জামশেদপুরে আবার বড় ভাসুরের দুখানা কুকুর। তাদের লোম সর্বত্র উড়ছে। সেখানে একাধিক বার নিজের মেয়ের মুখ থেকে কুকুরের লোম টেনে বার করতে হয়েছিল। বড় জা-কে কিছু বলার শাহস হয় না। কিন্তু বোঝা গেল শ্বাশুড়ির হাত থেকে বাঁচতে বড় জার আড়ালেই লুকোতে হবে, কারণ বড় ছেলে আর বৌকে জাঁদরেল জগদম্বাও সমঝে চলেন। রুমা কাউকে কিছু না বলে তাই নিজের ব্লাউজটা অন্য কাপড়ের সাথে জড়কে কাচতে ফেলত না। প্রাতঃকৃত্য সেরে ফেলার পর অতীনকে বলে কয়ে কেনা আলাদা একটা ছোট্ট প্লাস্টিকের গামলায় কেচে নিয়ে ডেটল জলে ধুয়ে মেলে দিত। তাতেও শ্বশ্রুমাতার রাগ। এত ভালো শ্বশুরবাড়ি, কাজ করতে বলা হচ্ছে না। তবু কেন নিজের বাতিকের জন্য নিজের জামা আলাদা কাচবে? উনি যখন বিধান দেননি, ছোট বৌয়ের এত সাহস হয় কী করে?
উনি না হয় ঝি চাকরের সাথেও এভাবে কথা বলেন না তারা টিঁকবে না বলে; কিন্তু সবচেয়ে বশংবদ ছোটো ছেলের বৌকেও যদি দুটো কথা ঝাঁজিয়ে বলতে না পারেন, তা হলে আর ছেলের মা হয়ে লাভ কী হল? অন্য দুই বৌকে একটা কথা বললে দশটা কথা উল্টে শুনতে হয়। ঐ ছেলেরা বৌদের কিছু বললে মাকে ‘গুয়ে বসিয়ে দেয়’। মেয়ে জামাই যতই হোক কুটুমবাড়ি। তাহলে হাতে থাকল পেনসিল। সেখানেও যদি সেভাবে হম্বি তম্বি করতে না পারেন, তাহলে বেঁচে সুখ কোথায়? এই তো নাতনি ঘরে আসার পর কেমন সোনার চেন গড়িয়ে দিলেন।
কেমন সাহস? ননদের কাছে আবার ঐ ছোটোলোকের মেয়ে, যে বিয়ের পরেও নিজের পদবি চক্রবর্তীর বদলে ব্যানার্জী লেখে, বলেছে, “মাছের তেলে মাছ ভাজা”। মেয়েও তাঁর শুনিয়ে দিয়েছে আচ্ছা্ করে, “ও কথা বলিসনি। ঐ মা-ই অন্তুকে পেটে ধরেছে। কষ্ট করে বড় করেছে। ছেলের কাছ থেকে নিয়ে দেবে না তো কার কাছে নেবে?” শ্বাশুড়ি আর ননদের কথা শুনলে মনে হয়, রুমারা সব বাণের জলে ভেসে আসা, আগাছা কিংবা সয়ম্ভূ। পৃথিবীতে এক মাত্র অন্তুকেই তার মা কষ্ট করে জন্ম দিয়েছেন।
পাণিহাটিতে রুমাদের সংসারে থাকা কালে এক আনা সাহায্য করুন বা না করুন, তিনি উপস্থিত থাকলে তিনিই সর্বময়ী কর্ত্রী। সঙ্গে রয়েছে পেনশন আর বাড়ি ভাড়ার টাকার গুমোর, যদিও সে টাকা উনি সঙ্গে করে বিশেষ না এনে জামশদপুরের সংসারেই খরচ করতেন, এমনকি কলকাতায় এলেও বড় দুই ছেলের জিম্মায় সই করা চেকবই পাসবই ফেলে আসেন। মায়ের খুব প্রয়োজন হলে কুরিয়ার করে চেক বা ড্রাফ্ট পাঠায় ওঁর ভালো ছেলেরা। এর মধ্যে অন্তুর যতটা ধসে উসুক। যখন টাকা হাতে আসবে তখন দেখিয়ে দেবেন, বড় বাড়ির শিক্ষা কী জিনিস? নিজের সংসারে বড় আর মেজ বৌয়ের ওপর ইচ্ছা মতো দুর্ব্যবহার করতে পারেন না। সেই শোধ ছোটো ছেলের সংসারে এসে যদি তুলতে না পারলে চলে?
কী অন্যায় দেখো – এই বেআক্কেলে বৌটা কিনা বাচ্চা বিয়োনোর মতো ধকল নিয়েও সব দিকে নজর রাখছে! বলছে ঘিয়ে ভাজা লুচির বদলে মাখন মাখা রুটি খাবে। চার পিস করে মাছ খাওয়া নাকি সইবে না। না খাক। ছোটোবাড়ির মেয়ে। উনি কেন পুত্রবধূকে যত্ন করার বিনিময়ে নিজের রসনার তৃপ্তি চাইবেন না। ছেলে যেখান থেকে খুশি টাকার যোগাড় করুক। এক মেজ ছাড়া কেউ মায়ের খোঁজ নেয় না। বাচ্চা হওয়ার খরচের বাহানায় সামান্য হাজার দশেক টাকাও দিতে পারল না অন্তু। সব ঐ বৌয়ের প্ররোচনায়। সেই ছেলের মেয়েকে কিছু দিতে হাত সরে? একটা সুযোগ আসুক, ওর বৌকে পা ধরিয়ে ক্ষমা চাইয়ে নেবেন। হ্যাঁ, সেটা পেরেছিলেন। আবার আড়াই মাসের বাচ্চাকে জামশেদপুরের ঠান্ডায় নিয়ে গিয়ে পরিত্যক্ত দুষিত ঘরে রেখে পরিচ্ছন্নতার বড়াইও করতে পেরেছিলেন।
গলার কষ্ট রুমার বারো মাস। বাধ্য হয়ে বছরে কয়েকবার স্টেরয়েডও নিতে হয়। কিন্তু বাচ্চাকে দুধ খাওয়াতে হবে বলে ঐ ওষুধ এড়াতে বিটাডাইন দিয়ে বার বার গার্গেল করত – দিনে দশ বারো বার পর্যন্ত। বড় জায়ের বোতলটাও শেষ করে ফেলেছিল। দিদিভাই বিটাডাইন মাউথওয়াশ হিসাবে ব্যবহার করত। এই নিয়েও শ্বাশুড়ি ঠাকরুনের বিরক্তি। দিদিভাই তারপরেও রুমা ও তার ঘরখানার বেহাল অবস্থা দেখে রোজ রাতে ওর কম্বলের তলায় গরম জলের ব্যাগ ঢুকিয়ে দিয়ে যেত।
ওদিকে জামশেদপুরের ধারালো ঠাণ্ডার মধ্যেও বাচ্চার মাথা থেকে রুমার পরানো টুপি খুলে নিতেন ঠাকুমা। কারণটা ছোটো বৌ পরিয়েছে বলে না বড় বৌয়ের দেওয়া বলে স্পষ্ট নয়। দুটোই কাজ করত মনে হয়। বড় বৌ তো বড় ছেলের মতই জুজু। তাকে কিছু বলতে পারছেন না যখন, তাহলে তার দেওয়া টুপিটাই খারাপ বলে ছুঁড়ে ফেলা যাক। ওনার হাত থেকে বাঁচতে দুই জায়ের আড়ালে আশ্রয় নিতে হোত রুমাকে। মেজ জা শাশুড়ির সুনজরে থেকে একটু মিচকে হলেও বাচ্চার ব্যাপারে মায়ের উল্টো পাল্টা কাজ কর্ম সমর্থন করত না। ঐ শত্রুশিবিরে থেকেও রুমা খোঁচা খেয়ে সব সময় কেঁচো হয়ে থাকতে পারত না, মাঝেমাঝে ফোঁস করে উঠত।