স্নানের গামলায় বসানোর আগে তুলনামূলক কম গরম জলে বাচ্চার মাথা ধুইয়ে দেওয়ার নিয়ম শাশুড়ি ননদের কাছেই শেখা। কিন্তু দেখেছে স্নানের গামলায় বসানোর পর ছুনছুন করে কন্যে হিসি করে ফেলেন। তাই রুমা বাচ্চার মুখটাও তার দেহ ডোবানোর আগে ধুইয়ে দিতে চাইত। এতে পিসির সমর্থন থাকলেও মায়ের মাথায় এসেছে বলে ঠাকুমা কিছুতেই অনুমতি দেবেন না। তাই রুমার ডান হাতের আলতো পরিচ্ছন্ন পরিচর্যার পর ওঁর হেগো হাত এগিয়ে আসতো শিশু মুখে নিজের কর্তৃত্ব জাহির করতে। একেক সময় রুমার ডান হাত আর সরস্বতীর বাঁ হাত যেন প্রতিযোগিতায় নামত। বার ছয়েক ডলা মোছার পর দেড় মাসের শিশু কেঁদে উঠলে মাকেই হার মানতে হোত, কারণ ঠাকুমা অপরাজেয়। শ্বাশুড়ির তাণ্ডবে ননদ ভরসা। তাই খরচের চিন্তা ভাবালেও রুমার মনে হোত দিদি থাকুক, মেয়েটার ঠিকঠাক পরিচযর্যা হোক; কারণ ননদ মায়ের দোষ না দেখলেও ভাইয়ের বৌকে অকারণে পীড়া দেওয়ার পক্ষপাতী ছিল না। বরং সাহায্যই করতে চাইত। নার্সিংহোম থেকে ভাইজিকে কোলে করে নিজের গাড়িতে চড়িয়ে সেই তো এনেছে।
ওদিকে নাতনি পাছে হিসি করে, তাই তার ঠাকুমা নিজের বিছানায় রাখতে দিতেন না। বাধ্য হয়ে একবার মেয়েকে রোদ খাওয়ানোর জন্য রুমা দালানের রোদে শুইয়ে রেখেছিল। তারে মেলা ভেজা কাপড় থেকে তার পাশে টুপটাপ জল পড়তে দেখে ননদই রুমাকে ধমকে মায়ের বিছানায় নিয়ে গিয়ে শোয়ায়। তারপর থেকে অবশ্য নাতনিকে নিজের বিছানায় শোয়ার অধিকার দিয়েছিলেন, অবশ্যই প্লাস্টিকসহ। মুখে শুধু স্বাস্থ্যের বুলি আউড়ে সংস্কারের কথা স্বীকার না করলেও আঁতুড় না কাটা বাচ্চা ও তার মায়ের ঠ্যাকাছোঁয়া যে তাঁর একদম পছন্দ ছিল না, তা বেশ বোঝা যেত। অথচ উদারতা দেখানোর জন্য এবং ছোট বৌকে শায়েস্তা করার জন্য বৌয়ের অমতে মুসলমান কাপড় কাচুনিকে হেঁসেলে বহাল করেছিলেন। মুসলমান বলে নয়, পাঁচবাড়ি কাপড় কেচে বেড়ানো হেগো কাপড় না মানা মেয়েটাকে রান্নাঘরে ঢোকানোয় উচ্চ শিক্ষিতা রুমার সত্যিই খুঁতখুতুনি ছিল।
মেয়েটা আবার কাপড় কেচে নগদ রোজগার আর রান্নার কাজে মোটা মাইনে, কোনওটাই হাতছাড়া করতে চাইত না। তাই কাপড় কাচতে বেরোলে বাঁধা মাইনের বাড়িতে সময় মতো ফেরার প্রয়োজন মনে করত না। এমনকি পাড়ায় এলেও রুমার হেঁসেলে হাজিরা না দিয়ে লুকিয়ে অন্যদের কাপড় কেচে ফিরে যেত। কারণ রান্নার মাইনেটা ধ্রুবক, কাপড় কাচার নগদ রোজগারটা চলরাশি। এইসব নিয়েও অসন্তোষ আর কার ওপর ঝাড়বে? সুতরাং অতীনকে অফিস থেকে ফিরেই যুগপৎ মা ও বৌয়ের পরস্পর বিরোধী নালিশ শুনতে হোত। রুমা অনেক সময় রাঁধুনি-কাচুনির ওপর অল্প কারণেও রুঢ় ব্যবহার করে ফেলত; কেননা মেয়েটা রুমার সংসারে তাকেই অবজ্ঞা করে শ্বশ্রুমাতার আজ্ঞাবাহী ছিল।
বৌকে যত্ন করার জন্য সরস্বতীদেবীর ছোটো ছেলের ভাড়াবাড়িতে কষ্ট করে আছেন বলে আস্ফালন করতেন। ছোটো বৌকে দুধসাবুর গ্লাস বা বাটি তিনি হাতে করে এনে দিতেন ঠিকই, কিন্তু তাই বলে খালি পাত্রটা বৌয়ের হাত থেকে নেন কী করে? ছোট পুত্রবধূ নাম্নী একজন অন্তজর উচ্ছিষ্ট যে! বাচ্চা কোলে আছে বলে একবার শাশুড়িকে দুধসাবু খাওয়া গ্লাসটা ধরতে বলে ফেলেছিল। স্পর্ধা দেখে তুলকালাম! ছেলেও মায়ের সম্মান হানিতে বেজায় রুষ্ট। বৌকে যৎপরোনাস্তি খিঁচিয়ে, পড়ে থাকা গ্লাসটা হাতে করে রান্নাঘরের সিঙ্কে রেখে এসে শাসন করেছিল –“তুমি বোঝ না, নাকি ইচ্ছা করে ন্যাকামো কর? এঁটো গ্লাসটা মাকে ধরতে বললে?”
সব চেয়ে আশ্চর্য, নবজাতিকাকে কিছু কিনে দেওয়ার বদলে মেয়ের বাড়ির সবার জন্য, এমন কি বোনপো বোনঝি বা তাদের বাচ্চাদের উপহার কিনে দিতেন। আর হিংস্র নিষ্ঠুরতায় বলে যেতেন, “জামা দেব, বাসন দেব, দোলনা কিনে দেব। তোর দিদিকে কত কিছু দিয়েছি। তোকেও দেব। তোকে তো যারা দেখতে আসছে কেউ তো ভালো কিছু দিচ্ছে না। তোর দিদিকে যারা দেখতে আসত, তারা এই এত জিনিস আনতো।” ছেলে চাপা অভিমানে মায়ের দেওয়া মিথ্যে প্রতিশ্রুতি সত্যি করতে অফিস থেকে ফিরে নিজেই আবার ঠাণ্ডায় বেরিয়ে বাজার ঘুরে এলোমেলো পোষাক খেলনা কিনে আসত।
মুখের ভাষাই ছিল, “সব সময় অন্তুকে আগলে রেখেছি”। কীসের আগলানো, রুমা আজও বুঝল না। ছোটো ছেলেকে নিঃস্ব করে দেওয়ার প্রচেষ্টাই কি তার ভালো চাওয়া? ছোটো ছেলে ও বৌয়ের থাকার ব্যবস্থা করতে দরকারে ভাড়া উঠিয়ে ঘর বন্দোবস্ত করবেন বলে বছরের পর বছর ল্যাজে খেলাচ্ছেন। আর সকালের কথা সন্ধ্যায় ঘুরিয়ে দিচ্ছেন। অতীনের হেলদোল নেই। একটাই যুক্তি, “মা জন্ম দিয়েছে, বড় করেছে”। যেন আর সমস্ত ভাই-বোনেরা সয়ম্ভূ, তাদের কষ্ট করে জন্মও দিতে হয়নি, লালন পালনও করতে হয়নি। ওনার নিজের মুখেরই কথা, “অন্তুর বেলা কোনও কষ্ট পাইনি। ও তো আমার হেলা ফেলা করে মানুষ”। কিন্তু “সবচেয়ে ভালো ছেলেটার আজ বিয়ের পর সব চেয়ে অধঃপতন” দেখে মনে হয় ছেলেকে জন্ম দিতে ও মানুষ করতে যা কষ্ট করেছেন, ভূভারতে তার তুলনা হয় না। আর ছেলে মা যখন যেদিকে, তখন সেদিকে হেলে কথা বলে; নিজের পায়ে কুড়ুল মেরেও। এই বৈমাত্রেয় আচরণের জন্য কোনও অভিযোগ তো দূর, অভিমানও নেই। ঐ চতুর মিথ্যেবাদী ঐ মহিলাকেই বিশ্বের শ্রেষ্ঠ সচ্চরিত্র মানুষ হিসাবে প্রতিষ্ঠার জন্য অতীনও কি কম মিথ্যে বলে, নিজেকে কম ঠকায়?
বিপুল খরচ পোষাতে বাচ্চা নিয়ে জামশেদপুর যাবার প্রস্তাবে রুমা প্রথমটায় সায়ই দিয়েছিল। কিন্তু শেষে ভদ্রমহিলার হাবভাব দেখে পিছিয়ে যেতে চেয়েছিল। কিন্তু অন্নপ্রাশনের আয়োজন ওখানে করবেন বলাতে ছেলে রাজি। একরকম জোর করেই রুমাকে রাজি করিয়ে ট্রেনে চাপানো হয়েছিল। বড্ড দুধ তোলা আর বমির ধাত ছিল গুবলুর। ঠাকুমার শাড়িতে মুখ থেকে দুধের ফোঁটা ফেলার অপরাধে, ওর মুখ মোছা রুমাল দিয়ে ঠাকুমা প্রথমে নিজের শাড়ি ও তারপরে নিজের সীটখানা পরিস্কার করে রুমার অস্বস্তি আপত্তি অগ্রাহ্য করে ঐ নোংরা সীট মোছা কাপড়টা দিয়েই নাতনীর কচি ঠোঁট মুখ ঘষে দিলেন। ছেলে একটু মিনমিন করে চুপ। এই যখন ভূমিকা, তখন উপসংহারটা কেমন হবে ভেবে শঙ্কিত হয়েছিল রুমা।