আমি দীপা । নামটা বাপির দেওয়া । মায়ের মণি টুকু নিজের কাছে রেখে দীপাটা আমায় দিয়েছে ।নচিকেতার এই গানটা আমার খুব প্রিয় । তবে আজ কেন ভাল লাগছে না ! ভিতর থেকে দুঃখ দলা পাকিয়ে উঠছে,! জানি না কেন?
“একলা মানুষ মাতৃগর্ভে একলা মানুষ চিতায়
একলাপুরুষকর্তব্যেএকলাপুরুষ পিতায়
আর মধ্যিখানের বাকিটা সময়
একলা না থাকার অভিনয়,,
একলা না থাকার অভিনয়,,”
হ্যাঁ, আমি ডাইরি লিখি। ডাইরিতে লিখে রাখি নিজের কথা। আজও লিখছি। আজ আমার মন ভাল নেই । যেন পৃথিবীর সব মনখারাপ আমার ভিতরে কেউ ঢুকিয়ে দিয়েছে। আজ মনে হচ্ছে বাপির কথা লিখি ।’ দত্তা’ পড়ছিলাম। বাপি আর মায়ের বিয়েতে বাপির এক বাপির এক বন্ধুর উপহার ছিল। ভাল লাগল না । গান শুনতে গেলাম । নচিকেতার গানটা “যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে তবেই নাকি একলা চলতে হয়,, “ । মনটা আরও খারাপ হয়ে গেল । অথচ আমার মন ভাল থাকারই কথা । কদিন বাদে আমার পঁচিশ বছর বয়স হবে । এই বয়স-টা দৈর্ঘ্যের হিসাবে বড় না গুনে ,জানি না। শুধু জানি এই বয়সের একটা মূল্য আছে । এই বয়সটা এমন একটা বয়স যে বয়সে বুকে ভ্রমর এসে বসে। তবে সেই গল্পটা ছোট করেই লিখব । কাল অর্ণব দের বাড়ি থেকে আসছে। হয়ত পাকা কথাই বলতে আসছে । বাপির কাছে আমি কিছু লুকাইনি । বাপি আমার সব । মা বল বন্ধু বল । যে বয়সে স্মৃতি থেকে যায় সেই বয়স থেকে জেনেছি । বাপি স্কুলে যাওয়ার সময় জামা পড়িয়ে দেওয়া স্নান করে ব্যাগ গুছিয়ে দেওয়া আর নিজের জামা পড়ত বোতামগুলো সব আগে পরে । আমার খুব হাসি পেত । আমার প্রথম পিরিয়ডের সময় কি বুঝেছিল জানিনা । মাসিকে ডেকে এনেছিল । মাসিই বুঝিয়ে দিয়েছিল । তখন পিরিয়ড কথাটা এত অতি-সরল ছিল না । খুব তাড়াতাড়ি আমি আমার কাজ গুলো শিখে নিয়েছিলাম । সে সব বলতে গেলে মহাভারত হয়ে যাবে । আমি জানি বাপি নচিকেতার গানটার মত একলা না থাকার অভিনয় করে । আমি ঠিক করে নিয়েছি অর্ণব কে বলব বাপিকে আমি একলা রাখতে পারব না । আমাদের পাশের সিঙ্গেল ফ্লাটটায় নিয়ে যাবো । হয়ত বাপি রাজি হবে না । এই ফ্লাটটায় মায়ের স্মৃতি জড়িয়ে আছে । বাপি বলে মণি মানে আমার মা নাকি খুব লাকি ছিল । বিয়ের পর বাপির উন্নতি এই ফ্লাটটা কিনেছিল । সব নিজের হাতে গুছিয়েছিল ।মায়ের সব গল্প বাপির কাছ থেকে শোনা । আমি জানি অর্ণব আমার সব কথা বুঝবে ।
সুজয়
সকাল ৭টা
নাম না জানা পাখিটা সকাল থেকে সুন্দর সুর করে ডেকে যাচ্ছে, সুজয়ের ঘুম সবেমাত্র ভেঙেছে, পাখির ডাকটা কানে যেতে জানালার দিকে তাকিয়ে দেখতে পেল পাখিটা হলুদ রঙের গলার কাছটা কালচে রঙের, গ্রাম বাংলার পাখি নয়, শীত কালে এরা পাহাড়ী এলাকা ছেড়ে এদিকে চলে আসে কদিন ধরে ভালো ঠান্ডা পরেছে, সুজয় কম্বল টা টেনে নিয়ে পাশ ফিরে শোয় ।
“মণি অনেকক্ষণ আগেই উঠে গেছে। বালতিতে জল ভরার আওয়াজে সুজয় বুঝতে পারে মনি বাথরুমে স্নান করছে, সুজয় ভাবে এখন হয়তো সাবান জলে ধুয়ে ফেলবে রাতের ভালোবাসার স্মৃতিচিহ্ন, আচ্ছা ভালোবাসার দাগ কি সাবান জলে ধুয়ে যায়, ! এই সব ভাবতে ভাবতে গতরাতের কাটানো মুহুর্তে গুলো মনে করে মৃদু অনুভূতিপ্রবণ হয়ে পরে, টেবিল ঘড়িতে সময়টা দেখে নেয়, সবে মাত্র সাতটা বাজে, তারপরে আজ রোববার কি হবে এত তাড়াতাড়ি উঠে, ততক্ষণ মণি আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চুল ঠিক করছে, তারপর ঠাকুর ঘরে যাবে, এই সময় প্রতিদিন ঠাকুর ঘরে মায়ের সাথে পুজোর জোগাড় করে । মাকে দেওয়া কথা গুলো মনে আছে সুজয়ের, দেখো মা মণিদীপা খুব সুন্দর মেয়ে তোমার কোনো অসুবিধা হবে না! , ও খুব সুন্দর ভাবে মানিয়ে নিতে পারে, আমার উপর এইটুকু আস্থা রাখতে পারো। মা শুধু একটা কথাই বলেছিল, ভাল হলে তো ভালোই। অনেক দিন পর মণিকে খুব সুন্দর লাগছে প্রতিদিনই দেখে কিন্তু আজ একদম অন্যরকম সুন্দর, কি জানি , কেন আজ সকাল থেকে সব কিছুই খুব সুন্দর লাগছে ! প্রথমে হলুদ পাখিটা, তারপর জলের শব্দ ,,সবকিছু, হলুদ পাখি টার কথা মনে পড়তেই জানালার দিকে তাকায়, সুজয় বলে ওঠে, দেখো মণি পাখিটা কি সুন্দর!, মণি জানালার কাছে আসতে ডাক দিয়ে উড়ে গেল, সুজয় বলে যাঃ উড়ে গেল, কতক্ষণ ধরে বসে ছিল, সুন্দর ডাকছিল, ভাবছিলাম ছবি তুলে রাখি আর তোলা হয়নি, মনি বলল হলুদ পাখিটা তো, ওতো প্রায়ই আসে তুমি খেয়াল করনা, মণির চোখ পড়তেই হেসে ওঠে, সুজয় বুঝতে পারে না মণির হাসির কারণ কি, হাত দিয়ে ইশারা করে দেখিয়ে দিতে বুঝতে পারে কালকে রাতে লেগে যাওয়া লিপস্টিকের দাগটা এখনো গালে লেগে আছে,
“ আজ কত তারিখ খেয়াল আছে!, “
‘কেন ৫ডিসেম্বর, “
“শুধুই৫ডিসেম্বর আর কিছু নয় !”
মণি হাসতে হাসতে ঠাকুর ঘরে চলে যায়।
সুজয় কিছুতেই মনে করতে পারে না, বিবাহ বার্ষিকী তো ফেব্রুয়ারি মাসের সাত তারিখে, তালে আজকে কি! সকাল বেলা বড় ভাবনার মধ্যে ফেলে রেখে গেলো মনি, যাওয়ার আগে বলে গেছে গ্যাসে চা করা আছে, খেয়ে নিও,চা খেতে খেতেও মনে পরলো না, এক ঘন্টা হয়ে গেল, মণির ঠাকুর ঘর থেকে আসার সময় হয়ে গেল, সুজয় বুঝে গেছে ও না মনে করালে মনে পরবে না, মণি ঠাকুর ঘর থেকে ফিরে বলল কিগো মনে পরেছে,, সুজয় প্রথমেই হার স্বীকার করে নেয়। মণি বলল তোমরা পুরুষেরা কত সহজেই সব কিছু ভুলে যাও, ঠিক আছে আমি মনে করিয়ে দিচ্ছি। ৫ডিসেম্বর ,কলেজ ফেরত বাস স্ট্যান্ডে, একটা ছেলে বলেছিল ‘তোকে কিছু বলার ছিল মণিদীপা !‘
এবার কি মনে পরেছে?
এবার সুজয়ের মনে পরে গেছে, একটা গান শুনিয়ে দেয় “কে প্রথম কাছে এসেছিল, কে প্রথম ভালোবেসে ছিল,, মণি তখন মুচকি হেসে ওঠে, পাখি টা আবার এসে বসেছে। মণিও দ্যাখে পাখিটা সুর করে ডাকছে। “ হঠাৎই ছবিটা কোথায় যেন হারিয়ে গেল। চব্বিশ বছর পরেও সেইসব কথা পরিস্কার মনে আছে, মনে হয় কালকের ঘটনা। অনেকক্ষণ ধরে আজও একটা পাখি খুব ডাকছে, সবেমাত্র ঘুম ভেঙেছে সুজয়ের । পাশের ঘর থেকে মেয়ে দীপা বলে ওঠে বাপি আজকে এত তাড়াতাড়ি উঠে পরলে এত তাড়াতাড়ি তো ওঠো না তুমি।
“ মন টা ভালো নেই রে দীপা।”
“ আজ ডিসেম্বরের ৫ তারিখ না?”
, দীপা কিছু বুঝতে পারে না, পাখি টা তখনও ডেকে যাচ্ছে।
‘বাপি চা খাবে,, ‘
সুজয় ভলান্টিয়ার রিটেয়ারম্যান্ট নিয়ে নিয়েছে অনেকদিন আগেই ।বিশেষ কোন কাজ নেই,তাই সুজয় বলল , পরেই কর! ,সুজয় ভাবল মেয়েটা দেখতে দেখতে কত বড় হয়ে গেলো, সামনের মাসে ২৫ বছর হয়ে যাবে ! পাখিটা এখন আর নেই হয়তো উড়ে গেছে খেয়াল করিনি। সুজয় পাশ ফিরে শুল। ছবিটা আবার ভেসে উঠল।“বাথরুমে জলের শব্দ, বালতিতে জল ভরছে। মণি স্নান করবে । ভিতর থেকে মণি বলল “এই কিগো , দেখো তো, নাইটির পাশে একটা জিনিস আছে দাও তো, দেখবে ফুল ফুল যেটা ভিতরে পরে, নিতে ভুলে গেছি! ‘মণি ব্রেসিয়ারের কথা বলছে! আবার বলল “কিগো আজ বিকালে সময় হবে । বেরব একটা জিনিস কিনতে হবে! কিগো শুনছ এটা খুব টাইট হয় । আটট্রিস লাগবে। কিগো দাও এই যে হাত বাড়িয়ে আছি ।।” মণি দরজাটা একটু ফাঁকা করে! ফরসা হাতটুকু ছাড়া কিছু দেখা যাচ্ছে না । ইচ্ছে করেই হাতে না দিয়ে একটু উপরে ধরে আছি। দেখি কি করে ‘কি গো দাও, মণি নাও দিয়েছি তো !, আরও একটু খোলো না কেউ তো নেই ।
‘আরে একুশটা থাকে! ড্রয়ারে আছে, দেখ খালি প্যাকেটটা আছে!”
সুজয় কথাগুলো ভাবছিল পরিস্কার মনে আছে সব ,মনে হচ্ছে সব যেন কালকের ঘটনা ! আজ খুব মণির কথা মনে পরছে, ওর একটাই ছবি আছে, আরও দুটো ছিল, দার্জিলিং এ তোলা কিন্তু লুকিয়ে রেখেছি না হলে ছোট বেলায় দীপার কৌতহলী প্রশ্নের জবাব দিতে হিমসিম খেতে হতো। ওর মুখের দিকে তাকিয়েই তো, । কথাটা খারাপ হলেও সত্যি! দশ মাস পেটে না ধরলে সে পুরোপুরি মা হতে পারে না । সৎমার নজির খুব একটা ভাল নয় । তাছাড়া মণির জায়গায় অন্য কাউকে বসাতে পারতাম না। ভাবতে ভাবতে সুজয়ের চোখে জল আসে। “সামনের মাসে দীপার জন্মদিন ছোট বেলায় যখন বুঝত না ওর মন রাখতে ইচ্ছার বিরুদ্ধে গিয়ে জন্মদিন করতাম। তারপর একদিন নিজেই বলে, বাপি ,এবার থেকে আর জন্মদিন করবে না। আমার জন্মদিন মানেই তো মায়ের,,, । “ সুজয়ের কিছু দিন ধরে শিলিগুড়ির কথা খুব বেশী করে মনে পরছে, কিছু দিন আগে দীপাকে ফোন করেছিল সুতপা, বলেছিল জামাই বাবু কে নিয়ে আসতে পারিস তো কিছু দিনের জন্য ঘুরে যেতিস ।সেই ছোট বেলায় একবার দীপাকে শিলিগুড়ি থেকে দার্জিলিং ঘুরিয়ে নিয়ে এসে ছিলাম , ছবি গুলো সবই রাখা আছে, আজ ছবি গুলো খুব দেখতে ইচ্ছা করছে। এই সময় দীপা ঘরে ঢোকে দ্যাখে বাপির চোখে জল, দীপা বলে মায়ের কথা মনে পরছে, না বাপি ? সুজয় কিছু বলতে পারে না চশমা খুলে জল লুকোনোর চেষ্টা করে। দীপা বলে বাপি মনে আছে তো আজ অর্ণব দের বাড়ি থেকে ওর বাবা আসবে, সুজয় ভুলেই গেছিল অনেকদিন আগেই দীপা বলেছিল ওদের পরিবার দেখা করতে চায়। সুজয় দীপাকে বলে আসবে, আমি তো বাড়িতেই থাকি, অসুবিধা কি,, সুজয় দীপার মুখের দিকে তাকিয়ে ভাবে, মেয়েরা কত তাড়াতাড়ি বড় হয়ে যায়, ছোট বেলায় বিয়ের কথা বললে রেগে যেতো আর আজকে নিজেই,,
দীপা বলে কি ভাবছ বাপি,,
কিছু না, ভাবছি তোর বিয়ে হয়ে যাবে, চলে যাবি, তার পর,,,
দীপা কখন রান্নাঘরে চলে গেছে খেয়াল করেনি, সুজয় মণির ছবির দিকে তাকিয়ে থাকে ভাবে বিকালে অর্ণবের বাবাকে কি বলবে, আজ যদি তুমি থাকতে, মায়েদের অনেক প্রশ্ন থাকে!জানালার দিকে তাকায় সুজয়, আজ একটা হলুদ পাখি মুখে করে খড়কুঁটোর মত কিছু নিয়ে এসেছে ,পাখিদের সংসারে যেমন খড়কুঁটো মানুষের সংসারে তেমনি স্মৃতি!
পাখিটা নিশ্চয় সঠিক জায়গা খুজছে যেখানে নিরাপদে থাকবে ।যেখানে বাসা বানানো যায়।