the Hindus.” রামমোহন বেদ এবং উপনিষদ পঠনের মাধ্যমে তাঁর নিজস্ব সাহিত্যের মধ্যে এগুলির ব্যাখ্যা করেছেন এবং তাঁর লেখনীর উপর বেদ-উপনিষদের প্রত্যক্ষ প্রতিফলনও লক্ষ্য করা যায়। উপনিষদভিত্তিক রামমোহনের সাহিত্যকর্মগুলি এইভাবে চিহ্নিত করা যায় –
ক) বেদান্ত গ্রন্থ – ১৮১৫ খ্রীঃ
খ) বেদান্ত সার – ১৮১৫/১৬ খ্রীঃ
গ) তলাবকার উপনিষদ বা কেনোপনিষদ – ১৮১৬ খ্রীঃ
ঘ) ঈশোপনিষদ – ১৮১৬ খ্রীঃ
ঙ) কঠোপনিষদ – ১৮১৭ খ্রীঃ
চ) মান্ডুক্যপনিষদ – ১৮১৭ খ্রীঃ
ছ) মুন্ডক্যপনিষদ – ১৮১৯ খ্রীঃ
ঠাকুর পরিবারের দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর ছিলেন রেনেসাঁ চিন্তাধারার এক প্রধান গ্রাহক। তাঁর প্রথম উপনিষদ পাঠের অধ্যয়নকাল ছিল ১৮৩৮ থেকে ১৮৪৩ সাল। এই সময়ে তিনি প্রধান সহায়তা পেয়েছিলেন রামচন্দ্র বিদ্যাবাগীশের থেকে যিনি ঈশোপনিষদের প্রধান শ্লোক দেবেন্দ্রনাথকে ব্যাখ্যা করে শোনান –
“ঈশ বাস্যমিদং সর্বং যৎকিঞ্চিত জগৎতম
জগৎতেন ত্যক্তেন ভুক্ততীথাঃ ।”
এগারোটি উপনিষদের মূল বক্তব্যবিষয়গুলি তিনি দেবেন্দ্রনাথের কাছে প্রাঞ্জল করে তুলে ধরেন। ১৮৪৪-৪৮ সালে শুরু হয় দেবেন্দ্রনাথের উপনিষদ পঠনের দ্বিতীয় অধ্যায় এবং এই সময়েই রচিত তাঁর ‘আত্মজীবনী’র দশম, দ্বাদশ ও চতুর্দশ অধ্যায়ে পাওয়া যায় উপনিষদের মূল্যবান প্রভাব। দ্বাদশ অধ্যায়ের মুখবন্ধে তিনি লিখেছেন যে শংকরাচার্য্যের মতে ১১ টি উপনিষদ বর্তমান কিন্তু তাঁর নিজস্ব অনুসন্ধানে তিনি ১৪৭টি উপনিষদের স্বরূপ খুঁজে পেয়েছেন। এই সময়েই তিনি উপনিষদ বিষয়ে প্রচুর জ্ঞান অর্জন করেন এবং ‘ব্রহ্মউপাসনা’র প্রতিপাদ্য বিষয়টি তিনি উপনিষদের সাহায্যেই লেখেন। ১৮৪৫ থেকে ১৮৪৮ পর্যন্ত সময়কালে দেবেন্দ্রনাথ উপনিষদের নতুন ব্যাখ্যা শুরু করেন। বেদ পড়ার এক ঐকান্তিক আগ্রহ তিনি অনুভব করেন এবং তাঁর কয়েকজন শিষ্যকে তিনি বেদ পড়ার জন্য কাশীতে পাঠান, পরে নিজেও কাশী গিয়ে বেদ অধ্যয়ন করেন। ১৮৪৮ সালে তিনি ‘ব্রাহ্মগ্রন্থ’ রচনা করেন তাঁর নিজস্ব রীতিতে যা পরে ‘ব্রহ্মোপনিষদ’ নামে খ্যাত হয়। তিনি গায়ত্রী মন্ত্রকে ‘ব্রহ্মোপসনা’র প্রথম মূলমন্ত্ররূপে রেখে উপনিষদের প্রতি তাঁর শ্রদ্ধাঞ্জলি নিবেদন করেন।
রবীন্দ্র জীবনীকার শ্রী প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায় রবি জীবনে উপনিষদের প্রভাব বর্ণনা করতে গিয়ে বলেছেন – “Nothing has influenced him more, both consciously and as an undercurrent of thought, than the Upanishads….
I maintain that Rabindranath’s career is only an evolution and development of his Upanishadic education”.
রবীন্দ্রনাথ উপনিষদের প্রকৃত মূল্যায়ন করতে পেরেছিলেন এবং উপনিষদের দর্শনকে তাঁর মানবিক ও আধ্যাত্মিক মননের মাঝখানে গ্রহণ করেছিলেন। তাঁর মতে, “Like all truths realized through life, the truths of the Upanishads are concrete. Many tendencies of thought have been reconciled in them, because life itself is a great reconciler.” বহু ইউরোপীয় তত্ত্ববিদ উপনিষদের দর্শনের মধ্যে শুধু জীবনের নেতিবাচক দিক দেখেছেন, যেমন- মোহ, দুঃখ এবং অসত্য। কিন্তু উপনিষদের মধ্যে যে একটি অভিনব দিক আছে তাকে গুরুত্ব দিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ এবং রবীন্দ্রনাথই প্রথম যিনি উপনিষদের বাণীর মধ্যে পেয়েছিলেন ‘আনন্দম্‌’ বা আনন্দ বাণীকে।
রবীন্দ্রনাথের সুচিন্তিত গ্রন্থ ‘সাধনা’র প্রতি ছত্রে বেদ-উপনিষদের গভীর দর্শন-তত্ত্ব প্রতিফলিত হতে দেখা যায়। শুধু প্রাচ্য নয়, পাশ্চাত্যের অনুরাগীবৃন্দও ‘সাধনা’র ভূয়সী প্রশংসা করেছেন তার সমৃদ্ধ দর্শনতত্ত্বের জন্য। ২৭.২.১৯১৪ তারিখে “West London Post” রবীন্দ্রনাথের ‘সাধনা’-র সুন্দর সমালোচনা করে শেষ মন্তব্যটি করে –
“The writer was brought up in the midst of a family where texts of the Upanishads were used in daily worship and in ‘Sadhana”, it is the wish of the author that his Western reader shall come into touch with the spirit of ancient India and the reader of the book jhas no difficulty in gratifying the author’s wish.”
তাঁর ‘নৈবেদ্য’ গ্রন্থের কবিতাগুলির মধ্যে উপনিষদের প্রভাব সবচেয়ে বেশী পরিলক্ষিত হয়। ১৯০১ সালে রচিত ‘নৈবেদ্য’র ৫৭, ৫৮ ও ৬০ সংখ্যক কবিতাগুলির মধ্যে ‘শ্বেতাশ্বতর’ উপনিষদের প্রভাব দেখা যায়। ৫৭ সংখ্যক কবিতা “হে সকল ঈশ্বরের পরম ঈশ্বর”-এর সঙ্গে ‘শ্বেতাশ্বতর’ উপনিষদের ৬-সংখ্যক মন্ত্র “তমিস্মরণং পরমং মহেশ্বর তাং চ দৈবতাম্‌”-এর মিল পাওয়া যায়। ঈশোপনিষদের প্রায় প্রত্যেকটি মন্ত্র যেন গাঁথা হয়ে আছে রবীন্দ্রনাথের ‘নৈবেদ্য’র মর্মমূলে। কয়েকটি উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে –
“নৈবেদ্য”-র ৫৮ সংখ্যক কবিতা –
“তাঁহারে দেখিয়াছেন বিশ্বচরাচর
ঝরিছে আনন্দ হতে আনন্দ নির্ঝর
…অগ্নির প্রত্যেক শিখা ভয়ে তব কাঁপে
বায়ুর প্রত্যেক শ্বাস তোমারি প্রতাপে….।”
এর সাথে ঈশোপনিষদের ১৮ সংখ্যক মন্ত্রের মূল সুর – “অগ্নেনয় শুপথারায় অস্মিন…”-এর মিল পাওয়া যায়। আবার ১১ সংখ্যক মন্ত্র, “বিদ্যাম্‌ চ অবিদ্যাম চ…” এর সাথে ৫৬-সংখ্যক কবিতার “ত্রাসে লাজে নতশিরে নিত্যনিরবধি….”। ৯ সংখ্যক মন্ত্র “অহ্মম্‌ তব প্রবিশন্তি”-র প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়েছে ‘গীতাঞ্জলি’-র এই গানে –
“অন্ধজনে দেহ আলো, মৃতজনে দেহ প্রাণ ।”
আরো কিছু গানে, কবিতায় উপনিষদের প্রভাব খুঁজে পাওয়া যায়। রবীন্দ্রনাথের ‘খেয়া’-র ‘বিকাশ’ কবিতায় ঊষার যে সৌন্দর্য্যময়ী রূপ পাওয়া যায়, সেই রূপই ধরা পড়েছিল কয়েক হাজার বছর আগে বিশ্বামিত্রের উমা বন্দনায়। ঋক্‌বেদের এই ছত্রে এর প্রতিধ্বনি মেলে – “আবা শূন্যমেদ ছিন্নতি মধ্যানুশ।” ঋক্‌ বেদ সংহিতার অন্য একটি মন্ত্র, “মধু বার্তা ঋতায়তে মধু ক্ষরন্তি সিন্ধব”-র সাথে আমরা মিল খুঁজে পাই ‘আরোগ্য’-র এই কবিতার –
“এ দ্যুলোক মধুময়, মধুময় এ পৃথিবীর ধূলি”।
ঋক্‌ বেদের অপর একটি মন্ত্র – “সংগচ্ছদ্ধম্‌ সংবদদ্ধম্‌”-এর সাথে অপূর্ব মিল পাই এই গানটির –
“এক সূত্রে বাঁধিয়াছি সহস্রটি মন
এক কার্য্যে সঁপিয়াছি সহস্র জীবন ।”
ভারতবর্ষের বহু প্রাচীন শ্লোকের মধ্যে যে অন্তর্নিহিত সত্য লুকিয়েছিল, তাই রূপ নিয়েছিল ঊনবিংশ শতাব্দীতে, বাংলার নবজাগরণের যুগে কিছু মনীষীর চিন্তাজগতে। দুঃখের মধ্যেও যে অবিমিশ্র আনন্দ সুপ্ত আছে, প্রকৃতির মধ্যে যে বিশ্বপ্রেমের বীণা অনুরণিত হয়, সৃষ্টির মধ্যে যে শাশ্বত শান্তির আভাস পাওয়া যায়, তারই আধ্যাত্মিক ব্যঞ্জনা পরিস্ফুট হয়েছে বেদ ও উপনিষদে। তাই বোধহয় রবীন্দ্রনাথ তাঁর বেদনাবিধুর জীবনে কখনো হার মানেননি, শক্তি যুগিয়েছিল হয়ত উপনিষদের অমৃতবাণী।
“মরিতে চাহিনা আমি এ সুন্দর ভুবনে
মানবের মাঝে আমি বাঁচিবারে চাই ।”
উনবিংশ শতাব্দীতে যখন জাতির জীবনে মহা সংকট আসন্ন, সেই সময় বাংলার সমাজ দর্পণে তিন ধরণের সমাজ চেতনা প্রতিবিম্বিত হয়েছিল- ক) প্রাচ্যবাদী, খ) পাশ্চাত্যবাদী ও গ) প্রগতিবাদী। রামমোহন, দেবেন্দ্রনাথ ও রবীন্দ্রনাথ এই তৃতীয় ধারার চিন্তাজগতের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। তাঁরা প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য দর্শন, বিজ্ঞান ও সাহিত্য –দুইয়ের সাথেই পরিচিত ছিলেন। উভয় সংস্কৃতির উৎকৃষ্ট বিষয়গুলিকে নিয়ে তাঁরা গড়তে চেয়েছিলেন এক মিলন সেতু। সে যুগের ভাঙনধরা, ক্ষয়িষ্ণু সমাজে এক বলিষ্ঠ পদক্ষেপ রেখেছিলেন এই তিন মনীষী। সেই সময়ে কিছু মানুষ রক্ষণশীল প্রাচীন গোঁড়ামির মধ্যে ভারতের ত্রাণের উপায় দেখেছিলেন, কেউ বা চেয়েছিলেন পাশ্চাত্যের অন্ধ অনুকরণ। কিন্তু এই প্রগতিবাদীরা যুক্তিবাদী ছিলেন। তাঁরা প্রাচীন ভারতীয় সংস্কৃতির ঐতিহ্যময় যুগ থেকে আহরণ করেছিলেন বেদ উপনিষদের মূল্যবান মন্ত্র, অন্যদিকে সঞ্চয় করেছিলেন ইউরোপীয় সংস্কৃতির ও প্রগতির সমৃদ্ধময় সামগ্রী। এরই মধ্যে উপনিষদের বাণী, যা একদিন বৈদিক ভারতে উচ্চারিত হয়েছিল ঋষিদের মাধ্যমে, তা ভারতবর্ষে বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্যের পথকে সুগম করেছিল, সৃষ্টির অপার মহিমাকে জাগরূক করেছিল, গ্লানির মধ্যে আনন্দের স্বাদ এনেছিল এবং কন্টক-বিদীর্ণ সমাজে এনেছিল যুক্তি, শান্তি ও প্রগতির আশ্বাস। রেনেসাঁ যুগের এই মহানায়কদের বিপুল সাহিত্যকর্মের মধ্যে ঔপনিষদিক প্রভাব তাঁদের চিন্তার জগতকেই শুধু অলংকৃত করেনি, শিক্ষাকামী সমগ্র ভারতবর্ষীয় আন্দোলনকেই এক নব রূপ দান করেছিল।
ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।